১৮.
'আমাকে একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'
মাহতিমের চোখ স্থির হয়ে যায়। উঠে যায় সে, দায়সারাভাবে দাঁড়িয়ে থাকে অহনার সামনে। অহনা পুনরায় বলল,' একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'
' কেন?'
' আমি চাইছি তাই!'
' কিছু চাওয়া অগোচরে থাকা ভালো।'
' ধরো না। একবার শুধু।'
মাহতিম নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। কষ্ট হচ্ছে তার, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দম নেয়,
' আমি দৃশ্যমান হলেই আমার শক্তি কমে যাবে। যে কাজের জন্য এসেছি সেটা অপূর্ণ থেকে যাবে।'
' এতো বাঁধা কেন? তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে?'
' আমি আসতে চাইনি। তুমি ডেকে এনেছো।'
'আমি ডেকে এনেছি? কিন্তু আমিতো কখনোই তোমাকে ডাকিনি, চিনতামও না।'
' কে বলেছিল অর্ণব নামের সেই ছেলেটার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর?'
' আমি তাকে চিনতে পারি নি। দু'মাসের পরিচয়ে তাকে আমার বিশ্বাস করা উচিত হয়নি।'
' এটাই কারণ।'
'ক্ষমা চাইছি।'
মাহতিম অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে রাখে। চোখ তার নত। কিছুতেই অহনার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। গাল বেয়ে তার কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল,
' মানুষ কত সহজে হা*রি*য়ে যায়। যাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি সেও হা*রি*য়ে গেল।'
অহনা নাক টেনে বলে,' তোমার এত কষ্ট কিসের? বলো আমাকে।'
' আমার কোনো কষ্ট নেই। জীবন নিয়েও কোনো আফসোস নেই। শুধু....'
' শুধু কি? এটাই বলবে তো, তুমি একজন ম্যাজিশিয়ান। তুমি ম্যাজিক করে সব করতে পারো। আমি জানি, আমার আগেই মনে হয়েছিল। কি, ঠিক বলছি তো?'
মাহতিম অহনার দিকে চেয়ে থাকে,
' হ্যাঁ, তুমি ঠিক। ঠিক তুমি। আমি একজন ম্যাজিশিয়ান, আমি জা*/দু জানি।'
' তাহলে কষ্ট কিসের? তুমি কেন কাঁদছো? চোখের পানি কখনো মিথ্যে হয় না।'
' আমি বুঝতেই পারছি না, কেন আমি কাঁদছি! কারণ অজানা।'
বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠে অহনার। মাহতিমের কাছে এগিয়ে আসে। অশ্রুসজল চোখজোড়া র/ক্তি/ম হয়ে আছে মাহতিমের। অহনার দিকে হাত বাড়ায়। কাঁধে দুহাত রাখে। অহনার চোখের কোণে জমে থাকা পানির কণা আঙুলের ঘষায় সরিয়ে দেয়,
' কাঁদছো কেন?'
' তুমিওতো কাঁদছো।'
মাহতিম দু হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয়,' কাঁদছি না আমি। তুমি খুব বোকা, বুঝতে পারো না।'
' জ/ড়ি/য়ে ধরো। আমার হাঁসফাঁস লাগছে।'
মাহতিম এক ঝ/ট/কা/য় অহনাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠে অহনা। শক্ত করে মাহতিমের শার্ট খামচে ধরে। ছেড়ে দিলেই বুঝি হারিয়ে যাবে। কেঁদে কেঁদে শার্টের অনেকটা ভিজিয়ে ফেলেছে।
মাহতিম অহনার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া টের পায়। গরম নিঃশ্বাস অনুভব করে। আলতো করে মাথায় চুমু খায়। কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়,
' পা/গ/লী মেয়ে, কান্না শেষ হয়েছে?'
অহনা জ/ড়ি//য়ে ধরে আছে মাহতিমকে। মাহতিম ছাড়াতে চাইলেও সে আরো জোড়ালোভাবে ধরে আছে। অহনা বিরক্ত হয়ে বলল,' এমন অদ্ভুত আচরণ করছো কেন? আর একটু থাকতে দাও।'
' ঘরে যাও। সবাই অপেক্ষা করছে।'
' সবাই ঘুমাচ্ছে।'
' তাহলে তুমি কি করছো?'
' চোখে দেখো না? আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি আগলে রেখেছি।'
' কোনটা তোমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি?'
অহনা মাহতিমের বুকে হাত রেখে বলে,' এটা, এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইলেও দেব না। এর উষ্ণতা থেকে আমি বঞ্চিত হতে চাই না কখনো।'
' তোমার জ্ঞান লোপ পেয়েছে। হুঁশে নেই তুমি। ছাড়ো আমাকে আর ঘরে চলো।'
' আরেকটু!'
মাহতিম সরিয়ে দেয় অহনাকে। বুকের গরম ওম থেকে ছাড় পেতেই অহনার কেমন শীত লেগে উঠে। শরীর তার তেজ হা/রি/য়ে ফেলে। মাহতিম বলল,' কতক্ষণ এভাবে ছিলে মনে আছে?'
অহনা অনুভূতির রো/ষা/ন/ল থেকে বেরিয়ে আসতেই ওর মনে হয়, একটু আগেই জ/ড়ি/য়ে ধরেছিল। ল/জ্জা/য় নুইয়ে যায়। আবেগের বশে কি করে বসল?
দৌড়ে ঘরে চলে যায় অহনা। মাহতিম ভাবতে থাকে, একটু আগে নিজেই এতো কান্ড করল একটু জড়িয়ে ধরার জন্য। আর এখন নিজেই ল//জ্জা পাচ্ছে।
ভালোবাসা সবাইকে কেমন বেহায়া করে দেয়। নি/র্ল/জ্জ করে দেয় নিমেষেই। প্রমময় ছোঁয়া পেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সেটাই হলো অহনার ক্ষেত্রে।
আছরের পর রোস্তম হাজির হয় মোড়ল বাড়ি। বিশাল দৈর্ঘ ও প্রস্থ ব্যাপী বাড়ি। তবে আধুনিক বাড়ি বলা যায়। রোস্তম থমথমে পরিবেশ দেখে পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরপরই প্রবেশ করে।
মোড়ল বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। রোস্তমকে দেখে হেসে বলল,' আসো, আসো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। একটু দেরি করে ফেললে বটে, তবে সমস্যা নেই।'
রোস্তম ক্ষমা চেয়ে নেয়। মোড়ল তাকে বসতে বলে। কিন্তু সে বসে না। মোড়ল অনেক জোরাজুরি করতেই রোস্তম সোফায় বসে। মোড়ল ঘরের দিকে মুখ করে বলে,' অতিথির জন্য নাস্তা নিয়ে আয়।'
রোস্তম থমথম খেয়ে যায়। ভয়েভয়ে বলল,' কর্তা, কেন ডেকেছেন আমাকে? আমি কোনো ভুল করিনি। কিছুদিনের মধ্যেই শহরে চলে যাব, মেয়েটা পড়বে, আমিও পাশে থাকতে পারব।'
' সেকি কথা? মেয়ে আবার চলে যাবে কেন? এবার না হয় একেবারে থেকে যাক। নিজের দেশের মাটি বলে কথা।'
' না কর্তা, মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়ালে আমিও শান্তি পাব।'
নাস্তা এসে যায়। মোড়ল থাকে চা এগিয়ে দেয়। এতো খাতির যত্ন দেখে রোস্তম আরো কাঁচুমাচু হয়ে বসে। মোড়ল আবার বলল,' মেয়ের চিন্তা আর করো না। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।'
' তা কেমন করে হবে? কখন আমার প্রাণও চলে যায়। মেয়েটাকে কোনো কূল করে দিতে পারলেই আমি শান্তি পেতাম।'
' আচ্ছা শুনো, আমার বড় ছেলেকে কেমন লাগে তোমার?'
রোস্তম ভেবে পায় না হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?
' আপনার ছেলেরা হলো হিরে, নজরকাড়া, কার না ভালো লাগে বলুন?'
' আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার কেমন লাগে?'
' ভালোই লাগে, শহর থেকে পড়াশোনা করে আশা ছেলে, এলাকারও উন্নয়ন হবে তাকে দিয়ে।'
' একটা অনুরোধ রাখবে রোস্তম?'
রোস্তম বিনীত হয়ে বলে,' ছি ছি কর্তা, কি বলছেন আপনি? আপনি বললে জীবনটাও দিয়ে দেব। আপনি কেন অনুরোধ করবেন, আপনি আদেশ করবেন।'
' না, এখানে তুমি নিজেকে ছোট করে দেখবে না। এই মুহূর্তে আমি আর তুমি সমান। এটা ভেবেই আমি বলছি কথাটা।'
রোস্তম ঢোক গিলে নেয়,' কি কথা?'
' তোমার মেয়েকে আজ সকালে দেখেই ভালো লেগে গেছে। বড় ছেলে আরিশের জন্য কবে থেকেই মেয়ে দেখছি, মনের মতো কাউকে পাইনি। তোমার মেয়েকে দেখে মনে হলো রুপে, গুনে সে আমার ছেলের জন্য উত্তম। আমি চাই তাদের দুই হাত এক করতে। তোমার কি মতামত? আমি জোর করবো না। জানতে চাই শুধু।'
রোস্তম আনন্দিত হবে নাকি বিষন্ন হবে বুঝতে পারছে না। চুপ করে রইল।
মোড়ল আবার বলল,' আমার ছেলে ভালো, তোমরা এই এলাকায় আছো, কখনো কি তাকে নিয়ে কোনো খা/রা*/প কথা শুনেছো?'
রোস্তম এক গাল হেসে বলল,' আমি ভাবতে পারিনি আপনার আমার মেয়েকে ভালো লেগেছে। আমার মেয়ের সৌভাগ্য এই বাড়িতে বিয়ে হবে। আমি রাজি।'
' আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে তারাতাড়ি তারিখটা ফেলে দেব, কি বলো বেহাই?'
রোস্তম ভেবে বলল,' মেয়েকে একবার কথাটা জানানো জরুরি। যদি....'
' আরে কোনো ব্যাপার না। আর এমন ভ/য়ে ভ*য়ে থাকবে না। মনে করবে আমরা সমান। বেড়াই আমরা, গলায় গলায় ভাব থাকবে। মেয়ের সাথে কথা বলে আমাকে জানাবে। আমি নিজে যাব তোমার মেয়েকে দেখতে বাড়ির মহিলাদের নিয়ে।'
বলেই মোড়ল রোস্তমের কাঁধে হাত রাখল। রোস্তম জোরপূর্বক হাসল। তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
পুরো বিষয়টা খেয়াল করল মাহতিম। সে পাশে থেকেই মোড়ল আর রোস্তমের সব কথা শুনে নিল....
চলবে.....
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন