Ads

https://www.cpmrevenuegate.com/b8yhybmrq8?key=9f4e3679f1c8c81a3529870bf1b4e18f
ছায়া_মানব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছায়া_মানব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-২১

 


অহনা জানালার কাছে যেতেই মতি এগিয়ে আসে। অহনা জানালা বন্ধ করে দিতে চাইলে মতি ধরে ফেলে,

'‌আমাকে দেখতে ভালো লাগে না, সেটা না হয় মানলাম। কিন্তু এখন দেখছি ঘৃণাও করো।'


' অযথা কথা বাড়াবেন না। আমি মোটেও আপনাকে তেমন কোনো কথা বলিনি। চলে যান।'


' চলেতো যাব, কিন্তু তোমাকে সাথে নিয়ে।'

মতি চোখ মেরে লোকটাকে আসতে বলল। লোকটা এসেই অহনার মুখে রুমাল চেপে ধরে। জ্ঞান হারিয়ে অহনা লুটিয়ে পড়ে। মতি পৈশাচিক হাসি দিয়ে অহনাকে সাথে নিয়ে চলে যায়।


রাত হয়ে এসেছে, অথচ অহনাকে পাওয়া যাচ্ছে না। রোস্তম পায়চারি করছে ঘরে। বিকেলের পুরো সময়টা খুঁজে কাটিয়েছে। এই মুহূর্তে থানায় ডায়রি করতে পারে না। লোকে মন্দ কথা বলবে। কাল দেখতে আসবে, আর আজ মেয়ে পালিয়েছে, বিষয়টা মানুষের কানে যাওয়ার আগেই অহনাকে খুঁজে পেতে হবে। ময়না রোস্তমের পাশে এসে দাঁড়ায়। বলল,

'চাচা, আমি অহনা আপাকে দেখেছি বিকেলে, এরপর থেকে আর দেখিনি। শেষবার তার ঘরে যেতে দেখেছি। বের হতে দেখিনি ঘর থেকে, আমিতো বাইরে ছিলাম, তবুও খেয়াল ছিল। ভেতরে ঢুকল কিন্তু আর বের হলো না। আমার কেমন জানি খটকা লাগছে।'


' কি বলতে চাইছো তুমি? তার মানে.... কেউ তাকে ঘর থেকে..'


' না চাচা, আমি এমনটা বলিনি। এখনতো সব বিপদ শেষ। এখন কেউ কেন ঘর থেকে নিয়ে যাবে?'


' নিশ্চয় আমার মেয়েকে কেউ অপহরণ করেছে। কিন্তু এখন আমি কি করব? আল্লাহ না করুক, যদি মেয়েটার কিছু হয়ে যায়?'


' এমন কথা বলবেন না। অহনা আপা ঠিক চলে আসবে।'


সবার মন ভার। বাইরের লোককে জানানো হয়নি। অহনার ঘরে দরজা লাগিয়ে বলা হয়েছে, পরদিন অনেক কাজ তাই এখন ঘুমাচ্ছে। ঘুমের কথা বলে পুরো বিকেল কাটিয়ে দিল। এখন‌ও আসছে না।


মতি অহনাকে নিয়ে যায় একটি বাংলোতে। চারিদিকে গাছপালায় আবৃত জায়গাটার মাঝ বরাবর বাড়িটি। রাত গভীর হতেই অহনার জ্ঞান ফিরে আসে। পাশেই দেখতে পায় মতি সিগারেট টানছে। নাকে গন্ধ আসতেই অহনা কাঁশি দিয়ে উঠে। 

সাথে সাথেই মতি সিগারেট ফেলে দিয়ে অহনার কাছে আসে।


অহনা নিজেকে বড় একটি খাটে আবিষ্কার করে। উঠেই বলল,' আমি এখানে কেন?'


মতি গলা পরিষ্কার করে বলে,' এখানেই থাকার কথা ছিল তোমার।'


'আপনি এখানে এনেছেন তাই না?'


' জানার পরেও আবার জিজ্ঞেস করো কেন?'


' আমি বাড়ি যাব।' জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে,' রাত হয়ে গেছে অনেক। বাবা চিন্তা করছে হয়তো। এতক্ষণে সবাই জেনে গেছে। কি করলেন আপনি?'


' এছাড়া উপায় ছিল না। কি করতাম আমি? নিজের ভাইয়ের সাথে তোমার রোমান্স দেখতাম?'


' দরকার হলে সেটাই করতেন। আমার পেছনে কেন পড়ে আছেন? আমি কি ক্ষতি করেছি আপনার? আমার দোষটা কি?'


' তোমার একটাই দোষ, তুমি সুন্দরী। তুমি এতটাই সুন্দর যে সারাজীবন তাকিয়ে থাকলেও নজর লাগবে না কখনো।'


'আপনার নজরটাই খারাপ। কখনো কাউকে ভালো চোখে দেখেন না। কাউকে মন দিয়ে ভালো নজরে দেখলেই বুঝতেন প্রতিটা মানুষ কত সুন্দর।'


' তুমি ছাড়া আর কেউ সুন্দর না। তোমার মধ্যে কোনো খুঁত নেই। সবার মাঝেই কিছু না কিছু খুঁত থাকে। তুমি নিখুঁত। তাই তোমাকেই চাই।'


' মানুষ তার খুঁতের জন্য‌ই নিখুঁত। আপনার মন থাকলে আমি হয়তো একটু হলেও গলতাম। এখন তা মনে হচ্ছে না। আমাকে যেতে হবে। বাবা হয়তো খুঁজে মরছে।'


' সে যাই বলো। কার মধ্যে কি আছে না নেই, আমার সেটা দেখার দরকার নেই। আমার তোমাকে চাই, ব্যাস। আর কিছু লাগবে না। আর এই বাড়িটা দেখছ যে, এটা আমার বাবার তৈরি বাংলো। মাঝে মাঝে বাবা আসেন, আমি আর ভাইও আসি। এখন কেউ আসবে না এদিকে। সবাই বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। কেউ আসবে না এখানে। তোমাকে বাঁচাবে কে আমার থেকে?'


' আপনাকে আমি খারাপ ভাবলেও কিছুটা মানবিক ভেবেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে আপনার মতো নরপশু আর কেউ নেই। পৃথিবীর খারাপ লোকগুলোর মধ্যে আপনি একজন।'


' কালকেই তোমাকে বিয়ে করব। তুমি রাজী না থাকলেও।'


' আমি আপনাকে বিয়ে করব না।'


' করতেতো তোমাকে হবেই। আমি যে মানব না।'


' আমি এখান থেকে যেতে চাই। যেতে দিন আমাকে। আমি কখনোই আপনাকে চাই না।'

অহনা চিৎকার করে বলে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে,' কেন আমার সাথেই বার বার এমনটা হয়। আমি কি এমন দোষ করেছি, যার জন্য এমন শাস্তি পাচ্ছি? আমি চাই না আর কাউকে জীবনে, আমাকে মুক্তি দাও তোমরা।'


' কি করে মুক্তি দিই তোমাকে?' মতি অহনার কাছে বসে বলল। পরক্ষণেই আবার বলল,' চাইলেই আমি তোমার সাথে এখন যা ইচ্ছা করতে পারি। কেউ বাঁচাতে আসবে না। কিন্তু আমি সেটা চাই না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই চাইবো নিজে থেকে আমার কাছে ধরা দাও।'


অহনা কাঁদে। ঘৃণা ভরা চোখে তাকায় মতির দিকে,

' কাপুরুষ আপনি।'


' হজম করে নিলাম। যা ইচ্ছা বলো।'


অহনা উঠে দরজার দিকে যায়। মতি তার হাত টেনে ধরে,

' তোমাকে বেঁধে রাখিনি কষ্ট পাবে বলে। কিন্তু এভাবে তিড়িং বিড়িং করলে বাঁধতেই হবে। কিছু করার নেই।'


অহনা নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়। মতি বিরক্তিতে 'চ' এর মতো করে শব্দ করে,

'এভাবে লাফাচ্ছ কেন? আমাকে কি শান্তিতে থাকতে দেবে না? আমি আজ পর্যন্ত কখনোই মেয়ে দেখে এতক্ষণ কিছু না করে থাকিনি। তোমাকে বিয়ে করব বলেই কিছু করছি না, সহ্য করছি।'


অহনা দেখে, এসব কথা বলার পরেও চোখে কোনো লজ্জা নেই মতির,

' সব মেয়েদের সাথেই ফ্লার্ট করেন?'


' অনেকের সাথে করেছি। কিন্তু আর করব না। তোমাকে পেয়ে গেছিতো।'


' ঘৃণা করি আপনাকে। আপনি একটা অস*ভ্য লোক, খারাপ লোক, বাজে লোক।'


' অসভ্যতামির কি দেখেছ?। সব করা বাকি আছে এখনো। বিয়েটা করে নিই কালকে, তারপরেই সব অস*ভ্যতামি করব, অপেক্ষা করো। আর যদি এভাবে লাফালাফি করো তাহলে আমি নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলব। কিছু একটা করে বসব তখন।'


অহনা ভয়ে চুপ হয়ে যায়। কোনো কথা বলে না। দু-হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে খাটের উপর গিয়ে বসে।


মাহতিম নিমোকে খুঁজে মরছে। আরেকবার নাজের সাথে দেখা করবে ভেবে নেয়। ইতিমধ্যে নাজের কাছে খবর এসেছে ক্যাপ্টেন নিমোকে কেউ হ*ত্যা করেছে নির্ম*মভাবে। মাহতিম নিজের বাড়ি আসে। মাহতিম কে দেখেই নাজ এগিয়ে আসে,' একটা নিউজ আছে!'


' কি নিউজ?'


' ক্যাপ্টেনকে কেউ মে*রে দিয়েছে।'


' এটা হতে পারে না। এবার আমি কিভাবে সব সামলাবো? উনি আমার একমাত্র ভরসা ছিল।' মাহতিমের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। 


' শান্ত হয়ে বোস। এত ভাবলে হবে না। তুই স্ট্রং, তুই পারবি একাই সব সামাল দিতে।'


নাজ আর মাহতিম যখন কথা বলছিল তখন শুনে নিল ইশতিয়া‌। পুরো ব্যাপারটা হজম করে সে এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল।


চলবে......

বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-২০


২০.

অহনার মুখ থেকে অস্ফুট কিছু শব্দ বের হচ্ছে শুধু। ভালো করে খেয়াল করে দেখল, এটা মতি। অহনা ছাড়ানোর চেষ্টা করে সফল হয়। হাতে কামড় বসাতেই সে ছেড়ে দেয়। পরক্ষণেই অহনার দিকে এগিয়ে আসে,' কেন করলে এমনটা?'


অহনা নিজেকে সামলে বলে,' আমি কিছুই করিনি। এভাবে আমাকে ধরার সাহস করে দিল আপনাকে?'


' আমি মানতে পারব না কোনোমতেই। তুমি এই বিয়ে করবে না। আমি বার বার বলছি এই বিয়ে করবে না।'


' আমি আপনার কথার গোলাম ন‌ই। আপনার যা ইচ্ছা করে নেন।'


' আমি তোমাকে ভালোবাসি, বিশ্বাস করো!'


অহনা অবাক হয়ে যায়। কথাটা তার কাছে ভালো লাগেনি,

' কি বললেন?'


' আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।'


' আমি বাসি না। এসব কি শুরু করলেন?'


' ভালোবাসি আমি তোমাকে, সেদিন দেখার পর থেকেই। আমি ভেবেছি বাড়িতে বিয়ের কথা বলব, কিন্তু তার আগেই কি করে এসব ঘটে গেল। আমি আগেই ভেবেছি বাবাকে বলব, কিন্তু তোমাকে আকাশে উড়তে দেখে আমি ভেবেছি ভূতে ধরেছে, আগে সুস্থ করব তারপর বিয়ে করব। কিন্তু এর আগেই এতসব ঘটে গেল। আমি এখন কি করব অহনা? বলে দাও।'


' কিছু করার নেই। আপনার বাবা বিয়েটা ঠিক করেছে। আর এখানে আমার বাবার সম্মানের প্রশ্ন, আমি কিছু করতে পারব না।'


' তুমি পারবে। তুমি ছাড়া আর কেউ ভরসা নেই। তুমি তোমার বাবাকে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো, বিয়ে করতে চাও।'


' কিন্তু আমি মিথ্যে কেন বলব? পারব  না আমি।'


' পারতে হবে তোমাকে। আমি কিছুতেই ভাইয়ের সাথে তোমাকে মেনে নিতে পারব না। আমার ভাইটা একদম বোকা, তোমার সাথে তাকে মানাবে না।'


'কেন মানাবে না। আপনাকে যদি গোয়ালের গাভীর সাথে মানায় তাহলে উনাকে কেন আমার সাথে মানাবে না?'


' একবার বোঝার চেষ্টা করো।'


'কিছূ চেষ্টা করব না।'


মতি এগিয়ে এসে অহনার হাত চেপে ধরে,

'এমন করো না। আমি ভালো হয়ে যাব একদম। আর কখনো কোনো অন্যায় কাজ করব না। তোমাকে বিয়ে করতে পারলে আর কিছু চাই না।'


' নিজের সীমার মধ্যে থাকুন। আমাকে কে বিয়ে করল না করল, এতে আমার কিছু যায় আসে না। চলে যান এখান থেকে, না হয় বাবাকে ডাকব।'


' তার মানে তুমি ভাইকেও বিয়ে করতে চাও না। ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি।'


মতি চলে যায়। অহনা তার কপালে ভালোবাসা হারানোর ভাঁজ দেখতে পেল। নিজেকে নিজে শুধালো,' এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? কেন হচ্ছে? আমি কেন বার বার এত এত প্রশ্নের সম্মুখীন হ‌ই? কেন আমার সাথেই সব অনিয়ম হয়?'


মাহতিম বন্দরের একটি জাহাজে উঠে যায়। সেখানে থেকে সোজা নরসিংদীতে ফিরে আসে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছে ক্যাপ্টেন নিমো এখানেই থাকে। তার সাথে দেখা করাটা জরুরি ছিল, তাই এসেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ক্যাপ্টেন সেখান থেকে চলে গেছে দুইদিন আগেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না।


মাহতিম আবার ফিরে আসে। তার প্রিয় বন্ধু নাজের কাছে যায়। অল্প বয়সী যুবতী নাজ। নিজের ঘরে বসে সে ফোনে কথা বলছিল, এমন সময় আগমন ঘটে মাহতিমের। মাহতিম তার পাশে গিয়ে বলল,' নাজ, আমি এসেছি।'


চমকে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে নাজ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করতে যাবে, তার আগেই মাহতিম তার মুখ চেপে ধরে,' দোহাই লাগে, কথা বলিস না, সবাই জেনে যাবে।'


' তুমি? তুমি এখানে কি করে? এটা কিভাবে সম্ভব?'


' সব পরে বলছি, এখন চিৎকার করিস না।'


মাহতিম আস্তে আস্তে নাজের মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে আনে,

'‌তোর সাহায্য দরকার আমার!'


' কিসের সাহায্য? আর তুই এতদিন দেখা করিসনি কেন?আমিতো ভাবতেই পারিনি তোকে আবার দেখতে পাব। ঠিক কি হয়েছিল তোর সাথে?'


' সে অনেক লম্বা কাহিনী। তুই আগে আমাকে সাহায্য কর।'


' অবশ্যই! তোকে সাহায্য করব নাতো কাকে করব?‌ কি করতে হবে বল, আমি তোকে সাহায্য করব।'


মাহতিমের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। নাজের প্রতি তার ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়,

' আমি জানতাম তুই আমাকে না করবি না। তোকে ছাড়া এখানে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। এবার আমার টার্গেট ফিলাপ হবে।'


' সিউর মাই ফ্রেন্ড। তোকেতো আমি শেষ পর্যন্ত সাহায্য করব।'


' এখন বল ক্যাপ্টেন নিমো কোথায় আছে?'


নাজের চোখে-মুখে চিন্তার রেখা পড়ে। কিছু ভাবছে সে। মাহতিম আবার বলল,' ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলা দরকার। তিনি আমার সব বিষয় জানেন। ওনার সাহায্য লাগবে আমার।'


' ক্যাপ্টেন আজ দু'দিন নিখোঁজ। কেউ জানে না তিনি কোথায়!'


' ঠিক আছে আমি খুঁজে বের করব। তুই শুধু বাইরের দিকটা নজরে রাখ, তাহলেই হবে।'


মাহতিম চলে যেতেই নাজ কল করে তার সঙ্গী রিভাকে, 

' রিভা শুনতে পাচ্ছ?'


'হ্যাঁ বলো।'


' মাহতিম ফিরে এসেছে।'


' হোয়াট? তোমার কি মাথা ঠিক আছে? ভুলভাল বকছো কেন?'


' আমার মাথা একদম ঠিক আছে। একটু আগে মাহতিমের সাথে আমার দেখা হলো। সে আমাকে বলল,  তাকে সাহায্য করতে।'


' তুমি করবে তাকে সাহায্য?'


' হ্যাঁ, আমি তাকে সাহায্য করব।'


' বিষয়টা কি সবাইকে জানাবো?'


' এখন না। সময় হলে আমি জানাবো। আমার আরো কিছু খোঁজ নেওয়া বাকি।'


নাজ কল রেখে শুয়ে পড়ে। অনেক প্রশ্ন মাথায় রয়ে যায়।


সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই অহনা তার বাবার কাছে যায়,

' বাবা আমি বিয়েটা করব।'


রোস্তমের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। হ্যারি, টিকু, রুমি, ইরা 'হুররে' বলে উঠে। অহনা সিদ্ধান্ত নেয় ময়নাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। তাই ময়নার বাবাকে খবর জানায় আসতে।


খবর জানাতে দেরি হলো, কিন্তু তার আসতে দেরি হলো না। এসেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। অহনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলে রোস্তম বাঁধা দেয়,

'ভাই, মেয়েটা এই কয়দিনে মন জয় করে নিয়েছে। এখন হঠাৎ চলে গেলে আমরা সবাই কষ্ট পাব। কিছুদিন পর আমার মেয়ের বিয়ে, বিয়ের পর‌ই না হয় যাবে।'


' তাহলেতো ভালোই হলো। ঠিক আছে তবে।'


' আপনিও থেকে যান। কয়টা দিনের‌ই ব্যাপার শুধু। তারপর মেয়ে নিয়ে চলে যাবেন।'


ময়নার বাপ আর অমত করে না। তিনিও থেকে যান।

রোস্তম আরেক দফা মোড়ল বাড়ি গিয়ে জানিয়ে আসেন, মেয়ে তার বিয়েতে রাজী হয়ে গেছে। মোড়ল‌ও খুশি হয়। বাড়ির মহিলাদের ডেকে বলে, 'কাল‌ই তাহলে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ছেলেকেও নিয়ে যাব। বিয়ে হবে ছেলে-মেয়ের, তাদের দেখা হ‌ওয়া, কথা হ‌ওয়াটা জরুরি।'


রোস্তম চলে আসে বাড়িতে। এখন তার অনেক কাজ। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। বাজারে গিয়ে নিজের হাতে বাহারী খরচ করে আনলেন। এলাকার অনেক মহিলা সাহায্য করতে আসল। মোড়লের বাড়ির ব‌উ হবে অহনা, সেটা ভেবেই সবাই হিংসেয় জ্বলছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না, উপরে উপরে ভালো সাজতে সবাই ইচ্ছুক।


অহনার মনে খারাপ প্রচুর। বার বার‌ মাহতিমের কথা মনে পড়ছে। কয়েকদিনেই কেমন আপন হয়ে গেল লোকটা, আর এখন কাছে নেই। হাঁসফাঁস লাগছে অহনার। জানালায় চোখ দিতেই পুনরায় মতিকে দেখতে পায়। একটা লোকের সাথে কথা বলছে সে। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কোনো কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। অহনা বিরক্ত হয়‌ মতিকে দেখে। মনে মনে আওড়ালো,' এই উটকো ঝামেলা আবার কি করতে আসছে কে জানে? সতর্ক থাকতে হবে আমাকে.....



চলবে.....

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৯

 

১৯.

মাহতিম ফিরে আসতেই অহনা তাকে ডাকে। কিছুটা আড়ালে নিয়ে প্রশ্ন করে,' কোথায় ছিলে তুমি? অনেকক্ষণ দেখিনি।'


মাহতিমের চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। অহনা তার চোখে চোখ রেখে বলল,' কি হয়েছে? আবার কি হলো? কাঁদছো কেন?'


' কিছু হয়নি তো। আমাকে যেতে হবে।'


' এই ঘর সন্ধ্যায় কোথায় যাবে?'


' কাজ আছে। যেতেই হবে।'


' আমাকে বলো কি কাজ! আমিও যাব তোমার সাথে।'


'না, কাজটা একান্ত‌ই আমার, আমাকেই যেতে হবে। এই র/হ/স্য শেষ দিতে হবে। খুব তারাতাড়ি সব কিছু থেকে মুক্ত হ‌ওয়া প্রয়োজন।'


' কিসের র/হ/স্য, কি বলছ তুমি? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। বুঝিয়ে বলো।'


মাহতিম ওর কাঁধে হাত রাখে,' এইটুকু মনে রাখো, আমার দুটো কাজ, একটা জুড়ে তুমি অন্যটা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি চাই না কেউ জানুক সেটা।'


' আমাকেও বলবে না?‌ কি এমন কথা যেটা আমাকে বলা যাবে না?'


' ভরসা রাখো। আমাকে এখন যেতে হবে, বড় বি/প/দ হয়ে যাবে না গেলে।'


মাহতিম চলে যেতে চাইলেই অহনা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,' তুমি এভাবে যেতে পারো না।'


' বোঝার চেষ্টা করো, আমি চাই না আমার ছোট্ট ভুলের জন্য অগণিত প্রাণ চলে যাক। আমাকে যেতেই হবে।'


' এতে কিছু জানি না আমি, আমাকে সব বলো আগে। তারপর যেতে দেব।'


' সময় হলে বলব, এখন সঠিক সময় না আহি। আর একটা কথা, সন্ধ্যায় তোমার বাবাকে হন্তদন্ত হয়ে বেরুতে দেখে পিছু নিয়েছিলাম।'


অহনা অবাক হয়ে বলল,' কেন গেল?'


' মোড়লের ছেলের সাথে তোমার বিয়ে পাকা করে এসেছে তোমার বাবা। তুমি অনেক লাকি, মোড়ল তোমাকে পছন্দ করেছে।'


' কিইই? কি বলছ এসব? তুমি মজা করছ নাতো?'


' আমি কেন মজা করব। এটাতো আনন্দের বিষয়, কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে, বিয়েতে আমি থাকতে পারবো না। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আমার, যেটা না করলে হয়তো আমি আর কখনোই তোমার সামনে দাঁড়াতে পারব না।'


অহনা আঁতকে উঠে। চোখ সজল হয়ে আসে, তোমার কি সত্যি আনন্দ হচ্ছে?'


মাহতিম চোখ সরিয়ে নেয়। অন্যদিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে। কান্নাটা হজম করে নিয়েছে ঢোকের সাথে। অহনা আবার বলল,' কি হলো? খুব আনন্দ পাচ্ছ তাই না?'


' হ্যাঁ, আমি খুব খুশি। তোমার বিয়ে হবে, ছেলেটা খুব ভালো। আজকাল এমন ছেলে পাওয়া যায় না‌।'


অহনা ঠোঁট কামড়ে কাঁদে,' আমার কষ্ট হচ্ছে।'


মাহতিম চুপ করে থাকে। অহনা পুনরায় বলল,' আমি তোমাকে যেতে দেব না।'


' যেতে হবেই আমাকে। কেন বুঝতে পারছ না? আমি সাধারণ মানুষ ন‌ই।'


' সে যাই হ‌ও তুমি। আমি তোমাকে ছাড়বো না‌।'


মাহতিম অহনার কাছে এসে দাঁড়ায়, ওর কাঁধে হাত রেখে বলে,' আমি তোমাকে কষ্ট দিতে পারবো না কখনো। যদি কখনো দিয়ে ফেলি, তবে সেদিন যেন আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়, তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি থাকতে পারব না কখনো।' 

মাহতিম গলা পরিষ্কার করে অন্যদিকে তাকিয়ে আবার বলল,' তোমার বিয়ে করে নেওয়া উচিত। একজন থেকে ঠকে গিয়ে তুমি বিষন্নতায় আছো, এখন কারো সান্নিধ্যে‌ই তুমি ঠিক হয়ে উঠবে। আমি তোমার খুশি চাই। আমি অনেক খুশি , তোমার বিয়ে হবে খুব ভালো একটা ছেলের সাথে।'


' আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছো না তুমি! এর মানে কি জানো? এর মানে হলো তুমি মিথ্যে বলছ, তুমি মোটেও খুশি না।'


' আমি কতটা খুশি বলে বোঝাতে পারব না।'


' এতো খুশি তুমি? এতদিনের কিছু স্মৃতিও বুঝি তোমাকে কষ্ট দিতে পারেনি?'


' কোনো স্মৃতি মনে রাখিনি আমি। স্মৃতিরা কষ্ট দেয় খুব। মনে রাখতে চাই না।'


' তবে চলে যাও। ধরে রাখব না‌।'


মাহতিমের বুকের ভেতরটা মো/ছ/ড় দিয়ে উঠে। দিশেহারা লাগছে তার নিজেকে। উল্টো দিকে ফিরে তাকাতেই অহনা তার হাত চে//পে ধরল,' সত্যি কি চলে যাবে? আমার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না। মজা করছ না তো?'


' আমি মজা করছি না।'


অহনা চোখের পানি মুছে নেয়। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে জিজ্ঞেস করে,' কবে ফিরে আসবে তবে?'


' জানা নেই। নাও আসতে পারি।'


' তার মানে নিশ্চয়তা দিতে পারছ না। কি বোকা তুমি, গুছিয়ে মিথ্যেও বলতে পারো না আমাকে। আবার নাকি ছেড়ে যাবে।'


মাহতিম গোল গোল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। চোখের পাপড়িগুলো পানিতে ট‌ইটুম্বর। নিষ্প্রাণ ঠোঁট দুটো তাকে অহনার দিকে টানছে। নিজের চোখ সরিয়ে নেয়। মনে মনে বলে, এতো সুন্দর তুমি, কখনোই চোখ সরাতে পারিনা। কেন এতো ভালো লাগে তোমাকে? সবাই পেতে চায়, আমিও চাই হয়তো। কিন্তু আমি কি সেই একজন হতে পারব? কখনোই না। আমি তোমার কাছে অদৃশ্য। আমার অস্তিত্ব নেই, আমি তোমাকে পাওয়ার মতো আকাশচুম্বী আশা রাখতে পারি না‌। ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মাহতিমের। অহনার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে মাটিতে নত করে।


অহনা কোনো কথা না বলে লুটিয়ে পড়ে মাহতিমের বুকে। চাতক পাখির মতো অহনাও যেন তার বৃষ্টির সন্ধান পেল।  হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে,

' আমি কেন এত কষ্ট পাই? সব কষ্ট কেন আমাকেই বেছে নেয়? আমি কেন দুটো দিন শান্তিতে থাকতে পারিনা‌? কষ্ট আমাকে পেতেই হবে।'


মাহতিম শেষ স্পর্শ ভেবে নিজেও জড়িয়ে নেয়। শক্ত করে আলিঙ্গন করে নেয়। অহনা ক্ষান্ত কন্ঠে বলে,' এই বুকের স্পর্শ একান্ত‌ই আমার। এর স্পর্শে আমি হা/রি/য়ে যাই। বার বার ইচ্ছে করে স্পর্শে তলিয়ে যাই, ভীষণ করে। কিভাবে ছাড়বো? পারব না। এই একান্ত সম্পদটাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে রাখতে চাই।'

 পরক্ষণেই শান্ত হয়ে যায়। গলা পরিষ্কার করে যোগ করে,'তোমাকে আটকে রাখবো না। কারণ আমি জানি, তুমি ফিরে আসবেই। সঠিক সময়ে‌ই আসবে।'


' এতোটা আত্মবিশ্বাস তোমার?'


' অনেক।'


' যেতে হবে এবার।'


অহনা ছেড়ে দেয়। মাহতিম এগিয়ে যায় সামনের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়।


রোস্তম মেয়ের ঘরে ঢুকে। কাছে এসে বলে,' কিছু কথা বলব তোকে।'


' আমি জানি!'


রোস্তম অবাক হয়ে বলল,' কি জানিস তুই? তুমি মতির সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছ তাইতো?'


রোস্তম চোখ মুখ বিকৃত করে বলল,' নারে। আরিশের সাথে।'


' সে যাই হোক। আমি বিয়ে করব না এখন।'


' কেন করবি না। কারণটাতো বলবি।'


' কোনো কারণ নেই। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।'


রোস্তম চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। পাশেই ছিল ময়না, বলল,' আপা, তুমি বিয়ে করতে চাও না কেন? আরিশ ভাই অনেক ভালো। আমার স্বামীর সাথে তার খুব খাতির ছিল।'


অহনা আঁতকে উঠে। ময়নার দিকে ঝাঁ/ঝা/লো চোখে তাকায়। কিছু বলার আগেই ময়না বলল,' আপা ভ//য় পেয়ো না‌ আরিশ ভাই এমনি যেত। আমার স্বামীর কোনো কাজ সম্পর্কেই সে জানত না।'


অহনা কিছু বলে না আর। ময়নাকে বলল,' তোমার বাবা কষ্ট পাচ্ছে। তোমার বাড়ি যাওয়া উচিত। পরে না হয় আবার আসবে।'


' হ্যাঁ আপা, কালকেই চলে যাব। লোকের ম*ন্দ কথা শুনবে বাবা, তাই যাচ্ছি না।'


' কে কি বলল না বলল তাতে কান দিতে নেই। তুমি যাবে। কেউ কিছু বললে মুখের উপর জবাব দেবে। মনে রেখো, তুমি যদি চুপ থাকো তাহলে লোকে সেটার সুযোগ নিয়ে আরো অত্যাচার করবে তোমাকে। আর যদি রুখে দাঁড়াও তাহলে কেউ সাহস পাবে না।'


' হ্যাঁ আপা। আমি রুখে দাঁড়াব‌ই।'


রোস্তম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আস্তে করে আবার বলে,' তোর মা থাকলে হয়তো সে বোঝাতে পারত। আমার কথা তুই বুঝতে পারছিস না। আমার তোকে নিয়ে চিন্তা হয়। আমি চাই তুই ভালো একজন জীবনসঙ্গী নিয়ে সুখী থাক আজীবন। আমার এই একটাই আশা। তোর উপর ভরসা করছে এটা। মোড়লরা বড়লোক, তাদের কথা না মানলে কি করবে জানি না, তবে মেনে নিলে সমাজে একটা ভালো সম্মান পাব। তুই আমার এই একটা কথা অন্তত রাখ মা।'


বলেই রোস্তম চলে গেল। অহনার কিছু ভালো লাগছে না। মাহতিম চলে যাওয়ায় মন খা*রা*/প, তার মধ্যে আবার বিয়ে। মেনে নিতে পারছে না। বাইরে বের হয় অহনা। কল পাড়ে গিয়ে চোখে মুখে পানি দেয়।


ঘরের দিকে পা বাড়াতেই কেউ তার মুখ চেপে ধরে। অহনা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। 

গম্ভীর স্বর ভেসে উঠে,' তুমি এটা করতে পারো না। কখনোই না.....  


চলবে......

বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৮

 

১৮.

'আমাকে একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'


মাহতিমের চোখ স্থির হয়ে যায়। উঠে যায় সে, দায়সারাভাবে দাঁড়িয়ে থাকে অহনার সামনে। অহনা পুনরায় বলল,' একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'


' কেন?'


' আমি চাইছি তাই!'


' কিছু চাওয়া অগোচরে থাকা ভালো।'


' ধরো না। একবার শুধু।'


মাহতিম নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। কষ্ট হচ্ছে তার, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দম নেয়,

' আমি দৃশ্যমান হলেই আমার শক্তি কমে যাবে। যে কাজের জন্য এসেছি সেটা অপূর্ণ থেকে যাবে।'


' এতো বাঁধা কেন? তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে?'


' আমি আসতে চাইনি। তুমি ডেকে এনেছো।'


'‌আমি ডেকে এনেছি? কিন্তু আমিতো কখনোই তোমাকে ডাকিনি, চিনতাম‌ও না।'


' কে বলেছিল অর্ণব নামের সেই ছেলেটার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর?'


' আমি তাকে চিনতে পারি নি। দু'মাসের পরিচয়ে তাকে আমার বিশ্বাস করা উচিত হয়নি।'


' এটাই কারণ।'


'ক্ষমা চাইছি।'


মাহতিম অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে রাখে। চোখ তার নত। কিছুতেই অহনার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। গাল বেয়ে তার কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল,

' মানুষ কত সহজে হা*রি*য়ে যায়। যাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি সেও হা*রি*য়ে গেল।'


অহনা নাক টেনে বলে,' তোমার এত কষ্ট কিসের? বলো আমাকে।'


' আমার কোনো কষ্ট নেই। জীবন নিয়েও কোনো আফসোস নেই। শুধু....'


' শুধু কি? এটাই বলবে তো, তুমি একজন ম্যাজিশিয়ান। তুমি ম্যাজিক করে সব করতে পারো। আমি জানি, আমার আগেই মনে হয়েছিল। কি, ঠিক বলছি তো?'


মাহতিম অহনার দিকে চেয়ে থাকে,

' হ্যাঁ, তুমি ঠিক। ঠিক তুমি। আমি একজন ম্যাজিশিয়ান, আমি জা*/দু জানি।'


' তাহলে কষ্ট কিসের? তুমি কেন কাঁদছো? চোখের পানি কখনো মিথ্যে হয় না।'


' আমি বুঝতেই পারছি না, কেন আমি কাঁদছি! কারণ অজানা।'


বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠে অহনার। মাহতিমের কাছে এগিয়ে আসে। অশ্রুসজল চোখজোড়া র/ক্তি/ম হয়ে আছে মাহতিমের। অহনার দিকে হাত বাড়ায়। কাঁধে দুহাত রাখে। অহনার চোখের কোণে জমে থাকা পানির কণা আঙুলের ঘষায় সরিয়ে দেয়,

' কাঁদছো কেন?'


' তুমিওতো কাঁদছো।'


মাহতিম দু হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয়,' কাঁদছি না আমি। তুমি খুব বোকা, বুঝতে পারো না।'


' জ/ড়ি/য়ে ধরো। আমার হাঁসফাঁস লাগছে।'


মাহতিম এক ঝ/ট/কা/য় অহনাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠে অহনা। শক্ত করে মাহতিমের শার্ট খামচে ধরে। ছেড়ে দিলেই বুঝি হারিয়ে যাবে। কেঁদে কেঁদে শার্টের অনেকটা ভিজিয়ে ফেলেছে। 

মাহতিম অহনার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া টের পায়। গরম নিঃশ্বাস অনুভব করে। আলতো করে মাথায় চুমু খায়। কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়,

' পা/গ/লী মেয়ে, কান্না শেষ হয়েছে?'


অহনা জ/ড়ি//য়ে ধরে আছে মাহতিমকে। মাহতিম ছাড়াতে চাইলেও সে আরো জোড়ালোভাবে ধরে আছে। অহনা বিরক্ত হয়ে বলল,' এমন অদ্ভুত আচরণ করছো কেন? আর একটু থাকতে দাও।'


' ঘরে যাও। সবাই অপেক্ষা করছে।'


' সবাই ঘুমাচ্ছে।'


' তাহলে তুমি কি করছো?'


' চোখে দেখো না? আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি আগলে রেখেছি।'


' কোনটা তোমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি?'


অহনা মাহতিমের বুকে হাত রেখে বলে,' এটা, এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইলেও দেব না‌। এর উষ্ণতা থেকে আমি বঞ্চিত হতে চাই না কখনো।'


' তোমার জ্ঞান লোপ পেয়েছে। হুঁশে নেই তুমি। ছাড়ো আমাকে আর ঘরে চলো।'


' আরেকটু!'


মাহতিম সরিয়ে দেয় অহনাকে। বুকের গরম ওম থেকে ছাড় পেতেই অহনার কেমন শীত লেগে উঠে। শরীর তার তেজ হা/রি/য়ে ফেলে। মাহতিম বলল,' কতক্ষণ এভাবে ছিলে মনে আছে?'


অহনা অনুভূতির রো/ষা/ন/ল থেকে বেরিয়ে আসতেই ওর মনে হয়, একটু আগেই জ/ড়ি/য়ে ধরেছিল। ল/জ্জা/য় নুইয়ে যায়। আবেগের বশে কি করে বসল?


দৌড়ে ঘরে চলে যায় অহনা। মাহতিম ভাবতে থাকে, একটু আগে নিজেই এতো কান্ড করল একটু জড়িয়ে ধরার জন্য। আর এখন নিজেই ল//জ্জা পাচ্ছে।


ভালোবাসা সবাইকে কেমন বেহায়া করে দেয়। নি/র্ল/জ্জ করে দেয় নিমেষেই। প্রমময়‌ ছোঁয়া পেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সেটাই হলো অহনার ক্ষেত্রে। 


আছরের পর রোস্তম হাজির হয় মোড়ল বাড়ি। বিশাল দৈর্ঘ ও প্রস্থ ব্যাপী বাড়ি। তবে আধুনিক বাড়ি বলা যায়। রোস্তম থমথমে পরিবেশ দেখে পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরপরই প্রবেশ করে। 


মোড়ল বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। রোস্তমকে দেখে হেসে বলল,' আসো, আসো। তোমার জন্য‌ই অপেক্ষা করছিলাম। একটু দেরি করে ফেললে বটে, তবে সমস্যা নেই‌।'


রোস্তম ক্ষমা চেয়ে নেয়। মোড়ল তাকে বসতে বলে। কিন্তু সে বসে না। মোড়ল অনেক জোরাজুরি করতেই রোস্তম সোফায় বসে। মোড়ল ঘরের দিকে মুখ করে বলে,' অতিথির জন্য নাস্তা নিয়ে আয়।'


রোস্তম থমথম খেয়ে যায়। ভয়েভয়ে বলল,' কর্তা, কেন ডেকেছেন আমাকে? আমি কোনো ভুল করিনি। কিছুদিনের মধ্যেই শহরে চলে যাব, মেয়েটা পড়বে, আমিও পাশে থাকতে পারব।'


' সেকি কথা? মেয়ে আবার চলে যাবে কেন? এবার না হয় একেবারে থেকে যাক। নিজের দেশের মাটি বলে কথা।'


' না কর্তা, মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়ালে আমিও শান্তি পাব।'


নাস্তা এসে যায়। মোড়ল থাকে চা এগিয়ে দেয়। এতো খাতির যত্ন দেখে রোস্তম আরো কাঁচুমাচু হয়ে বসে। মোড়ল আবার বলল,' মেয়ের চিন্তা আর করো না। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।'


' তা কেমন করে হবে? কখন আমার প্রাণ‌ও চলে যায়। মেয়েটাকে কোনো কূল করে দিতে পারলেই আমি শান্তি পেতাম।'


' আচ্ছা শুনো, আমার বড় ছেলেকে কেমন লাগে তোমার?'


রোস্তম ভেবে পায় না হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?

' আপনার ছেলেরা হলো হিরে, নজরকাড়া, কার না ভালো লাগে বলুন?'


' আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার কেমন লাগে?'


' ভালোই লাগে, শহর থেকে পড়াশোনা করে আশা ছেলে, এলাকার‌ও উন্নয়ন হবে তাকে দিয়ে।'


' একটা অনুরোধ রাখবে রোস্তম?'


রোস্তম বিনীত হয়ে বলে,' ছি ছি কর্তা, কি বলছেন আপনি? আপনি বললে জীবনটাও দিয়ে দেব। আপনি কেন অনুরোধ করবেন, আপনি আদেশ করবেন।'


' না, এখানে তুমি নিজেকে ছোট করে দেখবে না। এই মুহূর্তে আমি আর তুমি সমান। এটা ভেবেই আমি বলছি কথাটা।'


রোস্তম ঢোক গিলে নেয়,' কি কথা?'


' তোমার মেয়েকে আজ সকালে দেখেই ভালো লেগে গেছে। বড় ছেলে আরিশের জন্য কবে থেকেই মেয়ে দেখছি, মনের মতো কাউকে পাইনি। তোমার মেয়েকে দেখে মনে হলো রুপে, গুনে সে আমার ছেলের জন্য উত্তম। আমি চাই তাদের দুই হাত এক করতে। তোমার কি মতামত? আমি জোর করবো না। জানতে চাই শুধু।'


রোস্তম আনন্দিত হবে নাকি বিষন্ন হবে বুঝতে পারছে না। চুপ করে র‌ইল।

মোড়ল আবার বলল,' আমার ছেলে ভালো, তোমরা এই এলাকায় আছো, কখনো কি তাকে নিয়ে কোনো খা/রা*/প কথা শুনেছো?'


রোস্তম এক গাল হেসে বলল,' আমি ভাবতে পারিনি আপনার আমার মেয়েকে ভালো লেগেছে। আমার মেয়ের সৌভাগ্য এই বাড়িতে বিয়ে হবে। আমি রাজি।'


' আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে তারাতাড়ি তারিখটা ফেলে দেব, কি বলো বেহাই?'


রোস্তম ভেবে বলল,' মেয়েকে একবার কথাটা জানানো জরুরি। যদি....'


' আরে কোনো ব্যাপার না। আর এমন ভ/য়ে ভ*য়ে থাকবে না। মনে করবে আমরা সমান। বেড়াই আমরা, গলায় গলায় ভাব থাকবে। মেয়ের সাথে কথা বলে আমাকে জানাবে। আমি নিজে যাব তোমার মেয়েকে দেখতে বাড়ির মহিলাদের নিয়ে।'

বলেই মোড়ল রোস্তমের কাঁধে হাত রাখল। রোস্তম জোরপূর্বক হাসল। তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।


পুরো বিষয়টা খেয়াল করল মাহতিম। সে পাশে থেকেই মোড়ল আর রোস্তমের সব কথা শুনে নিল....


চলবে.....

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৭


১৭.

গ্রামের পাশের সরু গলি দিয়ে ধান ক্ষেতে আসতেই মোড়লের সাথে দেখা হয়। রোস্তম সালাম দিতেই লোকটা থামে। সবার দিকে তাকিয়ে বলল,' রোস্তম যে, তা কেমন আছো?'


'আপনাদের দোয়ায় ভালোই আছি।'


'এরা কারা? এলাকায় নতুন মনে হচ্ছে।'


রোস্তম গলা নামিয়ে সরল কন্ঠে বলল,' শহর থেকে এসেছে, আমার মেয়ের বন্ধু সকল।'


' মেয়ে ক‌ই? তাকে তো অনেক দিন দেখি না। কলেজে পড়ে না?'


রোস্তম পেছন থেকে টেনে অহনাকে সামনে দাঁড় করালো,' এই যে আমার মেয়ে। অনেকদিন পর গ্রামে পা রাখল। শহরেই পড়ে।'


অহনা সালাম দিল মোড়লকে। সালাম নিয়েই মোড়ল অহনাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে,

' মেয়েতো বড় হয়ে গেছে অনেক। তা কিছু কি ভেবেছ?'


' এখনো ভাবা হয়নি। মা ম//*রা মেয়েটাকে এখন চাপ দিতে চাই না‌।'


' বিষয়টা আমি ভাবব। আসি রোস্তম আলী, আবার দেখা হবে।'


অহনা রোস্তমের দিকে তাকালো,' বাবা, লোকটা তোমাকে কি ভাবতে বলেছে?'


' কিছু না। চল তুই।'


অহনা আবার পেছনে চলে আসে। মাহতিমের মুখটা লাল হয়ে আছে। অহনা তুড়ি বাজিয়ে জিজ্ঞেস করে,' কি হলো? কি ভাবছ?'


মাহতিম অহনার দিকে তাকায়,' যা তোমার বাবা ভাবছে।'


' বাবা আবার কি ভাবছে?'


' কিছু না। কেউ পেছনে আসছে।'


মাহতিম দাঁড়িয়ে পড়ে। অহনা সবার সাথে তাল মিলিয়ে তাদেরকে চারিদিকটা দেখায়।


পেছন থেকে মতিকে দেখে মাহতিম ভাবার চেষ্টা করে তাকে চিনে কিনা। না চিনে না। কখনো দেখেনি। অহনা পেছনে তাকালেই লোকটা কেমন লুকিয়ে পড়ছে। মাহতিম ভেবে পায় না লোকটা এমন করছে কেন?


অহনাকে গিয়ে বলল। অহনা থেমে যায়। সবাই অনেকটা সামনে চলে যায়। মতি বেরিয়ে আসতেই অহনা তার কাছে যায়,

' সমস্যা কি আপনার? পিছু নিলেন কেন?'


মতি পাশে কাউকে না দেখে বলল,' কাল রাতে একটা বিষয় দেখেছি, বুঝতে পারছি না সত্যি কিনা।'


' কি দেখেছিলেন?'


' আমি দেখেছিলাম তুমি উড়ছিলে আকাশে। আমি অনেকবার খেয়াল করেছি দেখলাম উড়ছিলে। স্যরি তুমি করে বললাম, আসলে তুমিতো এখন আর ছোট না, তাই বললাম।'


অহনা আঁতকে উঠে, বলল,' ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে দেখলেন কিভাবে?'


' আমি মানে.... আমার ঘুম আসছিল না রাতে, তাই হাঁটতে বেড়িয়েছিলাম।'


' আর কাউকে কি দেখেছেন?'


' না, তুমি একা। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না কিভাবে উড়েছিলে তুমি?'


অহনা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, বলল,' আপনি ভুল দেখেছেন। মানুষ কখনো উড়তে পারে নাকি।'


' আমি ঠিক দেখেছি, এবার তুমি আমাকে সত্যিটা বলবে। কিভাবে তুমি পারলে। আমাকে বলো, না হয় খা/রা//প হয়ে যাবে।'


' এমন কিছুই হয়নি। আপনি কাকে দেখে আমাকে ভাবছেন কে জানে। চোখে দুই চামচ বেশি দেখেন। আমাকে যেতে হবে, বায়।'


' আমি জানি তুমি মিথ্যে বলছ। আমি জেনেই ছাড়ব কিভাবে এই শক্তি পেলে তুমি। এবার দেখো আমি কি করি!'


' কি করবেন? কি//ড ন্যা প করবেন?'


' দরকার হলে সেটাই করব। আমার জানতে হবে।'


অহনা চলে যেতেই মতি তার হাত চেপে ধরে,' সত্যিটা বলে যাও। আমি ভুল দেখিনা কখনো। আমি একা নয় আরো অনেকে দেখেছে, সবাইতো আর ভুল দেখেনি।'


' বাহ, একটু আগে বললেন আপনি হাঁটতে বেরিয়ে দেখেছেন এখন বলছেন আরো অনেকে দেখেছে?'


'কথা না বাড়িয়ে সত্যিটা বলো।'


' হাত ছাড়ুন।'


' ছাড়ব না।'


মতি হাত ছাড়ছে না দেখে মাহতিম তার নাক বরাবর ঘু*/ষি মা///রে। নাক ফে//টে র*/ক্ত পড়তে থাকে। অদৃশ্য মার খেয়ে মতি চমকে উঠে। ব্যথার দিকে খেয়াল করল না সে।বলল,' কে মা/*র/ল আমাকে? এখানে কিছু তো গোলমাল হচ্ছে। আমি খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি না।'


' নিজেকে গুটিয়ে নিন, আর চলে যান।' অহনা রেগে চলে যেতেই মতি আবারো হাত চেপে ধরে।

মাহতিম কন্ট্রোল হারিয়ে ধা'ক্কা দেয় তাকে। মতি এবার কিছুটা ভয় পেল। কিছু বলতে যাবে, তখনি ময়না ডাকল অহনাকে। পেছনে পড়ে যাওয়ায় সবাই আবার ফিরে এলো। মতির এমন হাল দেখে রোস্তম জানতে চায় কি হয়েছে! মতি কোনো কথা না বলে প্রস্থান করে। অহনা 


দাঁয়সাড়া দাঁড়িয়ে থাকে। মতিকে নিয়ে ভাবছে সে। ভ/য় পাচ্ছে এটা ভেবে, একদিন বিষয়টা সবাই জেনে যাবে, খুব শিঘ্রই। ময়না ওর কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকি দিতেই অহনার হুঁশ ফিরে। সবার সাথে আবার চলতে থাকে।


দুপুর হতেই সবাই ফিরে আসে বাড়িতে। ফ্রেস হয়ে খাবার খেয়ে নেয়। বাড়িতে মাত্র তিনটা রুম। একটায় রোস্তম থাকে, বাকি দুইটায় অহনা ও তার বন্ধুরা। ছেলেদের জন্য একটা রুম মেয়েদের জন্য একটা। বিকেলে সবাই শুয়ে আছে। ইরা আর রুমি দিনের তোলা সব ছবি স্ক্রল করে দেখছে। ময়না অহনার পাশেই তার কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।


ইরা আর রুমির ছবি তোলা দেখে মাহতিম বলল,' মেয়েরা এতো ছবি তুলে কি পায়?'


অহনা হেসে বলল,' শান্তি।'


' আর কিছুতে কি শান্তি নেই?'


' এতো প্রশ্ন করো কেন? যেটা বুঝো না সেটা নিয়ে কথা বলতে নেই।'


মাহতিম চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার বলল,' মন খারাপ?'


অহনা ফিসফিস করে বলল,' তাতে তোমার কি? কথা বলো না। সবাই এমনিতেও আমাকে পাগল মনে করে।'


' বাইরে যাবে?'


' না।'


'‌আচ্ছা, তুমি কেন ছবি তুললে না?'


'‌আমার ভালো লাগে না।'


' কেন? তোমার কি শান্তি পেতে ইচ্ছে করে না?'


' সবার ভালো লাগা এক না। মেয়েরা স্বভাবত অনেক ছবি তুলে। আমি নই।'


' সেটা দেখতেই পেলাম। প্রায় হাজারটা ছবি তুলল। কিন্তু তুলে লাভ কি, বসে বসে এখন সব ডিলেট করছে। একটু পর সেখান থেকে পাঁচটা ছবি অবশিষ্ট থাকবে শুধু।'


' কি বলতে চাও?'


' তেমন কিছু না। কথা হলো, ডিলেট‌ই যখন করবে, তখন এতো ছবি তোলার মানে কি?'


' সেটা ওদের ব্যাপার।'


ময়না উঠে বলল,' আপা তুমি কার সাথে কথা বলছ?'


অহনা মাহতিমের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙায়। মাহতিম বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। অহনা বলল,' মনে মনে!'


ময়না যথাযথ উত্তর না পেয়ে আবারো শুয়ে পড়ে। অহনা উঠে পড়ে। বাইরে বেড়িয়ে দেখতে পায় মাহতিম কল পাড়ে থাকা একটি বেঞ্চের মধ্যে বসে আছে। অহনা পেছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখে। মুহুর্তেই তা ভেদ করে বেরিয়ে আসল তার বুক বরাবর। মাহতিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অহনা দেখতে পায় তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। অহনার মনটাও হুঁ হুঁ করে উঠে,

' কাঁদছ নাকি?'


মাহতিম নিজেকে সামলে নেয়,' ক‌ই নাতো।'


' আমি বুঝতে পারছি। কেন কষ্ট পাচ্ছ?'


' একদম না। বেশি ভাবছ।'


' আমি ভুল বলিনি। তোমার চোখ পড়তে পারি আমি।'


মাহতিম অহনার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয়,

' আচ্ছা, মৃ/*ত মানুষ কি ভালোবাসার অধিকার রাখে?'


অহনা এমন প্রশ্ন শুনে উত্তর খুঁজে পায় না। নির্বাক দৃষ্টিতে তাকায় মাহতিমের দিকে। মাহতিম আবার বলে,' মৃ*/ত মানুষের কি কষ্ট হয়?'


অহনা এবার উত্তর দেয়,' ভালোবাসার অধিকার সবার আছে। কষ্ট সবার হয়। কিন্তু তুমি এসব কেন বলছ?'


' আমার কষ্ট হয় কেন?'


' ধুর বোকা, তুমি কি আর...'


অহনা থেমে যায়। নিরবতা গ্রাস করে নেয় তাকে। বুকে কেমন চিনচিন ব্যথা হচ্ছে। কেমন একটা খাপছাড়া ভাব তার মনটাকে বিষিয়ে তুলে। হা/রা/নো/র ভ*য় জেগে ওঠে।


রোস্তম অহনার মায়ের ছবিটা দেখছিল। কান্নাভেজা চোখ তার। ছবিটায় হাত বুলিয়ে বলল,' মেয়েটাকে কোনো কূল কিনারা না করে চলে গেলে তুমি! স্বা-র্থ/পর তুমি। আমি কিভাবে কি করব? তুমি কি জানো, বাবা না থাকলেও মা তার সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারে। কিন্তু মা না থাকলে বাবা কেন পারে না? সবাই এটাই বলে। আমি জানি, আমি পারব মেয়েটাকে ভালোভাবে রাখতে, তবুও ভ\য় হয়, তুমি থাকলে সবকিছু আরো ভালো হতো।'


দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। রোস্তম চোখ-মুখ মুছে দরজা খুলে দেয়। মধ্যবয়স্ক একটি লোক এসেছে। রোস্তম আসার কারণ জিজ্ঞেস করতে বলল,' কর্তা আমনেরে যাইতে ক‌ইছে।'


রোস্তম ভ/য় পেয়ে যায়। মোড়লকে তার ভালো মনে হয় কিন্তু বড়লোকদের সে বিশ্বাস করে না। কখন কি ঝা*মে/লা দিয়ে বসে বলা যায় না। লোকটা আবার বলল,' কর্তা বলেছে আছরের পর যাইতে। কথা আছে নাকি।'


চলে যায় লোকটি। রোস্তম বিভোর হয়ে ভাবে, কোনো ভুল করেছে কিনা। হঠাৎ ডা/কা/তে রোস্তম ভ/য় পেয়ে যায়। কিভাবে ক্ষমা চাইবে এই বিষয়টা কয়েকবার ভেবে নেয়..... 


চলবে......

রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৬


১৬.

সকালে ফ্রেস হয়েই অহনা ব্যাগ গোছাতে থাকে। রোস্তম এসেই মেয়েকে ব্যাগ গোছাতে দেখে জিজ্ঞেস করে। কিছু বলে না অহনা। তৈরি হয়ে অন্যদের বলল,' তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে। আজকেই চলে যাব।'


রোস্তম বাধা দিয়ে বলে,' নারে মা, আর কয়দিন পর না হয় যাবি। এখন যাস না।'


' না বাবা, পরীক্ষা আছে আমার। তুমিও চলো, আমি কি একা রেখে যাব নাকি তোমাকে?'


' আমি এই বাড়ি ছেড়ে কীভাবে যাব। তুই আর দুদিন পর যাস।'


অহনা নারাজ। বাবাকে নিয়ে সে চলে যাবে। হ্যারি বলল,' গ্রামে কখনো আসা হয়না। একদিন অন্তত থাক। এলাকাটা ঘুরে দেখি আমরা।'


' এখানের পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের বিপরীত। এখানে থাকা মানেই বিপদ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে গেলেই ভালো হয়।'


মাহতিম পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বুকের সাথে হাত দুটো ভাঁজ করে এক পাশে দেয়ালের সাথে ঠেস মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলল না। অহনার দিকে তাকিয়ে আছে সে। অহনা এক নজর মাহতিমকে দেখেই আবার চোখ সরিয়ে নেয়। 

ইরা একদম যেতে নারাজ। রোস্তমকে বলল,' আঙ্কেল, ওকে চলে যেতে বলুন, আমরা থাকব।' তারপর অহনার দিকে তাকিয়ে বলে,' তুই যেতে পারিস, আমরা কিছু বলব না। পারলে এখুনি চলে যা। আমরা থাকব আঙ্কেলের সাথে।'


অহনা চোখ রাঙায় ইরাকে। ইরা দমে যায়। রুমি বলেই ফেলল,' তুই আমাদের বের করে দিতে চাস নাকি তোদের বাড়ি থেকে?'


অহনা করুণ চোখে তাকায় রুমির দিকে,' ছি, কি বলছিস এসব? দেখলি না কতকিছু ঘটে গেল এখানে। আমরা গেলেই মঙ্গল হবে। তোদের কথা ভেবেই ভয় পাচ্ছি। আমার কিছু হয়ে গেলে সমস্যা নেই, কিন্তু তোদের কিছু হলে আমি আঙ্কেল আন্টিকে কি জবাব দেব? তোদের ক্ষতি হোক আমি চাই না। আমাকে ভুল বুঝিস না।'


অহনা মাহতিমের দিকে চোখ দিতেই সে ইশারায় ডাকে। অহনা নজর দেয় না তার দিকে। গোছগাছ প্রায় শেষ। নাস্তা করেই র‌ওনা দেবে। 


অহনা কল পাড়ে যায় হাত-মুখ ধুঁতে। কল পাড় পিচ্ছিল খুব। পা দিতেই উল্টে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই একটি শক্তপোক্ত হাত ওকে ধরে নেয়। মাহতিম বলল,' সামলে চলবে। এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?'


' তুমি জানো না, এখানে পদে পদে বিপদ লুকিয়ে আছে। আমাদের যাওয়া উচিত। তুমিও তৈরি হ‌ও।'


' আমি কেন?'


' তাহলে ঠিক আছে, যক্ষ হয়ে এই বাড়ি পাহারা দাও।'


' আমি বলতে চেয়েছি, আমি কি তৈরি হবো?'


' আমিতো ভুলেই গিয়েছি তুমি কখনো ফ্রেস হ‌ও না। সবসময় এক‌ই ড্রেস, কিছু খেতেও দেখি না। অদ্ভুত তুমি! অথচ তোমার কাছে গেলেই কেমন নেশালো গন্ধ পাই। তোমার হরমোনের প্রভাব পড়ে আমার উপর। মানে আমি বলতে চেয়েছি, তোমার গায়ের স্মেলটা আমার ভালো লাগে। আমাকে তোমার দিকে টানে। ইচ্ছে করে সারাজীবন তোমার সাথে ঐ মুহুর্তকে থামিয়ে কাটিয়ে দিই। কিন্তু এটা হ‌ওয়ার নয়। আমি.....'


অহনাকে থামিয়ে দিয়ে মাহতিম বলল,

' তোমার কি বলা শেষ?'


' না আরো অনেক কিছু বলার আছে, সেটা শোনার সময় হয় না তোমার।'


' এখন বলবে?'


' বলব না। তুমি শোনার যোগ্য না।'


' আচ্ছা শুনো!'


অহনা পেছনে তাকিয়ে দেখল ইরা এসে গেছে। ইরা অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' একা একা কার সাথে কথা বলছিস? এখানেতো কেউ নেই। তোকে বার বার দেখছি কারো সাথে কথা বলছিস, আদৌ কেউ নেই। বিষয়টা ভাবাচ্ছে আমাকে।'


' এদিকে তাকা!'


অহনা হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল একটা বিড়ালকে, বলল,'এই বিড়ালটার সাথে কথা বলছিলাম। গম্ভীর থাকে সবসময়। ইচ্ছে করে তার গলা টিপে দেই।'


' ওফফ্ তোর যা ইচ্ছা কর। আমি যাচ্ছি।'


ইরা চলে যেতেই মাহতিম বলল,' আমাকে কি তোমার বিড়াল মনে হয়?'


' ইশশ্, তার মানে বুঝে গেছ এটা তুমি? আমি কিন্তু বলিনি একবার‌ও। নিজেকেই নিজে বিড়াল বললে।'


' তুমি একটু বেশিই বুঝ।'


' কারণ আমার ব্রেইন ভালো।'


' একদম না।'


' প্রমাণ চাই নাকি তোমার?'


' হ্যাঁ চাই, আমার জানামতে তোমার ঘটে বুদ্ধি নেই।'


' কি প্রমাণ দিতে হবে?'


' বুদ্ধিমান হলে এখান থেকে যেতে না। আর কয়টা দিন থেকে যেতে। বুদ্ধি নেই বলেই চলে যেতে চাইছো!'


' এটা কেমন কথা হলো?'


' যা বলছি ঠিক বলছি। দেখো আহি, তোমার মা চলে গেছে বেশিদিন হয়নি। এখন পিতৃভূমি ছেড়ে চলে গেলে লোকে কথা শোনাবে। তুমি জানো না লোকের কথা কতটা বিষাক্ত হয়। এখানে থাকাটা উত্তম হবে।'


অহনা চমকে উঠে, আহি? আহি কে? তুমি কি আমাকে আহি বলে ডাকলে নাকি?'


মাহতিম আমতা আমতা করে বলে,' আসলে, তোমার নামটা ছোট করে নিয়েছি। অহনা থেকে আহি।'


' ওহ, ঠিক আছে, আমি যাব না। কিছুদিন থেকে যাই আরো। খুশিতো এবার তুমি?'


' বুদ্ধিমানের মতো কাজ করলে।'


' এদিকে আস। আমি কেমন বুদ্ধিমান তোমাকে দেখাবো।'


মাহতিম চলে যায়। আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। অহনা হেসে উঠে। 

ঘরে গিয়ে সবাইকে একবার গম্ভীর মুখে পর্যবেক্ষণ করে দেয় অহনা। মুখে হাসি নেই কারো। চলে যাবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে।

অহনা খাটের উপর পা ছড়িয়ে বসে বলল,' বৃষ্টি আসবে আজকে।'


' টিকু বলল,' হ্যাঁ, সেই বৃষ্টিতে মাছ পড়বে প্রচুর, সেটা তুই ধরবি আর গালে ফুরবি।'


' আমরা যাচ্ছি না কোথাও।'


অহনার কথায় সবাই সচকিত হয়ে উঠে। রুমি আয়েশি ভঙ্গিতে বলে,' কি বললি এখন? আমরা যাচ্ছি না ফিরে?'


' কানে এয়ারফোন নেই, তাও শুনতে কষ্ট হচ্ছে নাকি তো। এক কথা দুইবার বলব না‌।'


রুমি মন খারাপ করে নিতেই অহনা তার কাছে এসে হেসে বলল,' চলো এবার, পার্টি করি‌। অনেক মজা হবে।'


অহনার ভিন্ন রূপ দেখে সবাই আনন্দিত হয়ে উঠে। আজকাল তাকে একটু বেশি গম্ভীর বা হাসিখুশি মনে হয়। আগে তেমন ছিল না।


সবাই মিলে বের হয় গ্রাম ঘুরে দেখতে। অহনা সবার থেকে আলাদা হাঁটছে, পেছনে। হ্যারি, টিকু, রুমি, ইরা অনেক এক্সাইটেড। মাঝে মাঝে অহনাকে বলছে, কিন্তু তার কর্ণপাত নেই। একেতো গ্রাম তার আগের পরিচিত অন্যদিকে মাহতিমের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে সে‌। 


হাঁটার সময় অহনার মনে হলো কেউ তার পিছু নিয়েছে। পেছন ফিরে দেখল কেউ নেই। মাহতিম তার পাশেই হাঁটছে, বলল,' কি হলো?'


অহনা নিজেকে ঠিক রেখে বলল,' কিছু না।'


আবারো অহনার মনে হলো কেউ পেছনে। গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, বাঁশঝাড় অগণিত। কেউ থাকলেও তাকে দেখা যাবে না। অহনা বার বার পেছনে দেখছে। এক পর্যায়ে মাহতিমকে বলল,' তুমি কি পেছনে কাউকে দেখতে পাচ্ছ?'


মাহতিম পেছনটায় ভালো করে চোখ বুলিয়ে বলল,' না, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।'


' ওহ।'


ইরা অহনার সামনে থাকায় ওর কথা সব শুনতে পায়। একা একা কারো সাথে কথা বলতে দেখে ইরা আরো ঘাবরে যায়। ভাবে, হয়তো জিনে আছর করেছে অহনাকে। না হয় এতবার একা একা কথা বলে কেন? 


অহনা আবারো বিরক্ত হয়, কেউ তার পিছু নিয়েছে সেটা বেশ ভালো বুঝতে পেরেছে। মাহতিম‌ও অহনার দুশ্চিন্তার জন্য সতর্ক দৃষ্টি দেয়। একটু পর‌ই অহনাকে বলল,' কেউ তোমাদের অনুসরণ করছে।'


অহনা ব্রু কুঁচকে ফেলে,' কেউ কেন অনুসরণ করবে?'


' আমার জানা নেই। খুব শিঘ্রই সে সামনে আসবে।'


' কে সে?'

  


চলবে....

সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৫



মাহতিম কিছু বলল না। উত্তর দিতে সে অনিচ্ছুক। অহনার হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে গেল।


ক্লান্ত থাকার দরুন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। অহনা এপাশ-ওপাশ করে। ঘুম আসছে না তার। হাজারটা প্রশ্ন মনে। উঠে পড়ে বিছানা থেকে। দরজা খুলে বাইরে বের হয়‌। মাহতিম তার কাঁধে হাত রাখে,

' যাচ্ছ কোথাও?'


অহনার চুপ করে থাকে। মাহতিম পুনরায় প্রশ্ন করে,' বের হলে কেন?'


অহনা কিছু না বলে হাঁটা ধরল। কিছুক্ষণ পরেই মুখ খুলে,

' ভাবছি তোমার মতো কম কথা বলব। কথা কম কাজ বেশি।'


' কিন্তু গন্তব্য কোথায়?'


' দেখতেই পাবে।'


অহনা নদীর পাড়ে গিয়ে থামে। পূর্ণিমা প্রখর থাকায় চারিদিকটা খুব ভালোই দেখতে পাচ্ছে। নদীতে নেমে পড়ে অহনা। মাহতিম তাকে বাঁধা দেয় না। আপনমনে অহনা পানিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে। একটু পর উঠে এসে মাহতিমের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে,' কে তুমি?'


মাহতিম দূরে তাকিয়ে বলে,' মাহতিম।'


' আমি তোমার পরিচয় জানতে চেয়েছি। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছো? কেন এসেছো? আমাকে কেন সাহায্য করছো? কি সম্পর্ক আমাদের মধ্যে? এসব উত্তর জানতে চাই আমি।'


' জেনে গিয়ে কি করবে?'


' সেটা তোমার না জানলেও চলবে। আপাতত নিজের পরিচয় দাও।'


' এই মুহূর্তে আমার কোনো পরিচয় নেই। না আর কখনো থাকবে!'


অহনা ভাবে, বলল,' তোমার কথা কখনোই আমি পুরোপুরি বুঝি না। কি বলতে চাও তা স্পষ্ট করে বলো না কেন? আমার হাঁসফাঁস লাগে, তোমার মধ্যে আমি অন্যরকম কিছু দেখতে পাই।'


' সেটাই, যেটা অপূর্ণ ছিল।'


 অহনা মাহতিমের কাঁধ স্পর্শ করে। কিন্তু ছুঁতে পারে না। আকুতি জড়ানো কন্ঠে বলে,' আমি তোমাকে ছুঁতে চাই।'


মাহতিম কিছুটা দূরে সরে যায়। অহনা আবারো এগিয়ে আসে, তুমি কেন এমন অদৃশ্য হয়ে থাকো? পাশে থাকলেও অস্তিত্ব নেই। আমার কেন জানি না ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।'


'কিসের কষ্ট তোমার?'


' জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে আমি স্বশরীরে দেখতে চাই। দেখা দাও।'


অহনার কথায় মাহতিম কোমল হয়ে আসে। দৃশ্যমান হলো আস্তে আস্তে। অহনার কাঁধ স্পর্শ করতেই সে ব্যথায় শব্দ করে উঠে।


' ব্যথা হচ্ছে খুব তাই না?' মাহতিম কোমল স্পর্শে বলল।


' এখন ব্যথা নেই।'


' আর থাকবেও না। আমি উপশম করে দিলাম।'


মুহুর্তেই সকল ব্যথা উধাও হয়ে যায় অহনার। মাহতিমের স্পর্শের জাদুতে শরীর তার চাঙ্গা হয়ে উঠে।


মাহতিম বলল,'তোমাকে একা রেখে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি আমার। আমি না গেলে এতকিছু ঘটত না।'


' নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন? দোষী আমি। আমি রেগে গিয়ে বের করে দিয়েছি।'


মাহতিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,' জীবনটা আরেকটু দীর্ঘ হলে কি হতো?'


অহনা বুঝতে পারে না তার কথা,

' তোমার জীবনটা আছে কিনা সেটাও জানি না আমি। তুমি কি? আদৌ মানুষ নাকি অদৃশ্য কিছু? আমি বুঝতে পারি না।'


অহনার মাহতিমের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে তার খুব চেনা মনে হয়, তবুও মনে করতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই চোখের দিকে সে আগেও তাকিয়ে ছিল। অনেক কথা জমা রয়েছে এই চোখে। অহনা বলল,' তুমি কেন সবসময় অদৃশ্য থাকো? কেন লোকের সম্মুখে আসো না? তোমার কি কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না?'


' যতবার আমি দৃশ্যমান হব। ততবার আমার শক্তি একটু একটু করে শেষ হয়ে যাবে। দুটো কাজের জন্য আমি এসেছি। সেগুলো শেষ না হতেই শক্তি শেষ হয়ে গেলে দুর্ভোগ নেমে আসবে।'


অহনা প্রশ্ন করে,' কোন দু'টো কাজ? কেন দুর্ভোগ নেমে আসবে?'


' খুব শিঘ্রই জানতে পারবে।'


হঠাৎ বাতাস ব‌ইতে শুরু করে। ভিজে থাকার কারণে অহনার শীত করে। আস্তে আস্তে তা আরো জোড়ালো হয়। শীতে দাঁতে দাঁত চেপে আছে অহনা। অহনা মাহতিমের দিকে তাকিয়ে দেখল, সে একমনে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। রাগে ফুঁসে উঠে বলল,' কখনো কি বাংলা সিনেমা দেখেছ?'


মাহতিম অবাক হয়ে বলে,' না! আমি পছন্দ করতাম না।'


' পছন্দ করতে না মানে? যাই হোক, সেজন্য‌ই এই অবস্থা।'


' কি হয়েছে?'


' তুমি তো দেখনি, বলে কি করব?'


' বলো?'


' সিনেমায় নাইকার শীত করলে নায়ক তার শার্ট খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দেয়। ছেলেদের শীত লাগে না বেশি তাই আরকি।'


মাহতিম হেঁসে উঠল। অহনা বিভোর হয়ে সে হাসি দেখে। গম্ভীর এই লোকটার হাসি তার ভীষণ রকমের ভালো লেগে যায়। অনেকদিন পর বলে হয় সে হাসল। অহনা বলল,' আমি হাসির কথা বলিনি। তোমার উচিত আমাকে সাহায্য করা।'


' তুমি শার্ট চেয়েছো, কিন্তু আমিতো শার্ট গায়ে দেইনি।'


' দেখতেই পাচ্ছি। তুমি এমন গাঢ় পাঞ্জাবি কেন পরেছ? বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছ মনে হয়। তুমি কি গোসল করো না? সবসময় এটাই দেখি যে।'


' এটা মানুষদের জন্য প্রযোজ্য। ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার। বাড়ি যাওয়া উচিত।'


' আমার অনেক শীত করছে। পারব না যেতে।'


মাহতিম অহনার কাছে আসে। তার ভেজা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দেয়। দুই কাঁধে হাত রাখে। অহনা কিছুটা সরে যেতে চাইলেই মাহতিম আরো শক্ত করে নিজের দিকে টেনে আনে। কোমরে এক হাত রেখে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। অহনা শিউরে উঠে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ছোটার চেষ্টা করছে না, এই অনুভূতি তার ভালো লাগছে। ঠোঁট দুটো ঝাঁকি দিয়ে উঠে অহনার। কেমন দিশেহারা ভাব তার মধ্যে। চোখ বন্ধ করে নেয়। 

মাহতিম অহনাকে শক্ত করে ধরে আছে। অহনা চোখ খুলতেই চোখাচোখি হয় মাহতিমের। লজ্জার ভাব স্পষ্ট। দৃষ্টি দিতে পারছে না। এখন তার ঠান্ডা লাগছে না। মাহতিমের শরীরের ওম তার শরীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অহনার গরম নিঃশ্বাস বারি খাচ্ছে মাহতিমের চ‌ওড়া বুকে।


গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি নেশা করে পুরনো পোড়া বাড়িটা থেকে বের হয়। সাথে তার চার সঙ্গি। ড্রাগের নেশায় তারা পাঁচজন ঢুলছে। তাদের মনে হচ্ছে, পিঠে একটা ডানা লাগিয়ে দিলেই হয়তো তারা উড়তে পারবে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তায় পা বাড়ায়। ওদের মধ্যে একজন উপরে তাকাতেই অহনাকে দেখতে পায়। চোখ কচলে মতিনকে জিজ্ঞেস করে,' গুরু! মানুষ কি আকাশে উড়ে?'


মতি হেসে উঠে,' হ উড়ে। আমার মতো করে।'


' না গুরু! তুমিতো নিচে। আকাশেও মানুষ উড়ে।'


' শা* আমি উড়ছি দেখে নে।'


' তুমি না। একটা সুন্দরী মেয়ে। মেয়েরাও পাখি হয়, উড়ে যায়।'


মতি উপরে তাকায়। অহনাকে দেখেই মুহুর্তেই আরো জোরে হেসে উঠে,' মেয়েটা উড়ছে দেখ। এটা পাখি, আমার উরন্ত পাখি।'

গান ধরে, এক মুহুর্তের জন্য মাথা ঝাঁকি দিয়ে আবারো দেখে। কেমন সন্দেহ হয় তার। ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে চোখে-মুখে পানি দেয়। ফ্রেস হয়ে আবার দেখতে পায় উরন্ত অহনাকে। মাহতিমকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছে অহনাকে। অহনা উড়ছে দেখে মতি বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। দূরে সরে যাচ্ছে অহনা। আরজ কিছুটা কাছে গিয়ে দেখে নেয়। অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। ভাবছে নেশার কারণে এটা হচ্ছে। আবারো পানি দেয় চোখে-মুখে। 

না সে সত্যি দেখছে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' আমি যা দেখছি তোরাও কি তাই দেখছিস?'


' হ গুরু। মেয়েটা উড়ছে। কিন্তু কিভাবে? পাখি উড়তে দেখেছি, আজ প্রথম মেয়ে উড়তএ দেখলাম।'


 মতি নিজেকে সামলে নেয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বিষয়টা সে জেনেই ছাড়বে.....


চলবে.....

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৪


১৪

অহনার মুখে হঠাৎ মাহতিম শব্দ শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকায়। অহনা সেটা বুঝতে পেরে বলল,' আসলে... আমি...'


' কি আমি আমি করছিস? মাহতিম কে?' হ্যারি জিজ্ঞেস করল।


' ক‌ই কেউ না। ময়নার কথা শুনে হঠাৎ নামটা মুখে আসল।'


অহনা দিকে সবাই সন্দিহান চোখে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেয়। ময়নার দিকে তাকিয়ে দেখল সে কাঁদছে। অভয় দিয়ে সবটা বলতে বলল হ্যারি।


ময়না চোখ মুছে আবার যোগ করে,' সোহেল আমাকে ধ*র্ষণ করে। আমার শাশুড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল শুধু। রাফিজ ঘরে এসে আমাকে না দেখে পুরো বাড়ি খুঁজে। একপর্যায়ে খুঁজে পায়। সেদিন রাফিজ সোহেলকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আমাকে রাফিজ বলল, এসব থেকে দূরে থাকতে। রাফিজ অনুতপ্ত ছিল, নারী পাচারকারী দলের সাথে সে পরিচিত ছিল না, শুধু মেয়েগুলোকে পাহারা দেওয়াই ওর কাজ ছিল। সোহেলের সাথে খারাপ আচরণ করায় রাফিজের খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে খু*ন করে তাকে। আমি আগে জানলে বাঁচিয়ে নিতাম তাকে।

রাফিজ চলে যাওয়ার পর আমি একা হয়ে যাই। সেদিন বিকেলেই সোহেল আমার সাথে বাজে কাজ করে। নিজেকে বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করি। সবশেষে সোহেলের ফোন আসতেই সে বারান্দায় যায়, সে সুযোগে আমি জানালা বেয়ে পালিয়ে এসেছি। নদীর পাড়ে আসতেই অহনা আপার সাথে দেখা হয়।'


অহনা বলল,' তাহলে সবাই তোমায় মৃ*ত বলছিল কেন?'


ময়না ঢোক গিলে বলতে শুরু করে,' মর্গে থেকে একটা ডেড বডি এনে বলছিল, ওটাই আমি। আমি ম*রে গিয়েছি গলায় দঁড়ি দিয়ে।'


মাহতিম অহনার কানের এসে বলে,' তুমি চাইলে সবাইকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারি।'


অহনা বলল,' না, এখানে আরো মেয়ে আছে। তাদের খুব বিপদ, আমাদের তাকে সাহায্য করা উচিত।'


' কিন্তু তারা কোথায়?'


' সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।'


মাহতিম চলে যায়। অহনা দেখল সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। টিকু বলল,' তুই নিজে নিজে কার সাথে কথা বলছিলি?'


' ক‌ই, কারো সাথে না তো?'


' আমি দেখলাম। কাউকে বললি কিছু দেখে আসার জন্য।'


সবাই বলল,' হ্যাঁ। এখানে থেকে আবার ভূতে ধরল নাতো?'


এর‌ই মাঝে সোহেল এসে পড়ে। সাথে এসেছে আফতাব জহরু। এতজনকে একসাথে দেখে তার জিভ লকলক করে উঠে। সোহেল সব খুলে বলল। আফতাব বলল,' তাহলে আর সমস্যা নেই। আজ রাতের মধ্যে আরো দু'টো মেয়ে জোগাড় করার কথা ছিল, এখন আর লাগবে না, ওদের দিয়েই হয়ে যাবে। আজ রাতেই আসছে তারা। তৈরি রাখিস এদের।' বলেই আফতাব চলে গেল।


সোহেল অহনাকে বলল,' তোমাকে আমার লাগবেই। তোমাকে ভোগ করে তারপর‌ই পাচার করব। আগে আমি মজা নেব, তারপর টাকা পাব। বিষয়টা দারুণ না?'


অহনা কিছু বলার আগেই তার মুখে রুমাল পেঁচিয়ে দেয়। সবার মুখে একে একে রুমাল বেঁধে দেয়। সোহেল কোমরে এক হাত রেখে বলে,' তোমাদের কিচিরমিচির আর ভালো লাগছে না। একটু চুপ থাকো।'


মাহতিম অহনার কাঁধে হাত রাখে। ভরসা দেয়,' একটু অপেক্ষা করো, আমি সবাইকে উদ্ধার করব।'


ভরসার হাত পেয়ে অহনা দমে যায়। সোহেল তার দিকে যেতেই আফতাব ডেকে উঠে। সোহেল বিরক্তিতে দেয়ালের সাথে হাত দিয়ে আঘাত করে,' শা*লার বাপ শান্তি দিল না। যখনি একটু শান্তি নিতে আসি তখনি কল করবে বা ডেকে নেবে। বাইনঞ্চ* বহুত জালাচ্ছে। ইচ্ছে করছে গলাটা কে*টে দিই।'


সোহেল চলে যায়। মাহতিম অহনাকে বলল,' প্রায় একশটা মেয়ে বন্দি আছে।'


অহনা মাহতিমের দিকে তাকায়,' আমরা কিভাবে ওদের উদ্ধার করবো? তুমি কিছু করলেইতো সবাই দেখে যাবে।'


' ভাবতে হবে।'


মাহতিম ভাবে। পরক্ষণেই বলল,' চিন্তা করো না। সারাজীবন গোয়েন্দা হয়ে কাটিয়েছি, এখন এই সামান্য বিষয়টা আমি সামলাতে পারব!'


' গোয়েন্দা হয়ে কাটিয়েছ মানে?'


অহনার কথার উত্তর না দিয়েই মাহতিম চলে যায়। সোহেল আর আফতাবের কথোপকথন শুনে। বুঝতে পারে, রাতেই মেয়েগুলোকে পাচার করা হবে। কিন্তু অহনাকে কষ্ট দেওয়ার কারণে মাহতিমের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে আছে। সোহেল আর তার বাবার সামনে যায়। সোহেলের হাত দিয়ে আফতাবকে থা*প্পর বসায়। আফতাব রেগে গিয়ে ছেলের কলার চেপে ধরে। সোহেল বলছিল, সে ইচ্ছে করে দেয়নি। কিভাবে হলো বুঝতে পারেনি। তবুও আফতাব কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়। হনহন করে বেরিয়ে পড়ে আফতাব। সোহেল ভ্যাবলার মতো বসে থাকে। তখনি পেছন থেকে ধাক্কা দেয় মাহতিম।

সোহেল পড়ে গিয়ে ধমক দিয়ে উঠে,' কে এখানে? বেরিয়ে আয় বলছি।' আরো কিছু অশ্রাব্য গালিও দেয়। মাহতিম তাকে দেয়ালের সাথে ছুড়ে মারে। মাথা ফেটে র/ক্ত বের হয়। সোহেল গালিগালাজ করছে, কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছে না। মাহতিম পুনরায় তাঁকে ধাক্কা দেয়। সোহেল হুমড়ি খেয়ে দরজার সাথে পড়ে যায়। কোনরকমে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।


রাত হতেই পাঁচটা মালবাহী ট্রাক এসে হাজির হয় সেই গোপন দরজার কাছে। একে একে সবগুলো মেয়েকে আনা হয়। ট্রাকে তোলা হয় তাদের। সোহেল অহনার কাছে এসে বলল,' কোনো ব্যাপার না, যাওয়ার পথে তোমার সাথে রোমান্স হবে। এখানে তো সুযোগ পেলাম না।'


গা ঘিন ঘিন করে উঠে অহনার। মাহতিম তেড়ে আসতেই অহনা তাকে থামিয়ে দেয়, বলল,' বুদ্ধি দিয়ে কাজ করা উত্তম। ওদেরকে ওদের স্টাইলেই শাস্তি দিতে হবে।'


সোহেল হেসে উঠে,' কার সাথে কথা বলছো? মাথাটা গেছে মনে হয়!'


রুমি, ইরা, টিকু, হ্যারিও চিন্তায় পড়ে গেছে। আজকাল কেন অহনা নিজে নিজে কথা বলে। 


সোহেল অহনার চুলে ফুঁ দিয়ে চলে যায়। মেয়েদেরকে জোর করে ট্রাকে তুলতে থাকে। অহনাকেও তোলা হয় একটি ট্রাকে। 

মাহতিম কিছু করছে না দেখে অবাক হয় অহনা। মাহতিম চুপ করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকের ডালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর কিছুই দেখতে পায় না অহনা। এভাবে মাহতিমকে কিছু না করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ মুখ লাল হয়ে আছে তার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাক চলতে শুরু করবে, কিন্তু মাহতিম এখনো দাঁড়িয়েই আছে।


সকলের মধ্যে আহাজারি। মেয়েগুলো কেঁদে মরছে, অথচ আওয়াজ নেই, মুখ বাঁধা তাদের।


ট্রাক ছাড়ার পজিশন নিতেই অহনা ভয়ে কেঁপে উঠে। মাহতিমকে ডাকতে থাকে।

যখন সব আশা ছেড়ে দিল অহনা, তখন বাইরে থেকে শব্দ পায় গুলির। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে। আনন্দে নেচে উঠে সে। পুলিশ ট্রাকগুলোকে ঘিরে ধরেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে উদ্ধার করে। 

অহনা দেখল মাহতিম এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে বাকি র‌ইল না সেই জানিয়েছে পুলিশকে। ইন্সপেক্টর রিজু সেন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,' এখানে অহনা কে?'


অহনা এগিয়ে আসে। ইন্সপেক্টর বলল,' আরে আপনি সেই না, যাকে কিছুদিন আগে উদ্ধার করেছিলাম? আপনি কিভাবে এখানে আটকা পড়লেন।'


' আমার বোনকে খুঁজতে এসে।'


' যাই হোক, আপনি অনেক সাহসী। আপনার জন্য‌ই আজ এই অপরাধীরা ধরা পড়ল। কবে থেকেই এই গ্যাংটাকে খুঁজছিলাম, বুঝতেই পারিনি আমাদের নাকের ডগায় ছিল।'


' আমি... মানে, বুঝতে পারছি না।'


' আপনিইতো আমাদের কল করে বললেন আসতে।'


অহনার মাহতিমের দিকে তাকায় একনজর, তারপর বলল,' জ্বী আমিই।'


' আপনার হাজবেন্ড কেমন আছেন?'


ইন্সপেক্টরের কথা শুনে সবার চোখ ছানাবড়া। হ্যারি এগিয়ে এসে বলল,' ওর এখনো বিয়ে হয়নি।'


' কি বলছেন আপনি? কিছুদিন আগেই ওনার সাথে আমার দেখা হলো। আজ আবার হলো। এই থানায় কালকেই বদলি হয়েছি আমি।'


অহনা হ্যারিকে বলল,'সবাইকে নিয়ে তুই যা। আমার কিছু কথা আছে ইন্সপেক্টরের সাথে। আমি কথা বলেই আসছি।'


হ্যারি যেতে না চাইলেও অহনা তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। তারপর ইন্সপেক্টরকে বলে,' আসলে আমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করেছি, তাই এরা জানে না।'


' কি বলেন? পুলিশকে বোকা বানাচ্ছেন নাতো আবার?'


' সবাই জানে। শুধু বন্ধুরা ছাড়া। আপনিও জানলেন এখন। আমি তাহলে আসি?'


ইন্সপেক্টর গাড়িতে গিয়ে একজন কনস্টেবলকে বলল,' মেয়েটাকে সন্দেহ হয়। ওর পুরো ডিটেলস্ চাই আমার কালকের মধ্যেই।'


' জ্বী স্যার!'


অহনার মাহতিমের কাছে যায়,

' কি হলো, বাড়ি যাবে না?'


' অবশেষে ধরা পড়ল তারা। যাদের বহুকাল আগেও ধরতে পারিনি আমি।'


' বহুকাল আগে মানে? কি বলছ? তুমি কি এদের চিনতে?'  


চলবে......

সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৩



১৩.

ছবির পেছনে দরজা দেখে অহনা অবাক হয়। ময়নাকে ভরসা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরটা অন্ধকার। কিছুক্ষণ হাতড়ে চলতেই অন্য একটি দরজার সামনে হাজির হয়। বাইরে থেকে আটকানো সেটা। অহনা অনেক চেষ্টা করে খোলার জন্য, বিফলে‌ যায়। 


পেছনে তাকিয়ে দেখে সোহেল বুকের সাথে হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ময়না ভয়ে অহনার সাথে লেপ্টে যায়। অহনা অভয় দেয়,' কিছু হবে না ময়না। ভয় পেয়ো না।'


সোহেল কপট রাগ নিয়ে বলল,' তোমাদেরকে ছেঁড়ে রাখাই আমার উচিত হয়নি। বার বার হতাশ করছ আমাকে। এবার দেখবে আমি কি করি।'


বলেই ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' ময়নারে ধর, আমি এটাকে সামলাই।'


পুনরায় ওদেরকে আগের ঘরটায় নেওয়া হয়। চেয়ারের সাথে দুজনকেই শক্ত করে বাঁধা হয়। 


সোহেল অনেকটা হিংস্র হয়ে যায়। অহনার সামনে এগিয়ে আসে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' তোর সামনেই আজ তোর বোনের এমন হাল করব, পরেরবার আমার উপর কথা বলতেও তার ভয় হবে।'


ময়না কেঁদে উঠে,' ছেঁড়ে দাও ভাই, আমার বোনকে ছেঁড়ে দাও।'


' ধরবো কি ছাড়ার জন্য? আজকে ওকে দিয়েই নাস্তাটা সেরে নেব।' সোহেল শয়তানি হাসি দিয়ে উঠে‌।


অহনার দিকে এগিয়ে আসে। অহনা ছোটার জন্য ছটফট করতে থাকে। এই মুহূর্তে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই,

' দূরে থাক আমার থেকে। তোকে দেখতেও আমার ঘেন্না লাগে।'


' এত অহংকার ভালো নয়‌। তোমার অহংকার যতক্ষণ না ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ততক্ষণ আমি শান্তি পাবো না।'


' এতো কনফিডেন্স? তাহলে মনে রাখ, আমাকে বাঁচাতে সে আসবেই। তখন কোল কি হাল হবে সেটা নিয়েই ভয়ে আছি আমি।'


' দেখিয়ে দিই তাহলে আমার কনফিডেন্সের মাত্রা। দেখি কে বাঁচাতে আসে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, আর না।  কাজ সব শেষ দিতে দিয়ে তোমার কাছেই আসতে পারিনি। এখন তাহলে আর কাজটাই করে নিই‌।'


সোহেল আরো এগিয়ে আসে‌। ময়না কেঁদে মরছে, ছুটতে পারছে না। সোহেল অহনার কাছাকাছি এসে শরীরের ঘ্রাণ নেয়,

' এত সুন্দর ঘ্রাণ! আমি মুগ্ধ! বিমোহিত! মেয়েদের শরীরের ঘ্রাণ আমার অনেক প্রিয়, তোমারটা আরো প্রিয়।'


' কাপুরুষ তুই? অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছিস।'


'ইশশ! এভাবে বলো না। তবে বলতে ইচ্ছে করলে বলো, আমার এসব গায়ে লাগে না।'


অহনা চোখ মুখ খিঁচে নেয়। সোহেল তার জামায় হাত দিতেই তার চোখ যায় জানালার দিকে। একজোড়া চোখ বাইরে থেকে দেখছে তাদের।


'কে ওখানে?' সোহেল হন্তদন্ত হয়ে জানালার কাছে যায়। 

ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' বাইরে গিয়ে দেখ, কে ছিল? আমি সিউর কেউ দেখছিল আমাদের।'


পরপরই অহনার দিকে তাকায়। আগুনের সাথে সাথে লালসা ঝড়ছে তার চোখ দিয়ে। অহনার দিকে এগিয়ে আসতেই ফোনে কল আসে। সোহেল ওপাশের কথাগুলো শুনেই অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' তোমার কাছে আসলেই যত বাধা পড়ে। চিন্তা করো না, বিশ মিনিটের মধ্যেই আসছি আমি।'


সোহেল বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যায়। অহনা কেঁদে উঠে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু কে জানো?'


'কে আপা?'


' তার নিজের শরীর।'


ময়না ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে‌। বুঝতে পারেনি সে। উত্তর পাওয়ার জন্য চেয়ে র‌ইল অহনার দিকে।


অহনা নাক টেনে বলল,' এই শরীরের জন্য‌ই বার বার ঐ নরপশুদের খোরাক হ‌ই। এই শরীরের লালসার জন্য‌ই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজেদের কি রক্ষা করবো? যেখানে নিজের শরীরটাই শত্রু‌।'


ময়না চুপ করে থাকে। কথাটার সম্পূর্ণ মানে সে এতক্ষণে বুঝে গেছে। সত্যিইতো মেয়েদের দুর্বলতা তার শরীর। এই শরীরের জন্য‌ই সে বাইরে বেরুতে পারে না, সবার লালসার দৃষ্টি থাকে।


ক্যাবলা দেখে নেয় হ্যারিকে। ছয়জন শক্তপোক্ত লোককে ডেকে এনে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। হ্যারিকে ডাকতে এসে সবাই বিপদে পড়ে। চারজনকেই বেঁধে নিয়ে যায় তালাবদ্ধ ঘরটাতে। 


হ্যারি তখন চিৎকারের শব্দ পেয়েছিল ঘরটিতে তাই জানালায় উঁকি দেয়। সোহেল সেটা দেখে নেয়।


অহনাকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে নিয়ে যায়। সবাইকে একসাথে বাঁধে। অহনা আরো অবাক হয় বাকিদের দেখে,

' তোরা এখানে আসলি কিভাবে?'


রুমি বলল,'‌ তোকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু এরা দেখে নেয়।'


' কেন করলি এটা? তোরা কেন আসতে গেলি? এবার সবাই বের হব কিভাবে?'


হ্যারি অভয় দেয়,' সবাই মিলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করে নেব। একটা না একটা উপায় বের হবেই।'


ময়না বলে উঠে,'পারবে না। এবার আমরা সবাই শেষ। বাকি মেয়েদের মতো আমাদের অস্তিত্ব‌ও বিলীন হয়ে যাবে সময়ের সাথে সাথে।'


ইরা ভয়ে বলল,' কি বলছো তুমি? আরো মেয়ে মানে?'


' আম ঠিকই বলছি। এসবতো চলছে আরো ত্রিশ বছর আগে থেকেই। আফতাব জহরু, মানে আমার শশুর এই সব করছে।'


অহনা ময়নার দিকে তাকায়,' পুরো ঘটনাটা আমাদের বলো। এমন কি হয়েছিল, যার জন্য তোমাকেও ছাড় দেয়নি?'


'শুনো তাহলে!'

ময়না বলতে শুরু করে,' আমার বাবা একজন সাধারণ মানুষ। বাজারে এইটা দোকান আছে শুধু। মা মা/রা গেছে আমার জন্মের সময়, বাবাই মানুষ করেছে। আমার পনেরো বছর হতেই আফতাব জহরু আমাকে বাবার দোকানে দেখতে পায়, সেখান থেকেই বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বড় বাড়িতে বিয়ে হবে ভেবে বাবা অনেক খুশি। আমি দেখতে মন্দ ছিলাম না বলে সবাই পছন্দ করে। আমার বিয়ে হয় আফতাব জহরুর মেজো ছেলের সাথে। দিন ভালোই যাচ্ছিল। একদিন আমার দেবর সোহেল বিনা অনুমতিতে আমার ঘরে প্রবেশ করে, আমার সাথে নোংরামি করার চেষ্টা করে। সেটা দেখে নেয় আমার স্বামী রাফিজ। সে তার ভাইকে থাপ্পর দেয়। আমাকে রক্ষা করার জন্য তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রাফিজ আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু গরীব বলে শাশুরী, ননদের অত্যাচার সহ্য করেছি খুব। উঠতে বসতে খোটা দিত। এভাবেই চলছিল দিন। একদিন বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে তারা বদ্ধ একটা ঘর দেখতে পাই। দরজাটা খুলে একজনকে বের হতে দেখে অবাক হ‌ই। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ দেখা গেলেও আসলে এটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। লোকটা বাইরে আসতেই আমি সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে যাই কি আছে দেখার জন্য। এখন মনে হচ্ছে, আমি না গেলেই আমার জীবনটা সুন্দর থাকতো।

দুইটা ঘর পেরিয়ে অনেকগুলো মেয়ের গোঙানির শব্দ পেলাম। আমি উৎসুক হয়ে দেখতে গেলাম। দেখলাম রাফিজ বসে আছে একটা চেয়ারে আর মেয়েগুলো কাতরাচ্ছে। আমাদের দেখে সে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম এতোগুলো মেয়ে এখানে কেন? আমি জিজ্ঞেস করতে করতেই ক্যাবলা নামক লোকটা এসেই ওকে বলল, মেয়েগুলোকে কেনার জন্য কাস্টমার এসে গেছে, আজ রাতেই নিতে আসবে, বাইরের দেশে পাচার করা হবে তাদের। রাফিজ লোকটাকে আকারে ইঙ্গিতে এসব বলতে না করল, কিন্তু লোকটা বুঝেনি তাই সব বলে দিল। সোহেল চলে এলো সেখানে। আমাকে দেখে রেগে গিয়ে থাপ্পর দিল। রাফিজ‌ও তার সাথে রেগে যায়। রাফিজ আমাকে নিয়ে ঘরে চলে আসে‌। আমাকে বুঝাতে থাকে বিভিন্নভাবে। কিন্তু আমি এমন অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারিনি। আমি আমার শাশুড়িকে সব বলি, ভেবেছি তিনি সাহায্য করবে। অথচ করেনি উল্টো সোহেলকে ডেকে এনে তার দিকে ঠেলে দিল আমাকে। সোহেল আমাকে তার মায়ের সামনেই.....'

এতটুকু বলতেই ময়না কেঁদে উঠে। অহনা কিছু বলার ভাষা পাচ্ছে না। কিছু বলতে যাবে, তখনি শব্দ এলো,' ওকে কাঁদতে দাও, মনে শান্তি আসবে।'


অহনা খুশিতে গদোগদো করে উঠে। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে,' মাহতিম!'


চলবে.....

মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১২



১২.

অহনা সোহেলের গলা চেপে ধরে। সোহেল এক টানে তার হাত সরিয়ে নেয়।

ময়নাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একবার পালাতে চেয়েছিল বলে এই অবস্থা করেছে। 


' তোমার অবস্থাও এমন হবে আবার পালাতে চাইলে।' সোহেল জহুরী দৃষ্টিতে তাকিয়ে অহনাকে বলল।


অহনা মুখ থুবড়ে বসে পড়ে। অকথ্য নির্যা/তন করেছে ময়নার উপর। অজ্ঞান হয়ে আছে, আদৌ জ্ঞান ফিরবে কিনা জানা নেই।


সোহেল নিচে নামিয়ে আনে ময়নাকে। অহনা ওর কাছে গিয়ে বসে। আদর করে ডাকে, সাড়া পায় না। সোহেল ঘরটিতে তালা মেরে আবারো বেরিয়ে যায়। 

অহনা দেখতে পায়, পাশেই পানির গামলা রাখা আছে। সেখান থেকে পানি এনে ময়নার চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর‌ই ময়না চোখ খুলে। অহনাকে সামনে দেখে খুব আনন্দিত হয়। জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। 

' আপা তুমি এসেছ? আমি তোমাকে অনেক মনে করেছি।'


অহনা ওর গালে হাত রেখে বলে,' পাগলী মেয়ে, কয়েক ঘন্টায় মন জয় করে নিলে, আর এখন বলছো আসছি কিনা? বোনের জন্য বোন সব করতে পারে।'


' আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আপা।'


' আমি সেটা জানি। কিন্তু কেন তোমাকে এখানে এনে কষ্ট দিচ্ছে এ সোহেল?'


' সে অনেক কথা আপা। তোমার সময় হবে না, আমাদের আগে এখান থেকে বের হতে হবে, বাড়ি গিয়ে সব বলব। এরা নরপশু, এদের থেকে বাঁচতেই হবে।'


' কিন্তু কিভাবে? চারিদিকে পাহারা, যেতে পারব না একদম। সবার চোখ এড়ানো সম্ভব হবে না।'


' আমি জানি। তবুও আমাদের চেষ্টা করতে হবে। সবার মতো আমরাও তাহলে আটকে যাব।'


' সবার মতো মানে? এখানে কি আরো কেউ আটকে ছিল?'


' এখনো শত শত মেয়ে আটকে আছে।'


অহনা আঁতকে উঠে। ময়নার গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,' আমাকে সবটা খুলে বলো, সবটা।'


' বলব আপা। কিন্তু এখন পালাতে হবে।'


অহনা উঠে দাঁড়ায়, ঘরটার চারিদিকে দেখে, তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না‌। ময়না দেখতে পায় পাশের দেয়ালে একখানা ছবি আটকানো। এমন পরিত্যক্ত জায়গায় ঘরটিতে ছবি আটকানো থাকার কথা না। অহনা আর ময়না ছবিটি খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। অহনার সন্দেহ হয় এটা নিয়ে। ছবিটা অনেক ভারী, হাত দিয়ে সরাতে পারছে না। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর ধরে ছবিটা এখানে রয়েছে। ময়না আর অহনা দুজন মিলে একসাথে ছবিটাকে ঠেলে সরায়। মুহুর্তেই চোখে মুখে বিষাদ নেমে আসে।


অহনার তার বন্ধু অহনার ঘর খুঁজে রুমালটা পায়। টিকু হাতে নিয়েই সেটা দিয়ে ঘাম মুছে। ঘাম থেকে পানির কণাগুলো রুমালে লাগতেই সেখানে কিছু লেখা ফুটে উঠে‌। টিকু ভয়ের চোটে সেটা হাত থেকে ফেলে দেয়,

' ভাই আমাকে বাঁচা। ভূতের রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে ফেলেছি ভুল করে। এখন আমার কি হবে?'


টিকু চোখ বন্ধ করে থাকে‌। সবাই তার কথায় নজর দেয়। ইরা তার মাথায় চাপড় মেরে বলল,' আমার থেকে বড় ভূত আর একটাও নেই, আমাকে ভয় না পেয়ে একটা রুমালে ভয় পাচ্ছিস কেন? চোখ খোল।'


' না আমি খুলব না। রুমালের ভেতরে ভূত আছে‌। সে লিখেছে।'


হ্যারি হাতে নেয় রুমালটা। দেখল একটা লেখা,' বড় বাড়ি।'


হ্যারি উল্টে পাল্টে দেখে বলল,' ক‌ই তেমন কিছু না। লেখাটা আগেই ছিল, তুই খেয়াল করিসনি টিকুর বাচ্চা।'


রুমিও দেখল, বলল,' হ্যাঁ, তেমন কিছু নেই। তবে একটু খটকা লাগছে।'


হ্যারি উৎসুক হয়ে তাকায়,'কিছু কি মনে হচ্ছে তোর?'


' হ্যাঁ, কেমন অদ্ভুত লাগছে আঁকা গুলো। আর দেখ, কিছু অগোছালো অক্ষর, আমার মনে হয় কেউ এই রুমালের দ্বারা সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।'


'দেখতে হবে। টিকু তাহলে ঠিক বলেছে। পানি লাগায় লেখাটা ফুটে উঠেছে। আমাদের দেখা উচিত, আর কোনো সূত্র পাই না।'


তারা রুমালটার উপর পানি ঢালল, আরো কিছু লেখা ফুটে উঠল। লেখা ছিল, ফুলের বাগান, বাম দ্বিতল।


লেখাগুলো বুঝতে পারছিল না কেউই, আসলে কি বোঝানো হয়েছে। 


এর‌ই মাঝে রোস্তম ঘরে প্রবেশ করে। ওদের হাতে রুমালটা দেখেই বলল,' এটা ময়নার রুমাল, তার বাড়ি থেকে পেয়েছে।'


সবাই তখন জিজ্ঞেস করল,' আপনি কি জানেন বড় বাড়ি দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে?'


' পাশের এলাকায় বড় বাড়ি রয়েছে। অহনা ঐ বাড়িটার কথা বলেছিল, ময়নার শশুর বাড়ি এটা।'


হ্যারি বলল,' তার মানে এটাই সংকেত। আমরা ঐ বাড়িতে গেলেই পরবর্তী সংকেতের উদ্দেশ্য বুঝতে পারব। চলো সবাই।'


রোস্তম যেতে চাইলে সবাই তাকে না করে। তাকে বাড়িতে রেখেই চারজন র‌ওনা দেয়। রাস্তার মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে বাড়ির ঠিকানাও নিয়ে নেয়।


বাড়ির গেইটে প্রবেশ করতেই দারোয়ান আটকায় তাদের। কিন্তু সবার স্মার্টনেস দেখে ঢুকতে দেয়। কলিং বেল চাপতেই বয়স্ক একজন মহিলা দরজা খুলে দেয়। বড় গলায় কাউকে ডেকে বলল,' আপা, বাইত্তে মেহমান আইছে। দেইখ্যা যান।'


একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এগিয়ে আসেন। ব্রু কুঁচকে তাকায় চারজনের দিকে,' কারা তোমরা?'


টিকু কিছু বলতে যেতেই রুমি তার হাত চেপে ধরে ইশারা দেয় চুপ থাকতে‌। তারপর হ্যারি বলল,' আমরা ময়নার বন্ধু।'


চাকর মহিলাটি সুর টেনে বলল,' ওমা, কয় কি? মাইয়া মানুষের আবার ছেইলে বন্ধু। আর কি যে দেহার বাকি আছে।'


মধ্যবয়সী মহিলাটি বলল,' রুনি, তুই চুপ থাক। রান্নাঘরে যা।' তারপর চারজনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,' কেমন বন্ধু? ময়নার তো কোনো কালে কোনো বন্ধু ছিল না।'


রুমি বলল,' আমরা ওর ছোটবেলার বন্ধু। আমরা ওর থেকে বয়সে বড় ছিলাম, কিন্তু একসাথে খেলতাম। সেখান থেকেই পরিচয়, খবর নিয়ে দেখবেন।'


' ঠিক আছে। তোমরা কি জানো না ময়না আর নেই?'


' জানি তো।'

রুমি কথাটা বলতেই হ্যারি থামিয়ে দেয়,

' আসলে ওর কথা মনে পড়ছিল, এখানে ওর অনেক স্মৃতি আছে, তাই আপনাদের বাড়িতে ঘুরে দেখতে আসলাম।'


' ঠিক আছে। দেখো তবে।'

মহিলাটি উঠে, একজন কাজের লোককে তাদের নাস্তা দিতে বলে চলে যায়।

ইরা রেগে যায়,' বড়লোক হয়েছে যে মনে হয় মাথা কিনে নিয়েছে। কিভাবে কথা বলে চলে গেল।'


' এই মুহূর্তে রাগ না করে আসল কাজ কর। আমাদের কাজ অহনাকে খুঁজে বের করা। পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখ কে কি পাস!'


তারা সবাই মিলে বাড়ির আনাচে-কানাচে দেখতে থাকে। একেকজন একেক দিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।


হ্যারি আবিষ্কার করে ফুলের বাগান। রুমালটা বের করে দেখে। বাম দ্বিতল কথাটার মানে বুঝতে পারছে না। বাড়িটার দিকে তাকায়, বাম পাশের উপরের তলায় চোখ দেয়। একটি জানালা দেখতে পায়.....

 


চলবে....

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১১



১১.

কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়েই অহনার হৃদয়ে কেঁপে উঠে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,' কে?'


আস্তে আস্তে পেছনে তাকায়। সোহেল দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝটকায় অহনা তার হাতটা সরিয়ে ফেলে। সোহেল হাতদুটো বুকের সাথে ভাঁজ করে দাঁড়ায়,

' পালাতে চেয়েছিলে তাই না?'


অহনা কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সোহেল চোখ মুখ হিংস্র করে আবার থেমে যায়,

' সুন্দরীদের গায়ে হাত তুলি না আমি, তাদের আদর করতেই ভালোবাসি। কিন্তু সবাই আমাকে হতাশ করে, তারা আমার থেকে পালাতে চায়।'


' শয়তানের কাছে কেউ কখনো নিজ ইচ্ছায় থাকতে চায় না।'


' তুমি ভুলে গেছ, আমার নাম সোহেল।'


সোহেল অহনাকে আবার আগের ঘরটিতে টেনে নেয়। ক্যাবলাকে জোরেশোরে একটা লা*থি দিতেই সে চোখ খুলে। সোহেল চলে যায় বিশ্রী একটা গালি দিয়ে। এবার আর অহনাকে বাঁধা হয়নি। শুধু বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।


ঘরটাতে তেমন আলো নেই। অনেক শীত‌ও পড়ছে হঠাৎ করে। অহনা কান পেতে শুনল, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই অহনা আপনচিত্তে বৃষ্টিতে ভিজে। আজ সুযোগ নেই। শীতে তার দাঁত-মুখ খিঁচে আসে। একটা টিশার্ট আর প্লাজু ছিল শুধু পরনে। কাঁপন আসে শরীরে।


একটু পর‌ই সোহেল আবার আসে। হাতে তাঁর বিরিয়ানি। অহনার সামনে এসেই প্যাকেট খুলে খেতে বলে। অহনা অন্য দিকে ফিরে যায়। সুযোগ পেয়ে পালানোর চেষ্টা করে,‌ কিন্তু ব্যর্থ হয়। সোহেল সহজেই একহাতে টেনে ধরে ওকে। অহনা স্থির হয়ে যায়। সোহেল ধমক দেয়,''খেয়ে নাও বলছি। না হয় আর কিছুই পাবে না সারাদিন।'


' খাব না বলছিতো।'


' সুন্দরীদের প্রতি আমার একটু বেশি দরদ তাই বিরিয়ানি নিয়ে এলাম। খাও বলছি, না হয় কি করব?'


' আমি খাব না। বন্দি করে এখন খাবার খাওয়ানো হচ্ছে?'


' আহহ্, সুন্দরী, কথা বলো না বেশি, হৃদয়ে লাগে। যদি নিজে না খাও তাহলে আমি খাইয়ে দেব বলে দিলাম।'


অহনা রেগে যায়, তেড়ে আসে সোহেলের দিকে,' তোকে আমি মে/রে দেব। আমাকে অসহায় ভাববি না একদম।'


' একদম না। তুমি অসহায় কে বলেছে? আমিতো পাশেই আছি, তাহলে কি করে অসহায় হলে?'


অহনা চুপ করে থাকে। কিছু বলতে পারছে না। বার বার ভাবছে মাহতিমের কথা। তাকে বেরিয়ে যেতে বলা উচিত হয়নি। এখন কত সমস্যায় পড়ল।


' মেয়ে মানুষ একটু বেশি না বললে শান্তি পায় না। আর সুন্দরী হলেতো কথাই নেই। যাই হোক, একটা কথা বলব।'


সোহেলের কথায় ব্রুক্ষেপ করে না অহনা। নিজেকেই বলল,'সারাক্ষণতো বলেই যাচ্ছিস, মুখ তোর থামছে না, আবার কি বলতে চাস?'


সোহেল অহনার কানের কাছে তার মুখ নেয়। তার কানের পাশ দিয়ে বেয়ে আসা চুলে ফুঁ দিয়ে পেছনে উড়িয়ে দেয়। পরক্ষণেই কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,' খেয়ে নাও পাপি, ময়নাকে দেখতে যাবেতো তুমি তাই না?'


ময়নার কথা বলতেই অহনা বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে নেয়। 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গোগ্রাসে গিলতে থাকে খাবারগুলো। মরিচ কামড়ে পড়ায় আকাশ-বাতাশ এক করে চিৎকার করে উঠে। সোহেল কানে হাত চেপে ধরে,' কানের পোকা বের করে ফেলবে দেখছি, পানি খাও তারাতাড়ি।'


সোহেল নিজেই পানি এগিয়ে দেয় অহনাকে। তারাতাড়ি খেতে গিয়ে কি একটা অবস্থা হলো। অহনা একদম ঝাল খেতে পারে না। অল্প ঝাল হলেও ম/রে যাওয়ার অবস্থা। অহনা খাওয়া অর্ধেক শেষ করেই বলল,' আমার খাওয়া শেষ, এবার ময়নার কাছে যাব।'


সোহেল শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,' পুরোটা শেষ করতে হবে। আজকে আর খাবার পাবে না, তাই ক্ষুদা থেকে তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। তোমার মূল্য....'

সোহেল থেমে যায়। 


অহনা কিছু না বলে আবারো খাওয়া শুরু করে। পুরোটা শেষ করে। ঝালের কারণে তার নাক-মুখ জ্বলতে শুরু করে, তবুও শেষ করে। 

' আমার খাওয়া শেষ।'


সোহেল হাসে,' বোনের জন্য এতো টান? ঝাল খাবার খেয়ে নিলে?'


' এতো কথা না বলে নিজের কাজ কর। কাপুরুষের মতো আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস কেন?'


' এতো বিপদে থেকেও তোমার তেজ কমেনি। অতি দুঃসাহস। পাতানো বোনের জন্য নিজেই ফেঁসে গেলে। জানো না, বাঘের মুখে আছ, যে বাঘ কাউকে ছাড় দেয় না। এক থাবায় পুরোটা হজম করে নেয়, চিবানোর প্রয়োজন মনে করে না।'


' তোর মতো বেড়ালেরা নিজেকে বাঘ ভাবতেই শেখে। তাদের নিজস্বতা নেই। আমাকে আবার বোনের কাছে নিয়ে চল, অন্তত এই পূণ্যটা জীবনে কর, পাপের খাতা ভরে গেছে তোর, জায়গা খালি নেই।'


' বোন? হা হা হা... আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাচ্ছি‌।'


অহনা মনে মনে বলল,' মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। কয়দিন দাঁত ব্রাশ করেনি কে জানে।'


' কিছু বললে?'


অহনা না বুঝার ভান ধরে,' ক‌ই কিছু না তো। আপনার কানের পর্দা বেশি মোটা তাই শুনতে পান অনেক কিছু।'


অহনার বন্ধুরা এসে হাজির হয় ইলাশপুর। অহনাদের বাড়িতে আসতেই দেখল রোস্তম ঘরের চৌকাঠে বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। টিকু তার পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,' এই ব্রো, এখানে কোথায় অহনা থাকে?'


রোস্তম চোখ তুলে তাকায়,' তোমরা কারা?'


' আমি টিকু, ওদের নাম জানতে হবে না, আপাতত আমারটাই জেনে নিন। বলুন অহনাকে চিনেন? আপনি কি তাদের কাজের লোক?'


' না বাবা, আমি অহনার বাবা। কিন্তু তোমরা কারা?'


টিকু রোস্তমের ঘাড়ে হাত রেখে কথা বলছিল এতক্ষণ, যখন জানল এটা অহনার বাবা, হকচকিয়ে উঠে। হাত সরিয়ে দেয় তার ঘাড় থেকে। আমতা আমতা করে বলে,' আঙ্কেল আমার অভিনয়টা কেমন হয়েছে বলেন তো?'


' কিসের অভিনয়?'


' একটু আগে আমি আপনাকে বললো বললাম, ফাজলামো করে জিজ্ঞেস করলাম আপনার মেয়ের কথা সেটা আরকি।'


' ওহ, আমি ভেবেছি আজকালকার ছেলেমেয়েদের বুঝি অধঃপতন হলো।'


' স্যরি আঙ্কেল। আমি বুঝতে পারিনি।'


' আমি কিছু মনে করিনি। তোমরা ভেতরে যাও, অনেকটা পথ এসেছ।'


রুমি এতক্ষণ সেলফি নিয়েই বিজি ছিল আর অন্যদিকে ইরা পরিবেশের ছবি তুলতেই ব্যস্ত। হ্যারি কোমড়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে তাদের সবার অবস্থা দেখছিল। 


সবাই ঘরে গিয়ে বসে। রোস্তম তাদের শরবত দেয়। তারা অহনার কথা জানতে চাইলেই সব কথা খুলে বলে। চারজন অবাক হয়ে যায়। এতকিছু ঘটে গেল কিন্তু অহনা তাদের কিছুই জানায়নি। ময়নার কথা কিছুই বলেনি। তবুও তারা ঠিক করে নেয় অহনাকে খুঁজে বের করবে।


সোহেল অহনাকে তিনটা ঘর পাড় করে নিয়ে যায় অন্য একটি ঘরে। সেখানে একটি সিঁড়ি। অহনা এবং সোহেল সেই সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে। দেখতে পায় থানে থানে বাক্স রাখা। বাক্সগুলো খুব বড়, আস্ত মানুষকে ঢুকিয়ে রেখে দেওয়ার মতো। অহনা সেগুলো ধরে দেখতে থাকে। সোহেল হাঁক দেয়,' কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? এসো তারাতাড়ি।'


অহনা সোহেলের তালে হাঁটে। একটা ঘরে এসে পৌঁছায়। অহনা ঘরে পা দিয়েই ভেতরে তাকায়। চারিদিক দেখে বলল,'ক‌ই এখানে কি?'


সোহেল উপরে ইশারা দিয়ে দেখায়। অহনা উপরে তাকাতেই চিৎকার দিয়ে উঠে। পা দুটো শীতল হয়ে আসে.....


চলবে......

বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১০



১০

মুখোশধারী লোকটি অহনাকে নিয়ে বড় বাড়ির পেছনে যায়। তালাবদ্ধ একটা ঘর। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখা গেলেও মূলত ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। বাইরে লোক দেখানোর জন্য তালা ঝুলানো হয়েছে। লোকটি দরজায় করাঘাত করতেই ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে দেয়। লোকটি থপ করে অহনাকে নিচে ফেলে দেয়। গা ঝেড়ে বলে,' তেজের থেকেও এর ওজন বেশি। সুন্দরী মেয়েরা বেশি ওজন হয় নাকি রে ক্যাবলা?'


ক্যাবলা দাঁত বের করে সাঁয় দেয়,' হ বস। তবে এবারের মাইয়াডা খাসা।'


' এরে নিয়ে আলাদা ঘরে রাখ। এর তেজ বেশি, সবার সাথে মিশতে সময় লাগবে।'


মাথা দুলিয়ে বলল ক্যাবলা,' জ্বী বস, এখুনি যাচ্ছি।'


মাহতিম রাগের বসে বাইরে ছিল। অদৃশ্য হ‌‌ওয়ার সুবাদে সে ঘুরে বেড়ায় চারিদিকে।

অহনার কথা তার মনে হতেই জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। না দেখতে পেয়ে ভাবে ওয়াশরুমে গিয়েছে হয়তো। কিন্তু দশ মিনিট পরেও যখন এলো না তখন মাহতিম ঘরে ঢুকে। কোথাও পায় না। এত রাতে কোথাও যাবেও না। মাহতিম নিজের বোকামির জন্য নিজেকে দোষারোপ করে। সে ভাবে, যদি সে রেগে বের হয়ে না যেত তাহলে এতো কিছু হতো না, তার দেখা উচিত ছিল। সে জানতো অহনা খুব বোকাসোকা মেয়ে। সহজে তার মাথায় বুদ্ধি আসে না। আবার কোনো ভুল করে বসবে। মাহতিম সবসময় তার মনোযোগ অহনার দিকে রাখে, আজ একটু রাগের জন্য ভুল করে বসল।


অহনার ঘোর কে/টে যায়। নিভু নিভু চোখে চারিদিকে তাকায়। অন্ধকার ঘরে কাউকে না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। হাতে-পায়ে বাঁধন দেওয়া‌, মুখেও রুমাল বাঁধা। একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছোটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এক চুল‌ও নড়াতে পারে না নিজেকে। পরিশেষে শান্ত হয়ে দেখতে থাকে। মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না।


রাত আরো গভীর হতেই মুখোশধারী লোকটি আসে। দরজায় ক'ট'ক'ট শব্দ হয়। অহনা চোখ তুলে তাকায়। আবছা আলোয় মুখোমুখি দেখতে পায় একজন ছায়া‌ মানবকে। অহনার চোখে হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যায়। লোকটা একটা দিয়াশলাই কাঠি জ্বালিয়ে নেয়, ফুটে ওঠে তার চেহারা। অহনা দেখতে পায়, এটা মাহতিম নয়, অন্য কেউ। কিন্তু তার মুখ ডাকা। লোকটি এক টানে নিজের মুখোশটি খুলে ফেলে। অহনা দেখতে পায় লোকটি আর কেউ নয়, দুপুরে কথা হ‌ওয়া সে লোকটি, বড় বাড়ির ছোট ছেলে। অহনা কিছু বলতে লাগে, কিন্তু মুখে রুমাল থাকার কারণে শব্দ বের হয় না। লোকটি অহনার মুখ থেকে রুমাল সরিয়ে দেয়, বলল,' তোতাপাখি কি কখনো কথা না বলে থাকতে পারে? তুমি বলো, আমি শুনছি।'


' কু//ত্তা/***র বা////চ্চা।' অহনা গালি দিতেই ফিক করে হেসে ফেলে লোকটি।


' তুমি মনে হয় আমার নাম জানো না তাই ভুল নামে ডাকছো। আমার নাম সোহেল জহরু।'


' আমাকে এখানে ধরে আনলি কেন?'


' ইশশ্, বুকে লাগে কথাগুলো। একটু আদর করে বলো, সুন্দরীরদের আদরমাখা কথা আমার খুব ভালো লাগে।'


' ছেঁ//ড়ে দে শ*য়.  তা*ন।'


' এটা বাংলা সিনেমা না। ডায়লগ বন্ধ করো। নিজ দায়িত্বে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করো।'


' কখখনো না।' অহনা নিজেকে ছোটানোর অনেক চেষ্টা করে। শক্ত দড়ি দিয়ে বেধেছে, সহজে খুলবে না। সোহেল অহনার দিকে এগিয়ে আসে,

' নিজেকে তোমার অসহায় লাগছে না?'


অহনা রপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে,' তুই একটা কাপুরুষ।'


'একদম না, আমি সুপুরুষ। প্রমাণ চাও?'


' আমাকে ছাড় বলছি, না হয় পস্তাবি। ও আসবে, তোদের সবাইকে দেখে নেবে।'


সোহেল ভয় পাওয়ার ভান ধরে বলল,' ওরি বাবা, ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এ আসবে, আমাকে মারবে খুব। ভয় পাচ্ছি আমি, খুব ভয় পাচ্ছি।' উচ্ছস্বরে হেসে উঠে সোহেল,' তোমার কান্না, কথা, কেউ শুনবে না, এই চার দেয়াল ছাড়া। যত ইচ্ছে ডেকে যাও সবাইকে।'


' তোকে শেষ করতে ও একাই যথেষ্ট। দেখবি, আসবেই।'


' ওকে অপেক্ষা করি সেই মহামানবের জন্য। আরেকটা কথা বলব তোমায়, ময়নার ব্যাপারে।'


অহনা সচকিত হয়ে উঠে ময়নার কথা শুনে,

' ময়না কোথায়, বলুন আমাকে?'


' আমার কাছেই আছে।'


' ও কোথায়? আমি ওর কাছে যাব।'


' কাল সকালেই তোমাকে তার কাছে পাঠানো হবে। এখন আমার ঘুম পাচ্ছে, এনার্জি নেই একদম। কাল দেখা হবে, গুড নাইট।'


' আমাকে ছাড়....'


সোহেল চলে যায় ঘরের দরজা বন্ধ করে।


সকাল হতেই রোস্তম সারা বাড়ি খুঁজে মেয়েকে, পায় না। এক পর্যায়ে পুরো এলাকা খুঁজে, কোথাও নেই। রোস্তম হাঁউমাঁউ করে কাঁদে, ময়নার পর তার মেয়েটাকেও হারিয়ে গেল।


রোস্তম আর এক মুহূর্তও দেরী করে না। পুলিশের কাছে যায়। ময়নার ব্যাপারেও গিয়েছিল, কিন্তু বিষয়টা আগেই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, মৃ//ত ঘোষণা করা হয়েছিল ময়নাকে। এখন অহনাকে খোঁজার জন্য আবার থানায় ডায়রি করতে গেলে সবাই তাকে পা//গ/ল ভাবে। তাকে বের করে দেয়। তার মামলাটা নেওয়া হয় না। রোস্তম বাড়ি না গিয়ে রাস্তার ধারেই বসে থাকে।


অহনার ঘুম ভাঙতেই সে পিঠে ব্যথা অনুভব করে। বন্দি থেকে সারা শরীর ফোঁড়ার মতো ব্যথা হয়ে যায়। অস্ফূট স্বরে আওয়াজ করে। জনমানব নেই এখানে যে সাহায্য করবে। অহনা স্থির থাকতে পারছে না, ব্যথা প্রচন্ড।


ক্যাবলা হাতে করে দুটো রুটি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। থালাটা এগিয়ে দেয় অহনার দিকে,

' খাইয়া লন।'


অহনা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ক্যাবলা আবারো বলল,' এই জায়গায় এইডাই সকাল বিকালের খানা। না খাইলে সারাদিন না খাইয়া থাকন লাগব।'


' খাব না আমি। নিয়ে যাও এই ময়লা পানি আর বাশি রুটি।'


' তাইলে উপাস থাকেন। বসের আদেশ, না খেলে জোর না করতে।'


ক্যাবলা চলে যেতে চাইলেই অহনা থাকে ডাকে,' ভাই শুনো?'


' হ আপা, কন।'


' আমি খাব।'


' এতক্ষণে লাইনে আইছেন। খাইয়া লন, এইছাড়া উপায় নাই। বসের যারে পছন্দ অয় তারেই নিয়া আহে। কপাল খারাপ আম্নের, সুন্দরী ক্যান আপনি?'


অহনা সুযোগ বুঝে বলল,' হাতের বাঁধন না খুললে আমি খাব কি করে বলো?'


ক্যাবলা এক গাল হেসে বলল,' কি যে কন আপা। খাঁড়ান, আমি খুইলা দিতাছি।'


মূলত অহনার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কোনোমতে বাঁধন খুলে ক্যাবলাকে আক্রমন করবে। 


ক্যাবলা হাতের বাঁধন খুলে দেয়। অহনা বলল,' আপনি ওপাশে ঘুরে দাঁড়ান, কারো সামনে খেতে লজ্জা করে আমার।'


' আইচ্ছা আপা। আমনে খান, বসের আদেশ আপনাকে খাওয়ানোর।'


ক্যাবলা উল্টো দিকে ফিরতেই অহনা পায়ের বাঁধন খুলে নেয়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েই চেয়ারটা হাতে নেয়। শরীরে জোর নেই, তবুও সমস্ত শক্তি দিয়ে ক্যাবলার মাথায় আ///ঘা***ত করে। ক্যাবলা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

অহনা নিজেকে ছাড়াতে পেরে উচ্ছ্বাসিত হয়। বন্ধ ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে। চারিদিকে কেমন অন্ধকার। পাশেই একটা জানালো দেখল অহনা। খুব ছোট সেটা, তাকিয়ে দেখে বড় বাড়ির পেছনের দিক এটা, ফুলের বাগানের কাছে। অহনা দেখল কেউ একজন নয়নতারা ফুল তুলছে। অহনা তাকে ডাকতেই কাঁধে কারো স্পর্শ পায়.....


চলবে.....

বুধবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৯



৯.

অহনা লুকিয়ে লুকিয়ে বের হ‌ওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। লোকটা চলে গেলেই অহনা‌ গেইটে যায়। বের হয়ে বাড়ি যায়। 


বিছানায় বসে মুখে এক হাত রেখে অহনা ভাবতে থাকে, কি করা যায়। রোস্তম আসে,' কিছু পেলি?'


 অহনার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,' নাগো বাবা, পাইনি কিছু। তবে পেয়ে যাব। ও আমাকে আপা বলে ডেকেছে যেহেতু, আমি ওকে খুঁজে বের করবোই।'


' তবে আর খুঁজে কাজ নেই। কিছু পাসনি যেহেতু আর পাবিও না। তুই আর ভাবিস না মেয়েটাকে নিয়ে।'


' এটা কেমন কথা বলছ বাবা? ও আমার বোন। আমি কি আমার বোনকে খুঁজব না? বের করবোই, যেখানেই থাকুক। পারলে পাতাল থেকেও খুঁজে বের করব।'


অহনা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় গাছের আড়ালে বসে থাকে। সাথে নিয়ে এসেছে ময়নার ঘর থেকে নিয়ে আসা রুমালটা। অহনা চোখ বুলায় রুমালের উপর। কিছু চিহ্ন আর আঁকাআঁকি করে রেখেছে। খুব সূক্ষ্ম নজরে দেখল, ছোট ছোট ঘরগুলোতে বাংলা বর্ণমালার কয়েকটা অক্ষর, তা আ হে ব সো ফ ল। অহনা অক্ষরগুলো একে একে সাজানোর চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ পর বের করে এর আসল মানে। একটা নাম সোহেল এবং অপরটি আফতাব। রুমালের শেষাংশে ছোট একটি মেয়ের চেহারা ফুটে উঠেছে, চোখে পানি, তার কাঁধে হাত রেখে আছে আরো কিছু মেয়ে। 


নাম দুটো অহনার অচেনা মনে হলো। ঘরে গিয়ে রোস্তমকে জিজ্ঞেস করে,' বাবা, আফতাব বা সোহেল নামের কাউকে চেনো?'


' হ, পাশের এলাকার, বড় বাড়ির মালিক আর তার ছেলে।'


' বড় বাড়ি কোনটা বাবা?'


' ময়নার শশুর বাড়ি বললি না। সেটাকেই সবাই বড় বাড়ি বলে।'


অহনার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে গেল যে কিছু একটা বিষয় নিশ্চয় আছে। কিন্তু এখন কি করা উচিত। অহনা বসে বসে ভাবে, প্রথমে সে ঐ বাড়িতে যাবে, গিয়ে দেখবে ময়না আছে কিনা। তারপর পদক্ষেপ নেবে।


কল আসে ইরার। অহনার ভাবনায় ছেদ পড়ল। কল ধরে,

' হ্যালো।'


' হ্যালো পরে বলিস। আগে বল ঐদিন দেখা করলি না কেন?'


' বাবা কল করেছিল, তাই গ্রামের বাড়ি এসেছি।'


' আমাদের কিছু বললি না। হঠাৎ কেন গেলি?'


' আমার মা....' অহনার গলা নরম হয়ে আসে। বলতে পারছে না। হঠাৎ মায়ের কথা মনে হতেই বুক চিঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।


' কিরে পানসা, কিছু বল।'


' আমার মা আর নেই। চলে গেছে আমাকে একা রেখে।'


' যা হয় ভালোর জন্য হয়। তুই কাঁদিস না, তোকে ভেঙে পড়লে হবে না। তোর বাবা কত কষ্ট করে ক্ষেতে-খামারে, তুই ভেঙে পড়লে তাকে কে সামলাবে? তোকে কিছু করতে হবে তোর বাবার জন্য।'


অহনা কান্না থামায়,' ঠিক বলেছিস। আমিতো স্ট্রং, আমি কাঁদবো না।'


' এখন বল, কেমন আছিস?'


' এইতো ভালো। সবাই কেমন আছে?'


' একদম পাক্কা আছে সবাই। তবে তুই ছাড়া ভালো লাগছে না। যদিও তোকে অল টাইম পানসা বলি, তবুও তুই না থাকলে আমাদের আনন্দ আরো পানসে হয়ে যায়।'


' থাক আর বলতে হবে না। তোদের কাছে তো আমার দামটাই নেই।'


' একদম না। তুই আমাদের গুলুমুলু, সুন্দরী বান্ধবী। তবে রাগ করেছি আমি তোর সাথে! এক বালতি রাগ করেছি!'


' এতো রাগ কেন আমার উপর? নাকি বয়ফ্রেন্ডের সব রাগ আমার উপর ঝাঁড়বি?'


' না। রাগ করেছি তোর বোকামি দেখে। ঠিক আছে তুই বিপদের সময় চলে গেছিস। কিন্তু এরপর কি হলো? আমাদের একবার কল করে বলতে পারতি, আমরাও দেখতে যেতাম। এমনকি দুইদিন হয়ে গেল কোনো কল করলি না, আমার কলটাও ব্যাক করলি না।'


' গ্রামে কারেন্টের সমস্যা খুব। চার্জ দিতে পারিনি।'


' আচ্ছা বুঝলাম। আমরা সবাই কি তোকে দেখতে আসব?'


' না লাগবে না। আমি ময়নাকে পেলেই চলে যাব।'


' ময়না কে?'


' আমার বোন।'


' তোর তো কোনো বোন ছিল না। কোথা থেকে আমদানি করলি?'


' সে অনেক কথা। পরে সময় করে বলব, এখন রাখছি।'


ইরা তবুও মানল না। সে সব বন্ধুদের জানিয়ে দিল বিষয়টা। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা অহনার গ্রামের বাড়ি যাবে। পরদিন‌ই র‌ওনা হবে।


রাত হয়ে এসেছে অহনার মনটা খুব খারাপ। এখনো সে ময়নাকে খুঁজে পায়নি। ক্ষতি হবে ভেবে আরো চিন্তায় পড়ে। 


রাত হয়ে এসেছে। অহনা টি শার্ট আর প্লাজু পড়ে নেয়। ব‌ই হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ভীষণ হাঁসফাঁস করতে থাকে। ঘরের দরজার দিকে তাকাতেই একটি ছায়া দেখতে পায়।

'চ' সূচক শব্দ করে বলল,' তুমিতো আমাকে একদম ভয় পাইয়ে দিলে।'


মাহতিম ওর পাশে এসে বসে। কোনো কথা বলে না। অহনা আবার বলল,' সবসময় এতো চুপচাপ থাক কেন? ভাল্লাগেনা।'


কিছুই বলে না‌ মাহতিম। জ্বলজ্বল চোখে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। অহনা আবারো বলল,' সবসময় এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কি আর কিছুই করতে পারো না?'


এবারও কোনো উত্তর না পেয়ে বালিশ ছুঁড়ে মারে মাহতিমের দিকে। বালিশটা তার দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়।

' তুমি খুব বোকা।' মাহতিম মুখ খুলল।


' তোমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বোকা। না হয় এভাবে তাকিয়ে না থেকে এতোক্ষণ কিছু না কিছু বলতে।'


' অপ্রয়োজনে কথা বলো তুমি, ঠিক আগের মতো!'


' আমি অপ্রয়োজনে কথা বলি না তুমি প্রয়োজনে কথা বলো না।'


' ঝগড়া করো না। কোথাও যাবে? তোমার মন খারাপ বুঝতে পেরেছি।'


' আমি কাল কি করব সেটাও জানো কিন্তু ময়নাকে খুঁজতে কোনো সাহায্য করতে পারছ না কেন? আগে এই উত্তর দাও।'


কিছু বলে না মাহতিম। চুপ হয়ে যায় একদম। অহনা আবার বলে,' ইচ্ছে করছে তোমার মাথায় কয়েক হাজার পাথর ভাঙ্গি। কাজের সময় তুমি চুপ।'


' আমি তোমার জন্য ফিরে এসেছি আবার অন্য কারো জন্যে নয়।'


' যাই হোক। জানি না তুমি কোথা থেকে, কেন এসেছো। কিন্তু তবুও মনে হয় তোমাকে যুগ যুগ ধরে চিনি।'


' যাবে?'


' কোথায়।'


'চলো আগে।'


মাহতিম ওকে নিয়ে যায় নিরিবিলি একটা জায়গায়। অহনা আশ্চর্য হয়। ওরা একটি পাহাড়ের উপর। জোনাকিদের মেলা, নিচে নদী, পাখিদের ছন্দ, আকাশের নীলাভ আভা, চারিদিকে পূর্ণিমার প্রখর আলো, এক অপরূপ দৃশ্য। অহনা খুশিতে নেচে উঠে,

' এটা কোন জায়গা?'


মাহতিম উত্তর দেয় না। অহনা খুশি মনে ঝর্ণা ছুঁয়ে দেখে। জোনাকিদের সাথে মজা করে। মাহতিম অবাক হয়ে দেখে। তার চোখ থেকে আগুনের তেজটা কমে এসেছে।


' তোমার চোখদুটো ভয়ঙ্কর। যে কেউ দেখলে ভয়ে জ্ঞান হারাবে। আবার বলো না আমি কেন ভয় পাচ্ছি না! আসলে আমি কোনো কিছুকেই ভয় পাই না। ভয় আমাকে ভয় পায়, তাই আমার কাছে এসেও দূরে যায়।'


অহনার কথা মাহতিম বুঝতে পারে না। তবে তার চোখ মুখের ভাষাটা বুঝে নেয়। এই মুহূর্তে অহনা খুশি।


অনেকক্ষণ হয়ে এসেছে। মাহতিম বলল,' এবার তোমার যাওয়া উচিত।'


' না, আমি যাব না। আমি এখানেই আজ রাত কাটিয়ে দেব।'


মাহতিম কিছু না বলেই চোখের পলকে অহনাকে বাড়ি নিয়ে আসে।

রাগে ফুঁসতে থাকে অহনা,

' কেন নিয়ে এলে আমায়? আমি ওখানে শান্তিতে ছিলাম। জানে আমার কেমন সুনসান লাগে।'


' অনেকক্ষণ না দেখে‌ তোমার বাবা এসেছিল ঘরে।'


' তাতে কি হয়েছে? তুমি নিয়ে এলে কেন? এখন তোমাকে এর শাস্তি পেতে হবে।'


অহনা মাহতিমকে ধরতে গিয়েও পারে না। কারণ সে অদৃশ্য, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অহনা রাগের বশে বলেই ফেলল,' এখন থেকে তিন ঘন্টা তুমি আমার কাছেও আসবে না, কথা বলবে না, একদম আমার ঘরের বাইরে থাকবে। যদি আসো তো.....'


তার আগেই মাহতিম চলে যায়। কষ্ট পেয়েছে হয়তো বা অভিমান। 


রোস্তম ঘরে প্রবেশ করে,' ঘরের কি অবস্থা করেছিস, মনে হচ্ছে কাউকে পিটি*য়েছিস।'


অহনা কিছু বলল না। রোস্তম ওর পাশে এসে বসল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রাতের খাবার খেতে বলল তাকে। অহনা খাবে না বলল। রোস্তম বলল,' তবে আমিও আজ উপোস করলাম।'


বাবার এমন জেদ দেখে অহনাও আর রাগ করে থাকতে পারল না। রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে। তবে মনে অনুশোচনা হতে থাকে মাহতিমের জন্য। ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে।


রাত গভীর হতেই মুখোশধারী একজন লোক প্রবেশ করে অহনার ঘরে। অজ্ঞান করে তাকে কাঁধে তুলে নেয়.....


চলবে.....

ছায়া_মানব_পর্ব-৮



৮.

অহনা মাথা ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে। নিজেকে সামলে নেয়। বশিরকে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কি আপনার মেয়ের ডেড বডি দেখেছেন?'


বশির ঝংকার মেরে উঠে,' আমি নিজে হাতে দাফন করেছি আমার মেয়েকে।'


অহনা আরেকটা ঝটকা খায়। লোকটা তার মেয়েকে নিজের হাতে দাফন করলে, কাল যার সাথে দেখা হয়েছে, সে কে?


অহনা পুনরায় বলল,' দয়া করে আপনি পুরো ঘটনাটা বলেন। কি করে আপনার মেয়ে মারা গেল।'


' মেয়ের জামাই কয়দিন আগে মরছে। রাগে দুঃখে মেয়েও গলায় দড়ি দিল।'


' এই বাড়িতেই নাকি শশুর বাড়িতে?'


' মেয়ের শশুর বাড়িতে।'


অহনা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,' আপনি কি তার ঘরটা দেখাবেন আমাকে?'


' নিশ্চয়! আমার মেয়ে খুব শৌখিন ছিল। তার ঘর সবসময় আয়নার মতো ঝকঝকে করতো। বাহারী জিনিসে ভরপুর। আসো আমার সাথে!'


অহনা বশিরের পেছন পেছন যায়। দেখল, ঠিকই বলেছে লোকটা। বাহারী সাজে ঘরটা। অহনার নিজের ঘরের কথা মনে পড়ল। একবার যখন টিকু ওর ঘরে এসেছিল, তখন অহনা ওয়াশরুমে ছিল। বের হতেই টিকু নাক সিঁটকে বলল,' গরুর গোয়ালটাও তোর ঘরের থেকে বেশি সুন্দর। আমার মনে হয় না গরু ছাগল‌‌ও এখানে এক রাত্রি থাকতে চাইবে না।'


অহনা তখন ভেঙচি কেটে বলেছিল,' ভাগ্যিস তুই গরু বা ছাগল না, তাহলে তুইও থাকতে পারতিনা'


বশির অহনাকে পুরো ঘর দেখায়। অহনা দেখে মন ভরে। ওর চোখ যায় একটি রোমালের দিকে। নকশা করা। অহনা অবাক হয় সেই নকশা দেখে। কোন ফুল, লতাপাতা না। এটায় কিছু চিহ্ন আঁকা। অহনা বশিরের অগোচরে সেটা লুকিয়ে নেয়। দেখা শেষে বের হয়ে যায় সে। বশিরের থেকে বিদায় নিতেই সে প্রশ্ন করে,' আমার মেয়েকে নিয়ে তুমি এতো কিছু জানতে চাইলে, কিন্তু আমি জানি না তুমি কে? যদি পরিচয়টা দিতে!'


অহনা বলল,' আমি তার সিনিয়র ছিলাম স্কুলে।'


' কিন্তু আমার মেয়েতো ক্লাস সিক্সের পর আর পড়েনি। এতোদিন পর তুমি তাকে কেন খুঁজতে আসলে।'


অহনা ঘাবরে যায়, বলল,' অনেক আগেই তার সাথে কথা হয়েছিল। কিছুদিন আগে বলতে পারেন। তাই খবর নিতে এসেছিলাম।'


কোনো রকমে বিদায় নিয়ে অহনা চলে যায়। অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে মনে, কিন্তু উত্তর জানা নেই।

অনেক সময় উত্তর আমাদের সামনেই থাকে। আমরা দেখতে পাই না।


অহনা বশিরের থেকে ময়নার শশুর বাড়ির ঠিকানা নিয়েছিল। গন্তব্য এখন ময়নার শশুর বাড়ি।


দুপুরের খাবার খেয়েই অহনা র‌ওনা দেয় ময়নার শশুর বাড়ি। চাকরের সমাগম মানুষের থেকেও বেশি। অহনা গেইট পাড় হতে চাইলেই দারোয়ান তাকে আটকে দেয়। অহনা লম্বা ঘোমটা টেনে বলল,' আমি ভেতরে যেতে চাই।'


দারোয়ান বলল,' ভেতরে বাইরের লোক যাওয়া নিষেধ।'


' আমি তাদের আত্মীয় হ‌ই।'


' কেমন আত্মীয়? এই বাড়িতে ত্রিশ বছর আছি আমি। কোনো আত্মীয় আমার অচেনা না।'


' তাদের বাড়ির ব‌উয়ের সব আত্মীয়কে চেনেন?'


' না।'


' তাহলে? এই বাড়ির মালিকের বাবার ভাইয়ের চাচাতো বোনের ছেলের মেয়েকে চিনেন?'


দারোয়ান কিছুক্ষণ ভেবে নেয়,' না, চিনি না।'


' চিনবেন কি করে, বুড়ো হয়ে গেছেনতো তাই। আমাকে যদি এখন ভেতরে ঢুকতে না দেন, তাহলে আমি গিয়ে বড়বাবুর কাছে নালিশ করব। আপনার চাকরি যাবে।'


' না, ঠিক আছে, আপনি ভেতরে যান। কিছু বলবেন মালিককে।'


অহনা ভেতরে চলে যায়।একজন চাকরানীকে দেখতে পেয়ে অহনা জিজ্ঞেস করে,' তুমি কি এই বাড়িতেই থাক?'


' হ্যাঁ।'


' তাহলে বলো, এই বাড়ির ব‌উ নাকি মা/রা গেছে?'


' কোনডা? ছোডডা না বড়ডা।'


অহনা অবাক হয়ে যায়। বড় ব‌উ না ছোট ব‌উ সে সেটা জানে না। বলল,' দুইজন‌ই।'


' খাঁড়ান আপা। আমি গামলাটা রাইখ্খা আসি।'


মেয়েটা গামলা রেখেই অহনার কাছে আসে।

'তয় আপা কন, আম্নে কি ক‌ইছিলেন?'


' এই বাড়ির দুই ব‌উয়ের কথা।'


' ব‌ড় ব‌উতো দুই মাস আগে মরছে শ্বাসকষ্ট উইঠা। আর ছোডডা গলায় দড়ি দিছে।'


' কেন দিয়েছে তুমি কি জানো?'


' হের জামাইর লাইগ্গা। মাইয়া ভালাই আছিল, জামাইডাও ভালা।' তারপর মেয়েটা অহনার কানের কাছে এসে বলল,' তয় আপা, শশুর বাড়ির লোকজনডি ভালা না। মাইয়াডারে অত্যাচার করত। বড় ব‌উডারেও করছে। এরা এমনিতেও মরতো।'


ভেতর থেকে একজন লোকের আগমন দেখে মেয়েটি সরে যায়। অহনাও পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। অহনা ফুল হাতা শার্ট গায়ে দিয়েছে, হাত কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। গলায় একখানা কালো উড়না জড়ানো। বাতাসের কারণে সেটার কিছু অংশ উড়তে লাগল। ঘর থেকে বের হ‌ওয়া মানুষটি সেটার দিকে চোখ দেয়।


লোকটি এগিয়ে আসে অহনার দিকে,

' ঠিক ধরেছিলাম। এখানে কেউ ছিল। কে তুমি মেয়ে?'


অহনা বের হয়ে আসে। ভয় হচ্ছে তার খুব।

' আমি আমার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে এসছি।'


' কে তোমার বান্ধবী?'


' ময়না।'


' ময়না নামের কেউ এখানে থাকে না। ফিরে যাও।'


' এটা তার শশুর বাড়ি।'


' কালকেই সে মরে গেছে, তুমি হয়তো জানো না।'


' আমি জানি। আর এটাও জানি, সে এখনো জীবিত।'


' এসব উল্টা পাল্টা কি বলছ? সবাই সাক্ষী আছে, জিজ্ঞেস করো।'


' আমি বিশ্বাস করি না। নিজের চোখে না দেখলে কিছুই বিশ্বাস হয় না আমার।'


' তোমার বিশ্বাসের জন্য কি আরেকবার কাউকে মেরে দেখাব?'


' কি বললেন আপনি?‌ কাকে মেরেছেন?'


' কথা বাড়িও না। তোমার মতো মেয়ে কিছুই করতে পারবে না। এখান থেকে চলে যাও ভালোয় ভালোয়, না হয় ময়নার মতোই তোমার অবস্থা হবে।'


' আমি যাব না। কি করবেন করে নিন।'


' কাউকে ছাড় দেই না আমি‌। তোমার ভালোর জন্য বলছি চলে যাও না হয় খারাপ হবে। সুন্দরী মেয়ে বলে ছেড়ে দিচ্ছি, কারণ আবার দেখা হবে।'


লোকটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। অহনা বিরক্ত হয়,

' আপনার হাসি ঠিক আপনার সেই পাকা চুলের মতো বাজে।'


হাসি থামিয়ে লোকটি বলল,' সুন্দরী মেয়েদের গালিতেও শান্তি পাওয়া যায়। তোমার দিকে নজর পড়েছে আমার। এখন‌ চলে যাও, পরে আবার দেখা হবেই হবে। কারণ আমার নজরে পড়েছে। বিদায় সুন্দরী।'


অহনা নাক‌ সিঁটকায়,

' আপনার থেকে গন্ধ আসছে, সরে দাঁড়ান।'


লোকটি চলে যায়। একজন চাকরানী এসে বলল,' এই বাড়িত্তে যেই একবার ঢুকে তারে আর বাইর হ‌ইতে দেখি না। তারা সবাই ক‌ই যায় কেউ জানে না। বিশেষ করে মাইয়ারা।'


' এসব কি বলছো? মানে কি? আর ঐ লোকটা কে?'


' বাড়ির ছোড ছেলে। গাউড়া পুরা। আপা, আম্নে চ‌ইলা যান। বিপদে পড়বেন।'


' আমার চিন্তা করো না। এটা বলো তুমি, ময়নার লাশের চেহারা কি তুমি দেখেছো?'


' না আপা। তারেতো তারাতাড়ি দাফন করা হ‌ইছিলো। তার বাপরেও একবার দেখতে দেয়নাই।'


' ঠিক আছে তুমি যাও।'


মেয়েটি চলে যেতেই অহনা গেইটের দিকে পা বাড়ায়। মুহুর্তেই তার পা থেমে যায়। গাছের আড়ালে চলে যায়। একজন লোক ভেতরে ঢুকছে, তাকে চেনে অহনা। কালকে যে লোকটা ছুরি নিয়ে আক্রমন করেছে, এটাই সেই লোক......


চলবে......

রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৭


৭.

অহনাকে চিৎকার করতে দেখে লোকটি সরে যায়। রোস্তম এসে মেয়েকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। 

' কি হয়েছিল মা? মাথা ঘুরে গেল নাকি?'


' না বাবা।'


অহনা কিছু বলে না রোস্তমকে। যদি চিন্তা করে সে। 


রাতের খাবার খেয়ে যখন সবাই ঘুমাতে যায়, তখন জানালায় খটখট শব্দ শুনতে পায়। অহনার পাশেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ময়না। শব্দ শুনে অহনা উঠে যায়। শব্দের গতি অনুমান করে জানালায় চোখ দেয়। অহনা জানালা খুলে দিতেই তাকে কেউ ছিটকে ফেলে দেয়। বুঝতে পারে, এটা মাহতিম। পরক্ষণেই খেয়াল করে, কেউ তাকে ছু/রি দিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিল। অহনা মাটি থেকে উঠেই দৃষ্টি দেয় সামনে। সন্ধ্যার সেই লোকটাকে দেখতে পায়। অহনা তেড়ে আসে তার দিকে। মাহতিম তাকে থামিয়ে দেয়। 

লোকটা দাঁত কেলিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অহনার দিকে এগিয়ে এসে ছু/রি ধরতেই সেটাকে একটি খেলনা বন্দুক বানিয়ে দেয় মাহতিম। লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে ছু/রিটাকে। কাজ করছে না দেখে এটাকে ফেলে দিয়ে এগিয়ে আসে অহনার দিকে। আবার পেছনে ফিরে যায়। ঘুমন্ত ময়নার মাথার কাছে গিয়ে তাকে আঘাত করতে যেতেই তার হাত শূন্যে ভেসে থাকে। সে কোনোমতেই হাত টেনে নিচে নামাতে পারছে না। এটা দেখে অহনা উচ্চস্বরে হেসে উঠে। জেগে যায় ময়না। সামনে এমন অদ্ভুত একটা মানুষকে দেখে ভয়ে সে দৌড়ে এসে অহনার পেছনে লুকায়।


পাশের ঘর থেকে রোস্তম উঠে আসে। দরজা খুলতে বলে অহনাকে। অহনা ভয় পেয়ে যায়‌। বাবাকে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মাহতিম লোকটাকে ঠিক করে দেয়। লোকটা ভয়ে তড়িঘড়ি হয়ে জানালা দিয়ে লাফ দেয়। বেগোছে পড়ে পায়ে ব্যথা পায়‌। তবুও ভূতের ভয় সাঙ্গ করে পালিয়ে যায়।


অহনা দরজা খুলে দেয়। রোস্তম সারা ঘর খুঁজে বলল,' ঘরে কেউ ছিল মনে হয়? কে দিল?'


' কেউ না বাবা। আমি ছিলাম আর ময়না ছিল শুধু।'


' কেউ চিৎকার করেছে। আর তুই এতো রাতে হাসছিলি কেন?'


অহনা ঠোঁট কামড়ে ভাবে কি বলবে। মাথা চুলকে বলল,' আমি একটা হাস্যরসিক স্বপ্ন দেখেছি, যেখানে তুমি মাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে রেজিনা আন্টিকে জড়িয়ে ধরেছিলে সেটাই দেখলাম।'


' ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।'

রোস্তম কিছুটা ভারী গলায় বেরিয়ে যায়। অহনাও গিয়ে শুয়ে পড়ে। ময়না ভয় পেয়ে আছে তাই অহনা তাকে বোনের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।


সকালে ঘুম ভাঙতেই ময়নাকে বিছানায় দেখতে পায় না অহনা। দৌড়ে বাইরে যায়, দেখতে পাচ্ছে না। তন্নতন্ন করে পুরো বাড়ি খুঁজে কিন্তু পায় না। হতাশ হয়ে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ে। রোস্তম এলাকা খুঁজেও পায় না। হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টা কারো হজম হচ্ছে না। রোস্তম অহনাকে বলল,' মেয়েটা সকালে খুব তারাতাড়ি উঠেছিল।'


অহনা সচকিত হয়,' বাবা, তুমি সেটা আমাকে আগে বললে না কেন? তারপর কোথায় গেল?'


' সকাল ভোরে উঠেই বাইরের চালতা গাছটার নিচে বসে ছিল। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলল না। আমি ঘরে চলে আসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর দেখতে পেলাম না। কোথাও উধাও হয়ে গেছে। এরপর তুইও উঠে গেলি।'


' কোথায় গেল বাবা? ওর পরিচয়টাও এখনো জানা হলো না।'


অহনা ঠিক করে নদীর পাড়ে যাবে। সেখান থেকে যদি কোনো ক্লু পেয়ে যায় তাহলে খুঁজতে সুবিধা হবে। তৎক্ষণাৎ দেরী না করে অহনা নদীর পাড়ে র‌ওনা দেয়। 


গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হয় মতির সাথে। গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি। অহনা তাকে দেখেই কপাল কুঁচকায়। পাশ কেটে চলে যেতে চাইলেই মতি তাকে ডাক দেয়,' অহনা না?'


অহনা দাঁড়ায়, ছোট করে উত্তর দেয়,' হু।'


' বেচারা, মাকে হারিয়ে ফেললাম। কি আর করার, যা হয় ভালোর জন্য‌ই হয়।'


রেগে উঠে অহনা,' আর কিছু বলার আছে?'


' রেগে যাচ্ছিস কেনো? মেলা দিন পর তোরে দেখলাম, একটু কথা বলি ভালো করে।'


' আমার তাড়া আছে, যেতে হবে।'


' সে আমারও রাজ্যের তাড়া থাকে, তাই বলে তোর সাথে দেখা হলো, কথা বলবো না, তা কি হয়?'


' আমি আপনার মতো বেকার মানুষ ন‌ই।'


' তাইলে কি, কয়টা রাজ্য চালাস তুই?'


' আপনার কথা শেষ হলে আসতে পারেন। আমাকে যেতে হবে।'


অহনা পাশ কেটে চলে যায়। মতি ছোট ছোট দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিজেকেই বিড়বিড় করে বলে,'সেই ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলা কবে এতো বড় হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। বিষয়টা দেখতে হবে।'


অহনা নদীর পাড়ে হন্যি হয়ে খুঁজে ময়নাকে। কিছুই পায় না। আশাহত হয়ে যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনি তার চোখ যায় পড়ে থাকা একটা লকেটের দিকে। বালির নিচ থেকে খুব অল্প পরিমাণ অংশ দেখা যাচ্ছে। অহনা বালির ভেতর থেকে বের করে লকেটটি। পরিষ্কার করে ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখে। লকেটটি খুলতেই অবাক হয়। সেখানে ময়নার সাথে অন্য একটি ছবি। অহনা সেটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। রোস্তমকে দেখাতেই সে চিনতে পারে। বলল, পাশের এলাকায় তার বাড়ি। অহনা ঠিক করে, সে যাবে ঐ বাড়িতে। রোস্তম যেতে না করে, কিন্তু অহনা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, সে যাবেই।


লোকটির ঠিকানা বের করে অহনা র‌ওনা দেয়। একটা অটো নিয়ে তার বাড়ি পৌঁছায়। কয়েকজন লোককে জিজ্ঞেস করে বাড়ির খবর নিয়ে নেয়। 


একটা বহু পুরনো বাড়িতে থাকে লোকটা, নাম বশির। দরজা ধাক্কাতেই বশির ঘুমঘুম চোখে বেরিয়ে আসে। অহনাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে,' কাকে খুঁজছেন আপনি?'


অহনা লকেটটা বশিরের হাতে দেয়। লকেট দেখেই বশির হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। মুহুর্তেই ভেঙে পড়ে। এমনিতেই সারারাত কান্না করে কাটিয়েছে। ভোর রাতের ঘুমটাই চোখে ছিল। অহনার দিকে দৃষ্টি দেয় বশির,' এটা তুমি কোথায় পেলে মামনি?'


' আপনি কি চিনেন এই মেয়েটাকে?'


' আমি তার অভাগা বাবা।'


' তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?'


' আমি জানি না তুমি কে? তুমি হয়তো জানো না কালকেই আমার মেয়েটা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।' বলেই বশির অঝোরে কাঁদতে লাগল।


অহনার পা দুটো অসাড় হয়ে আসে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, অহনার মাথায় ঢুকছে না কিছুই। অহনা কাঁধে কারো স্পর্শ পায়। বুঝতে পারে মাহতিম কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। অহনা নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কিছু ভুল বলছেন নাতো?'


' আমি কেন নিজের মেয়েকে নিয়ে মিথ্যা বলব? বাবা হয়ে আমি মেয়ের মৃ/ত্যুর সংবাদ দিচ্ছি, তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলছি?'


' না আঙ্কেল। কিন্তু....'


অহনা থেমে যায়। লোকটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে, এখন তাকে প্রশ্ন না করে সঙ্গ দেওয়াই উত্তম। একটু পর ধীরস্থির হয়ে সব জানতে চাইবে।


অনেকগুলো প্রশ্ন অহনার মাথায় ঘুরপাক খায়। যদি ময়না কালকেই মারা যায়, তাহলে আজ সকাল পর্যন্ত তার সাথে কে ছিল? দেখে তো মনে হয়নি সে মৃ/ত! মাথা ধরে এসেছে অহনার। ময়নাকে সে মৃ/ত ঘোষণা দিতে পারে না.....


চলবে......

ছায়া_মানব_পর্ব-২১

  অহনা জানালার কাছে যেতেই মতি এগিয়ে আসে। অহনা জানালা বন্ধ করে দিতে চাইলে মতি ধরে ফেলে, '‌আমাকে দেখতে ভালো লাগে না, সেটা না হয় মানলাম। ...