২০.
অহনার মুখ থেকে অস্ফুট কিছু শব্দ বের হচ্ছে শুধু। ভালো করে খেয়াল করে দেখল, এটা মতি। অহনা ছাড়ানোর চেষ্টা করে সফল হয়। হাতে কামড় বসাতেই সে ছেড়ে দেয়। পরক্ষণেই অহনার দিকে এগিয়ে আসে,' কেন করলে এমনটা?'
অহনা নিজেকে সামলে বলে,' আমি কিছুই করিনি। এভাবে আমাকে ধরার সাহস করে দিল আপনাকে?'
' আমি মানতে পারব না কোনোমতেই। তুমি এই বিয়ে করবে না। আমি বার বার বলছি এই বিয়ে করবে না।'
' আমি আপনার কথার গোলাম নই। আপনার যা ইচ্ছা করে নেন।'
' আমি তোমাকে ভালোবাসি, বিশ্বাস করো!'
অহনা অবাক হয়ে যায়। কথাটা তার কাছে ভালো লাগেনি,
' কি বললেন?'
' আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।'
' আমি বাসি না। এসব কি শুরু করলেন?'
' ভালোবাসি আমি তোমাকে, সেদিন দেখার পর থেকেই। আমি ভেবেছি বাড়িতে বিয়ের কথা বলব, কিন্তু তার আগেই কি করে এসব ঘটে গেল। আমি আগেই ভেবেছি বাবাকে বলব, কিন্তু তোমাকে আকাশে উড়তে দেখে আমি ভেবেছি ভূতে ধরেছে, আগে সুস্থ করব তারপর বিয়ে করব। কিন্তু এর আগেই এতসব ঘটে গেল। আমি এখন কি করব অহনা? বলে দাও।'
' কিছু করার নেই। আপনার বাবা বিয়েটা ঠিক করেছে। আর এখানে আমার বাবার সম্মানের প্রশ্ন, আমি কিছু করতে পারব না।'
' তুমি পারবে। তুমি ছাড়া আর কেউ ভরসা নেই। তুমি তোমার বাবাকে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো, বিয়ে করতে চাও।'
' কিন্তু আমি মিথ্যে কেন বলব? পারব না আমি।'
' পারতে হবে তোমাকে। আমি কিছুতেই ভাইয়ের সাথে তোমাকে মেনে নিতে পারব না। আমার ভাইটা একদম বোকা, তোমার সাথে তাকে মানাবে না।'
'কেন মানাবে না। আপনাকে যদি গোয়ালের গাভীর সাথে মানায় তাহলে উনাকে কেন আমার সাথে মানাবে না?'
' একবার বোঝার চেষ্টা করো।'
'কিছূ চেষ্টা করব না।'
মতি এগিয়ে এসে অহনার হাত চেপে ধরে,
'এমন করো না। আমি ভালো হয়ে যাব একদম। আর কখনো কোনো অন্যায় কাজ করব না। তোমাকে বিয়ে করতে পারলে আর কিছু চাই না।'
' নিজের সীমার মধ্যে থাকুন। আমাকে কে বিয়ে করল না করল, এতে আমার কিছু যায় আসে না। চলে যান এখান থেকে, না হয় বাবাকে ডাকব।'
' তার মানে তুমি ভাইকেও বিয়ে করতে চাও না। ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি।'
মতি চলে যায়। অহনা তার কপালে ভালোবাসা হারানোর ভাঁজ দেখতে পেল। নিজেকে নিজে শুধালো,' এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? কেন হচ্ছে? আমি কেন বার বার এত এত প্রশ্নের সম্মুখীন হই? কেন আমার সাথেই সব অনিয়ম হয়?'
মাহতিম বন্দরের একটি জাহাজে উঠে যায়। সেখানে থেকে সোজা নরসিংদীতে ফিরে আসে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছে ক্যাপ্টেন নিমো এখানেই থাকে। তার সাথে দেখা করাটা জরুরি ছিল, তাই এসেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ক্যাপ্টেন সেখান থেকে চলে গেছে দুইদিন আগেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না।
মাহতিম আবার ফিরে আসে। তার প্রিয় বন্ধু নাজের কাছে যায়। অল্প বয়সী যুবতী নাজ। নিজের ঘরে বসে সে ফোনে কথা বলছিল, এমন সময় আগমন ঘটে মাহতিমের। মাহতিম তার পাশে গিয়ে বলল,' নাজ, আমি এসেছি।'
চমকে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে নাজ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করতে যাবে, তার আগেই মাহতিম তার মুখ চেপে ধরে,' দোহাই লাগে, কথা বলিস না, সবাই জেনে যাবে।'
' তুমি? তুমি এখানে কি করে? এটা কিভাবে সম্ভব?'
' সব পরে বলছি, এখন চিৎকার করিস না।'
মাহতিম আস্তে আস্তে নাজের মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে আনে,
'তোর সাহায্য দরকার আমার!'
' কিসের সাহায্য? আর তুই এতদিন দেখা করিসনি কেন?আমিতো ভাবতেই পারিনি তোকে আবার দেখতে পাব। ঠিক কি হয়েছিল তোর সাথে?'
' সে অনেক লম্বা কাহিনী। তুই আগে আমাকে সাহায্য কর।'
' অবশ্যই! তোকে সাহায্য করব নাতো কাকে করব? কি করতে হবে বল, আমি তোকে সাহায্য করব।'
মাহতিমের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। নাজের প্রতি তার ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়,
' আমি জানতাম তুই আমাকে না করবি না। তোকে ছাড়া এখানে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। এবার আমার টার্গেট ফিলাপ হবে।'
' সিউর মাই ফ্রেন্ড। তোকেতো আমি শেষ পর্যন্ত সাহায্য করব।'
' এখন বল ক্যাপ্টেন নিমো কোথায় আছে?'
নাজের চোখে-মুখে চিন্তার রেখা পড়ে। কিছু ভাবছে সে। মাহতিম আবার বলল,' ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলা দরকার। তিনি আমার সব বিষয় জানেন। ওনার সাহায্য লাগবে আমার।'
' ক্যাপ্টেন আজ দু'দিন নিখোঁজ। কেউ জানে না তিনি কোথায়!'
' ঠিক আছে আমি খুঁজে বের করব। তুই শুধু বাইরের দিকটা নজরে রাখ, তাহলেই হবে।'
মাহতিম চলে যেতেই নাজ কল করে তার সঙ্গী রিভাকে,
' রিভা শুনতে পাচ্ছ?'
'হ্যাঁ বলো।'
' মাহতিম ফিরে এসেছে।'
' হোয়াট? তোমার কি মাথা ঠিক আছে? ভুলভাল বকছো কেন?'
' আমার মাথা একদম ঠিক আছে। একটু আগে মাহতিমের সাথে আমার দেখা হলো। সে আমাকে বলল, তাকে সাহায্য করতে।'
' তুমি করবে তাকে সাহায্য?'
' হ্যাঁ, আমি তাকে সাহায্য করব।'
' বিষয়টা কি সবাইকে জানাবো?'
' এখন না। সময় হলে আমি জানাবো। আমার আরো কিছু খোঁজ নেওয়া বাকি।'
নাজ কল রেখে শুয়ে পড়ে। অনেক প্রশ্ন মাথায় রয়ে যায়।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই অহনা তার বাবার কাছে যায়,
' বাবা আমি বিয়েটা করব।'
রোস্তমের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। হ্যারি, টিকু, রুমি, ইরা 'হুররে' বলে উঠে। অহনা সিদ্ধান্ত নেয় ময়নাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। তাই ময়নার বাবাকে খবর জানায় আসতে।
খবর জানাতে দেরি হলো, কিন্তু তার আসতে দেরি হলো না। এসেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। অহনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলে রোস্তম বাঁধা দেয়,
'ভাই, মেয়েটা এই কয়দিনে মন জয় করে নিয়েছে। এখন হঠাৎ চলে গেলে আমরা সবাই কষ্ট পাব। কিছুদিন পর আমার মেয়ের বিয়ে, বিয়ের পরই না হয় যাবে।'
' তাহলেতো ভালোই হলো। ঠিক আছে তবে।'
' আপনিও থেকে যান। কয়টা দিনেরই ব্যাপার শুধু। তারপর মেয়ে নিয়ে চলে যাবেন।'
ময়নার বাপ আর অমত করে না। তিনিও থেকে যান।
রোস্তম আরেক দফা মোড়ল বাড়ি গিয়ে জানিয়ে আসেন, মেয়ে তার বিয়েতে রাজী হয়ে গেছে। মোড়লও খুশি হয়। বাড়ির মহিলাদের ডেকে বলে, 'কালই তাহলে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ছেলেকেও নিয়ে যাব। বিয়ে হবে ছেলে-মেয়ের, তাদের দেখা হওয়া, কথা হওয়াটা জরুরি।'
রোস্তম চলে আসে বাড়িতে। এখন তার অনেক কাজ। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। বাজারে গিয়ে নিজের হাতে বাহারী খরচ করে আনলেন। এলাকার অনেক মহিলা সাহায্য করতে আসল। মোড়লের বাড়ির বউ হবে অহনা, সেটা ভেবেই সবাই হিংসেয় জ্বলছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না, উপরে উপরে ভালো সাজতে সবাই ইচ্ছুক।
অহনার মনে খারাপ প্রচুর। বার বার মাহতিমের কথা মনে পড়ছে। কয়েকদিনেই কেমন আপন হয়ে গেল লোকটা, আর এখন কাছে নেই। হাঁসফাঁস লাগছে অহনার। জানালায় চোখ দিতেই পুনরায় মতিকে দেখতে পায়। একটা লোকের সাথে কথা বলছে সে। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কোনো কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। অহনা বিরক্ত হয় মতিকে দেখে। মনে মনে আওড়ালো,' এই উটকো ঝামেলা আবার কি করতে আসছে কে জানে? সতর্ক থাকতে হবে আমাকে.....
চলবে.....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন