১০
মুখোশধারী লোকটি অহনাকে নিয়ে বড় বাড়ির পেছনে যায়। তালাবদ্ধ একটা ঘর। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখা গেলেও মূলত ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। বাইরে লোক দেখানোর জন্য তালা ঝুলানো হয়েছে। লোকটি দরজায় করাঘাত করতেই ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে দেয়। লোকটি থপ করে অহনাকে নিচে ফেলে দেয়। গা ঝেড়ে বলে,' তেজের থেকেও এর ওজন বেশি। সুন্দরী মেয়েরা বেশি ওজন হয় নাকি রে ক্যাবলা?'
ক্যাবলা দাঁত বের করে সাঁয় দেয়,' হ বস। তবে এবারের মাইয়াডা খাসা।'
' এরে নিয়ে আলাদা ঘরে রাখ। এর তেজ বেশি, সবার সাথে মিশতে সময় লাগবে।'
মাথা দুলিয়ে বলল ক্যাবলা,' জ্বী বস, এখুনি যাচ্ছি।'
মাহতিম রাগের বসে বাইরে ছিল। অদৃশ্য হওয়ার সুবাদে সে ঘুরে বেড়ায় চারিদিকে।
অহনার কথা তার মনে হতেই জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। না দেখতে পেয়ে ভাবে ওয়াশরুমে গিয়েছে হয়তো। কিন্তু দশ মিনিট পরেও যখন এলো না তখন মাহতিম ঘরে ঢুকে। কোথাও পায় না। এত রাতে কোথাও যাবেও না। মাহতিম নিজের বোকামির জন্য নিজেকে দোষারোপ করে। সে ভাবে, যদি সে রেগে বের হয়ে না যেত তাহলে এতো কিছু হতো না, তার দেখা উচিত ছিল। সে জানতো অহনা খুব বোকাসোকা মেয়ে। সহজে তার মাথায় বুদ্ধি আসে না। আবার কোনো ভুল করে বসবে। মাহতিম সবসময় তার মনোযোগ অহনার দিকে রাখে, আজ একটু রাগের জন্য ভুল করে বসল।
অহনার ঘোর কে/টে যায়। নিভু নিভু চোখে চারিদিকে তাকায়। অন্ধকার ঘরে কাউকে না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। হাতে-পায়ে বাঁধন দেওয়া, মুখেও রুমাল বাঁধা। একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছোটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এক চুলও নড়াতে পারে না নিজেকে। পরিশেষে শান্ত হয়ে দেখতে থাকে। মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না।
রাত আরো গভীর হতেই মুখোশধারী লোকটি আসে। দরজায় ক'ট'ক'ট শব্দ হয়। অহনা চোখ তুলে তাকায়। আবছা আলোয় মুখোমুখি দেখতে পায় একজন ছায়া মানবকে। অহনার চোখে হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যায়। লোকটা একটা দিয়াশলাই কাঠি জ্বালিয়ে নেয়, ফুটে ওঠে তার চেহারা। অহনা দেখতে পায়, এটা মাহতিম নয়, অন্য কেউ। কিন্তু তার মুখ ডাকা। লোকটি এক টানে নিজের মুখোশটি খুলে ফেলে। অহনা দেখতে পায় লোকটি আর কেউ নয়, দুপুরে কথা হওয়া সে লোকটি, বড় বাড়ির ছোট ছেলে। অহনা কিছু বলতে লাগে, কিন্তু মুখে রুমাল থাকার কারণে শব্দ বের হয় না। লোকটি অহনার মুখ থেকে রুমাল সরিয়ে দেয়, বলল,' তোতাপাখি কি কখনো কথা না বলে থাকতে পারে? তুমি বলো, আমি শুনছি।'
' কু//ত্তা/***র বা////চ্চা।' অহনা গালি দিতেই ফিক করে হেসে ফেলে লোকটি।
' তুমি মনে হয় আমার নাম জানো না তাই ভুল নামে ডাকছো। আমার নাম সোহেল জহরু।'
' আমাকে এখানে ধরে আনলি কেন?'
' ইশশ্, বুকে লাগে কথাগুলো। একটু আদর করে বলো, সুন্দরীরদের আদরমাখা কথা আমার খুব ভালো লাগে।'
' ছেঁ//ড়ে দে শ*য়. তা*ন।'
' এটা বাংলা সিনেমা না। ডায়লগ বন্ধ করো। নিজ দায়িত্বে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করো।'
' কখখনো না।' অহনা নিজেকে ছোটানোর অনেক চেষ্টা করে। শক্ত দড়ি দিয়ে বেধেছে, সহজে খুলবে না। সোহেল অহনার দিকে এগিয়ে আসে,
' নিজেকে তোমার অসহায় লাগছে না?'
অহনা রপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে,' তুই একটা কাপুরুষ।'
'একদম না, আমি সুপুরুষ। প্রমাণ চাও?'
' আমাকে ছাড় বলছি, না হয় পস্তাবি। ও আসবে, তোদের সবাইকে দেখে নেবে।'
সোহেল ভয় পাওয়ার ভান ধরে বলল,' ওরি বাবা, ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এ আসবে, আমাকে মারবে খুব। ভয় পাচ্ছি আমি, খুব ভয় পাচ্ছি।' উচ্ছস্বরে হেসে উঠে সোহেল,' তোমার কান্না, কথা, কেউ শুনবে না, এই চার দেয়াল ছাড়া। যত ইচ্ছে ডেকে যাও সবাইকে।'
' তোকে শেষ করতে ও একাই যথেষ্ট। দেখবি, আসবেই।'
' ওকে অপেক্ষা করি সেই মহামানবের জন্য। আরেকটা কথা বলব তোমায়, ময়নার ব্যাপারে।'
অহনা সচকিত হয়ে উঠে ময়নার কথা শুনে,
' ময়না কোথায়, বলুন আমাকে?'
' আমার কাছেই আছে।'
' ও কোথায়? আমি ওর কাছে যাব।'
' কাল সকালেই তোমাকে তার কাছে পাঠানো হবে। এখন আমার ঘুম পাচ্ছে, এনার্জি নেই একদম। কাল দেখা হবে, গুড নাইট।'
' আমাকে ছাড়....'
সোহেল চলে যায় ঘরের দরজা বন্ধ করে।
সকাল হতেই রোস্তম সারা বাড়ি খুঁজে মেয়েকে, পায় না। এক পর্যায়ে পুরো এলাকা খুঁজে, কোথাও নেই। রোস্তম হাঁউমাঁউ করে কাঁদে, ময়নার পর তার মেয়েটাকেও হারিয়ে গেল।
রোস্তম আর এক মুহূর্তও দেরী করে না। পুলিশের কাছে যায়। ময়নার ব্যাপারেও গিয়েছিল, কিন্তু বিষয়টা আগেই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, মৃ//ত ঘোষণা করা হয়েছিল ময়নাকে। এখন অহনাকে খোঁজার জন্য আবার থানায় ডায়রি করতে গেলে সবাই তাকে পা//গ/ল ভাবে। তাকে বের করে দেয়। তার মামলাটা নেওয়া হয় না। রোস্তম বাড়ি না গিয়ে রাস্তার ধারেই বসে থাকে।
অহনার ঘুম ভাঙতেই সে পিঠে ব্যথা অনুভব করে। বন্দি থেকে সারা শরীর ফোঁড়ার মতো ব্যথা হয়ে যায়। অস্ফূট স্বরে আওয়াজ করে। জনমানব নেই এখানে যে সাহায্য করবে। অহনা স্থির থাকতে পারছে না, ব্যথা প্রচন্ড।
ক্যাবলা হাতে করে দুটো রুটি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। থালাটা এগিয়ে দেয় অহনার দিকে,
' খাইয়া লন।'
অহনা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ক্যাবলা আবারো বলল,' এই জায়গায় এইডাই সকাল বিকালের খানা। না খাইলে সারাদিন না খাইয়া থাকন লাগব।'
' খাব না আমি। নিয়ে যাও এই ময়লা পানি আর বাশি রুটি।'
' তাইলে উপাস থাকেন। বসের আদেশ, না খেলে জোর না করতে।'
ক্যাবলা চলে যেতে চাইলেই অহনা থাকে ডাকে,' ভাই শুনো?'
' হ আপা, কন।'
' আমি খাব।'
' এতক্ষণে লাইনে আইছেন। খাইয়া লন, এইছাড়া উপায় নাই। বসের যারে পছন্দ অয় তারেই নিয়া আহে। কপাল খারাপ আম্নের, সুন্দরী ক্যান আপনি?'
অহনা সুযোগ বুঝে বলল,' হাতের বাঁধন না খুললে আমি খাব কি করে বলো?'
ক্যাবলা এক গাল হেসে বলল,' কি যে কন আপা। খাঁড়ান, আমি খুইলা দিতাছি।'
মূলত অহনার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কোনোমতে বাঁধন খুলে ক্যাবলাকে আক্রমন করবে।
ক্যাবলা হাতের বাঁধন খুলে দেয়। অহনা বলল,' আপনি ওপাশে ঘুরে দাঁড়ান, কারো সামনে খেতে লজ্জা করে আমার।'
' আইচ্ছা আপা। আমনে খান, বসের আদেশ আপনাকে খাওয়ানোর।'
ক্যাবলা উল্টো দিকে ফিরতেই অহনা পায়ের বাঁধন খুলে নেয়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েই চেয়ারটা হাতে নেয়। শরীরে জোর নেই, তবুও সমস্ত শক্তি দিয়ে ক্যাবলার মাথায় আ///ঘা***ত করে। ক্যাবলা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
অহনা নিজেকে ছাড়াতে পেরে উচ্ছ্বাসিত হয়। বন্ধ ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে। চারিদিকে কেমন অন্ধকার। পাশেই একটা জানালো দেখল অহনা। খুব ছোট সেটা, তাকিয়ে দেখে বড় বাড়ির পেছনের দিক এটা, ফুলের বাগানের কাছে। অহনা দেখল কেউ একজন নয়নতারা ফুল তুলছে। অহনা তাকে ডাকতেই কাঁধে কারো স্পর্শ পায়.....
চলবে.....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন