পর্ব-৩
মেসেজটা দেখে অহনা ভয় পেয়ে যায়। রাতে ওর সাথে কি ঘটতে চলেছে বুঝতে পারে না। সজাগ হয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।
রাত গভীর হতেই ড্রেক উঠে পড়ে। মোবাইলের ফ্লাশ অন করে। সবাই ঘুমিয়ে আছে। অহনাও ঘুমিয়ে পড়েছে। মেসেজের কথা তার মনে নেই। ড্রেক অহনাকে শনাক্ত করে তার শিওরে যায়। কামনায় তার দৃষ্টি স্থির, জিভ লকলক করছে, যেন লোভনীয় কোনো খাবার দেখছে সে। হালকা আলোয় অহনাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ড্রেক তার গালে হাত স্পর্শ করায়। মুহুর্তেই শিহরিত হয় অহনা।
অহনার মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দেয় ড্রেক। হাতদুটো মিশিয়ে নিতেই অহনা জেগে উঠে। ড্রেক সাথে সাথেই মুখ চেপে ধরে তার। গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
চোখের পলক না পড়তেই একটা কালো ছায়া এগিয়ে আসে ওদের দিকে। অহনা এক হাত দিয়ে কালো ছায়াটিকে নির্দেশ করে। ছায়াটি খুব কাছে আসতেই ড্রেকের চোখ পড়ে। সে দিকে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ড্রেক তার নিজস্ব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ছায়াটি কাছে এসেই ড্রেকের কলার চেপে ধরে। ড্রেক অস্পষ্ট উচ্চারণ করে,' কে রে তুই?'
' তোর জম।'
বলেই ছায়া মানবটি তাকে শুন্যে ছুঁড়ে মারে। ড্রেক তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে বাইরে গিয়ে পড়ে। তাঁবুর প্রতিটি লোক সজাগ হয়ে যায়। এমন দৃশ্য দেখতে পাবে কেউ তা কল্পনা করেনি। রুমি, ইরা ভয়ে অহনার পেছনে এসে দাঁড়ায়।
টিকু আর হ্যারি বাইরে যায় ড্রেককে দেখতে। ছায়া মানবের রাগ যেন ঝরে পড়ছে। সকল রাগ দেখাচ্ছে ড্রেকের উপর। পুনরায় তাঁর গলা চেপে ধরে। ড্রেকের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জিব বেরিয়ে আসে, চোখ উল্টে গেছে। টিকু, হ্যারি কেউ সাহস পাচ্ছে না তার সামনে যাওয়ার। এক মিনিটের মাথায় ড্রেকের প্রাণ বেরিয়ে যায়। মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ড্রেককে।
অহনা বাইরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু দেরি হওয়ার দরুন ড্রেককে বাঁচাতে পারল না। আকস্মিক ঘটনায় সবাই হতভম্ব। সবাই ভয়ে তাঁবুতে ফিরে যায়। একজন অন্যজনকে শক্ত করে ধরে ভেতরে থাকে।
ছায়া মানবটি দাঁড়িয়ে আছে ড্রেকের উল্টানো চোখের দিকে তাকিয়ে। ভয়ে অহনার পুরো শরীর ঘামতে শুরু করে। অনবরত ঢোক গিলছে। ভয়ে ভয়ে কদম বাড়ায়, পুনরায় এক কদম পিছিয়ে আসে। পরক্ষণেই সাহস নিয়ে ছায়াটির সামনে এসে দাঁড়ায়।
' কে তুমি?'
ছায়া মানব অহনার দিকে তাকায়। তার চোখ জ্বলজ্বল করছিল। অহনা তার চেহারা পুরোপুরি দেখতে পায় না। শুধু একটা শরীরের কাঠামো আর আগুন জ্বলা চোখ ছাড়া আর কিছুই নজরে আসছে না। ভয় আরো বেড়ে যায়। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারছে না সে।
' কে তুমি? উত্তর দিচ্ছো না কেন?'
আবারো নিস্তব্ধ। অহনা হাত বাড়িয়ে দেয় তাকে ছোঁয়ার জন্য। হাতটি ছায়া মানবের একদম কাছে আনতেই সে উধাও হয়ে যায়। অহনা হাতড়ে খুঁজতে থাকে কিন্তু পায় না। কেমন ঘোরের মতো কাজ করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
সকালে অহনার জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে বাইরে মাটিতে আবিষ্কার করে। উঠে গিয়ে তাঁবুতে যায়। দেখল সবাই গোছগাছ করছে। অহনা জিজ্ঞেস করল,' কিরে কোথায় যাচ্ছিস সবাই?'
টিকু ওর দিকে ঘৃণার চোখে তাকায়,' তুই কালো জাদু জানিস তাই না? আমাদেরও মেরে দিবি এখানে থাকলে, তাই আমরা চলে যাচ্ছি। থাকব না এখানে আর এক মুহূর্তও।'
' আমি কালো জাদু জানি না। বিশ্বাস কর আমাকে, কাল রাতে যা হয়েছিল তা আমার আগে জানা ছিল না।'
হ্যারি তেড়ে আসে,' ড্রেককে মেরে দিলি, এবার কি আমাদেরও মারবি নাকি? একদম কথা বলবি না আমাদের সাথে। আজ থেকে তোর আর আমাদের রাস্তা আলাদা। আমরা আর কেউ বন্ধু নই। আমাদের থেকে দূরে থাক, এটাই ভালো হবে।'
অহনা তেজ নিয়ে বলল,' ড্রেক রাতে আমার গায়ে হাত দিয়েছিল। ঘুমন্ত পেয়ে সুযোগ নিচ্ছিল। তাই কেউ সাহায্য করতে এসেছিল, এখানে আমার দোষ কি?'
কেউ আর কোনো কথা বলল না। রুমি এতোক্ষণে মুখ খুলল,' ড্রেকতো আগেও তোকে পেতে চেয়েছে। কাল একটু বেশি করে ফেলেছিল, তাই বলে তুই তাকে মেরে দিবি?'
অহনা কাঠকাঠ গলায় বলে,' আর কতবার বলব আমি মারি নি।'
' বা* মেয়েখোর, শা* ড্রেকের বাচ্চা মেয়ে দেখলেই খেতে চায়। এবার নিজের প্রাণটাও দিল। শা* ব্রিটিশের দালাল মেয়ে দেখলে হুঁশ থাকে না। জানে না মেয়েগুলা ভয়ঙ্কর। মরল শা* মা*।' বলল টিকু।
সবাই গোছগাছ শেষে রওনা দেয়। গাড়িতে উঠতেই অহনা আসে,
' আমিও রেডি, চল চলে যাই, এখানে সব অস্বাভাবিক।'
হ্যারি গলা বাড়িয়ে বলে,' তোকে নিয়ে গিয়ে মরব নাকি? কি জানি পরের শিকার কাকে করিস। আমরা গেলাম।'
সবাই অহনাকে রেখে চলে যায়। অহনা একা একা নরম ঘাসে বসে থাকে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে না। মোবাইলটাকে আছাড় মারে। কাঁদতে থাকে। কিছুক্ষণ পর উঠেই মোবাইলটাকে হাতে নেয়, এই মুহূর্তে এটাই সম্বল। হারিয়ে গেলে বাড়িতে যেতে পারবে না। রাস্তাঘাট চেনা নেই তার। হাটতে থাকে বাঁকা কাদামাটির রাস্তা ধরে। পাশেই ঝর্ণা দেখতে পায়। জলপ্রপাত দেখেই আনন্দ হয় তার। ঝর্ণার পানিতে গা ডুবিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে পোশাক পরিবর্তন করে নেয়। রাস্তার পাশে অসংখ্য ছোট ছোট দোকান। সেখনা থেকে কিছুটা গুড় আর পিঠা নিয়ে নেয়। বাহারী কয়েক প্রকার পিঠা খেয়ে আবারো হাটতৈ শুরু করে। কোথা থেকে কোথায় যাবে তা তার জানা নেই। এক পর্যায়ে রাস্তার ধারে বসে পড়ে। হঠাৎ মনে পড়ে বন্ধুদের কথা। তাকে নিয়ে যায় নি বলে ছায়া মানব যদি আবার তাদের উপর রেগে যায়? যদি ক্ষতি করে বসে?
ঠিক তাই হলো। সাথে সাথে অহনার ফোনে কল আসে।
' হ্যালো, হ্যালো অহনা... শুনছিস?'
ইরার কন্ঠ এমন ভয়ানক দেখে অহনা আঁতকে উঠে,' কি হয়েছে তোর? বল আমাকে? কথা বল!'
' ঐ... এ ছায়াটা.....'ইরা বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই গাড়িটিতে বিস্ফোরণ হলো।
অহনা চিৎকার দিয়ে উঠে।
' ঘেন্না করি তোমাকে ছায়া মানব। কখনো দেখতে চাই না তোমাকে। আর কখনো আমার সামনে আসলেই তোমাকে নিজের হাতে খুন করব।' ছায়া মানবের প্রতি তার রাগ ঝরে পড়ে। বন্ধুরা একটু ভুল করে ফেলেছে বলে এমন শাস্তি কেন দিল? মনে মনে সেই ছায়া মানবকে মেরে ফেলার ছক কষতে থাকে মনে।
সন্ধ্যা নেমে এলো। চারিদিকে অন্ধকার। একলা একটা মেয়ে মানুষ কি করবে, কোথায় যাবে, বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ মনে হলো দূর থেকে কেউ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। এখানে পদে পদে বিপদ, একা থাকায় আরো বেশি। অহনা ভয়ে তটস্থ হয়ে যায়। বাড়িতে অসুস্থ বাবা-মা ছাড়া কেউ নেই। কাকে জানাবে? কি করে বাড়ি যাবে?
আস্তে আস্তে গাছের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলো পাঁচজন যুবক। কামনার দৃষ্টিতে পরখ করে নেয় অহনাকে। অহনার খুব কাছে এসে দাঁড়ায়। বিশ্রী হাসিতে ফেটে পড়ে তারা। তাদের চোখে মুখে অহনার উজ্জ্বল মুখশ্রী ফুটে ওঠে।
তারা এগিয়ে আসতে থাকে অহনার দিকে.......
চলবে ইনশা'আল্লাহ....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন