পাঁচজন যুবক একে একে এগিয়ে আসে অহনার দিকে। অহনা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পেছনে পেছাতে থাকে যতক্ষণ না পিঠ ঠেকে যায়। এক পর্যায়ে অহনা মুছড়ে পড়ে যায়। একজন এগিয়ে এসে তার কানে কানে বলে,' এই বেলায় মেয়েলোক বাড়ি থেকে বের হয় না।'
সবাই খিলখিল করে হাসতে শুরু করল।
' সেরা একটা মাল ভাই। তারাতাড়ি কাজে লেগে পর।'
কে আগে যাবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধে তাদের মধ্যে। সবাই অহনাকে আগে ভোগ করতে চায়। শেষমেশ তারা সিদ্ধান্ত নেয় টস করবে। সেখানে যার নাম আগে হবে সেই আগে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথম পড়ল শরিফ নামের ছেলেটির কাছে। সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে।
শরিফ অহনাকে স্পর্শ করতেই তার শরীর বিষিয়ে উঠেছে। একের পর এক ছোঁয়া তার শরীরে বেদনার জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু ছায়া মানব আসবে না। একটু আগেই অহনা তাকে সামলে আসতে বারণ করেছে। সে কি করবে?
শরিফের কামনার দৃশ্য দেখে অন্যরাও হামলে পড়ে। তারা নিজেদের সংযত রাখতে পারছে না।
অহনা কোনো উপায় না পেয়ে চিৎকার করে ছায়া মানবকে ডাকে। বিষাক্ত হয়ে যাবে তার শরীর আর একটু দেরি করলে। অহনা ডাকার সাথে সাথেই ছায়া মানবের আবির্ভাব। পাঁচজনকে একাই সে আছাড় মারে। হাত গুড়িয়ে দেয়। ছেলেগুলো অদৃশ্য মার খেয়ে বোকা বনে যায়। তারা পালাতে চাইলেই ছায়া মানব তাদের ছিটকে দূরে ফেলে। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের মতো উড়তে থাকে।
অহনা তাকে থেমে যেতে বলে। কিন্তু সে থামে না। মেরে ফেলতে চায় সেই অশালীন যুবকদের। প্রায় আধমরা হয়ে যায় তারা। অহনা কাকুতি মিনতি করছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।
ছায়া মানব তাদের ছেড়ে দেয়। মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। পরপরই অহনাকে শূন্যে তুলে একটা উঁচু ঢিবির উপর নিয়ে যায়। সেখান থেকে আকাশকে অনেক সুন্দর দেখা যায়। চাঁদটাকে ছুঁতে পারবে এমন মনে হতে থাকল তার। আনন্দের সাথে দুঃখ হতে থাকে অহনার। কেঁদে উঠে, তার সাথে এসব কি হচ্ছে? কেন হচ্ছে, বুঝতে পারছে না। উঁচু জায়গায় রেখে ছায়াটিও কেমন উধাও হয়ে গেছে। সব দোষ দিতে থাকে সেই ছায়া মানবকে। সে না আসলে এতকিছু হতই না। পরক্ষণেই মনে পড়ল, সে না আসলে এতক্ষণে সে মৃত থাকত। এগারো জন পশুর কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে যেত সম্মান, পরিশেষে মৃত্যুই একমাত্র অপশন হতো। কিন্তু এই মুহূর্তে তার একা লাগছে। বাড়ি যেতে চায় সে। আচমকা ছায়া মানবের আবির্ভাব হয়। অহনার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। অহনা তার চেহারা ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না। ছায়াটি নরম ঘাসের উপর বসে পড়ে। অহনাও বসল, কিছুটা দূরে।
' কে তুমি?' প্রশ্ন করল অহনা।
কোনো উত্তর আসে না। ছায়াটি আকাশের উজ্জ্বল চাঁদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। অহনা আবারো বলল,' কে তুমি? কেন আমার পিছে পড়ে আছ? কেন সাহায্য করছ? কিন্তু এটা সাহায্য না, অন্যায় করছ তুমি!'
ছায়াটি উত্তর দেয় না। অহনা বিরক্ত হয়ে পড়ে। সে তেড়ে আসে ছায়াটির দিকে। তাকে হাত দিয়ে ধরতেই পিঠ ভেদ করে অহনার হাত অপর পাশে বেরিয়ে এলো। মনে হলো কোনো শরীর নেই। অহনা ছিটকে দূরে সরে যায়। তার মানে এটা সত্যি ছায়া? তার কোনো শরীর নেই। আঁতকে উঠে অহনা।
' তোমার শরীর কোথায়? ধরতে পারছি না কেন?'
কোনো উত্তর নেই। অহনা আবারো তাকে ধরতে যায়। আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। অহনা তার পিঠে হাত দিতেই তা ভেদ করে পেট দিয়ে বেরিয়ে আসে। ছায়াটি শুধুই ছায়াই। তাকে ধরা যাচ্ছে না। অহনা আবারো জিজ্ঞেস করল,' কে তুমি? পরিচয় কেন দিচ্ছ না? আমার সাথে কি তোমার কোনো যোগসূত্র আছে?'
'আছে।' ছোট করে উত্তর দিল ছায়াটি। এতক্ষণে একটু কথা শুনে অহনা কিছুটা শান্ত হয়। পুনরায় জিজ্ঞেস করে,' কে তুমি?'
' জানতে চাও?'
' হ্যাঁ, বলো তুমি, কে তুমি? আমাকে কি করে চেনো? সব জানতে চাই আমি।'
' আমি তোমার খুব কাছের।'
অহনা ভাবে,' কতটা কাছের? আমারতো কাছের বলতে বাবা-মা আর বন্ধুরা ছিল। তাদের আপনি মেরে দিলেন।'
' মরেনি তারা। তাদের শুধু ভয় দেখিয়েছি। পরেরবার আর তোমায় বিরক্ত করবে না।'
' কোথায় আছে ওরা?'
'স্থানীয় হাসপাতালে। বিস্ফোরণটা ততটা তেজি না। সাথে সাথে পুলিশ কল করেছি, তা হয়েছে বলতে, কিছুটা আঘাত শুধু।'
' আপনার পরিচয় দিন।'
' আগে তোমার বাড়ি যাওয়া উচিত।'
' কিন্তু কিভাবে?'
' চোখ বন্ধ করো।'
অহনা চোখ বন্ধ করে। একটু পরই চোখ খুলে দেখতে পায় সে আকাশে ভাসছে। কেউ তাকে পাঁজাকোলে করে জড়িয়ে রেখেছে। তার দিকে দৃষ্টি দেয়। খুব চেনা মনে হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না, কে সেই ব্যক্তি। তার উজ্জ্বল মুখশ্রী, চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে, ঠোঁটগুলো মৃদু নড়ছে। অহনা বিভোর হয়ে তাকে দেখছে। লোকটাকে তার ভীষণ ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে আগেও তাদের দেখা হয়েছে, কিন্তু কোথায়? মনে করতে পারছে না অহনা। এতো চেনা মনে হওয়া লোকটাকে সে আজকেই দেখছে। অহনা কোল থেকে নেমে যেতে চাইলেই নিচে চোখ দেয়। উঁচু-নীচু বাড়ি-ঘর, রাস্তা, মাঠ, নদী দেখে আতঙ্কে কেঁপে উঠে। লোকটির শার্ট খামচে ধরে। মনে হচ্ছে এই বুঝি নিচে পড়ে যাবে।
কারো বুকের গরম আভায় অহনা চোখ বন্ধ করে নেয়।
চোখ খুলতেই দেখতে পায় সকাল হয়ে গেছে এবং সে বিছানায় শুয়ে আছে। মাথা ধরে আছে তাই কিচেনে গিয়ে আঁদা চা খাওয়ার কল্পনা করে। কিচেনে যেতেই দেখতে পায় কেউ আগে থেকেই চা করে রেখেছে। অহনা অবাক না হয়ে চা খায়।
অহনা উদগ্রীব হয়ে যায় সেই অদৃশ্য মানুষটিকে দেখতে, তার পরিচয় জানতে। অহনা ভাবে, তাকে বিপদে দেখলেই ছায়াটির আবির্ভাব হয়। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় এখন সে পড়ে যাওয়ার নাটক করবে। তাই একটা চেয়ারে পা দিয়ে ওয়্যার ড্রপ এর উপর থেকে বই আনার চেষ্টা করে। ইচ্ছে করেই পা চেয়ার থেকে বাইরে নিয়ে আসে। পড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই কেউ তাকে ধরে ফেলে। অহনা অবাক হওয়ার ভান ধরে, মূলত তার আইডিয়া কাজে দিয়েছে।
যেহেতু স্বশরীরে ছায়াটি তাকে ধরল তাই অহনা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। এবার আর পালানোর সুযোগ নেই। আজ তার পরিচয় জেনেই ছাড়বে......
চলবে ইনশা'আল্লাহ.....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন