Ads

https://www.cpmrevenuegate.com/b8yhybmrq8?key=9f4e3679f1c8c81a3529870bf1b4e18f
"ভয়" লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
"ভয়" লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৫


 


আমাকে কোলে তুলে নিয়ে অভ্র ঘরের বাইরে পা রাখতেই ফস করে কালো কি একটা দৌড়ে গেল। অভ্র ব্যালেন্স হারিয়ে আমাকে নিয়ে প্রায় পড়ে যেতে যেতে ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেল।


বাইরে চাঁদের আলোয় আলোকিত তবুও দ্রুত বেগে দৌড়ে যাবার কারণে সেটা কি ছিল বোঝা যায়নি। 


অভ্র এবার আমাকে নিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য দুই পা সামনে এগোতেই থমকে দাড়ালো। অভ্র যেটা দেখছে আমিও তাই দেখছি। রজনীগন্ধার ঝোপের ভেতর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে জ্বলন্ত চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোতের ধারা বয়ে গেল।


অভ্র আমাকে ধীরে ধীরে কোল থেকে নামিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্লাশলাইট জ্বেলে রজনীগন্ধার ঝোপের দিকে আলো ফেলে একটা ঢিল ছুড়ে মারতেই দেখলাম একটা কালো বিড়াল বিশ্রী সুরে মিঁয়াও ডেকে দৌড়ে পালালো। 


অভ্র আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো– বুঝলে এবার, বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘে খায় বেশি। ভয়ের কারণ বিশ্লেষন না করে ভয় পাওয়া বোকামি। 


আমরা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাচ্ছি পুকুরের দিকে। রক্তজবার বাগানটা অতিক্রম করে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে রক্তজবার বাগানে জোরেসোরে দোল দিয়ে যেতেই আচানক রক্তজবার বাগানে আলোকিত হয়ে উঠলো জোনাকি পোকার আলোয়।


আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি রক্তজবার ঝোপের দিকে, সব কিছুই স্বাভাবিক আবার অস্বাভাবিক। তারচে বেশি অস্বাভাবিক সুন্দর লাগছে ডালে ডালে পাতায় পাতায় জোনাকিরা বসে ছন্দে ছন্দে যে আলো জ্বালছে। 


আমি পুরোপুরি বিমোহিত হয়ে অপলক তাকিয়ে উপভোগ করছি রাতের প্রকৃতির এই আজব আয়োজন। 


হঠাৎ দেখলাম একটা রক্তজবা ফুল বোটা থেকে খসে টুপ করে মাটিতে পড়লো। বাতাসে আবার ফুলটা গড়াগড়ি খেতে খেতে আমার প্রায় সামনে চলে এসেছে।


আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো ফুলটা তুলে খোঁপায় গোঁজার। দুই পা এগিয়ে ঝুকে পড়ে ফুলটা তুলবো এমন সময় অভ্র পেছন থেকে আমাকে টেনে তুলে বললো– কি করছো ওতে ধুলো মেখে গেছে তো।


আবার একটা দমকা হাওয়ায় ফুলটা দূরে কোথাও উড়ে গেল। 


মাথার ওপরে রূপালী চাঁদ, চাঁদের স্নিগ্ধ আলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে পৃথিবীতে আর খোলা আকাশের নিচে প্রিয়তমার হাতে হাত রেখে সে আলো গায়ে মেখে আমি যেন এখন কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করছি। 


ধীরে ধীরে আমরা শানবাঁধানো ঘাটে এসে বসলাম। পুকুরের জল চাঁদের আলো মেখে চিকচিক করছে। বাতাসে দোল দিয়ে যে মৃদু ঢেউ তুলছে সেই ঢেউয়ে পুকুরের পদ্মফুল যেন হেলেদুলে নাচছে। 


আমি অভ্রর কাঁধে মাথা রেখে বললাম– একটা কবিতা শোনাবে? 


অভ্র মিষ্টি হেসে আমার কপালে চুমু খেয়ে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কবিতা শুরু করলো–


আমি তোমার হাতে হাত রেখে হেটে যেতে চাই দূর হতে বহুদূরে, বলতে গেলে সেখানে, যেখানে জীবনের সীমারেখা টানা আছে। যদি জীবন সীমারেখা টেনে দেয় তবে বিধাতার কাছে ওপারের জনমেও তোমাকেই চেয়ে নেবো।


সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নামুক, অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো নিস্তব্ধ পৃথিবী জানুক আমি তোমার হাত ধরে হেটে চলেছি গন্তব্যহীন পথে। তেপান্তরের মাঠ পেড়িয়ে ঘন গভীর বন পেড়িয়ে যেতে যেতে হোক রাত গভীর। আমরা ক্ষানিকটা জিরিয়ে নেবো ঝোপের পাশের কোনো দূর্বাঘাসের চাদরের ওপর বসে, অন্ধকারে জোনাকিপোকার আলোর মিছিলে হারাবো দুজন। আমাদের এ যাত্রার সাক্ষী হবে জোনাক পোকা, সাক্ষী হবে ঝোপের ভেতর থেকে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়া রাতজাগা পাখিরা। সাক্ষী হবে রাতের আধার আর সেই পথ, যে পথে হেটে এসেছি এবং হেটে যাবো বহুদূর। 

চলতে চলতে যদি ক্লান্তি এসে তোমার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায় ভেবনা এই বুঝি চলার শেষ। কোলে তুলে নিয়ে আবারও শুরু হবে পথচলা। ফেলে যাবো বলে কাছে আসিনি, ফেলে যাবো বলে ভালোবাসিনি। মানুষটা যখন অস্তিত্বে মিসে যায় তখন তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। তুমি আমার সেই অস্তিত্বে মিসে যাওয়া ভালোবাসা, আমার প্রেম। জীবনের পরেও যদি নতুন কোনো জীবন পাই, সেই জীবনেও আমি তোমাকেই চাই।


কবিতা শেষে অভ্র চুপ করে আছে, আর আমি এখনও সেই কবিতার ঘোরের মধ্যেে ঘুরপাক খাচ্ছি। একটা মানুষ এতটাও ভালোবাসতে পারে?


আনন্দে আমার চোখে জল টলমল করে উঠলো, ক্ষনিকের এই জীবনটা অভ্রকে পেয়ে পরিপূর্ণ আমার। এরকম কাউকে জীবনসঙ্গী করে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের বিষয়। এবং প্রতিক্ষণ নিজেকে বড়ো ভাগ্যবতী মনে হয় আমার।


অভ্র আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখে জল দেখে অবাক হয়ে দুই হাত দিয়ে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো– কবিতা শুনিয়ে যদি মুখের হাসির বদলে চোখের জল দেখতে হয়, তাহলে আমি আর কোনদিন কবিতা শোনাবোনা বাবা।


আমি হেসেফেলে অভ্রর নাক টিপে দিয়ে বললাম– এটা আনন্দের হাদারাম, আনন্দে চোখে জল এসেছে। 


অভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো– জল খালে ফেলে ঠোঁটে হাসি ফোটাও, তোমার মায়াবী হাসি আমার প্রাণকে আরও সতেজ করে তোলে প্রতিটি মুহূর্ত।


পুকুরের ঠিক ওপারে পাড় ঘেঁষে কয়েকটা পদ্মফুল। অভ্র উঠে দাড়িয়ে বললো– একটা পদ্মফুল তুলে আনি তোমার খোঁপায় গুঁজে দেবো। 


কথা শেষে অভ্র এগিয়ে গেল। 


হঠাৎ করে দমকা হাওয়া এসে আমাকে ছুয়ে যেতেই শরীর একটা ঝাঁকুনি খেয়ে শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো।


এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি বারবার অভ্রকে বলতে চেয়েও পারিনি কারণ যদি ভুল বুঝে দূরে সরে যায়। আমি অভ্রকে হারিয়ে বাঁচতে পারবোনা।


এই সমস্যার কারণেই আজ পর্যন্ত অভ্রকে একান্তে কাছে আসতে দেইনি। তবে আমি যে চুপচাপ আছি তা-ও নয়। 


ছোটবেলায় সেই হুজুর বলেছিল আমার ফুলসজ্জার রাত হবে আমার স্বামীর জীবনের শেষ রাত। তার মানে অশুভ শক্তি আমার স্বামীকে মেরে ফেলবে। যদি তাই হয় তবে হুজুর আমাকে যে তাবিজ দিয়েছিল সেই তাবিজের কারণে অশুভ শক্তি আমাকে স্পর্শ করতে না পারলে অভ্রকেও ওরকম একটা তাবিজ দিলেই হয়। তাহলে তো অশুভ শক্তি অভ্ররও কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা। এ-সব ভেবেই মায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে ইতিমধ্যে আলাপ করেছি এবং মা বলেছে আগামীকাল সেই হুজুরকে নিয়ে আসবে আমাদের এখানে। 


এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঘরের জানালার পর্দায় চোখ পড়তেই ভয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে গেল যেন। জানালার পর্দায় ঘরের ভেতর থেকে পড়া একটা জীবন্ত ছায়া দেখে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর কেউ হাঁটাচলা করছে। কিন্তু আমি আর অভ্র ছাড়া তো এ বাড়িতে তৃতীয় কেউ নেই! 


ঝপাৎ করে পানিতে কিছু একটা পড়ার শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম পদ্মফুল তুলতে গিয়ে অভ্র পানিতে পড়ে গেছে। 


দৌড়ে গিয়ে অভ্রকে টেনে তুলে বললাম– এসব পাগলামি কে করতে বলেছে তোমায়, চলো ঘরে চলো।


অভ্র মিষ্টি হেসে একটা পদ্মফুল আমার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে বললো– কিছু পাগলামি স্মৃতি থাকতে হয় জীবনে, যেগুলো মৃত্যুর আগপর্যন্ত জীবন্ত থেকে যায় মস্তিষ্কে।


ঘরে এসে অভ্রর পোশাক চেঞ্জ করা হলে আমরা শুয়ে পড়লাম। 


রাত গভীর।


অভ্র বললো আমার ঠান্ডা লাগছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো আমায়। আমি অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। 


ধীরে ধীরে আমার শরীরে অভ্রর স্পর্শে কেমন একটা অনুভূতির আগমন ঘটছে। নিশ্চই অভ্র ইচ্ছে করে এরকম করছে। 


আমি অভ্রকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললাম– এই যে মিস্টার হাবভাব তো সুবিধার মনে হচ্ছেনা। 


অভ্র হেসেফেলে– হাবভাব অসুবিধারও কিছু নয় মিস, আমরা স্বামী স্ত্রী– বলে এক টানে আমাকে বুকে নিয়ে আমি কিছু বলার আগেই আমার ঠোঁটে ঠোঁট ডোবালো। এই প্রথম, এমন স্পর্শে আমি কেমন থমকে গেলাম। অভ্রর এই আদর ফিরিয়ে দেবার কোনো উপায় নেই আমার কাছে। আমার দেহ মন অভ্রর স্পর্শ ও আদরে বশিভূত হয়ে অন্যরকম এক সুখের অনুভবে মেতে উঠলো। 


আজ আর ফেরাতে পারিনি অভ্রকে। 


স্বামী স্ত্রীর এই একান্ত সময় পার হবার পরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি আমি, শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল অভ্রর ভয়ংকর চিৎকারে...


চলবে...

রবিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৪



আয়নায় তাকাতেই এক পলকের জন্য আমার ঠিক পেছনে ভয়ঙ্কর একটা মুখচ্ছবি দেখে আঁতকে উঠে একনজর অভ্রর দিকে তাকিয়ে আবার আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম না কেউ তো নেই।


আমাকে বিচলিত দেখে অভ্র জিজ্ঞেস করলো– কি হয়েছে? 


আমি মিথ্যা হাসি হেসে বললাম– না কিছু হয়নি।


রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। 


সারা বিকেল ঘুরে শপিং করে ফিরতে রাত হলো। 


দুজনেই ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে টিভি দেখছি। অভ্র বললো– বউয়ের হাতের এককাপ চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। 


আমি উঠে কিচেনে চলে এলাম। গ্যাসের চুলোয় ছোট পাতিল বসিয়ে পানি ঢেকে চুলোয় আগুন ধরিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই লাফিয়ে উঠলাম আমি। অভ্র কখন এসে দাড়িয়েছিল টেরই পাইনি। 


অভ্র মুচকি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে কয়েকটি চুমু খেয়ে বললো– ভীতু একটা। 


আমি পুরো অবাক, অভ্র এভাবে কখনও ঘাড়ে চুমু খায়নি এর আগে কোনদিন।


আমি বললাম– বউকে আদর করা শেখার নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হলে নাকি মিস্টার জামাই?


অভ্র মুচকি হেসে বললো– এমন বউ থাকলে নতুন নতুন আদর আবিষ্কার করতে কোথাও যেতে হয়না, মন থেকে এসে যায়। 


– বাব্বাহ কত্ত রোমান্টিক আমার জামাই – বলে আমি ঘুরে দাড়িয়ে গ্যাসের পাওয়ার আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে অভ্রকে বললাম– এখানে দাড়াও আমি ড্রইং রুম থেকে মোবাইলটা নিয়ে আসছি। 


অভ্রকে কিচেনে রেখে আমি ড্রইং রুমে এসে ভীষণ শক খেলাম। অভ্র তো ড্রইং রুমে বসেই টিভি দেখছে, যেখানে দেখে গিয়েছিলাম সেখানেই সেভাবে বসে আছে। 


আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কিচেনে যে অভ্র ছিল তাহলে সে কে? আমার আগেই বা কীভাবে আবার ড্রইং রুমে আসবে? দৌড়ে আসতে হলেও তো আমার পাশ কাটিয়ে আসতে হবে।


আমার হার্টবিট এতটাই বেড়ে চলেছে যেন এক্ষুনি ফেটে যাবে। গলা শুকিয়ে কথা বলার অবস্থা নেই। শরীরটা কেমন কাঁপছে। 


অভ্র আমার দিকে তাকিয়ে বললো– কি ব্যাপার কি হয়েছে তোমার?


আমি নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে অভ্রকে জিজ্ঞেস করলাম– আমি কিচেনে যাবার পরে থেকে তুমি এখানেই ছিলে?


অভ্র উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– হ্যা এখানেই ছিলাম তোমার অপেক্ষায়, বউ চা নিয়ে ফিরবে তারপর আমি খাবো সেই অপেক্ষায়। 


আমার কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে অভ্র আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে বেডরুমে যেতে যেতে বললো– তোমার শরীরটা মনে হয় দূর্বল, এখন আর কিচ্ছু করতে হবেনা চলো ঘুমাবো।


আমাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে অভ্র লাইট অফ করার জন্য সুইচ টিপবে এমন সময় মনে পড়লো চুলোয় তো পানি গরম হচ্ছে, চুলা নেভানো হয়নি তখন। 


আমি উঠে বসে বললাম– দাড়াও আমার কিচেনে যেতে হবে অভ্র। 


অভ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো– আবার কেন? 


বললাম– চুলো নেভানো হয়নি এবং কিচেনের লাইটও অফ করা হয়নি। 


– তোমার কষ্ট করে যেতে হবেনা, আমি যাচ্ছি – বলে অভ্র রুম থেকে বেরিয়ে গেল।


শরীরটা একদম ভারী লাগছে। রুম থেকে অভ্র বেরিয়ে যাবার সময় দরজা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে গিয়েছে। হঠাৎ দরজাটা মৃদু আওয়াজ করে অনেকখানি খুলে গেল। বুকশেলফের ওপর থেকে ফুলদানিটা ঠাস করে নিচে পড়তেই ভয়ে আমার শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো।


জানালা বন্ধ থাকায় ঘরে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও বাতাসে জানালার পর্দা সেরে গিয়ে আবার স্ব স্থানে আসলো। রুমের দরজাটা মৃদু আওয়াজ করে আবার একাএকা বন্ধ হয়ে গেল।


দরজার ওপাশ থেকে অভ্র দুষ্টুমি করছেনা তো! চেক করার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠে পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ক্যাচ করে দরজা খুলে যেতেই আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, অভ্র রুমে ঢুকে অবাক হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– হঠাৎ কি হলো তোমার, এমন ভয় ভয় কেন করছো?


– এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাড়িয়ে তুমি দরজা খুলছিলে এবং বন্ধ করছিলে – আমি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম। 


অভ্র অবাক হয়ে বললো– আমি এমন কেন করতে যাবো? আমি তো এই কিচেন থেকে আসলাম। 


কথা শেষ করে  আমার হাত ধরে টেনে এনে খাটে বসিয়ে অভ্র আমার পাশে বসে বললো– ইদানীং তুমি ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছো, কোন কারনে কি তোমার মন খারাপ? অথবা কোনো দুশ্চিন্তা থাকলে আমায় বলো।


– আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি অভ্র – আমি বললাম। 


অভ্র বললো– তুমি নিজেই চুলা এবং কিচেনের লাইট অফ করে এসে বললে যে ওসব বন্ধ করা হয়নি, এসব কি তোমার অস্বাভাবিক মনে হয়না? আগে তো তুমি এমন ছিলেনা।


অভ্রর কথা শুনে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। আমিতো চুলা নিভাইনি এবং লাইটও অফ করিনি, তাহলে এসব কীভাবে হলো। 


আর এতদিন তো সবকিছু ঠিকঠাক ছিল হঠাৎ আজই কেন এসব অদ্ভুতুরে কাণ্ডকীর্তির মাত্রা বেড়ে গেল। 


বারবার আমার মনে হচ্ছে কি যেন একটা নেই আমার কাছে। কিন্তু এসব পরে, আগে অভ্রকে কিছু একটা বলে বুঝ দিতে হবে।


আস্তে করে অভ্রর কাঁধে মাথা রেখে বললাম– আসলে কেমন একটা হাঁপিয়ে উঠেছি অভ্র, হঠাৎ করে মা বাবাকে ছেড়ে আলাদা থাকছি, যখন মনে পড়ে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। তবুও ব্যপার না, আমার তুমি এবং তোমার যত্ন ও ভালোবাসা হলেই চলবে। 


অভ্র আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো– আমি সবই বুঝি, এবং চেষ্টা করবো খুব জলদি আবার আমরা সবাই একত্র হবার।


রুমের লাইট অফ করে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি, অভ্র আমাকে তার বুকে পরম আদরে শিশুর মতো করে জড়িয়ে ধরে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। 


এভাবে চুপচাপ দীর্ঘ সময়। আমি চোখ বন্ধ করে আছি আর অভ্র আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। 


ধীরে ধীরে রুমের ভেতর একটা দুর্গন্ধ তীব্র হতে লাগলো। অভ্র মনে করেছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।অভ্র ধীরে ধীরে উঠে বসলো। বোঝার চেষ্টা করছে দুর্গন্ধটা কোথা থেকে আসছে। 


আমি চোখ খুলে জানালার দিকে তাকালাম। মৃদু বাতাসে জানালার পর্দা দুলতে দুলতে হঠাৎ অনেকখানি সরে যেতেই আমি জানালার স্বচ্ছ কাচের ওপাশে ভয়ঙ্কর সেই বিশ্রী মুখটা দেখেই ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কি ভয়ংকর সেই মুখ আর কি ভয়ঙ্কর তার চাহনি। চোখদুটো যেন জ্বলন্ত আগুনের গোলক।


আমি পুনরায় চোখ মেলে তাকানোর আগেই জানালার পর্দা আবার স্ব স্থানে এসেছে। তাই চোখ খুলে আর জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারলাম না।


অভ্র উঠে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে আবার খাটে এসে বললো– কেমন একটা বিশ্রী দুর্গন্ধ, পেয়েছো তুমি? 


আমি ঘুম ঘুম ভান করে উঠে বসে বললাম– কৈ না তো।


অভ্র হিসাব মেলাচ্ছে কিসের দুর্গন্ধ হতে পারে। আর আমি ভাবছি আজ হঠাৎ করে কেন এসব হচ্ছে। আর বারবার মনে হচ্ছে কিছু একটা আমার কাছে নেই। 


হঠাৎ গলায় হাত দিতেই চমকে গেলাম! ছোটবেলায় হুজুরের দেয়া সেই তাবিজটা কোথায় গেল আমার গলা থেকে। 


তাহলে কি গলার হার খোলার সময় হারের সঙ্গে তাবিজটাও খুলে রেখেছি?! 


উঠে গিয়ে আলমারি খুলতেই প্রাণে পানি ফিরে পেলাম। তাবিজটা হারের সঙ্গে পেচিয়ে আছে। তাবিজটা গলায় পরে লাইট অফ করে এসে অভ্রকে টেনে শুইয়ে ওর গলা ধরে শুয়ে পড়লাম।


তারপরে আর তেমন কোনকিছু টের পাইনি, এক ঘুমে সকাল। 


এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল সুন্দর ভাবে। 


এই কদিনে অভ্রও আর আমার একান্ত কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেনি।


আজ ভরা পূর্ণিমা রাত, চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় স্বর্গীয় রূপ ধারণ করেছে পৃথিবী। পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিফলন যেন হাত ইশারা করে ডাকছে আমায়। এমন রাতে নিজেকে ঘরে আটকে রাখা যে দায়।


আমাকে জানালার পাশে দাড়িয়ে আনমনে আকাশ পানে চেয়ে থাকতে দেখে অভ্র পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– প্রকৃতির এই মায়াবী রূপের সবটুকু উপভোগ করতে চাইলে ঘর থেকে বের হতে হবে তো। চলো পুকুর ঘাটে গিয়ে বসি।


আমি আগেপিছে ভাবার আর অবকাশ পেলামনা, অভ্রর এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। অভ্র আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ালো।


কিন্তু আজকের রাতটা যে সর্বনাশের রাত হবে সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি...


চলবে

বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৩

 

 

( ৩য় পর্ব ) 


টের পেলাম আজ সত্যি আমার পিরিয়ড শুরু হয়েছে এবং ঘাবড়ে গেলাম এই কথা অভ্রকে কিকরে বলবো। ও জানে আমার পিরিয়ড শেষ এবং এখন যদি এই কথা বলি ও নিশ্চিত ভুল বুঝবে আমায়।


অভ্র ভাববে এভাবে তাকে দূরে সরিয়ে রাখার নিশ্চই কোনো কারণ আছে। হয়তো ভাববে আমি ওর প্রতি অখুশি নয়তো ভিন্ন কিছু।


আমি মোবাইলের ফ্লাস জ্বালাবো এমন সময় অভ্র আমার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললো– একদম না, প্রকৃতি ইশারায় জানিয়ে দিচ্ছে এবার আমাদের একান্তে কাছে আসার সময় অথচ তুমি বুঝছো না।


আমার মাথায় আরও একটা বিষয় ঘুরছে, সেটা হলো হারিকেনটা ছিল টেবিলের মাঝ বরাবর সেখান থেকে একেবারে টেবিলের বাইরে এসে পড়লো কীভাবে? যদি কাত হয়েও পড়ে তাহলেও পড়ে থাকার কথা টেবিলের ওপরেই। বিষয়টি সত্যি রহস্যময়।


আজ প্রথমবার অভ্র বলেই ফেললো– আচ্ছা তোমার কি কোনো কারণে আমার ওপর রাগ আছে? অথবা মনে কোনো লুকোনো কষ্ট? 


আমি থতমত খেয়ে বললাম– অভ্র রাগ তো দূর, তোমার প্রতি আমার যে সীমাহীন ভালোবাসা সেখানে তিল পরিমাণ অভিযোগের অবকাশ নেই। 


: তাহলে দূরে সরে থাকছো যে!


: হুম, পরিক্ষা নিচ্ছি আমার বরের।


: কিসের পরিক্ষা নিচ্ছ বউ?


: ধৈর্যের পরিক্ষা, আমার বর কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে সেই পরিক্ষা। 


: তাহলে এই পরিক্ষায় আমি ফেল করতে চাই বউ।


: হা হা হা, এতটা অধৈর্য হলে তো চলবেনা বর সাহেব। সংসার জীবনের ভিত্তি হলো এই ধৈর্য। দুজনের ধৈর্য যত বেশি সংসারের স্থায়িত্ব এবং সুখশান্তি তত বেশী।


: ধৈর্য নাহয় পরে ধরবো, আগে বউকে ধরি।


কথা শেষ করেই অভ্র আমাকে জড়িয়ে ধরতেই বাইরে ধুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। অভ্র আমাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কি হতে পারে। 


আমি বললাম– হয়তো বাতাসে শুকনো নারকেল পড়েছে গাছ থেকে অভ্র। 


অভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো– চোরও হতে পারে, এরকম ওয়েদার শুধু জামাই বউয়ের জন্যই নয়। চোরদের জন্যও চুপচাপ কাজ শেরে সটকে পড়ার সময় বুঝলে? যাই বাইরে গিয়ে দেখি। 


এরকম পরিস্থিতিতে কিছুতেই অভ্রকে বাইরে যেতে দেয়া যাবেনা। 


আমি উঠে দাড়িয়ে অভ্রর হাত ধরে টেনে খাটে শোয়ালাম। 


পাতলা কম্বল টেনে আমাদের গায়ে জড়িয়ে অভ্রর বুকে মাথা রেখে বললাম– এরকম ওয়েদারে বউয়ের পাশে শুয়ে থাকতে হয় মিস্টার জামাই। 


অভ্র ইচ্ছে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো– শুধু শুয়ে থাকা আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে বিরিয়ানির প্লেটের সামনে বসে থাকা ভীষণ বেদনার বিষয় যে বউ।


অভ্রর কথা শুনে না হেসে আর থাকতে পারলাম না আমি। হেসে হেসে বললাম– বিরিয়ানি খেয়ে ফেললেই তো হয়ে গেল, মাঝেমধ্যে অপেক্ষা করা কিন্তু মধুর, অপেক্ষার পরে পেলে তখন তৃপ্তি বেশি।


অভ্র মজা করে বললো– আর তৃপ্তি! এরকম হবে জানলে আবেগের বশে বিয়ে না করে বিবেকের বশে চিরকুমার থেকে যেতাম। 


অভ্র আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো, আমি ধীরে ধীরে অভ্রকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।


সকালবেলা উঠে জলদি করে ফ্রেশ হয়ে অভ্রর জন্য নাস্তা রেডি করলাম। একটা নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবে ও।


নাস্তা শেষে রেডি হয়ে সবসময়ের মতো কোথাও যাবার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে মিষ্টি হেসে ভালোবাসি বউ বলে অভ্র বেড়িয়ে গেল।


আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রান্নার কাজে মনোযোগী হলাম, অভ্রর আসতে হয়তো দুপুর হয়ে যাবে। 


রান্নাঘর থেকে বাইরে বের হতেই অবাক হয়ে গেলাম। পুকুর পাড়ের কাছে সেই রক্তজবার বাগানের পাশে অনড় হয়ে দাড়িয়ে রক্তজবার বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে একটা সাত আট বছরের বাচ্চা মেয়ে।


– এই যে শুনছো?– আমি বললাম। 


মেয়েটি ঠিক সেভাবেই অনড়ভাবে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। 


আমি মেয়েটির কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে বাজপাখির মতো ছোবল মেরে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে এক মহিলা বললো– কতবার বলেছি তোকে এবাড়িতে ভুলেও ঢুকবিনা।


মহিলা সম্ভবত মেয়েটির মা।


মহিলা আবারও বললো– কেন এসেছিস এখানে? 


বাচ্চাটি মুখ ভার করে বললো– উনি ডেকেছে আমাকে ফুল দেবে বলে।


মহিলা বিরক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে তারপর আমাকে দেখিয়ে বাচ্চাকে বললো– কে ইনি ডেকেছেন? 


বাচ্চা মেয়েটা না সূচক মাথা নেড়ে আঙ্গুল দিয়ে রক্তজবার বাগানের দিকে ইশারা করে বললো– ঐখানে সাদা কাপড় পরা এক দাদু ছিল, সে আমাকে ডেকেছে।


মেয়েটির কথা শেষ হতে না হতে আমার এবং মেয়েটির মায়ের চোখ রক্তজবার বাগান তন্নতন্ন করে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। কিন্তু কৈ, কোথাও কেউ নেই। 


আমার বুকের ভেতরটা কেমন ধড়াম করে উঠলো। 

বাচ্চারা তো মিথ্যা বলেনা সহজে। তাহলে কি সাদা কাপড় পড়া সে কোনো অশুভ শক্তি ছিল?!


মেয়েটিকে তার মা– আর কোনদিন ভুলেও যেন এবাড়িতে আসতে না দেখি– বলে চলে যেতে যেতে আমাকে বললো– ভাবী আপনিও একটু সাবধানে থাকবেন, বাড়িটা আমার কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। 


আমি ঘুরে দাড়িয়ে ঘরে যাবার উদ্দেশ্যে দুপা বাড়াতেই পেছনের রক্তজবা গাছগুলো কেমন ঝরঝর করে হেলে-দুলে উঠলো। আমি চমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম সব স্বাভাবিক। 


ইশ চুলোয় তরকারি চাপিয়ে এসেছি আবার পুড়ে যায়নি তো! দৌড়ে রান্নাঘরে এসে দেখি যা ভেবেছি তাই। পুড়ে গেছে।


মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। 


বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়তে দেরী হলোনা মোটে।


ঘুম ভাঙলো অভ্রর ডাকে, চোখ খুলে দেখি হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে জনাব। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই এগিয়ে এসে আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো– জবটা অবশেষে পেয়ে গেলাম বউ, এবার আমি আমার বউটাকে মনের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারবো। 


আনন্দে আমার চোখের কোণে জল টলমল করে উঠলো অভ্রর আনন্দ দেখে, এটাই বোধহয় ভালোবাসা, এটাই প্রেমের প্রতিচ্ছবি।


আমাকে কোল থেকে নামিয়ে অভ্র বললো– জলদি করে রেডি হও আজ আমরা বাইরে ঘুরবো ফিরবো এবং বাইরেই খাবো।


অভ্রর সাথে পালিয়ে আসার পরে থেকে বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বাবা তো এখনও রেগে আছেন। মায়ের সাথেই যা দুচার কথা হয়। অভ্রর চাকরিটা হয়েছে এই খুশির খবর কারো সাথে শেয়ার করার আগপর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিনা যে।


মাকে ভিডিও কল করলাম, মা রিসিভ করতেই দেখলাম বাবা মায়ের কাছ থেকে সরে গেল। তারমানে বাবা মা পাশাপাশি বসা ছিল। 


মাকে বললাম– মা পালানোর মতো অপরাধ করে হলেও তো ভালোবাসার মানুষটাকে আজীবনের জন্য নিজের করে পেয়েছি বলো, ভালোবাসার জন্য এটুকু অপরাধ হয়তো জায়েজ আছে। ভালোবাসার মানুষটাকে পেয়েছি এবার তোমরা মেনে নিলেই তো আমি চির সুখী। তোমরা তো সবসময় আমার সুখই চাইতে মা।


আমার কথা শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো– তাই বলে পালিয়ে যাবি? বাবার সামনে সাহস করে বললেই হতো অভ্রকেই চাই। বাবা তো তোর, জম নয় যে মেরে ফেলতো।


– মা, বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ঐ কথাটুকু বলার সাহস মেয়েদের হয়না বলেই তো পালিয়ে যাবার মতো অপরাধ করে ফেলে। 


– বুঝলাম, কিন্তু তোর চোখের নিচে কালি পড়েছে যে, শরীর ঠিক আছে তো তোর? 


– হ্যা মা আমি একদম ঠিক আছি, শুধু তোমাদের কাছে যেতে পারছিনা বলে কষ্ট হয়। ওমা– আব্বার রাগ কি কমবেনা?


– কে জানে! তোর বাপের যে রাগ।


– বাংলা সিনেমার মতো বাবু নিয়ে গিয়ে আব্বার হাতে তুলে দিলেই নাতির মুখ দেখে রাগ পানি হয়ে যাবে দেইখো মা।


– হা হা হা, তুই এখনও সেই পাগলী মেয়ে রয়ে গেলি।


– মা, অভ্রর খুব ভালো একটা চাকরি হয়েছে। 


– আলহামদুলিল্লাহ খুশীর সংবাদ। ভালো থাকিস তোরা, সাবধানে থাকিস। এখন রাখি পরে আবার কথা হবে।


কল কেটে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি অভ্র নীল শাড়িটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। শাড়িটা আমার হাতে দিয়ে বললো– আজকে এটা পরে নীলপরি হয়ে যাও আমার মায়াপরি। তুমি রেডি হও তারপর আমরা বের হবো।


অভ্র গিয়ে খাটে বসলো। 


আমি শাড়ি চুড়ি পরে চোখে কাঁজল আঁকতে আঁকতে অভ্রর দিকে তাকিয়ে বললাম– এবার কিন্তু আমরা এই বাসা চেঞ্জ করে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিবো যত দ্রুত সম্ভব। 


অভ্র আমার দিয়ে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো– ওসব বাদ আগে বউটার ওপর আরও আরও ক্রাশ খেয়ে নেই। নীল শাড়ীতে তোমায় অপূর্ব লাগছে নীলপরি।


– বেশি বেশি বলছো কিন্তু – বলে আবার আয়নায় তাকাতেই বুকের ভেতর কলিজাটা যেন উল্টে গেল আমার, শরীরের লোম কাটা দিয়ে উঠলো। ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এ কি দেখলাম আমি...


চলবে...

রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-২



আজ অভ্র কাছে আসতে চাওয়া মাত্র আঁতকে উঠলাম, তাহলে কি এই রাতটাই অভ্রর জীবনের শেষ রাত হতে চলেছে?!


দাদী বলেছিল আমার বিয়ের পরে ফুলশয্যা রাতে দুজন দুজনের একান্ত কাছে আসার পরে নাকি বরের মৃত্যু হবে। কিন্তু আজ তো ফুলসজ্জা রাত নয়। ফুলশয্যা ফেলে এসেছি সেই কবে। তারপরও কি আজ একান্ত কাছাকাছি গেলে অভ্রর মৃত্যু হবে!


এসব ভাবতেই আমার শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো। গলা শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে যেন। আজ কীভাবে ফেরাবো অভ্রকে, ও আবার ভুল বুঝবেনা তো!


এসব চিন্তায় আমার আমার অবস্থা নাজেহাল। টেবিলের ওপর জগ থেকে পারাপার দুই গ্লাস পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম। 


অভ্রর সামনে যতই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছি ততই অস্বাভাবিকতা বেড়ে যাচ্ছে আমার। অভ্র কিন্তু এসব এতক্ষণ ঠিকই খেয়াল করেছে কিন্তু কিছু বলেনি।


এবার কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বললো– আর কতদিন এভাবে দূরে সরিয়ে রাখবে বলো তো, আমার যে ভীষণ ইচ্ছে হয় তোমাকে কাছে পেতে, আদরে আদরে তোমায় ভরিয়ে দিতে। আচ্ছা তুমি কি ভয় পাও এসবে?


আমি মজার ছলে বললাম– আদরে আমার এলার্জি আছে তাই। 


আমার কথা শুনে অভ্র হেসে ফেলে বললো– জীবনে এই প্রথম শুনলাম আদরেও এলার্জি থাকে। 


আমি ইচ্ছে করেই একটু ফান করলাম স্বাভাবিক হবার জন্য এবং মোটামুটি সাকসেস।


অভ্র বললো– আচ্ছা তাহলে ফার্মেসী থেকে ঘুরে আসি।


: এত রাতে ফার্মেসীতে কি তোমার?


: এলার্জির অষুধ আনতে যাবো তোমার জন্য। 


: মানে? 


: মানে হলো আগে তোমাকে এলার্জির ওষুধ খাইয়ে তারপর আদর করবো।


এবার অভ্রর কথা শুনে আমার হেসে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা।


হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বললাম– আচ্ছা অভ্র ওসব ছাড়া কি ভালোবাসা হয়না? 


অভ্র স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো– কেন হবেনা, কিন্তু ওসবও তো ভালোবাসার একটা অংশ, ভালোবাসা আরও মধুর করে তোলে। আর এটা তো এখন অবৈধ বা পাপ নয়, আমরা স্বামী স্ত্রী এখন।


: তবুও যদি বলি আমাদের ভালোবাসা বন্ধন ওসবের বাইরে হোক। 


: আরে পাগলী তাহলে তো তুমি আম্মু ডাক আর আমি আব্বু ডাক থেকে বঞ্চিত হবো।


অভ্রর যুক্তির কাছে আমি পরাজিত, আম্মু ডাকটাই তো একজন নারীর জীবনের পরিপূর্ণতা, এখানেই আমরা দূর্বল। 


আমি যে কেন এবং কোন ভয়ে দূরে সরে থাকছি সেটা আমি ভালো জানি। নয়তো অভ্রকে আমারও একান্ত কাছে পাবার ভীষণ ইচ্ছে যাকে, অভ্রর আদরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। প্রাপ্তবয়স্ক একটা মেয়ে আমি কিন্তু ভয়টা তো প্রিয়জনকে হারানোর। একান্ত কাছাকাছি এবং আদর সোহাগের ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে হলেও অভ্রর প্রাণে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরী। আমি কিছুতেই ওকে হারিয়ে বাঁচতে পারবোনা।


আমার ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি জোড়া, ওটাই নাকি এসবের কারণ। আমার ওপর নাকি অদৃশ্য শক্তির নজর আছে। 


ছোটবেলায় একবার– ছোটবেলা বলতে তখন বয়স নয় বছর হবে। দুপুরবেলা আব্বুর জন্য চালভাজা নিয়ে রাস্তায় যাবার সময় জবা ফুলগাছের নিচে বেহুশ হয়ে পড়েছিলাম। তারপর বেশ কয়েকদিন নাকি আমি অস্বাভাবিক ছিলাম। এরপর একজন নামডাকওয়ালা হুজুরকে বাড়িতে আনে আব্বা। হুজুর আমাকে একটা তাবিজ দিয়ে যায় এবং আব্বাকে বলে উঠোনের কোণের তেঁতুলগাছটা কেটে ফেলতে, ওখানেই নাকি তেনাদের আস্তানা।


আব্বা সেইদিনই তার শখের গাছটা কেটে ফেলে। 


ভূত প্রেত এসবে আমি বিশ্বাস করিনা কিন্তু মাঝেমধ্যে অদ্ভুত কিছু বিষয়ও লক্ষ্য করেছি কয়েকবার আমাদের বাড়িতে। রাত গভীরে হঠাৎ শরীর ভারী হয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া। ঘুমের মধ্যে ফিসফাস শব্দ শোনা। তাছাড়া এমনিতেই আমার সবসময় কেমন মনে হতো আশেপাশে কেউ রয়েছে। সেই কারণে মুরব্বিদের বলা কথা একেবারেও ফেলে দিতে পারিনা। 


আমাকে চুপচাপ দেখে অভ্র আমাকে জড়িয়ে ধরতেই রুমের জানালার কপাট খটাস করে আচানক খুলে গিয়ে হুহু করে রুমের মধ্যে হাওয়া ঢুকে আমাদের দুজনকেই ছুয়ে গেল যেন। 


আমি আর অভ্র দুজনেই অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। 


অভ্র পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মুচকি হেসে আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো– ভয় পেয়োনা আবার, বাতাসের তোড়ে জানালার কপাট খুলে গেছে। দাড়াও বন্ধ করে আসছি।


অভ্র উঠে গিয়ে জানালার কপাট বন্ধ করে এসে আমার পাশে বসলো। 


বাইরে হঠাৎ করে বাতাসের তান্ডব বাড়তে শুরু করছে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে সেই সাথে মেঘের গর্জন। ক্ষাণিক আগের মেঘমুক্ত আকাশ এখন কালো মেঘের কাছে বন্দি। ঝড় শুরু হয়েছে, বাতাসে গাছের শুকনো ডালপালা মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে এদিক সেদিকে। 


এই বাড়িটা শহরের কাছাকাছি হলেও বাড়ির মালিক গ্রামের বাড়ির মতো করেই সাজিয়েছে। সামনে বিশাল পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, পেছনে বিশাল বাগান। বাড়ির চারপাশে নানারকম ফলের গাছে ঘেরা। বাড়ির ডানপাশে আরেকটা বাড়ি। ঐ বাড়ির লোকজনকে কখনও এবাড়িতে আসতে দেখিনি। 


আমি আর অভ্র যখন পালিয়ে এসে বিয়ে করে থাকার জন্য ভাড়া বাসা খুজছিলাম তখন একজন আমাদের এই বাড়ির সন্ধান দিয়েছিল। সুন্দর সাজানো গোছানো পরিপাটি বাড়ি, আবার ভাড়াও কম।


এই বাড়িতে আসার পরে আমাদের সবকিছু বুঝিয়ে দেয় এক বৃদ্ধ চাচা। বয়স প্রায় সত্তর পচাত্তরের মাঝামাঝি। চুলদাড়ির সাথে পাকা ভ্রুতে বেশ অদ্ভুত লাগছিল চাচাকে। চাচা আমাদের জানায়– এ বাড়ির মালিক স্ব পরিবারে অনেক বছর আগে লন্ডন চলে গেছে বাড়িটা দেখাশোনার দায়িত্ব তাকে দিকে। সেই থেকে সে এই বাড়ির দেখাশোনা করে আসছে। এই বাড়ি থেকে চাচার বাড়ি প্রায় দুই কিলোমিটার, পায়ে হেটে আসতে যেতে হয়। এই বয়সে এখন এটা কষ্টকর। তাই তিনি চান বাড়িটা কারো কাছে ভাড়া দিতে যারা এখানে থাকবে এবং বাড়িটার দেখাশোনা করবে।


আমি প্রশ্ন করলাম– তাহলে আপনি কেন আপনার পরিবার নিয়ে এতসুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িতে থাকছেননা?


চাচার চোখেমুখে কেমন অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো, তিনি কথা ঘুরিয়ে বললেন– তোমরা যদি থাকতে চাও তাহলে এখানে নিরিবিলি থাকতে পারো। অল্প কটাকা ভাড়া দিলেই চলবে। আর হ্যা পুকুরপাড়ের ঐ রক্তজবা গাছের বাগানটার দিকে তেমন যেওনা। 


রক্তজবার বাগানের কথা শুনে খটকা লাগলেও যেহেতু আমরা পালিয়ে এসেছি, অভ্রর পকেটেও তেমন টাকাকড়ি নেই তাই এতবেশী না ভেবে আমরা এই বাড়িতে বসবাস শুরু করলাম। চাচারও যেন কষ্ট লাঘব হলো। এখন মাঝেমধ্যে এসে ঘুরে যায়।


সেই থেকে আমরা এই নিরিবিলি অদ্ভুত বাড়িতে আছি দুজন।


বাইরের বাতাসের গতি যেন বেড়েই চলছে সেই সাথে তাল মিলিয়ে ঝুম বৃষ্টি। 


হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো রুম জুড়ে মৃত্যুপুরীর অন্ধকার। অভ্র মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে দিয়াশলাই দিয়ে হারিকেনের ফিতায় আগুন ধরিয়ে চিমনি লাগাতে লাগাতে বললো– আজ এই রোমান্টিক ওয়েদার কিন্তু প্রকৃতি আমাদের উপহার দিয়েছে বউ, মিস করা যাবেনা। এই ওয়েদার কাছে আসার এবং ভালোবাসার। 


এদিকে আমার বুক দুরুদুরু করতে শুরু করেছে, সত্যি যদি অভ্র কাছে আসতে চায়।


হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় পুরো নব্বই দশকের ফিল পাচ্ছি, মনে হচ্ছে আমরা অনেকটা সময় পিছিয়ে সেই সোনালী যুগে চলে এসেছি। বেশ দারুণ লাগছে ব্যপারটি। এবাড়ির মালিক হয়তো খুব সৌখিন, পুরনো আমলের অনেক কিছুই বেশ যত্নে সংরক্ষিত আছে এ বাড়িতে।


হারিকেনর তেজ বাড়িয়ে মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে অভ্র চলে গেল কিচেনে। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুই হাতে দুই কাপ গরম গরম চা নিয়ে ফিরলো। আমি দেখে ভীষণ অবাক। 


অভ্র মুচকি হেসে বললো– এরকম রোমান্টিক ওয়েদারে সবাই বউয়ের হাতের গরম গরম চা খেতে চায়। কিন্তু আমি আমার হাতে চা বানিয়ে বউকে খাওয়াচ্ছি। একটু তো ডিফরেন্ট হওয়া উচিৎ বলো। তোমার জামাই বলে কথা। 


আমার এত আনন্দ অনুভব হলো বলে বোঝানো অসম্ভব, সবাই তো এরকম একটা কেয়ারিং হাসব্যান্ড এর সপ্নই দ্যাখে। সেই হিসেবে অভ্রকে পেয়ে আমি নিজেকে সবসময় ভাগ্যবতী মনে করি।


অভ্র খাটের পাশের জানালার কাছে গিয়ে বসে আমায় ডাকলো। আমি গিয়ে অভ্রর গা ঘেঁষে বসলাম। একটা পাতলা কাঁথা টেনে অভ্র আমাদের দুজনের গায়ে জড়িয়ে আমার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিলো। তারপর জানালার কপাট খুলতেই হুহু করে বাইরের বৃষ্টি ভেজা শীতল হাওয়া ভেতরে এসে আমাদের শীতল স্পর্শে ছুয়ে দিতে লাগলো।


আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি অভ্রর দিকে, কত সুনিপুণ ভাবে প্রকৃতির সাথে নিজের অনুভূতি মিশিয়ে মুহূর্তগুলো স্বর্গ সুখের করে তুলেছে অভ্র। 


আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে অভ্র আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো– মুহুর্ত গুলো গরম গরম ধোঁয়াওঠা চায়ের কাঁপে চুমুক দিয়ে উপভোগ করো বউ, এত ভাবনায় ডুবলে চা ঠান্ডা হয়ে যাবে যে।


বাইরে ঘোর কালো অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকানোর ক্ষণস্থায়ী আলোর লুকোচুরি, মেঘের গর্জনে পৃথিবী কেঁপে উঠছে ক্ষানিক বাদে বাদে। চোখের সামনে এমন দৃশ্য আর ধোঁয়াওঠা চায়ের কাঁপে চুমুক দিয়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই যে।


আমি খেয়াল করছি অভ্র ধীরে ধীরে আমাকে জড়িয়ে নিচ্ছে, ঠিক এমন সময় পেছনে টেবিলের ওপর রাখা হারিকেনটা হঠাৎ স্ব শব্দে মেঝেতে পড়ে চিমনি ভাঙ্গার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। আমরা দুজনেই লাফিয়ে উঠলাম। ভয়ে অভ্রকে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম...


চলবে...

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-০১

 –“ আমার পিরিয়ড চলছে অভ্র ”– এই কথা বলে আজ পরাপর দুই রাত নিজেকে অভ্রর থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি আমি। যদিও আমরা এখন স্বামী স্ত্রী তারপরও এরকম করার কারণ হলো কেউ একজন বলেছিল আমার ফুলশয্যার রাতে আমার স্বামীর মৃত্যু হবে। 


ফুলশয্যার রাতেই আমার স্বামীর মৃত্যু হবে এই কথাটা নাকি কোনো একজন বলেছিল আমার মাকে। সেই কারণে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরেও পরিবার থেকে কখনোই আমার বিয়ে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিলনা পরিবারের।


অবশ্য এই কথা আমাকে আর কেউ না বললেও আমার দাদী বলেছিল আমায়। সেই থেকে আমিও বিয়ের চিন্তাভাবনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার কারণে একজনের মৃত্যু হবে এটা কোনদিনই আমি চাইনি। ভেবেছি আজীবন নাহয় কুমারী হয়ে কাটাবো। সবার থেকে একটু ভিন্ন জীবনযাপন হবে আমার। সবাই স্বামীর সংসার করার স্বপ্ন দেখে সেটা সত্যি করে। আমি নাহয় স্বপ্নই দেখে যাবো।


ঐসব ঘর সংসারের আশা বাদ দিয়ে যখন স্বপ্নহীন দিন পার করছি তখন একদিন হঠাৎ করে জীবনে আসে অভ্র তারপর পাল্টে যায় পুরো গল্পটা। 


সেই সন্ধ্যায় বড়ো খালার বাড়িতে বিয়ের আনন্দে পুরো ধুমধাম। বড়ো খালার বড়ো মেয়ে মানে আমার খালতো বোন নুপুরের বিয়ে। 


সন্ধ্যায় বরযাত্রী আসতেই গেট ধরে বরযাত্রীদের একেবারে নাজেহাল করে ছাড়লাম আমরা সব ভাইবোন মিলে। সেইসময়ও অভ্র উপস্থিত ছিল কিন্তু বিশেষ ভাবে চোখে পড়ার মতো কিছু ছিলনা তখন।


সন্ধ্যার পরে সবাই মিলে হৈহল্লা আনন্দে মেতে আছে, কখনো গান, কখনও নাচ, আবার বরপক্ষের লোকদের সাথে ধাঁধা খেলা। 


সব বোনেরাই শাড়ী পরে আছে শুধু আমার পরনে সেলোয়ার কামিজ। এবার বোনেরা মিলে বায়না করলো আমারও শাড়ী পরে আসতে হবে। 


ব্যাস আমি চলে এলাম শাড়ী পরতে, ওদিক রং খেলা শুরু হয়ে গেল। 


বড়ো খালাদের ঘরের পেছনের বারান্দায় একটা পর্দার মতো টানানো। সেই পর্দার এপাশে দাড়িয়ে আমি পাজামা খুলে ছায়া পরে ব্লাউজটা কেবল পরবো এমন সময় অভ্র দৌড়ে এসে বারান্দায় উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়ে পর্দায় এপাশে চলে এসে আমাকে এ অবস্থায় দেখে একদম থ মেরে গেল। আমিও এতটাই চমকে গেলাম যে এই মুহূর্তে কি করবো সেই হিতাহিত জ্ঞানটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছি। আমার খোলা বুক। দুই হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে থ মেরে আমি তাকিয়ে আছি অভ্রর দিকে, আর অভ্রও তাকিয়ে আছে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে।


কয়েক সেকেন্ড পরে সম্বিৎ ফিরে পেতেই আমি চিৎকার করার জন্য মুখ খুলতেই অভ্র বিদ্যুৎ গতিতে এসে এক হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরলো। 


এবার আমি আরও বেশি ভয় পেয়ে গেলাম। এই ছেলে আবার অন্য কোনো মতলব নিয়ে আসেনি তো। ভয়ে আমার শরীর কাঁপছে। মনে মনে ভাবলাম এতটা ভয় পেলে চলবেনা এই মুহূর্তে, তাহলে ছেলেটা আরও সুযোগ পেয়ে যাবে। 


দিলাম অভ্রর হাতের তালুতে কামড় বসিয়ে। মা গো বলে অভ্র হাতটা সরিয়ে নিয়ে আবার অন্য হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরে বললো– বিশ্বাস করেন আমি এখানে খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। আমি জানতামওনা আপনি এখানে আছেন এবং আমি চিনিওনা আপনাকে। বাইরে ওরা রং মাখিয়ে দেবার জন্য ধাওয়া করছিল তাই ওদের হাত থেকে বাচতেই এই বারান্দায় উঠে দরজা বন্ধ করে লুকানোর চেষ্টা। কিন্তু এখানে এসে এরকম বিপদে পড়ে যাবো জানলে ওদের ইচ্ছে পূর্ণ হতে দিতাম তবু এখানে আসতাম না।


অভ্রর কথা শুনে মনে হয়েছিল একটুও মিথ্যা বলছে না। আর বাইরের পরিস্থিতিটাও এমন।


অভ্র আবার বললো– আমি বর পক্ষের লোক, বর আমার বন্ধু। আপনি চিৎকার করলে লোকজন যেমনটা ভাববে ঘটনা যে তার উল্টো সেটা তো কেবল আপনি আর আমি জানি। তারা ভুল বুঝে বিয়েটা ভেঙে দেবে, আর আমার লোকজনের সামনে মুখ দেখানোর আর কোনো উপায় থাকবেনা। প্লিজ আপনি চিৎকার করবেননা দয়া করে।


আমি এক হাত দিয়ে টেনে আমার মুখের ওপর থেকে অভ্রর হাত সরিয়ে বললাম– কিন্তু আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেল এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে হুম? 


অভ্র আমতা আমতা করে বললো– আপনি যে শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে মেনে নেবো।


আমি বললাম– আপাতত ঘুরে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে থাকুন, আমি শাড়ীটা পরে নেই তারপর দেখি কি শাস্তি দেয়া যায়।


অভ্র ঘুরে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো, আমি জলদি করে শাড়িটা পরে নুপুরের রুমে গিয়ে ওর লিপস্টিক এনে অভ্রর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম– আপনার শাস্তি হলো এই লিপস্টিপ ঠোঁটে মেখে বিয়ে বাড়ির সমস্ত লোকজনের সামনে ঘুরতে হবে।


অভ্র অবাক হয়ে হা করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বলতে গিয়েও আবার থেমে গেল। 


অভ্রর অবস্থা দেখে আমার হাসি আটকে রাখা দায়। হাসতে হাসতে আমি শেষ। বেচারা ফান্দে পড়েছে আজ।


আমি বললাম– কি ব্যাপার মিস্টার হ্যান্ডসাম, ঠোঁটে লিপস্টিক মাখবেন নাকি গায়ে কলঙ্কের কালি। একবার সবার কাছে বলে দিলেই কিন্তু খেল খতম। 


অভ্র কোনকিছু আর না বলে ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।


সবার সামনে অভ্র হাটাহাটি করছে, কেউ কেউ অভ্রর ঠোঁটে লিপস্টিক দেখে ভাবছে ছেলেটা পাগল হয়ে গেল নাকি! কেউ আবার হো হো করে হেসে দিচ্ছে। কেউ আবার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আর আমার তো হাসতে হাসতে অবস্থা কাহিল।


নুপুরের বরকে গিয়ে বললাম– দুলাভাই আপনার বন্ধু ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে ঘুরছে আপনাকেও একটু দিয়ে দেবো নাকি? বন্ধু বলে কথা। 


দুলাভাই অবাক হয়ে উঠে গিয়ে অভ্রকে ডেকে বললো– কিরে আমার বিয়ে হয়ে গেল তোর আগে সেই দুঃখে তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গেল নাকি? 


দুলাভাইয়ের কথা শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম সবাই। 


অভ্র লজ্জা পেয়ে বললো– ইয়ে মানে ভেসলিন ভেবে অন্ধকারে লিপস্টিক মেখে ফেলছি মনে হয়। 


আমি বললাম– ব্যপার কি বেয়াই, লিপস্টিক নিয়েও ঘোরেন নাকি আজকাল? এ-তো পুরাই বিয়ে পাগল ছেলে রে।


আবার সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। 


লজ্জায় বেচারার ফর্সা মুখটা একেবারে লাল হয়ে আছে।


যা-ই হোক সবশেষে নুপুরকে নিয়ে চলে গেল বরপক্ষ। কিছু অভ্রর প্রতি ভালোলাগার ছোট্ট একটা চারাগাছ জন্ম নিলো আমার হৃদয়ে। 


আমাকে আর বাড়িতে যেতে দিলনা খালামনি।


তিনদিন পরে আমরা গেলাম নুপুরকে আনতে। 

এবারও সাথে আসলো ভাইয়া ও তার দুই বোন এবং অভ্র। অভ্র ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড এবং দুজন দুজনের এতটাই কাছের যে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারেনা বলা যায়।


বিকেলে সবাই মিলে অনেক ঘোরাঘুরি এবং মজামাস্তি করা হলো। 


সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পরে খালামনি বললো সবাইকে লেবুর শরবত করে দিতে। সবার জন্য ঠিকঠাক করলেও একটা গ্লাসে আলাদা ভাবে বোম্বাই মরিচ গুলে সেটা তুলে দিলাম অভ্রর হাতে। 


সবাই শরবত খেতে শুরু করলো, অভ্রর গ্লাসে অভ্র চুমুক দিতেই কেমন একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল।


দুলাভাই অভ্রকে বললো– কি হলো খা, ও কিন্তু দারুণ শরবত বানায়। আহ অসাধারণ। 


আমি মুখ চেপে হেসে মনে মনে বললাম– কি দারুণ শরবত যে বানিয়েছি সেটা অভ্র টের পাচ্ছে দুলাভাই। 


আমাকে হাসতে দেখে জেদের বেশে অভ্র এক চুমুকে পুরোটা খেয়ে ফেললো। আমি অবাক! এরকম করবে ভাবতেই পারিনি।


অভ্রর মুখটা লাল হয়ে গেছে, ভাব দেখে মনে হচ্ছে কান দিয়ে এক্ষুণি ধোঁয়া বের হবে। চোখে জল টলমল করছে। 


নুপুর অভ্রর চোখে জল দেখে বললো– কি ব্যাপার ভাইয়া চোখে জল কেন? শরবত কি খুব বাজে ছিল? 


অভ্র বললো– আরে না না, তেমন কিছু না, আফসোস হচ্ছে তাই। 


দুলাভাই বললো– শরবত খেয়ে আবার আফসোস কিসের? 


অভ্র বললো– আফসোস হচ্ছে তুই বিয়েটা আরও আগে কেন করলিনা, আগে করলে শরবতের স্বাদটা আরও আগে থেকে পেতাম।


তারপর অভ্র উঠে সেই যে হাওয়া হয়ে গেল, ফিরলো অনেক পরে।


নুপুর কিন্তু বুঝতে পেরেছিল বিষয়টি এবং এই নিয়ে পরে নুপুর এবং দুলাভাই হাসাহাসি করলেও আমার খারাপ লাগছিল এটা ভেবে যে অভ্রর সাথে এমন করাটা ঠিক হয়নি।


রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে যে যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার ঘুম আসছিল না। চাঁদের মায়াবী স্নিগ্ধ আলোয় ভাসছিল চারপাশ। ভাবলাম ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখি।


ছাদে এসে এক কর্ণারে দাড়িয়ে চাদের দিকে তাকিয়ে আছি আনমনে। এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে কারো এগিয়ে আসার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাড়ালাম। অভ্র এগিয়ে আসছে। 


আমি বললাম– এতরাতে আপনি, ঘুমাননি এখনও?


আমার সামনে দাড়িয়ে অভ্র বললো– অত ঝাল খেলে ঘুমও পালায় বিয়াইন। ঝাল তো কমাতে হবে আগে। 


আমি বললাম– মধু খেয়ে নিন, কমে যাবে। 


অভ্র হঠাৎ করে আমার হাত ধরে টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললো– পৃথিবীর স্রেষ্ঠ মুধু নাকি এটাই, তাই খেয়ে নিলাম। এবার যদি ঝাল কমে। 


আমি থ মেরে দাড়িয়ে আছি, চোখের পলকে এটা কি ঘটে গেল। 


অভ্র মুচকি হেসে বললো– কি চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেলেন তো? মনে রাখতে হবে ওস্তাদের মার শেষ রাতে।


আমার কিছু বলার আর শক্তি নেই যেন, ছাদে বসে পড়লাম। 


অভ্র চলে যেতে যেতে বললো– চাঁদের নিজের আবার চাঁদ দেখার কি দরকার, নিচে এসে শুয়ে পড়ো।


এভাবেই আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ে যাই ধীরে ধীরে। একসময় পরিস্থিতি এমন হয় যে দুই পরিবারে জানাজানি হয়ে যায় এবং তারা মানে না।


কিন্তু আমরা দুজন দুজনের ভালোবাসায় এতটাই জড়িয়ে গেছি যে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবোনা।


অবশেষে আমরা পালিয়ে এসে বিয়ে করে ফেলি।


বাসর রাতে পিরিয়ডের কথা বলে অভ্রকে দূরে সরিয়ে রেখেছি আজ সাতদিন। কিন্তু অভ্র তো এতটাও বোকা নয় যে এসব বিষয়ে ওর মোটেও জ্ঞান নেই। 


আজ অভ্র কাছে আসতে চাওয়া মাত্র আঁতকে উঠলাম, তাহলে কি এই রাতটাই অভ্রর জীবনের শেষ রাত হতে চলেছে...


চলবে...


ছায়া_মানব_পর্ব-২১

  অহনা জানালার কাছে যেতেই মতি এগিয়ে আসে। অহনা জানালা বন্ধ করে দিতে চাইলে মতি ধরে ফেলে, '‌আমাকে দেখতে ভালো লাগে না, সেটা না হয় মানলাম। ...