১২.
অহনা সোহেলের গলা চেপে ধরে। সোহেল এক টানে তার হাত সরিয়ে নেয়।
ময়নাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একবার পালাতে চেয়েছিল বলে এই অবস্থা করেছে।
' তোমার অবস্থাও এমন হবে আবার পালাতে চাইলে।' সোহেল জহুরী দৃষ্টিতে তাকিয়ে অহনাকে বলল।
অহনা মুখ থুবড়ে বসে পড়ে। অকথ্য নির্যা/তন করেছে ময়নার উপর। অজ্ঞান হয়ে আছে, আদৌ জ্ঞান ফিরবে কিনা জানা নেই।
সোহেল নিচে নামিয়ে আনে ময়নাকে। অহনা ওর কাছে গিয়ে বসে। আদর করে ডাকে, সাড়া পায় না। সোহেল ঘরটিতে তালা মেরে আবারো বেরিয়ে যায়।
অহনা দেখতে পায়, পাশেই পানির গামলা রাখা আছে। সেখান থেকে পানি এনে ময়নার চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরই ময়না চোখ খুলে। অহনাকে সামনে দেখে খুব আনন্দিত হয়। জড়িয়ে ধরে একে অপরকে।
' আপা তুমি এসেছ? আমি তোমাকে অনেক মনে করেছি।'
অহনা ওর গালে হাত রেখে বলে,' পাগলী মেয়ে, কয়েক ঘন্টায় মন জয় করে নিলে, আর এখন বলছো আসছি কিনা? বোনের জন্য বোন সব করতে পারে।'
' আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আপা।'
' আমি সেটা জানি। কিন্তু কেন তোমাকে এখানে এনে কষ্ট দিচ্ছে এ সোহেল?'
' সে অনেক কথা আপা। তোমার সময় হবে না, আমাদের আগে এখান থেকে বের হতে হবে, বাড়ি গিয়ে সব বলব। এরা নরপশু, এদের থেকে বাঁচতেই হবে।'
' কিন্তু কিভাবে? চারিদিকে পাহারা, যেতে পারব না একদম। সবার চোখ এড়ানো সম্ভব হবে না।'
' আমি জানি। তবুও আমাদের চেষ্টা করতে হবে। সবার মতো আমরাও তাহলে আটকে যাব।'
' সবার মতো মানে? এখানে কি আরো কেউ আটকে ছিল?'
' এখনো শত শত মেয়ে আটকে আছে।'
অহনা আঁতকে উঠে। ময়নার গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,' আমাকে সবটা খুলে বলো, সবটা।'
' বলব আপা। কিন্তু এখন পালাতে হবে।'
অহনা উঠে দাঁড়ায়, ঘরটার চারিদিকে দেখে, তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। ময়না দেখতে পায় পাশের দেয়ালে একখানা ছবি আটকানো। এমন পরিত্যক্ত জায়গায় ঘরটিতে ছবি আটকানো থাকার কথা না। অহনা আর ময়না ছবিটি খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। অহনার সন্দেহ হয় এটা নিয়ে। ছবিটা অনেক ভারী, হাত দিয়ে সরাতে পারছে না। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর ধরে ছবিটা এখানে রয়েছে। ময়না আর অহনা দুজন মিলে একসাথে ছবিটাকে ঠেলে সরায়। মুহুর্তেই চোখে মুখে বিষাদ নেমে আসে।
অহনার তার বন্ধু অহনার ঘর খুঁজে রুমালটা পায়। টিকু হাতে নিয়েই সেটা দিয়ে ঘাম মুছে। ঘাম থেকে পানির কণাগুলো রুমালে লাগতেই সেখানে কিছু লেখা ফুটে উঠে। টিকু ভয়ের চোটে সেটা হাত থেকে ফেলে দেয়,
' ভাই আমাকে বাঁচা। ভূতের রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে ফেলেছি ভুল করে। এখন আমার কি হবে?'
টিকু চোখ বন্ধ করে থাকে। সবাই তার কথায় নজর দেয়। ইরা তার মাথায় চাপড় মেরে বলল,' আমার থেকে বড় ভূত আর একটাও নেই, আমাকে ভয় না পেয়ে একটা রুমালে ভয় পাচ্ছিস কেন? চোখ খোল।'
' না আমি খুলব না। রুমালের ভেতরে ভূত আছে। সে লিখেছে।'
হ্যারি হাতে নেয় রুমালটা। দেখল একটা লেখা,' বড় বাড়ি।'
হ্যারি উল্টে পাল্টে দেখে বলল,' কই তেমন কিছু না। লেখাটা আগেই ছিল, তুই খেয়াল করিসনি টিকুর বাচ্চা।'
রুমিও দেখল, বলল,' হ্যাঁ, তেমন কিছু নেই। তবে একটু খটকা লাগছে।'
হ্যারি উৎসুক হয়ে তাকায়,'কিছু কি মনে হচ্ছে তোর?'
' হ্যাঁ, কেমন অদ্ভুত লাগছে আঁকা গুলো। আর দেখ, কিছু অগোছালো অক্ষর, আমার মনে হয় কেউ এই রুমালের দ্বারা সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।'
'দেখতে হবে। টিকু তাহলে ঠিক বলেছে। পানি লাগায় লেখাটা ফুটে উঠেছে। আমাদের দেখা উচিত, আর কোনো সূত্র পাই না।'
তারা রুমালটার উপর পানি ঢালল, আরো কিছু লেখা ফুটে উঠল। লেখা ছিল, ফুলের বাগান, বাম দ্বিতল।
লেখাগুলো বুঝতে পারছিল না কেউই, আসলে কি বোঝানো হয়েছে।
এরই মাঝে রোস্তম ঘরে প্রবেশ করে। ওদের হাতে রুমালটা দেখেই বলল,' এটা ময়নার রুমাল, তার বাড়ি থেকে পেয়েছে।'
সবাই তখন জিজ্ঞেস করল,' আপনি কি জানেন বড় বাড়ি দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে?'
' পাশের এলাকায় বড় বাড়ি রয়েছে। অহনা ঐ বাড়িটার কথা বলেছিল, ময়নার শশুর বাড়ি এটা।'
হ্যারি বলল,' তার মানে এটাই সংকেত। আমরা ঐ বাড়িতে গেলেই পরবর্তী সংকেতের উদ্দেশ্য বুঝতে পারব। চলো সবাই।'
রোস্তম যেতে চাইলে সবাই তাকে না করে। তাকে বাড়িতে রেখেই চারজন রওনা দেয়। রাস্তার মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে বাড়ির ঠিকানাও নিয়ে নেয়।
বাড়ির গেইটে প্রবেশ করতেই দারোয়ান আটকায় তাদের। কিন্তু সবার স্মার্টনেস দেখে ঢুকতে দেয়। কলিং বেল চাপতেই বয়স্ক একজন মহিলা দরজা খুলে দেয়। বড় গলায় কাউকে ডেকে বলল,' আপা, বাইত্তে মেহমান আইছে। দেইখ্যা যান।'
একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এগিয়ে আসেন। ব্রু কুঁচকে তাকায় চারজনের দিকে,' কারা তোমরা?'
টিকু কিছু বলতে যেতেই রুমি তার হাত চেপে ধরে ইশারা দেয় চুপ থাকতে। তারপর হ্যারি বলল,' আমরা ময়নার বন্ধু।'
চাকর মহিলাটি সুর টেনে বলল,' ওমা, কয় কি? মাইয়া মানুষের আবার ছেইলে বন্ধু। আর কি যে দেহার বাকি আছে।'
মধ্যবয়সী মহিলাটি বলল,' রুনি, তুই চুপ থাক। রান্নাঘরে যা।' তারপর চারজনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,' কেমন বন্ধু? ময়নার তো কোনো কালে কোনো বন্ধু ছিল না।'
রুমি বলল,' আমরা ওর ছোটবেলার বন্ধু। আমরা ওর থেকে বয়সে বড় ছিলাম, কিন্তু একসাথে খেলতাম। সেখান থেকেই পরিচয়, খবর নিয়ে দেখবেন।'
' ঠিক আছে। তোমরা কি জানো না ময়না আর নেই?'
' জানি তো।'
রুমি কথাটা বলতেই হ্যারি থামিয়ে দেয়,
' আসলে ওর কথা মনে পড়ছিল, এখানে ওর অনেক স্মৃতি আছে, তাই আপনাদের বাড়িতে ঘুরে দেখতে আসলাম।'
' ঠিক আছে। দেখো তবে।'
মহিলাটি উঠে, একজন কাজের লোককে তাদের নাস্তা দিতে বলে চলে যায়।
ইরা রেগে যায়,' বড়লোক হয়েছে যে মনে হয় মাথা কিনে নিয়েছে। কিভাবে কথা বলে চলে গেল।'
' এই মুহূর্তে রাগ না করে আসল কাজ কর। আমাদের কাজ অহনাকে খুঁজে বের করা। পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখ কে কি পাস!'
তারা সবাই মিলে বাড়ির আনাচে-কানাচে দেখতে থাকে। একেকজন একেক দিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।
হ্যারি আবিষ্কার করে ফুলের বাগান। রুমালটা বের করে দেখে। বাম দ্বিতল কথাটার মানে বুঝতে পারছে না। বাড়িটার দিকে তাকায়, বাম পাশের উপরের তলায় চোখ দেয়। একটি জানালা দেখতে পায়.....
চলবে....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন