৮.
অহনা মাথা ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে। নিজেকে সামলে নেয়। বশিরকে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কি আপনার মেয়ের ডেড বডি দেখেছেন?'
বশির ঝংকার মেরে উঠে,' আমি নিজে হাতে দাফন করেছি আমার মেয়েকে।'
অহনা আরেকটা ঝটকা খায়। লোকটা তার মেয়েকে নিজের হাতে দাফন করলে, কাল যার সাথে দেখা হয়েছে, সে কে?
অহনা পুনরায় বলল,' দয়া করে আপনি পুরো ঘটনাটা বলেন। কি করে আপনার মেয়ে মারা গেল।'
' মেয়ের জামাই কয়দিন আগে মরছে। রাগে দুঃখে মেয়েও গলায় দড়ি দিল।'
' এই বাড়িতেই নাকি শশুর বাড়িতে?'
' মেয়ের শশুর বাড়িতে।'
অহনা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,' আপনি কি তার ঘরটা দেখাবেন আমাকে?'
' নিশ্চয়! আমার মেয়ে খুব শৌখিন ছিল। তার ঘর সবসময় আয়নার মতো ঝকঝকে করতো। বাহারী জিনিসে ভরপুর। আসো আমার সাথে!'
অহনা বশিরের পেছন পেছন যায়। দেখল, ঠিকই বলেছে লোকটা। বাহারী সাজে ঘরটা। অহনার নিজের ঘরের কথা মনে পড়ল। একবার যখন টিকু ওর ঘরে এসেছিল, তখন অহনা ওয়াশরুমে ছিল। বের হতেই টিকু নাক সিঁটকে বলল,' গরুর গোয়ালটাও তোর ঘরের থেকে বেশি সুন্দর। আমার মনে হয় না গরু ছাগলও এখানে এক রাত্রি থাকতে চাইবে না।'
অহনা তখন ভেঙচি কেটে বলেছিল,' ভাগ্যিস তুই গরু বা ছাগল না, তাহলে তুইও থাকতে পারতিনা'
বশির অহনাকে পুরো ঘর দেখায়। অহনা দেখে মন ভরে। ওর চোখ যায় একটি রোমালের দিকে। নকশা করা। অহনা অবাক হয় সেই নকশা দেখে। কোন ফুল, লতাপাতা না। এটায় কিছু চিহ্ন আঁকা। অহনা বশিরের অগোচরে সেটা লুকিয়ে নেয়। দেখা শেষে বের হয়ে যায় সে। বশিরের থেকে বিদায় নিতেই সে প্রশ্ন করে,' আমার মেয়েকে নিয়ে তুমি এতো কিছু জানতে চাইলে, কিন্তু আমি জানি না তুমি কে? যদি পরিচয়টা দিতে!'
অহনা বলল,' আমি তার সিনিয়র ছিলাম স্কুলে।'
' কিন্তু আমার মেয়েতো ক্লাস সিক্সের পর আর পড়েনি। এতোদিন পর তুমি তাকে কেন খুঁজতে আসলে।'
অহনা ঘাবরে যায়, বলল,' অনেক আগেই তার সাথে কথা হয়েছিল। কিছুদিন আগে বলতে পারেন। তাই খবর নিতে এসেছিলাম।'
কোনো রকমে বিদায় নিয়ে অহনা চলে যায়। অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে মনে, কিন্তু উত্তর জানা নেই।
অনেক সময় উত্তর আমাদের সামনেই থাকে। আমরা দেখতে পাই না।
অহনা বশিরের থেকে ময়নার শশুর বাড়ির ঠিকানা নিয়েছিল। গন্তব্য এখন ময়নার শশুর বাড়ি।
দুপুরের খাবার খেয়েই অহনা রওনা দেয় ময়নার শশুর বাড়ি। চাকরের সমাগম মানুষের থেকেও বেশি। অহনা গেইট পাড় হতে চাইলেই দারোয়ান তাকে আটকে দেয়। অহনা লম্বা ঘোমটা টেনে বলল,' আমি ভেতরে যেতে চাই।'
দারোয়ান বলল,' ভেতরে বাইরের লোক যাওয়া নিষেধ।'
' আমি তাদের আত্মীয় হই।'
' কেমন আত্মীয়? এই বাড়িতে ত্রিশ বছর আছি আমি। কোনো আত্মীয় আমার অচেনা না।'
' তাদের বাড়ির বউয়ের সব আত্মীয়কে চেনেন?'
' না।'
' তাহলে? এই বাড়ির মালিকের বাবার ভাইয়ের চাচাতো বোনের ছেলের মেয়েকে চিনেন?'
দারোয়ান কিছুক্ষণ ভেবে নেয়,' না, চিনি না।'
' চিনবেন কি করে, বুড়ো হয়ে গেছেনতো তাই। আমাকে যদি এখন ভেতরে ঢুকতে না দেন, তাহলে আমি গিয়ে বড়বাবুর কাছে নালিশ করব। আপনার চাকরি যাবে।'
' না, ঠিক আছে, আপনি ভেতরে যান। কিছু বলবেন মালিককে।'
অহনা ভেতরে চলে যায়।একজন চাকরানীকে দেখতে পেয়ে অহনা জিজ্ঞেস করে,' তুমি কি এই বাড়িতেই থাক?'
' হ্যাঁ।'
' তাহলে বলো, এই বাড়ির বউ নাকি মা/রা গেছে?'
' কোনডা? ছোডডা না বড়ডা।'
অহনা অবাক হয়ে যায়। বড় বউ না ছোট বউ সে সেটা জানে না। বলল,' দুইজনই।'
' খাঁড়ান আপা। আমি গামলাটা রাইখ্খা আসি।'
মেয়েটা গামলা রেখেই অহনার কাছে আসে।
'তয় আপা কন, আম্নে কি কইছিলেন?'
' এই বাড়ির দুই বউয়ের কথা।'
' বড় বউতো দুই মাস আগে মরছে শ্বাসকষ্ট উইঠা। আর ছোডডা গলায় দড়ি দিছে।'
' কেন দিয়েছে তুমি কি জানো?'
' হের জামাইর লাইগ্গা। মাইয়া ভালাই আছিল, জামাইডাও ভালা।' তারপর মেয়েটা অহনার কানের কাছে এসে বলল,' তয় আপা, শশুর বাড়ির লোকজনডি ভালা না। মাইয়াডারে অত্যাচার করত। বড় বউডারেও করছে। এরা এমনিতেও মরতো।'
ভেতর থেকে একজন লোকের আগমন দেখে মেয়েটি সরে যায়। অহনাও পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। অহনা ফুল হাতা শার্ট গায়ে দিয়েছে, হাত কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। গলায় একখানা কালো উড়না জড়ানো। বাতাসের কারণে সেটার কিছু অংশ উড়তে লাগল। ঘর থেকে বের হওয়া মানুষটি সেটার দিকে চোখ দেয়।
লোকটি এগিয়ে আসে অহনার দিকে,
' ঠিক ধরেছিলাম। এখানে কেউ ছিল। কে তুমি মেয়ে?'
অহনা বের হয়ে আসে। ভয় হচ্ছে তার খুব।
' আমি আমার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে এসছি।'
' কে তোমার বান্ধবী?'
' ময়না।'
' ময়না নামের কেউ এখানে থাকে না। ফিরে যাও।'
' এটা তার শশুর বাড়ি।'
' কালকেই সে মরে গেছে, তুমি হয়তো জানো না।'
' আমি জানি। আর এটাও জানি, সে এখনো জীবিত।'
' এসব উল্টা পাল্টা কি বলছ? সবাই সাক্ষী আছে, জিজ্ঞেস করো।'
' আমি বিশ্বাস করি না। নিজের চোখে না দেখলে কিছুই বিশ্বাস হয় না আমার।'
' তোমার বিশ্বাসের জন্য কি আরেকবার কাউকে মেরে দেখাব?'
' কি বললেন আপনি? কাকে মেরেছেন?'
' কথা বাড়িও না। তোমার মতো মেয়ে কিছুই করতে পারবে না। এখান থেকে চলে যাও ভালোয় ভালোয়, না হয় ময়নার মতোই তোমার অবস্থা হবে।'
' আমি যাব না। কি করবেন করে নিন।'
' কাউকে ছাড় দেই না আমি। তোমার ভালোর জন্য বলছি চলে যাও না হয় খারাপ হবে। সুন্দরী মেয়ে বলে ছেড়ে দিচ্ছি, কারণ আবার দেখা হবে।'
লোকটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। অহনা বিরক্ত হয়,
' আপনার হাসি ঠিক আপনার সেই পাকা চুলের মতো বাজে।'
হাসি থামিয়ে লোকটি বলল,' সুন্দরী মেয়েদের গালিতেও শান্তি পাওয়া যায়। তোমার দিকে নজর পড়েছে আমার। এখন চলে যাও, পরে আবার দেখা হবেই হবে। কারণ আমার নজরে পড়েছে। বিদায় সুন্দরী।'
অহনা নাক সিঁটকায়,
' আপনার থেকে গন্ধ আসছে, সরে দাঁড়ান।'
লোকটি চলে যায়। একজন চাকরানী এসে বলল,' এই বাড়িত্তে যেই একবার ঢুকে তারে আর বাইর হইতে দেখি না। তারা সবাই কই যায় কেউ জানে না। বিশেষ করে মাইয়ারা।'
' এসব কি বলছো? মানে কি? আর ঐ লোকটা কে?'
' বাড়ির ছোড ছেলে। গাউড়া পুরা। আপা, আম্নে চইলা যান। বিপদে পড়বেন।'
' আমার চিন্তা করো না। এটা বলো তুমি, ময়নার লাশের চেহারা কি তুমি দেখেছো?'
' না আপা। তারেতো তারাতাড়ি দাফন করা হইছিলো। তার বাপরেও একবার দেখতে দেয়নাই।'
' ঠিক আছে তুমি যাও।'
মেয়েটি চলে যেতেই অহনা গেইটের দিকে পা বাড়ায়। মুহুর্তেই তার পা থেমে যায়। গাছের আড়ালে চলে যায়। একজন লোক ভেতরে ঢুকছে, তাকে চেনে অহনা। কালকে যে লোকটা ছুরি নিয়ে আক্রমন করেছে, এটাই সেই লোক......
চলবে......
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন