অহনা আবারো জিজ্ঞেস করে,' বলো কে তুমি?'
অহনা আগ্রহ নিয়ে তাকায় ছায়া মানবের দিকে। সেও পূর্ণ দৃষ্টি দেয়।
' আমি মাহতিম। কিন্তু....'
অহনা উৎসুক হয়ে তাকায়,' কিন্তু কি? আর মাহতিম নামটা আমার খুব চেনা মনে হচ্ছে। মনে পড়ছে না তাও। আমাদের কি আগে কখনো দেখা হয়েছিল?'
' দেখা নয়, আমাদের মনের মিল ছিল।'
' আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।'
' তুমি বলোতো আজ থেকে দুই মাস বা তিন মাস আগে তোমার সাথে কি ঘটেছিল?'
' আমি জানি না। মনে নেই।'
' পাঁচ মাস বা ছয় মাস আগে কি ঘটেছিল?'
অহনা ভাবে। কিন্তু তার ভাব শূন্য। আগামী কিছু মাসের কোনো কথাই তার মনে নেই। মনে পড়ছে না এক মাস আগে কি হয়েছিল!
' আমার মনে পড়ছে না কিছু।'
' কারণ কোনো ঘটনাই তোমার মনে নেই। তুমি....'
ক্লাস শেষে সবাই বের হচ্ছিল তাই ছায়াটি কথা বন্ধ করে দেয়। উধাও হয়ে যায় কোথাও।
অহনা বাড়ি যায়। একটা ভাড়া বাড়িতে থাকে। মালিক একজন মহিলা। খুব খিটখিটে মেজাজের তিনি। একদম অনিয়ম পছন্দ করে না। হ্যারি কল করে অহনাকে,
' কই গেলি তুই? পার্টি এরেঞ্জ করেছি, আসবি কখন?'
' স্যরি ব্রো, আমার মনে ছিল না। ক্লাস শেষে বেরিয়ে পড়েছি। শরীরটা ভালো নেই, আমি ঘুমাব।'
' তোর ঘুমের মা* বাপ। এখন আসবি তুই। এতো কিছু জানতে চাই না।'
' আচ্ছা আসছি, দশ মিনিট লাগবে।'
অহনা নিজেকে জোর করে ঠেলতে ঠেলতে পুনরায় কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে কাউকে দেখতে পেল না। তাই কল করে হ্যারিকে। হ্যারি বলল তাদের বাড়িতে আসতে। অহনা রেগে যায়,' একটু আগে কলেজে আসতে বললি, এখন তোর বাড়ি যাব কেন? আমাকে কি ঘানি টানার বলদ পেয়েছিস নাকি?'
' ওফফ্ রাগ করিস না। তোর কি মাথা খারাপ নাকি? পার্টি বাড়িতে না করে কি কলেজের অফিস রুমে করব নাকি?'
' আচ্ছা আসছি। কথা বাড়াবি না আর।'
অহনা কলটা রাখতেই তার বাড়ি থেকে কল আসে। অহনার বাবা কল করেছে। কাঁদছেন তিনি,' মা তুই কেমন আছিস?'
' আমি ভালো বাবা, তুমি কেমন আছো? গলাটা এমন শুনাচ্ছে কেন?'
অহনার বাবা রোস্তম আলী ঝরঝর করে কেঁদে উঠে,' তোর মা আর আমাদের মাঝে নেই রে।'
অহনা আঁতকে উঠে,' কি বলছো বাবা? তুমি মায়ের কাছে কল দাও, আমি কথা বলব।'
রোস্তম নিজেকে সামলে নেয়,' হ্যাঁ রে মা, সুমা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তুই তারাতাড়ি তোর মাকে দেখতে আয়। তোকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল, পারেনি। তুই তাকে শেষ দেখে যা।'
' বাবা তুমি কাঁদবে না, আমি আসছি এখুনি।'
অহনার মনটা যেন মুহুর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মা তাকে দেখতে চেয়েছিল, শেষ দেখা আর দেখতে পেল না। ছুটে যায় মায়ের কাছে গ্রামের বাড়িতে।
হ্যারি কল করতে থাকে বার বার। লোকেশন ট্রেক করে জানতে পারে সে আসছে না, অন্য কোথাও যাচ্ছে।
অহনা বেলা একটার সময় বাড়ি পৌঁছায়। মাকে খাটিয়ারে দেখে অঝোরে কেঁদে উঠে। পাগলের মতো আচরণ করে সে। মাকে সে কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবে না। জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্না করে। রোস্তম তাকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে নেয়। দাপন করা হয় অহনার মাকে।
অহনা দক্ষিণ জানালার পাশে মুখ করে বসে আছে। টিনের চালে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। অহনার মনে হলো, মা তাকে বলেছিল বৃষ্টির সময় যদি আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হয় তাহলে সেটা পাওয়া যায়। অহনা কেঁদে কেঁদে মাকে ফেরত চাইল। রোস্তম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
সারাদিন কিছু খায়নি অহনা। রোস্তম কিছু খাবার নিয়ে আসে। অহনা দক্ষিণের দুয়ারে তাকিয়ে আছে। কিছুই মুখে রুচছে না। একমনে তাকিয়ে থেকে একসময় আন্দাজ করে, তার পাশে কেউ বসে আছে। অহনা খাবারের থালা হাতে নিয়ে বলল,' বাবা, তুমি এখন বিশ্রাম নাও, আমি খেয়ে নেব।'
রোস্তম চলে যায়। অহনা পাশে না ফিরেই বলল,' ভাবি নি এখানেও আসবে।'
'আমার যে আসতেই হতো।'
' কেন?'
' তুমি এখানে।'
' আমার বাড়িতে আমি এসেছি। তোমার কাজ কি?'
ছায়া মানবটি কিছু বলে না। সেও দক্ষিণে তাকিয়ে থাকে। অহনা বলল,' উত্তর নেই?'
ছায়াটি সরে যায় অহনার থেকে। সে উত্তর দিতে চায় না। গলায় বিঁধে তার।
বিকেল হতেই অহনা ঘুম থেকে জেগে উঠে। সন্ধ্যা হবে হবে প্রায়। গ্রামের নাম ইলাশপুর। গ্রামের পাশেই একটি নদী। অহনা সন্ধ্যা উপভোগ করতে নদীর পাড়ে যায়।
মিষ্টি বাতাসে গা এলিয়ে দেয়। পেছন থেকে কারো চিৎকার শুনে অস্বাভাবিকভাবে ভয় পেয়ে যায়। দেখল সাদা থান পড়া একটি মেয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। অহনা ভাবল এটা তার চোখের ভ্রুম। কিন্তু একদম কাছে চলে আসায় বিশ্বাস করল, এটা জলজ্যান্ত একটা মানুষ। মেয়েটির বয়স পনেরো কি ষোলো হবে। তার শরীরে ক্ষতের চিহ্ন। কেউ তাকে খুব মেরেছে। মেয়েটি অহনাকে বলল,' বোন আমাকে বাঁচাও। ওরা খুব নিষ্ঠুর, আমাকে মেরে ফেলবে।'
অহনা অভয় দেয়,' কেঁদো না তুমি, কেউ কিছু করবে না। আমি আছি।'
' ওরা ভয়ঙ্কর। আমাকে লুকিয়ে ফেলো বোন, আমাকে লুকিয়ে ফেলো।'
'ভয় পেয়ো না। তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে চলো।'
অহনা মেয়েটিকে নিয়ে নিজের ঘরে যায়। রোস্তম জিজ্ঞেস করলে বান্ধবী বলে পরিচয় দেয়। অহনা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে,' তোমার নাম কি বোন?'
মেয়েটি ঢকঢক করে গ্লাসের সব পানি সাবার করে বলল,' ময়না.... আমার নাম ময়না। বাবা আদর করে মনি ডাকত।'
' ওহ... তোমার বাবা কোথায়?'
' বাবা, বাবার বাড়িতে।'
' তোমার কি আর কেউ নেই?'
ময়না কেঁদে উঠে,' আমার কোনো কালেই আপন কেউ ছিল না। আজ একদম নেই, আরো নিঃস্ব আমি।'
' তোমার কি হয়েছিল, খুলে বলো আমাকে?'
' আমার খুব ক্ষুদা লেগেছে আপা, আমাকে কিছু খেতে দেবে?'
অহনা লজ্জিত হয়। মেয়েটাকে হাজারটা প্রশ্ন করছে কিন্তু তার যে ক্ষুদা লেগেছে কিনা একবারও জিজ্ঞেস করেনি।
' তুমি বসো, ভয় পেয়ো না। আমি এখনি যাব আর খাবার নিয়ে আসব।'
অহনা রান্নাঘরে যায়। পাতিলের ডাকনা উঠিয়ে দেখল খাবার স্বল্প। সেটাই বেড়ে নিয়ে আসে অহনা। ময়না গপাগপ করে খেতে থাকে। মনে হলো অনেকদিনের অনাহারি সে। অহনা ময়নার খাওয়ায় দেখে মনভরে।
খাওয়া শেষে অহনা তাকে বলল,' এখন তোমার বিশ্রাম নেওয়া দরকার বোন। তুমি বরং কিছুক্ষণ গা এলিয়ে নাও। ততক্ষণে আমি ভাত রেঁধে আসি।'
' আচ্ছা আপা।'
আপা শব্দটা অহনার হৃদয়ে গিয়ে লাগে। কত মায়া জড়ানো কন্ঠে ময়না তাকে আপা ডাকল। অহনা ময়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে যায়। রান্নাঘরের কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। অহনার মা কখনো মেয়েকে দিয়ে কাজ করাতো না। ছোট থেকেই কষ্ট করে শহরে পড়াশোনা করাচ্ছে। ছুটিতে এলেও তাকে আদর যত্নে রাখত। কখনো তার ঘর কন্যার কাজ করতে হয়নি। অহনা রান্নার জন্য কাঠ আনে, কিন্তু কোনমতেই আগুন ধরাতে পারে না। ধোঁয়ায় তার চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। এমতাবস্থায় তার চোখ যায় রান্নাঘরের জানালায়। ধোঁয়া যাওয়ার জন্য যে সুড়ঙ্গটা রেখেছে সেটা দিয়ে কেউ দেখছে। অহনা উপরে তাকাতেই সরে যায় সেটি। অহনা আবার চেষ্টা করতে থাকে আগুন ধরানোর, আবার সে কাউকে দেখতে পায়। জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অহনা। কাউকেই দেখে না।
অহনা আবার ফিরে আসতেই উঁকি দেয় সে মানব। মাথার চুল তার নজরুলের মতো লম্বা, খোঁচা খোঁচা দাড়িতে মুখ ভর্তি। সে পকেট থেকে একখানা ছু*রি বের করে। অহনা ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে.....
চলবে......
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন