১৩.
ছবির পেছনে দরজা দেখে অহনা অবাক হয়। ময়নাকে ভরসা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরটা অন্ধকার। কিছুক্ষণ হাতড়ে চলতেই অন্য একটি দরজার সামনে হাজির হয়। বাইরে থেকে আটকানো সেটা। অহনা অনেক চেষ্টা করে খোলার জন্য, বিফলে যায়।
পেছনে তাকিয়ে দেখে সোহেল বুকের সাথে হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ময়না ভয়ে অহনার সাথে লেপ্টে যায়। অহনা অভয় দেয়,' কিছু হবে না ময়না। ভয় পেয়ো না।'
সোহেল কপট রাগ নিয়ে বলল,' তোমাদেরকে ছেঁড়ে রাখাই আমার উচিত হয়নি। বার বার হতাশ করছ আমাকে। এবার দেখবে আমি কি করি।'
বলেই ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' ময়নারে ধর, আমি এটাকে সামলাই।'
পুনরায় ওদেরকে আগের ঘরটায় নেওয়া হয়। চেয়ারের সাথে দুজনকেই শক্ত করে বাঁধা হয়।
সোহেল অনেকটা হিংস্র হয়ে যায়। অহনার সামনে এগিয়ে আসে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' তোর সামনেই আজ তোর বোনের এমন হাল করব, পরেরবার আমার উপর কথা বলতেও তার ভয় হবে।'
ময়না কেঁদে উঠে,' ছেঁড়ে দাও ভাই, আমার বোনকে ছেঁড়ে দাও।'
' ধরবো কি ছাড়ার জন্য? আজকে ওকে দিয়েই নাস্তাটা সেরে নেব।' সোহেল শয়তানি হাসি দিয়ে উঠে।
অহনার দিকে এগিয়ে আসে। অহনা ছোটার জন্য ছটফট করতে থাকে। এই মুহূর্তে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই,
' দূরে থাক আমার থেকে। তোকে দেখতেও আমার ঘেন্না লাগে।'
' এত অহংকার ভালো নয়। তোমার অহংকার যতক্ষণ না ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ততক্ষণ আমি শান্তি পাবো না।'
' এতো কনফিডেন্স? তাহলে মনে রাখ, আমাকে বাঁচাতে সে আসবেই। তখন কোল কি হাল হবে সেটা নিয়েই ভয়ে আছি আমি।'
' দেখিয়ে দিই তাহলে আমার কনফিডেন্সের মাত্রা। দেখি কে বাঁচাতে আসে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, আর না। কাজ সব শেষ দিতে দিয়ে তোমার কাছেই আসতে পারিনি। এখন তাহলে আর কাজটাই করে নিই।'
সোহেল আরো এগিয়ে আসে। ময়না কেঁদে মরছে, ছুটতে পারছে না। সোহেল অহনার কাছাকাছি এসে শরীরের ঘ্রাণ নেয়,
' এত সুন্দর ঘ্রাণ! আমি মুগ্ধ! বিমোহিত! মেয়েদের শরীরের ঘ্রাণ আমার অনেক প্রিয়, তোমারটা আরো প্রিয়।'
' কাপুরুষ তুই? অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছিস।'
'ইশশ! এভাবে বলো না। তবে বলতে ইচ্ছে করলে বলো, আমার এসব গায়ে লাগে না।'
অহনা চোখ মুখ খিঁচে নেয়। সোহেল তার জামায় হাত দিতেই তার চোখ যায় জানালার দিকে। একজোড়া চোখ বাইরে থেকে দেখছে তাদের।
'কে ওখানে?' সোহেল হন্তদন্ত হয়ে জানালার কাছে যায়।
ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' বাইরে গিয়ে দেখ, কে ছিল? আমি সিউর কেউ দেখছিল আমাদের।'
পরপরই অহনার দিকে তাকায়। আগুনের সাথে সাথে লালসা ঝড়ছে তার চোখ দিয়ে। অহনার দিকে এগিয়ে আসতেই ফোনে কল আসে। সোহেল ওপাশের কথাগুলো শুনেই অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' তোমার কাছে আসলেই যত বাধা পড়ে। চিন্তা করো না, বিশ মিনিটের মধ্যেই আসছি আমি।'
সোহেল বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যায়। অহনা কেঁদে উঠে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু কে জানো?'
'কে আপা?'
' তার নিজের শরীর।'
ময়না ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারেনি সে। উত্তর পাওয়ার জন্য চেয়ে রইল অহনার দিকে।
অহনা নাক টেনে বলল,' এই শরীরের জন্যই বার বার ঐ নরপশুদের খোরাক হই। এই শরীরের লালসার জন্যই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজেদের কি রক্ষা করবো? যেখানে নিজের শরীরটাই শত্রু।'
ময়না চুপ করে থাকে। কথাটার সম্পূর্ণ মানে সে এতক্ষণে বুঝে গেছে। সত্যিইতো মেয়েদের দুর্বলতা তার শরীর। এই শরীরের জন্যই সে বাইরে বেরুতে পারে না, সবার লালসার দৃষ্টি থাকে।
ক্যাবলা দেখে নেয় হ্যারিকে। ছয়জন শক্তপোক্ত লোককে ডেকে এনে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। হ্যারিকে ডাকতে এসে সবাই বিপদে পড়ে। চারজনকেই বেঁধে নিয়ে যায় তালাবদ্ধ ঘরটাতে।
হ্যারি তখন চিৎকারের শব্দ পেয়েছিল ঘরটিতে তাই জানালায় উঁকি দেয়। সোহেল সেটা দেখে নেয়।
অহনাকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে নিয়ে যায়। সবাইকে একসাথে বাঁধে। অহনা আরো অবাক হয় বাকিদের দেখে,
' তোরা এখানে আসলি কিভাবে?'
রুমি বলল,' তোকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু এরা দেখে নেয়।'
' কেন করলি এটা? তোরা কেন আসতে গেলি? এবার সবাই বের হব কিভাবে?'
হ্যারি অভয় দেয়,' সবাই মিলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করে নেব। একটা না একটা উপায় বের হবেই।'
ময়না বলে উঠে,'পারবে না। এবার আমরা সবাই শেষ। বাকি মেয়েদের মতো আমাদের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাবে সময়ের সাথে সাথে।'
ইরা ভয়ে বলল,' কি বলছো তুমি? আরো মেয়ে মানে?'
' আম ঠিকই বলছি। এসবতো চলছে আরো ত্রিশ বছর আগে থেকেই। আফতাব জহরু, মানে আমার শশুর এই সব করছে।'
অহনা ময়নার দিকে তাকায়,' পুরো ঘটনাটা আমাদের বলো। এমন কি হয়েছিল, যার জন্য তোমাকেও ছাড় দেয়নি?'
'শুনো তাহলে!'
ময়না বলতে শুরু করে,' আমার বাবা একজন সাধারণ মানুষ। বাজারে এইটা দোকান আছে শুধু। মা মা/রা গেছে আমার জন্মের সময়, বাবাই মানুষ করেছে। আমার পনেরো বছর হতেই আফতাব জহরু আমাকে বাবার দোকানে দেখতে পায়, সেখান থেকেই বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বড় বাড়িতে বিয়ে হবে ভেবে বাবা অনেক খুশি। আমি দেখতে মন্দ ছিলাম না বলে সবাই পছন্দ করে। আমার বিয়ে হয় আফতাব জহরুর মেজো ছেলের সাথে। দিন ভালোই যাচ্ছিল। একদিন আমার দেবর সোহেল বিনা অনুমতিতে আমার ঘরে প্রবেশ করে, আমার সাথে নোংরামি করার চেষ্টা করে। সেটা দেখে নেয় আমার স্বামী রাফিজ। সে তার ভাইকে থাপ্পর দেয়। আমাকে রক্ষা করার জন্য তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রাফিজ আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু গরীব বলে শাশুরী, ননদের অত্যাচার সহ্য করেছি খুব। উঠতে বসতে খোটা দিত। এভাবেই চলছিল দিন। একদিন বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে তারা বদ্ধ একটা ঘর দেখতে পাই। দরজাটা খুলে একজনকে বের হতে দেখে অবাক হই। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ দেখা গেলেও আসলে এটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। লোকটা বাইরে আসতেই আমি সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে যাই কি আছে দেখার জন্য। এখন মনে হচ্ছে, আমি না গেলেই আমার জীবনটা সুন্দর থাকতো।
দুইটা ঘর পেরিয়ে অনেকগুলো মেয়ের গোঙানির শব্দ পেলাম। আমি উৎসুক হয়ে দেখতে গেলাম। দেখলাম রাফিজ বসে আছে একটা চেয়ারে আর মেয়েগুলো কাতরাচ্ছে। আমাদের দেখে সে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম এতোগুলো মেয়ে এখানে কেন? আমি জিজ্ঞেস করতে করতেই ক্যাবলা নামক লোকটা এসেই ওকে বলল, মেয়েগুলোকে কেনার জন্য কাস্টমার এসে গেছে, আজ রাতেই নিতে আসবে, বাইরের দেশে পাচার করা হবে তাদের। রাফিজ লোকটাকে আকারে ইঙ্গিতে এসব বলতে না করল, কিন্তু লোকটা বুঝেনি তাই সব বলে দিল। সোহেল চলে এলো সেখানে। আমাকে দেখে রেগে গিয়ে থাপ্পর দিল। রাফিজও তার সাথে রেগে যায়। রাফিজ আমাকে নিয়ে ঘরে চলে আসে। আমাকে বুঝাতে থাকে বিভিন্নভাবে। কিন্তু আমি এমন অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারিনি। আমি আমার শাশুড়িকে সব বলি, ভেবেছি তিনি সাহায্য করবে। অথচ করেনি উল্টো সোহেলকে ডেকে এনে তার দিকে ঠেলে দিল আমাকে। সোহেল আমাকে তার মায়ের সামনেই.....'
এতটুকু বলতেই ময়না কেঁদে উঠে। অহনা কিছু বলার ভাষা পাচ্ছে না। কিছু বলতে যাবে, তখনি শব্দ এলো,' ওকে কাঁদতে দাও, মনে শান্তি আসবে।'
অহনা খুশিতে গদোগদো করে উঠে। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে,' মাহতিম!'
চলবে.....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন