৭.
অহনাকে চিৎকার করতে দেখে লোকটি সরে যায়। রোস্তম এসে মেয়েকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়।
' কি হয়েছিল মা? মাথা ঘুরে গেল নাকি?'
' না বাবা।'
অহনা কিছু বলে না রোস্তমকে। যদি চিন্তা করে সে।
রাতের খাবার খেয়ে যখন সবাই ঘুমাতে যায়, তখন জানালায় খটখট শব্দ শুনতে পায়। অহনার পাশেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ময়না। শব্দ শুনে অহনা উঠে যায়। শব্দের গতি অনুমান করে জানালায় চোখ দেয়। অহনা জানালা খুলে দিতেই তাকে কেউ ছিটকে ফেলে দেয়। বুঝতে পারে, এটা মাহতিম। পরক্ষণেই খেয়াল করে, কেউ তাকে ছু/রি দিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিল। অহনা মাটি থেকে উঠেই দৃষ্টি দেয় সামনে। সন্ধ্যার সেই লোকটাকে দেখতে পায়। অহনা তেড়ে আসে তার দিকে। মাহতিম তাকে থামিয়ে দেয়।
লোকটা দাঁত কেলিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অহনার দিকে এগিয়ে এসে ছু/রি ধরতেই সেটাকে একটি খেলনা বন্দুক বানিয়ে দেয় মাহতিম। লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে ছু/রিটাকে। কাজ করছে না দেখে এটাকে ফেলে দিয়ে এগিয়ে আসে অহনার দিকে। আবার পেছনে ফিরে যায়। ঘুমন্ত ময়নার মাথার কাছে গিয়ে তাকে আঘাত করতে যেতেই তার হাত শূন্যে ভেসে থাকে। সে কোনোমতেই হাত টেনে নিচে নামাতে পারছে না। এটা দেখে অহনা উচ্চস্বরে হেসে উঠে। জেগে যায় ময়না। সামনে এমন অদ্ভুত একটা মানুষকে দেখে ভয়ে সে দৌড়ে এসে অহনার পেছনে লুকায়।
পাশের ঘর থেকে রোস্তম উঠে আসে। দরজা খুলতে বলে অহনাকে। অহনা ভয় পেয়ে যায়। বাবাকে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মাহতিম লোকটাকে ঠিক করে দেয়। লোকটা ভয়ে তড়িঘড়ি হয়ে জানালা দিয়ে লাফ দেয়। বেগোছে পড়ে পায়ে ব্যথা পায়। তবুও ভূতের ভয় সাঙ্গ করে পালিয়ে যায়।
অহনা দরজা খুলে দেয়। রোস্তম সারা ঘর খুঁজে বলল,' ঘরে কেউ ছিল মনে হয়? কে দিল?'
' কেউ না বাবা। আমি ছিলাম আর ময়না ছিল শুধু।'
' কেউ চিৎকার করেছে। আর তুই এতো রাতে হাসছিলি কেন?'
অহনা ঠোঁট কামড়ে ভাবে কি বলবে। মাথা চুলকে বলল,' আমি একটা হাস্যরসিক স্বপ্ন দেখেছি, যেখানে তুমি মাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে রেজিনা আন্টিকে জড়িয়ে ধরেছিলে সেটাই দেখলাম।'
' ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।'
রোস্তম কিছুটা ভারী গলায় বেরিয়ে যায়। অহনাও গিয়ে শুয়ে পড়ে। ময়না ভয় পেয়ে আছে তাই অহনা তাকে বোনের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই ময়নাকে বিছানায় দেখতে পায় না অহনা। দৌড়ে বাইরে যায়, দেখতে পাচ্ছে না। তন্নতন্ন করে পুরো বাড়ি খুঁজে কিন্তু পায় না। হতাশ হয়ে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ে। রোস্তম এলাকা খুঁজেও পায় না। হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টা কারো হজম হচ্ছে না। রোস্তম অহনাকে বলল,' মেয়েটা সকালে খুব তারাতাড়ি উঠেছিল।'
অহনা সচকিত হয়,' বাবা, তুমি সেটা আমাকে আগে বললে না কেন? তারপর কোথায় গেল?'
' সকাল ভোরে উঠেই বাইরের চালতা গাছটার নিচে বসে ছিল। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলল না। আমি ঘরে চলে আসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর দেখতে পেলাম না। কোথাও উধাও হয়ে গেছে। এরপর তুইও উঠে গেলি।'
' কোথায় গেল বাবা? ওর পরিচয়টাও এখনো জানা হলো না।'
অহনা ঠিক করে নদীর পাড়ে যাবে। সেখান থেকে যদি কোনো ক্লু পেয়ে যায় তাহলে খুঁজতে সুবিধা হবে। তৎক্ষণাৎ দেরী না করে অহনা নদীর পাড়ে রওনা দেয়।
গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হয় মতির সাথে। গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি। অহনা তাকে দেখেই কপাল কুঁচকায়। পাশ কেটে চলে যেতে চাইলেই মতি তাকে ডাক দেয়,' অহনা না?'
অহনা দাঁড়ায়, ছোট করে উত্তর দেয়,' হু।'
' বেচারা, মাকে হারিয়ে ফেললাম। কি আর করার, যা হয় ভালোর জন্যই হয়।'
রেগে উঠে অহনা,' আর কিছু বলার আছে?'
' রেগে যাচ্ছিস কেনো? মেলা দিন পর তোরে দেখলাম, একটু কথা বলি ভালো করে।'
' আমার তাড়া আছে, যেতে হবে।'
' সে আমারও রাজ্যের তাড়া থাকে, তাই বলে তোর সাথে দেখা হলো, কথা বলবো না, তা কি হয়?'
' আমি আপনার মতো বেকার মানুষ নই।'
' তাইলে কি, কয়টা রাজ্য চালাস তুই?'
' আপনার কথা শেষ হলে আসতে পারেন। আমাকে যেতে হবে।'
অহনা পাশ কেটে চলে যায়। মতি ছোট ছোট দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিজেকেই বিড়বিড় করে বলে,'সেই ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলা কবে এতো বড় হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। বিষয়টা দেখতে হবে।'
অহনা নদীর পাড়ে হন্যি হয়ে খুঁজে ময়নাকে। কিছুই পায় না। আশাহত হয়ে যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনি তার চোখ যায় পড়ে থাকা একটা লকেটের দিকে। বালির নিচ থেকে খুব অল্প পরিমাণ অংশ দেখা যাচ্ছে। অহনা বালির ভেতর থেকে বের করে লকেটটি। পরিষ্কার করে ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখে। লকেটটি খুলতেই অবাক হয়। সেখানে ময়নার সাথে অন্য একটি ছবি। অহনা সেটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। রোস্তমকে দেখাতেই সে চিনতে পারে। বলল, পাশের এলাকায় তার বাড়ি। অহনা ঠিক করে, সে যাবে ঐ বাড়িতে। রোস্তম যেতে না করে, কিন্তু অহনা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, সে যাবেই।
লোকটির ঠিকানা বের করে অহনা রওনা দেয়। একটা অটো নিয়ে তার বাড়ি পৌঁছায়। কয়েকজন লোককে জিজ্ঞেস করে বাড়ির খবর নিয়ে নেয়।
একটা বহু পুরনো বাড়িতে থাকে লোকটা, নাম বশির। দরজা ধাক্কাতেই বশির ঘুমঘুম চোখে বেরিয়ে আসে। অহনাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে,' কাকে খুঁজছেন আপনি?'
অহনা লকেটটা বশিরের হাতে দেয়। লকেট দেখেই বশির হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। মুহুর্তেই ভেঙে পড়ে। এমনিতেই সারারাত কান্না করে কাটিয়েছে। ভোর রাতের ঘুমটাই চোখে ছিল। অহনার দিকে দৃষ্টি দেয় বশির,' এটা তুমি কোথায় পেলে মামনি?'
' আপনি কি চিনেন এই মেয়েটাকে?'
' আমি তার অভাগা বাবা।'
' তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?'
' আমি জানি না তুমি কে? তুমি হয়তো জানো না কালকেই আমার মেয়েটা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।' বলেই বশির অঝোরে কাঁদতে লাগল।
অহনার পা দুটো অসাড় হয়ে আসে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, অহনার মাথায় ঢুকছে না কিছুই। অহনা কাঁধে কারো স্পর্শ পায়। বুঝতে পারে মাহতিম কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। অহনা নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কিছু ভুল বলছেন নাতো?'
' আমি কেন নিজের মেয়েকে নিয়ে মিথ্যা বলব? বাবা হয়ে আমি মেয়ের মৃ/ত্যুর সংবাদ দিচ্ছি, তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলছি?'
' না আঙ্কেল। কিন্তু....'
অহনা থেমে যায়। লোকটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে, এখন তাকে প্রশ্ন না করে সঙ্গ দেওয়াই উত্তম। একটু পর ধীরস্থির হয়ে সব জানতে চাইবে।
অনেকগুলো প্রশ্ন অহনার মাথায় ঘুরপাক খায়। যদি ময়না কালকেই মারা যায়, তাহলে আজ সকাল পর্যন্ত তার সাথে কে ছিল? দেখে তো মনে হয়নি সে মৃ/ত! মাথা ধরে এসেছে অহনার। ময়নাকে সে মৃ/ত ঘোষণা দিতে পারে না.....
চলবে......
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন