Ads

https://www.cpmrevenuegate.com/b8yhybmrq8?key=9f4e3679f1c8c81a3529870bf1b4e18f

বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩

Shadow

 Amid the shadowy labyrinth of New York City, Detective Sarah Harper found herself entangled in a web of mystery that would test her resolve like never before. The city's heartbeat echoed through the towering skyscrapers, but beneath the surface, a malevolent force lurked.


It all began with a cryptic message scrawled on the wall of an abandoned warehouse: "The Nightshade Conspiracy Unveiled." Sarah, known for her relentless pursuit of justice, couldn't ignore the ominous nature of those words. The warehouse, its windows shattered like fractured memories, held secrets waiting to be unearthed.


As Sarah delved into the investigation, she discovered a series of seemingly unrelated murders, each victim linked by a single thread – an enigmatic symbol etched into their flesh. The symbol resembled a twisted nightshade flower, casting an eerie foreboding over the crime scenes.


Digging deeper, Sarah unraveled a clandestine society known as "The Nightshade." A cabal operating in the shadows, orchestrating a complex game with the city as its chessboard. The more Sarah uncovered, the murkier the waters became.


Haunted by her own demons, Sarah struggled to distinguish ally from adversary. Her partner, Detective James Lawson, stood by her side, but even he couldn't fathom the depths of the conspiracy that threatened to consume them both.


The Nightshade, it seemed, had an agenda that transcended the boundaries of law and order. Their pursuit of power was relentless, leaving a trail of victims whose lives were intricately connected to the dark underbelly of the city.


As Sarah followed the twisted trail, she found herself entwined in a psychological chess match with the elusive mastermind behind The Nightshade. Cryptic messages arrived at her precinct, each one a move in the deadly game. The city became a labyrinth of deception, and Sarah, a pawn with the weight of justice on her shoulders.


A breakthrough came when she unearthed an old conspiracy involving corrupt officials and a long-buried scandal. The Nightshade, it seemed, was not just a criminal organization but a vengeful force seeking retribution for sins committed in the city's murky past.


The tension escalated as Sarah and James closed in on the elusive leader of The Nightshade. A high-stakes confrontation awaited them in the depths of an abandoned subway station, its tunnels echoing with the whispers of the conspiracy.


The showdown unfolded in a dimly lit chamber adorned with the nightshade symbol. The leader, masked in shadows, revealed a chilling truth – a personal vendetta against those who had betrayed the city. The labyrinthine plot had been a meticulously crafted revenge scheme, and Sarah stood at the epicenter.


In a heart-stopping moment, the leader unveiled a shocking connection between Sarah's past and the conspiracy. The revelation sent tremors through her resolve, but she steeled herself against the emotional onslaught. The game was far from over.


As the confrontation reached its climax, a revelation emerged – The Nightshade's ultimate plan was to expose the city's corrupt underbelly, not through justice, but through chaos. The leader's vendetta was a twisted form of cleansing, and Sarah realized that to save the city, she had to navigate the treacherous path between truth and vendetta.


In a pulse-pounding finale, Sarah and James thwarted The Nightshade's catastrophic endgame. The leader, unmasked and defeated, left behind a city forever changed. As the dawn broke over the skyline, the labyrinth of New York City revealed its scars, but Sarah emerged from the shadows, a beacon of justice.


The nightshade symbol, once a mark of terror, faded into obscurity. Sarah, forever marked by the harrowing journey, continued to patrol the city's streets. The echoes of the conspiracy lingered, a cautionary tale woven into the fabric of the metropolis.


And so, the labyrinth endured, its secrets buried deep, waiting for the next detective to navigate its twists and turns. In the heart of the city that never slept, Sarah Harper stood as a testament to the resilience of justice, a guardian against the shadows that threatened to consume the fragile balance between truth and vendetta.

Triller Unveils Magical Tale

 In the vibrant town of Harmonyville, where laughter echoed through the cobblestone streets, lived a peculiar character named Oliver Triller. He was an enigmatic storyteller, known for spinning tales that transported listeners to fantastical realms. Triller, with his weathered fedora and a twinkle in his eye, held court every Saturday at the town square.


One crisp autumn day, as the leaves danced to an invisible melody, a curious crowd gathered around Triller. He began weaving a story that transcended the boundaries of reality.


"Once upon a time," Triller began, "there existed a hidden world beyond the clouds. A world where dreams took shape and colors painted the sky with stories untold." The townspeople leaned in, captivated by his words.


In this mystical realm, Triller continued, lived a society of talking animals who possessed the secret to eternal happiness. A mischievous rabbit named Whiskerfluff held the key, a magical crystal that could fulfill the deepest desires of those who found it.


As the narrative unfolded, the crowd was transported into an imaginary landscape, a place where whimsical creatures and enchanted forests came to life. Triller's words painted pictures in their minds, and the air was filled with anticipation.


Whiskerfluff's journey to discover the crystal became a metaphor for the townspeople's own quests for fulfillment. The listeners found themselves identifying with the characters, each hoping to unlock their own version of the magical crystal.


In the heart of the story, an unexpected twist emerged. The once-trusty crystal shattered, releasing a burst of dazzling light that scattered across the mystical world. Triller's storytelling prowess brought forth gasps from the audience, who were now hanging on to every word.


The shattered crystal, it turned out, had transformed into a constellation of stars, each representing a unique aspiration. Whiskerfluff and his newfound friends embarked on a quest to collect these stars, realizing that true happiness was not in possessing a single magical object, but in the shared journey and connections forged along the way.


The townspeople listened intently, the magic of Triller's tale leaving an indelible mark on their hearts. As the story concluded, the once-skeptical citizens found themselves inspired to embark on their own quests for happiness, understanding that the journey itself held the key to fulfillment.


Triller tipped his hat to the mesmerized crowd, and the town square erupted in applause. His stories had the power to ignite imagination and kindle the flames of hope within the hearts of Harmonyville's residents.


And so, as the sun dipped below the horizon, Harmonyville embraced the magic of Triller's storytelling, carrying the lessons of the fantastical journey into their everyday lives. The air was filled with a renewed sense of wonder, and the townspeople went home with a sparkle in their eyes, ready to create their own stories and share them with the world.

ছায়া_মানব_পর্ব-২০


২০.

অহনার মুখ থেকে অস্ফুট কিছু শব্দ বের হচ্ছে শুধু। ভালো করে খেয়াল করে দেখল, এটা মতি। অহনা ছাড়ানোর চেষ্টা করে সফল হয়। হাতে কামড় বসাতেই সে ছেড়ে দেয়। পরক্ষণেই অহনার দিকে এগিয়ে আসে,' কেন করলে এমনটা?'


অহনা নিজেকে সামলে বলে,' আমি কিছুই করিনি। এভাবে আমাকে ধরার সাহস করে দিল আপনাকে?'


' আমি মানতে পারব না কোনোমতেই। তুমি এই বিয়ে করবে না। আমি বার বার বলছি এই বিয়ে করবে না।'


' আমি আপনার কথার গোলাম ন‌ই। আপনার যা ইচ্ছা করে নেন।'


' আমি তোমাকে ভালোবাসি, বিশ্বাস করো!'


অহনা অবাক হয়ে যায়। কথাটা তার কাছে ভালো লাগেনি,

' কি বললেন?'


' আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।'


' আমি বাসি না। এসব কি শুরু করলেন?'


' ভালোবাসি আমি তোমাকে, সেদিন দেখার পর থেকেই। আমি ভেবেছি বাড়িতে বিয়ের কথা বলব, কিন্তু তার আগেই কি করে এসব ঘটে গেল। আমি আগেই ভেবেছি বাবাকে বলব, কিন্তু তোমাকে আকাশে উড়তে দেখে আমি ভেবেছি ভূতে ধরেছে, আগে সুস্থ করব তারপর বিয়ে করব। কিন্তু এর আগেই এতসব ঘটে গেল। আমি এখন কি করব অহনা? বলে দাও।'


' কিছু করার নেই। আপনার বাবা বিয়েটা ঠিক করেছে। আর এখানে আমার বাবার সম্মানের প্রশ্ন, আমি কিছু করতে পারব না।'


' তুমি পারবে। তুমি ছাড়া আর কেউ ভরসা নেই। তুমি তোমার বাবাকে বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো, বিয়ে করতে চাও।'


' কিন্তু আমি মিথ্যে কেন বলব? পারব  না আমি।'


' পারতে হবে তোমাকে। আমি কিছুতেই ভাইয়ের সাথে তোমাকে মেনে নিতে পারব না। আমার ভাইটা একদম বোকা, তোমার সাথে তাকে মানাবে না।'


'কেন মানাবে না। আপনাকে যদি গোয়ালের গাভীর সাথে মানায় তাহলে উনাকে কেন আমার সাথে মানাবে না?'


' একবার বোঝার চেষ্টা করো।'


'কিছূ চেষ্টা করব না।'


মতি এগিয়ে এসে অহনার হাত চেপে ধরে,

'এমন করো না। আমি ভালো হয়ে যাব একদম। আর কখনো কোনো অন্যায় কাজ করব না। তোমাকে বিয়ে করতে পারলে আর কিছু চাই না।'


' নিজের সীমার মধ্যে থাকুন। আমাকে কে বিয়ে করল না করল, এতে আমার কিছু যায় আসে না। চলে যান এখান থেকে, না হয় বাবাকে ডাকব।'


' তার মানে তুমি ভাইকেও বিয়ে করতে চাও না। ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি।'


মতি চলে যায়। অহনা তার কপালে ভালোবাসা হারানোর ভাঁজ দেখতে পেল। নিজেকে নিজে শুধালো,' এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? কেন হচ্ছে? আমি কেন বার বার এত এত প্রশ্নের সম্মুখীন হ‌ই? কেন আমার সাথেই সব অনিয়ম হয়?'


মাহতিম বন্দরের একটি জাহাজে উঠে যায়। সেখানে থেকে সোজা নরসিংদীতে ফিরে আসে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছে ক্যাপ্টেন নিমো এখানেই থাকে। তার সাথে দেখা করাটা জরুরি ছিল, তাই এসেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ক্যাপ্টেন সেখান থেকে চলে গেছে দুইদিন আগেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না।


মাহতিম আবার ফিরে আসে। তার প্রিয় বন্ধু নাজের কাছে যায়। অল্প বয়সী যুবতী নাজ। নিজের ঘরে বসে সে ফোনে কথা বলছিল, এমন সময় আগমন ঘটে মাহতিমের। মাহতিম তার পাশে গিয়ে বলল,' নাজ, আমি এসেছি।'


চমকে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে নাজ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করতে যাবে, তার আগেই মাহতিম তার মুখ চেপে ধরে,' দোহাই লাগে, কথা বলিস না, সবাই জেনে যাবে।'


' তুমি? তুমি এখানে কি করে? এটা কিভাবে সম্ভব?'


' সব পরে বলছি, এখন চিৎকার করিস না।'


মাহতিম আস্তে আস্তে নাজের মুখ থেকে তার হাত সরিয়ে আনে,

'‌তোর সাহায্য দরকার আমার!'


' কিসের সাহায্য? আর তুই এতদিন দেখা করিসনি কেন?আমিতো ভাবতেই পারিনি তোকে আবার দেখতে পাব। ঠিক কি হয়েছিল তোর সাথে?'


' সে অনেক লম্বা কাহিনী। তুই আগে আমাকে সাহায্য কর।'


' অবশ্যই! তোকে সাহায্য করব নাতো কাকে করব?‌ কি করতে হবে বল, আমি তোকে সাহায্য করব।'


মাহতিমের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। নাজের প্রতি তার ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়,

' আমি জানতাম তুই আমাকে না করবি না। তোকে ছাড়া এখানে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। এবার আমার টার্গেট ফিলাপ হবে।'


' সিউর মাই ফ্রেন্ড। তোকেতো আমি শেষ পর্যন্ত সাহায্য করব।'


' এখন বল ক্যাপ্টেন নিমো কোথায় আছে?'


নাজের চোখে-মুখে চিন্তার রেখা পড়ে। কিছু ভাবছে সে। মাহতিম আবার বলল,' ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলা দরকার। তিনি আমার সব বিষয় জানেন। ওনার সাহায্য লাগবে আমার।'


' ক্যাপ্টেন আজ দু'দিন নিখোঁজ। কেউ জানে না তিনি কোথায়!'


' ঠিক আছে আমি খুঁজে বের করব। তুই শুধু বাইরের দিকটা নজরে রাখ, তাহলেই হবে।'


মাহতিম চলে যেতেই নাজ কল করে তার সঙ্গী রিভাকে, 

' রিভা শুনতে পাচ্ছ?'


'হ্যাঁ বলো।'


' মাহতিম ফিরে এসেছে।'


' হোয়াট? তোমার কি মাথা ঠিক আছে? ভুলভাল বকছো কেন?'


' আমার মাথা একদম ঠিক আছে। একটু আগে মাহতিমের সাথে আমার দেখা হলো। সে আমাকে বলল,  তাকে সাহায্য করতে।'


' তুমি করবে তাকে সাহায্য?'


' হ্যাঁ, আমি তাকে সাহায্য করব।'


' বিষয়টা কি সবাইকে জানাবো?'


' এখন না। সময় হলে আমি জানাবো। আমার আরো কিছু খোঁজ নেওয়া বাকি।'


নাজ কল রেখে শুয়ে পড়ে। অনেক প্রশ্ন মাথায় রয়ে যায়।


সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই অহনা তার বাবার কাছে যায়,

' বাবা আমি বিয়েটা করব।'


রোস্তমের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে আসে। হ্যারি, টিকু, রুমি, ইরা 'হুররে' বলে উঠে। অহনা সিদ্ধান্ত নেয় ময়নাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। তাই ময়নার বাবাকে খবর জানায় আসতে।


খবর জানাতে দেরি হলো, কিন্তু তার আসতে দেরি হলো না। এসেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। অহনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইলে রোস্তম বাঁধা দেয়,

'ভাই, মেয়েটা এই কয়দিনে মন জয় করে নিয়েছে। এখন হঠাৎ চলে গেলে আমরা সবাই কষ্ট পাব। কিছুদিন পর আমার মেয়ের বিয়ে, বিয়ের পর‌ই না হয় যাবে।'


' তাহলেতো ভালোই হলো। ঠিক আছে তবে।'


' আপনিও থেকে যান। কয়টা দিনের‌ই ব্যাপার শুধু। তারপর মেয়ে নিয়ে চলে যাবেন।'


ময়নার বাপ আর অমত করে না। তিনিও থেকে যান।

রোস্তম আরেক দফা মোড়ল বাড়ি গিয়ে জানিয়ে আসেন, মেয়ে তার বিয়েতে রাজী হয়ে গেছে। মোড়ল‌ও খুশি হয়। বাড়ির মহিলাদের ডেকে বলে, 'কাল‌ই তাহলে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ছেলেকেও নিয়ে যাব। বিয়ে হবে ছেলে-মেয়ের, তাদের দেখা হ‌ওয়া, কথা হ‌ওয়াটা জরুরি।'


রোস্তম চলে আসে বাড়িতে। এখন তার অনেক কাজ। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। বাজারে গিয়ে নিজের হাতে বাহারী খরচ করে আনলেন। এলাকার অনেক মহিলা সাহায্য করতে আসল। মোড়লের বাড়ির ব‌উ হবে অহনা, সেটা ভেবেই সবাই হিংসেয় জ্বলছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না, উপরে উপরে ভালো সাজতে সবাই ইচ্ছুক।


অহনার মনে খারাপ প্রচুর। বার বার‌ মাহতিমের কথা মনে পড়ছে। কয়েকদিনেই কেমন আপন হয়ে গেল লোকটা, আর এখন কাছে নেই। হাঁসফাঁস লাগছে অহনার। জানালায় চোখ দিতেই পুনরায় মতিকে দেখতে পায়। একটা লোকের সাথে কথা বলছে সে। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কোনো কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। অহনা বিরক্ত হয়‌ মতিকে দেখে। মনে মনে আওড়ালো,' এই উটকো ঝামেলা আবার কি করতে আসছে কে জানে? সতর্ক থাকতে হবে আমাকে.....



চলবে.....

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৫


 


আমাকে কোলে তুলে নিয়ে অভ্র ঘরের বাইরে পা রাখতেই ফস করে কালো কি একটা দৌড়ে গেল। অভ্র ব্যালেন্স হারিয়ে আমাকে নিয়ে প্রায় পড়ে যেতে যেতে ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেল।


বাইরে চাঁদের আলোয় আলোকিত তবুও দ্রুত বেগে দৌড়ে যাবার কারণে সেটা কি ছিল বোঝা যায়নি। 


অভ্র এবার আমাকে নিয়ে পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য দুই পা সামনে এগোতেই থমকে দাড়ালো। অভ্র যেটা দেখছে আমিও তাই দেখছি। রজনীগন্ধার ঝোপের ভেতর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে জ্বলন্ত চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোতের ধারা বয়ে গেল।


অভ্র আমাকে ধীরে ধীরে কোল থেকে নামিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফ্লাশলাইট জ্বেলে রজনীগন্ধার ঝোপের দিকে আলো ফেলে একটা ঢিল ছুড়ে মারতেই দেখলাম একটা কালো বিড়াল বিশ্রী সুরে মিঁয়াও ডেকে দৌড়ে পালালো। 


অভ্র আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো– বুঝলে এবার, বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘে খায় বেশি। ভয়ের কারণ বিশ্লেষন না করে ভয় পাওয়া বোকামি। 


আমরা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাচ্ছি পুকুরের দিকে। রক্তজবার বাগানটা অতিক্রম করে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে রক্তজবার বাগানে জোরেসোরে দোল দিয়ে যেতেই আচানক রক্তজবার বাগানে আলোকিত হয়ে উঠলো জোনাকি পোকার আলোয়।


আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি রক্তজবার ঝোপের দিকে, সব কিছুই স্বাভাবিক আবার অস্বাভাবিক। তারচে বেশি অস্বাভাবিক সুন্দর লাগছে ডালে ডালে পাতায় পাতায় জোনাকিরা বসে ছন্দে ছন্দে যে আলো জ্বালছে। 


আমি পুরোপুরি বিমোহিত হয়ে অপলক তাকিয়ে উপভোগ করছি রাতের প্রকৃতির এই আজব আয়োজন। 


হঠাৎ দেখলাম একটা রক্তজবা ফুল বোটা থেকে খসে টুপ করে মাটিতে পড়লো। বাতাসে আবার ফুলটা গড়াগড়ি খেতে খেতে আমার প্রায় সামনে চলে এসেছে।


আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো ফুলটা তুলে খোঁপায় গোঁজার। দুই পা এগিয়ে ঝুকে পড়ে ফুলটা তুলবো এমন সময় অভ্র পেছন থেকে আমাকে টেনে তুলে বললো– কি করছো ওতে ধুলো মেখে গেছে তো।


আবার একটা দমকা হাওয়ায় ফুলটা দূরে কোথাও উড়ে গেল। 


মাথার ওপরে রূপালী চাঁদ, চাঁদের স্নিগ্ধ আলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে পৃথিবীতে আর খোলা আকাশের নিচে প্রিয়তমার হাতে হাত রেখে সে আলো গায়ে মেখে আমি যেন এখন কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করছি। 


ধীরে ধীরে আমরা শানবাঁধানো ঘাটে এসে বসলাম। পুকুরের জল চাঁদের আলো মেখে চিকচিক করছে। বাতাসে দোল দিয়ে যে মৃদু ঢেউ তুলছে সেই ঢেউয়ে পুকুরের পদ্মফুল যেন হেলেদুলে নাচছে। 


আমি অভ্রর কাঁধে মাথা রেখে বললাম– একটা কবিতা শোনাবে? 


অভ্র মিষ্টি হেসে আমার কপালে চুমু খেয়ে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কবিতা শুরু করলো–


আমি তোমার হাতে হাত রেখে হেটে যেতে চাই দূর হতে বহুদূরে, বলতে গেলে সেখানে, যেখানে জীবনের সীমারেখা টানা আছে। যদি জীবন সীমারেখা টেনে দেয় তবে বিধাতার কাছে ওপারের জনমেও তোমাকেই চেয়ে নেবো।


সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নামুক, অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো নিস্তব্ধ পৃথিবী জানুক আমি তোমার হাত ধরে হেটে চলেছি গন্তব্যহীন পথে। তেপান্তরের মাঠ পেড়িয়ে ঘন গভীর বন পেড়িয়ে যেতে যেতে হোক রাত গভীর। আমরা ক্ষানিকটা জিরিয়ে নেবো ঝোপের পাশের কোনো দূর্বাঘাসের চাদরের ওপর বসে, অন্ধকারে জোনাকিপোকার আলোর মিছিলে হারাবো দুজন। আমাদের এ যাত্রার সাক্ষী হবে জোনাক পোকা, সাক্ষী হবে ঝোপের ভেতর থেকে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাওয়া রাতজাগা পাখিরা। সাক্ষী হবে রাতের আধার আর সেই পথ, যে পথে হেটে এসেছি এবং হেটে যাবো বহুদূর। 

চলতে চলতে যদি ক্লান্তি এসে তোমার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায় ভেবনা এই বুঝি চলার শেষ। কোলে তুলে নিয়ে আবারও শুরু হবে পথচলা। ফেলে যাবো বলে কাছে আসিনি, ফেলে যাবো বলে ভালোবাসিনি। মানুষটা যখন অস্তিত্বে মিসে যায় তখন তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। তুমি আমার সেই অস্তিত্বে মিসে যাওয়া ভালোবাসা, আমার প্রেম। জীবনের পরেও যদি নতুন কোনো জীবন পাই, সেই জীবনেও আমি তোমাকেই চাই।


কবিতা শেষে অভ্র চুপ করে আছে, আর আমি এখনও সেই কবিতার ঘোরের মধ্যেে ঘুরপাক খাচ্ছি। একটা মানুষ এতটাও ভালোবাসতে পারে?


আনন্দে আমার চোখে জল টলমল করে উঠলো, ক্ষনিকের এই জীবনটা অভ্রকে পেয়ে পরিপূর্ণ আমার। এরকম কাউকে জীবনসঙ্গী করে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের বিষয়। এবং প্রতিক্ষণ নিজেকে বড়ো ভাগ্যবতী মনে হয় আমার।


অভ্র আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখে জল দেখে অবাক হয়ে দুই হাত দিয়ে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো– কবিতা শুনিয়ে যদি মুখের হাসির বদলে চোখের জল দেখতে হয়, তাহলে আমি আর কোনদিন কবিতা শোনাবোনা বাবা।


আমি হেসেফেলে অভ্রর নাক টিপে দিয়ে বললাম– এটা আনন্দের হাদারাম, আনন্দে চোখে জল এসেছে। 


অভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো– জল খালে ফেলে ঠোঁটে হাসি ফোটাও, তোমার মায়াবী হাসি আমার প্রাণকে আরও সতেজ করে তোলে প্রতিটি মুহূর্ত।


পুকুরের ঠিক ওপারে পাড় ঘেঁষে কয়েকটা পদ্মফুল। অভ্র উঠে দাড়িয়ে বললো– একটা পদ্মফুল তুলে আনি তোমার খোঁপায় গুঁজে দেবো। 


কথা শেষে অভ্র এগিয়ে গেল। 


হঠাৎ করে দমকা হাওয়া এসে আমাকে ছুয়ে যেতেই শরীর একটা ঝাঁকুনি খেয়ে শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো।


এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি বারবার অভ্রকে বলতে চেয়েও পারিনি কারণ যদি ভুল বুঝে দূরে সরে যায়। আমি অভ্রকে হারিয়ে বাঁচতে পারবোনা।


এই সমস্যার কারণেই আজ পর্যন্ত অভ্রকে একান্তে কাছে আসতে দেইনি। তবে আমি যে চুপচাপ আছি তা-ও নয়। 


ছোটবেলায় সেই হুজুর বলেছিল আমার ফুলসজ্জার রাত হবে আমার স্বামীর জীবনের শেষ রাত। তার মানে অশুভ শক্তি আমার স্বামীকে মেরে ফেলবে। যদি তাই হয় তবে হুজুর আমাকে যে তাবিজ দিয়েছিল সেই তাবিজের কারণে অশুভ শক্তি আমাকে স্পর্শ করতে না পারলে অভ্রকেও ওরকম একটা তাবিজ দিলেই হয়। তাহলে তো অশুভ শক্তি অভ্ররও কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা। এ-সব ভেবেই মায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে ইতিমধ্যে আলাপ করেছি এবং মা বলেছে আগামীকাল সেই হুজুরকে নিয়ে আসবে আমাদের এখানে। 


এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ঘরের জানালার পর্দায় চোখ পড়তেই ভয়ে আমার শরীর অবশ হয়ে গেল যেন। জানালার পর্দায় ঘরের ভেতর থেকে পড়া একটা জীবন্ত ছায়া দেখে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর কেউ হাঁটাচলা করছে। কিন্তু আমি আর অভ্র ছাড়া তো এ বাড়িতে তৃতীয় কেউ নেই! 


ঝপাৎ করে পানিতে কিছু একটা পড়ার শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম পদ্মফুল তুলতে গিয়ে অভ্র পানিতে পড়ে গেছে। 


দৌড়ে গিয়ে অভ্রকে টেনে তুলে বললাম– এসব পাগলামি কে করতে বলেছে তোমায়, চলো ঘরে চলো।


অভ্র মিষ্টি হেসে একটা পদ্মফুল আমার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে বললো– কিছু পাগলামি স্মৃতি থাকতে হয় জীবনে, যেগুলো মৃত্যুর আগপর্যন্ত জীবন্ত থেকে যায় মস্তিষ্কে।


ঘরে এসে অভ্রর পোশাক চেঞ্জ করা হলে আমরা শুয়ে পড়লাম। 


রাত গভীর।


অভ্র বললো আমার ঠান্ডা লাগছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো আমায়। আমি অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। 


ধীরে ধীরে আমার শরীরে অভ্রর স্পর্শে কেমন একটা অনুভূতির আগমন ঘটছে। নিশ্চই অভ্র ইচ্ছে করে এরকম করছে। 


আমি অভ্রকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললাম– এই যে মিস্টার হাবভাব তো সুবিধার মনে হচ্ছেনা। 


অভ্র হেসেফেলে– হাবভাব অসুবিধারও কিছু নয় মিস, আমরা স্বামী স্ত্রী– বলে এক টানে আমাকে বুকে নিয়ে আমি কিছু বলার আগেই আমার ঠোঁটে ঠোঁট ডোবালো। এই প্রথম, এমন স্পর্শে আমি কেমন থমকে গেলাম। অভ্রর এই আদর ফিরিয়ে দেবার কোনো উপায় নেই আমার কাছে। আমার দেহ মন অভ্রর স্পর্শ ও আদরে বশিভূত হয়ে অন্যরকম এক সুখের অনুভবে মেতে উঠলো। 


আজ আর ফেরাতে পারিনি অভ্রকে। 


স্বামী স্ত্রীর এই একান্ত সময় পার হবার পরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি আমি, শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল অভ্রর ভয়ংকর চিৎকারে...


চলবে...

রবিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৪



আয়নায় তাকাতেই এক পলকের জন্য আমার ঠিক পেছনে ভয়ঙ্কর একটা মুখচ্ছবি দেখে আঁতকে উঠে একনজর অভ্রর দিকে তাকিয়ে আবার আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম না কেউ তো নেই।


আমাকে বিচলিত দেখে অভ্র জিজ্ঞেস করলো– কি হয়েছে? 


আমি মিথ্যা হাসি হেসে বললাম– না কিছু হয়নি।


রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। 


সারা বিকেল ঘুরে শপিং করে ফিরতে রাত হলো। 


দুজনেই ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে টিভি দেখছি। অভ্র বললো– বউয়ের হাতের এককাপ চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। 


আমি উঠে কিচেনে চলে এলাম। গ্যাসের চুলোয় ছোট পাতিল বসিয়ে পানি ঢেকে চুলোয় আগুন ধরিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই লাফিয়ে উঠলাম আমি। অভ্র কখন এসে দাড়িয়েছিল টেরই পাইনি। 


অভ্র মুচকি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে কয়েকটি চুমু খেয়ে বললো– ভীতু একটা। 


আমি পুরো অবাক, অভ্র এভাবে কখনও ঘাড়ে চুমু খায়নি এর আগে কোনদিন।


আমি বললাম– বউকে আদর করা শেখার নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হলে নাকি মিস্টার জামাই?


অভ্র মুচকি হেসে বললো– এমন বউ থাকলে নতুন নতুন আদর আবিষ্কার করতে কোথাও যেতে হয়না, মন থেকে এসে যায়। 


– বাব্বাহ কত্ত রোমান্টিক আমার জামাই – বলে আমি ঘুরে দাড়িয়ে গ্যাসের পাওয়ার আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে অভ্রকে বললাম– এখানে দাড়াও আমি ড্রইং রুম থেকে মোবাইলটা নিয়ে আসছি। 


অভ্রকে কিচেনে রেখে আমি ড্রইং রুমে এসে ভীষণ শক খেলাম। অভ্র তো ড্রইং রুমে বসেই টিভি দেখছে, যেখানে দেখে গিয়েছিলাম সেখানেই সেভাবে বসে আছে। 


আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কিচেনে যে অভ্র ছিল তাহলে সে কে? আমার আগেই বা কীভাবে আবার ড্রইং রুমে আসবে? দৌড়ে আসতে হলেও তো আমার পাশ কাটিয়ে আসতে হবে।


আমার হার্টবিট এতটাই বেড়ে চলেছে যেন এক্ষুনি ফেটে যাবে। গলা শুকিয়ে কথা বলার অবস্থা নেই। শরীরটা কেমন কাঁপছে। 


অভ্র আমার দিকে তাকিয়ে বললো– কি ব্যাপার কি হয়েছে তোমার?


আমি নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে অভ্রকে জিজ্ঞেস করলাম– আমি কিচেনে যাবার পরে থেকে তুমি এখানেই ছিলে?


অভ্র উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– হ্যা এখানেই ছিলাম তোমার অপেক্ষায়, বউ চা নিয়ে ফিরবে তারপর আমি খাবো সেই অপেক্ষায়। 


আমার কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে অভ্র আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে বেডরুমে যেতে যেতে বললো– তোমার শরীরটা মনে হয় দূর্বল, এখন আর কিচ্ছু করতে হবেনা চলো ঘুমাবো।


আমাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে অভ্র লাইট অফ করার জন্য সুইচ টিপবে এমন সময় মনে পড়লো চুলোয় তো পানি গরম হচ্ছে, চুলা নেভানো হয়নি তখন। 


আমি উঠে বসে বললাম– দাড়াও আমার কিচেনে যেতে হবে অভ্র। 


অভ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো– আবার কেন? 


বললাম– চুলো নেভানো হয়নি এবং কিচেনের লাইটও অফ করা হয়নি। 


– তোমার কষ্ট করে যেতে হবেনা, আমি যাচ্ছি – বলে অভ্র রুম থেকে বেরিয়ে গেল।


শরীরটা একদম ভারী লাগছে। রুম থেকে অভ্র বেরিয়ে যাবার সময় দরজা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে গিয়েছে। হঠাৎ দরজাটা মৃদু আওয়াজ করে অনেকখানি খুলে গেল। বুকশেলফের ওপর থেকে ফুলদানিটা ঠাস করে নিচে পড়তেই ভয়ে আমার শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো।


জানালা বন্ধ থাকায় ঘরে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও বাতাসে জানালার পর্দা সেরে গিয়ে আবার স্ব স্থানে আসলো। রুমের দরজাটা মৃদু আওয়াজ করে আবার একাএকা বন্ধ হয়ে গেল।


দরজার ওপাশ থেকে অভ্র দুষ্টুমি করছেনা তো! চেক করার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠে পা টিপে টিপে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ক্যাচ করে দরজা খুলে যেতেই আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, অভ্র রুমে ঢুকে অবাক হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– হঠাৎ কি হলো তোমার, এমন ভয় ভয় কেন করছো?


– এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাড়িয়ে তুমি দরজা খুলছিলে এবং বন্ধ করছিলে – আমি কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম। 


অভ্র অবাক হয়ে বললো– আমি এমন কেন করতে যাবো? আমি তো এই কিচেন থেকে আসলাম। 


কথা শেষ করে  আমার হাত ধরে টেনে এনে খাটে বসিয়ে অভ্র আমার পাশে বসে বললো– ইদানীং তুমি ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছো, কোন কারনে কি তোমার মন খারাপ? অথবা কোনো দুশ্চিন্তা থাকলে আমায় বলো।


– আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি অভ্র – আমি বললাম। 


অভ্র বললো– তুমি নিজেই চুলা এবং কিচেনের লাইট অফ করে এসে বললে যে ওসব বন্ধ করা হয়নি, এসব কি তোমার অস্বাভাবিক মনে হয়না? আগে তো তুমি এমন ছিলেনা।


অভ্রর কথা শুনে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। আমিতো চুলা নিভাইনি এবং লাইটও অফ করিনি, তাহলে এসব কীভাবে হলো। 


আর এতদিন তো সবকিছু ঠিকঠাক ছিল হঠাৎ আজই কেন এসব অদ্ভুতুরে কাণ্ডকীর্তির মাত্রা বেড়ে গেল। 


বারবার আমার মনে হচ্ছে কি যেন একটা নেই আমার কাছে। কিন্তু এসব পরে, আগে অভ্রকে কিছু একটা বলে বুঝ দিতে হবে।


আস্তে করে অভ্রর কাঁধে মাথা রেখে বললাম– আসলে কেমন একটা হাঁপিয়ে উঠেছি অভ্র, হঠাৎ করে মা বাবাকে ছেড়ে আলাদা থাকছি, যখন মনে পড়ে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। তবুও ব্যপার না, আমার তুমি এবং তোমার যত্ন ও ভালোবাসা হলেই চলবে। 


অভ্র আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো– আমি সবই বুঝি, এবং চেষ্টা করবো খুব জলদি আবার আমরা সবাই একত্র হবার।


রুমের লাইট অফ করে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি, অভ্র আমাকে তার বুকে পরম আদরে শিশুর মতো করে জড়িয়ে ধরে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। 


এভাবে চুপচাপ দীর্ঘ সময়। আমি চোখ বন্ধ করে আছি আর অভ্র আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। 


ধীরে ধীরে রুমের ভেতর একটা দুর্গন্ধ তীব্র হতে লাগলো। অভ্র মনে করেছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।অভ্র ধীরে ধীরে উঠে বসলো। বোঝার চেষ্টা করছে দুর্গন্ধটা কোথা থেকে আসছে। 


আমি চোখ খুলে জানালার দিকে তাকালাম। মৃদু বাতাসে জানালার পর্দা দুলতে দুলতে হঠাৎ অনেকখানি সরে যেতেই আমি জানালার স্বচ্ছ কাচের ওপাশে ভয়ঙ্কর সেই বিশ্রী মুখটা দেখেই ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কি ভয়ংকর সেই মুখ আর কি ভয়ঙ্কর তার চাহনি। চোখদুটো যেন জ্বলন্ত আগুনের গোলক।


আমি পুনরায় চোখ মেলে তাকানোর আগেই জানালার পর্দা আবার স্ব স্থানে এসেছে। তাই চোখ খুলে আর জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারলাম না।


অভ্র উঠে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে আবার খাটে এসে বললো– কেমন একটা বিশ্রী দুর্গন্ধ, পেয়েছো তুমি? 


আমি ঘুম ঘুম ভান করে উঠে বসে বললাম– কৈ না তো।


অভ্র হিসাব মেলাচ্ছে কিসের দুর্গন্ধ হতে পারে। আর আমি ভাবছি আজ হঠাৎ করে কেন এসব হচ্ছে। আর বারবার মনে হচ্ছে কিছু একটা আমার কাছে নেই। 


হঠাৎ গলায় হাত দিতেই চমকে গেলাম! ছোটবেলায় হুজুরের দেয়া সেই তাবিজটা কোথায় গেল আমার গলা থেকে। 


তাহলে কি গলার হার খোলার সময় হারের সঙ্গে তাবিজটাও খুলে রেখেছি?! 


উঠে গিয়ে আলমারি খুলতেই প্রাণে পানি ফিরে পেলাম। তাবিজটা হারের সঙ্গে পেচিয়ে আছে। তাবিজটা গলায় পরে লাইট অফ করে এসে অভ্রকে টেনে শুইয়ে ওর গলা ধরে শুয়ে পড়লাম।


তারপরে আর তেমন কোনকিছু টের পাইনি, এক ঘুমে সকাল। 


এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল সুন্দর ভাবে। 


এই কদিনে অভ্রও আর আমার একান্ত কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেনি।


আজ ভরা পূর্ণিমা রাত, চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় স্বর্গীয় রূপ ধারণ করেছে পৃথিবী। পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিফলন যেন হাত ইশারা করে ডাকছে আমায়। এমন রাতে নিজেকে ঘরে আটকে রাখা যে দায়।


আমাকে জানালার পাশে দাড়িয়ে আনমনে আকাশ পানে চেয়ে থাকতে দেখে অভ্র পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো– প্রকৃতির এই মায়াবী রূপের সবটুকু উপভোগ করতে চাইলে ঘর থেকে বের হতে হবে তো। চলো পুকুর ঘাটে গিয়ে বসি।


আমি আগেপিছে ভাবার আর অবকাশ পেলামনা, অভ্রর এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। অভ্র আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ালো।


কিন্তু আজকের রাতটা যে সর্বনাশের রাত হবে সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারিনি...


চলবে

বৃহস্পতিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৯

 

১৯.

মাহতিম ফিরে আসতেই অহনা তাকে ডাকে। কিছুটা আড়ালে নিয়ে প্রশ্ন করে,' কোথায় ছিলে তুমি? অনেকক্ষণ দেখিনি।'


মাহতিমের চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। অহনা তার চোখে চোখ রেখে বলল,' কি হয়েছে? আবার কি হলো? কাঁদছো কেন?'


' কিছু হয়নি তো। আমাকে যেতে হবে।'


' এই ঘর সন্ধ্যায় কোথায় যাবে?'


' কাজ আছে। যেতেই হবে।'


' আমাকে বলো কি কাজ! আমিও যাব তোমার সাথে।'


'না, কাজটা একান্ত‌ই আমার, আমাকেই যেতে হবে। এই র/হ/স্য শেষ দিতে হবে। খুব তারাতাড়ি সব কিছু থেকে মুক্ত হ‌ওয়া প্রয়োজন।'


' কিসের র/হ/স্য, কি বলছ তুমি? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। বুঝিয়ে বলো।'


মাহতিম ওর কাঁধে হাত রাখে,' এইটুকু মনে রাখো, আমার দুটো কাজ, একটা জুড়ে তুমি অন্যটা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি চাই না কেউ জানুক সেটা।'


' আমাকেও বলবে না?‌ কি এমন কথা যেটা আমাকে বলা যাবে না?'


' ভরসা রাখো। আমাকে এখন যেতে হবে, বড় বি/প/দ হয়ে যাবে না গেলে।'


মাহতিম চলে যেতে চাইলেই অহনা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,' তুমি এভাবে যেতে পারো না।'


' বোঝার চেষ্টা করো, আমি চাই না আমার ছোট্ট ভুলের জন্য অগণিত প্রাণ চলে যাক। আমাকে যেতেই হবে।'


' এতে কিছু জানি না আমি, আমাকে সব বলো আগে। তারপর যেতে দেব।'


' সময় হলে বলব, এখন সঠিক সময় না আহি। আর একটা কথা, সন্ধ্যায় তোমার বাবাকে হন্তদন্ত হয়ে বেরুতে দেখে পিছু নিয়েছিলাম।'


অহনা অবাক হয়ে বলল,' কেন গেল?'


' মোড়লের ছেলের সাথে তোমার বিয়ে পাকা করে এসেছে তোমার বাবা। তুমি অনেক লাকি, মোড়ল তোমাকে পছন্দ করেছে।'


' কিইই? কি বলছ এসব? তুমি মজা করছ নাতো?'


' আমি কেন মজা করব। এটাতো আনন্দের বিষয়, কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে, বিয়েতে আমি থাকতে পারবো না। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আমার, যেটা না করলে হয়তো আমি আর কখনোই তোমার সামনে দাঁড়াতে পারব না।'


অহনা আঁতকে উঠে। চোখ সজল হয়ে আসে, তোমার কি সত্যি আনন্দ হচ্ছে?'


মাহতিম চোখ সরিয়ে নেয়। অন্যদিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে। কান্নাটা হজম করে নিয়েছে ঢোকের সাথে। অহনা আবার বলল,' কি হলো? খুব আনন্দ পাচ্ছ তাই না?'


' হ্যাঁ, আমি খুব খুশি। তোমার বিয়ে হবে, ছেলেটা খুব ভালো। আজকাল এমন ছেলে পাওয়া যায় না‌।'


অহনা ঠোঁট কামড়ে কাঁদে,' আমার কষ্ট হচ্ছে।'


মাহতিম চুপ করে থাকে। অহনা পুনরায় বলল,' আমি তোমাকে যেতে দেব না।'


' যেতে হবেই আমাকে। কেন বুঝতে পারছ না? আমি সাধারণ মানুষ ন‌ই।'


' সে যাই হ‌ও তুমি। আমি তোমাকে ছাড়বো না‌।'


মাহতিম অহনার কাছে এসে দাঁড়ায়, ওর কাঁধে হাত রেখে বলে,' আমি তোমাকে কষ্ট দিতে পারবো না কখনো। যদি কখনো দিয়ে ফেলি, তবে সেদিন যেন আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়, তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি থাকতে পারব না কখনো।' 

মাহতিম গলা পরিষ্কার করে অন্যদিকে তাকিয়ে আবার বলল,' তোমার বিয়ে করে নেওয়া উচিত। একজন থেকে ঠকে গিয়ে তুমি বিষন্নতায় আছো, এখন কারো সান্নিধ্যে‌ই তুমি ঠিক হয়ে উঠবে। আমি তোমার খুশি চাই। আমি অনেক খুশি , তোমার বিয়ে হবে খুব ভালো একটা ছেলের সাথে।'


' আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারছো না তুমি! এর মানে কি জানো? এর মানে হলো তুমি মিথ্যে বলছ, তুমি মোটেও খুশি না।'


' আমি কতটা খুশি বলে বোঝাতে পারব না।'


' এতো খুশি তুমি? এতদিনের কিছু স্মৃতিও বুঝি তোমাকে কষ্ট দিতে পারেনি?'


' কোনো স্মৃতি মনে রাখিনি আমি। স্মৃতিরা কষ্ট দেয় খুব। মনে রাখতে চাই না।'


' তবে চলে যাও। ধরে রাখব না‌।'


মাহতিমের বুকের ভেতরটা মো/ছ/ড় দিয়ে উঠে। দিশেহারা লাগছে তার নিজেকে। উল্টো দিকে ফিরে তাকাতেই অহনা তার হাত চে//পে ধরল,' সত্যি কি চলে যাবে? আমার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না। মজা করছ না তো?'


' আমি মজা করছি না।'


অহনা চোখের পানি মুছে নেয়। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে জিজ্ঞেস করে,' কবে ফিরে আসবে তবে?'


' জানা নেই। নাও আসতে পারি।'


' তার মানে নিশ্চয়তা দিতে পারছ না। কি বোকা তুমি, গুছিয়ে মিথ্যেও বলতে পারো না আমাকে। আবার নাকি ছেড়ে যাবে।'


মাহতিম গোল গোল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। চোখের পাপড়িগুলো পানিতে ট‌ইটুম্বর। নিষ্প্রাণ ঠোঁট দুটো তাকে অহনার দিকে টানছে। নিজের চোখ সরিয়ে নেয়। মনে মনে বলে, এতো সুন্দর তুমি, কখনোই চোখ সরাতে পারিনা। কেন এতো ভালো লাগে তোমাকে? সবাই পেতে চায়, আমিও চাই হয়তো। কিন্তু আমি কি সেই একজন হতে পারব? কখনোই না। আমি তোমার কাছে অদৃশ্য। আমার অস্তিত্ব নেই, আমি তোমাকে পাওয়ার মতো আকাশচুম্বী আশা রাখতে পারি না‌। ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মাহতিমের। অহনার দিকে থেকে চোখ সরিয়ে মাটিতে নত করে।


অহনা কোনো কথা না বলে লুটিয়ে পড়ে মাহতিমের বুকে। চাতক পাখির মতো অহনাও যেন তার বৃষ্টির সন্ধান পেল।  হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে,

' আমি কেন এত কষ্ট পাই? সব কষ্ট কেন আমাকেই বেছে নেয়? আমি কেন দুটো দিন শান্তিতে থাকতে পারিনা‌? কষ্ট আমাকে পেতেই হবে।'


মাহতিম শেষ স্পর্শ ভেবে নিজেও জড়িয়ে নেয়। শক্ত করে আলিঙ্গন করে নেয়। অহনা ক্ষান্ত কন্ঠে বলে,' এই বুকের স্পর্শ একান্ত‌ই আমার। এর স্পর্শে আমি হা/রি/য়ে যাই। বার বার ইচ্ছে করে স্পর্শে তলিয়ে যাই, ভীষণ করে। কিভাবে ছাড়বো? পারব না। এই একান্ত সম্পদটাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে রাখতে চাই।'

 পরক্ষণেই শান্ত হয়ে যায়। গলা পরিষ্কার করে যোগ করে,'তোমাকে আটকে রাখবো না। কারণ আমি জানি, তুমি ফিরে আসবেই। সঠিক সময়ে‌ই আসবে।'


' এতোটা আত্মবিশ্বাস তোমার?'


' অনেক।'


' যেতে হবে এবার।'


অহনা ছেড়ে দেয়। মাহতিম এগিয়ে যায় সামনের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়।


রোস্তম মেয়ের ঘরে ঢুকে। কাছে এসে বলে,' কিছু কথা বলব তোকে।'


' আমি জানি!'


রোস্তম অবাক হয়ে বলল,' কি জানিস তুই? তুমি মতির সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছ তাইতো?'


রোস্তম চোখ মুখ বিকৃত করে বলল,' নারে। আরিশের সাথে।'


' সে যাই হোক। আমি বিয়ে করব না এখন।'


' কেন করবি না। কারণটাতো বলবি।'


' কোনো কারণ নেই। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।'


রোস্তম চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। পাশেই ছিল ময়না, বলল,' আপা, তুমি বিয়ে করতে চাও না কেন? আরিশ ভাই অনেক ভালো। আমার স্বামীর সাথে তার খুব খাতির ছিল।'


অহনা আঁতকে উঠে। ময়নার দিকে ঝাঁ/ঝা/লো চোখে তাকায়। কিছু বলার আগেই ময়না বলল,' আপা ভ//য় পেয়ো না‌ আরিশ ভাই এমনি যেত। আমার স্বামীর কোনো কাজ সম্পর্কেই সে জানত না।'


অহনা কিছু বলে না আর। ময়নাকে বলল,' তোমার বাবা কষ্ট পাচ্ছে। তোমার বাড়ি যাওয়া উচিত। পরে না হয় আবার আসবে।'


' হ্যাঁ আপা, কালকেই চলে যাব। লোকের ম*ন্দ কথা শুনবে বাবা, তাই যাচ্ছি না।'


' কে কি বলল না বলল তাতে কান দিতে নেই। তুমি যাবে। কেউ কিছু বললে মুখের উপর জবাব দেবে। মনে রেখো, তুমি যদি চুপ থাকো তাহলে লোকে সেটার সুযোগ নিয়ে আরো অত্যাচার করবে তোমাকে। আর যদি রুখে দাঁড়াও তাহলে কেউ সাহস পাবে না।'


' হ্যাঁ আপা। আমি রুখে দাঁড়াব‌ই।'


রোস্তম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আস্তে করে আবার বলে,' তোর মা থাকলে হয়তো সে বোঝাতে পারত। আমার কথা তুই বুঝতে পারছিস না। আমার তোকে নিয়ে চিন্তা হয়। আমি চাই তুই ভালো একজন জীবনসঙ্গী নিয়ে সুখী থাক আজীবন। আমার এই একটাই আশা। তোর উপর ভরসা করছে এটা। মোড়লরা বড়লোক, তাদের কথা না মানলে কি করবে জানি না, তবে মেনে নিলে সমাজে একটা ভালো সম্মান পাব। তুই আমার এই একটা কথা অন্তত রাখ মা।'


বলেই রোস্তম চলে গেল। অহনার কিছু ভালো লাগছে না। মাহতিম চলে যাওয়ায় মন খা*রা*/প, তার মধ্যে আবার বিয়ে। মেনে নিতে পারছে না। বাইরে বের হয় অহনা। কল পাড়ে গিয়ে চোখে মুখে পানি দেয়।


ঘরের দিকে পা বাড়াতেই কেউ তার মুখ চেপে ধরে। অহনা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। 

গম্ভীর স্বর ভেসে উঠে,' তুমি এটা করতে পারো না। কখনোই না.....  


চলবে......

বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-৩

 

 

( ৩য় পর্ব ) 


টের পেলাম আজ সত্যি আমার পিরিয়ড শুরু হয়েছে এবং ঘাবড়ে গেলাম এই কথা অভ্রকে কিকরে বলবো। ও জানে আমার পিরিয়ড শেষ এবং এখন যদি এই কথা বলি ও নিশ্চিত ভুল বুঝবে আমায়।


অভ্র ভাববে এভাবে তাকে দূরে সরিয়ে রাখার নিশ্চই কোনো কারণ আছে। হয়তো ভাববে আমি ওর প্রতি অখুশি নয়তো ভিন্ন কিছু।


আমি মোবাইলের ফ্লাস জ্বালাবো এমন সময় অভ্র আমার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললো– একদম না, প্রকৃতি ইশারায় জানিয়ে দিচ্ছে এবার আমাদের একান্তে কাছে আসার সময় অথচ তুমি বুঝছো না।


আমার মাথায় আরও একটা বিষয় ঘুরছে, সেটা হলো হারিকেনটা ছিল টেবিলের মাঝ বরাবর সেখান থেকে একেবারে টেবিলের বাইরে এসে পড়লো কীভাবে? যদি কাত হয়েও পড়ে তাহলেও পড়ে থাকার কথা টেবিলের ওপরেই। বিষয়টি সত্যি রহস্যময়।


আজ প্রথমবার অভ্র বলেই ফেললো– আচ্ছা তোমার কি কোনো কারণে আমার ওপর রাগ আছে? অথবা মনে কোনো লুকোনো কষ্ট? 


আমি থতমত খেয়ে বললাম– অভ্র রাগ তো দূর, তোমার প্রতি আমার যে সীমাহীন ভালোবাসা সেখানে তিল পরিমাণ অভিযোগের অবকাশ নেই। 


: তাহলে দূরে সরে থাকছো যে!


: হুম, পরিক্ষা নিচ্ছি আমার বরের।


: কিসের পরিক্ষা নিচ্ছ বউ?


: ধৈর্যের পরিক্ষা, আমার বর কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে সেই পরিক্ষা। 


: তাহলে এই পরিক্ষায় আমি ফেল করতে চাই বউ।


: হা হা হা, এতটা অধৈর্য হলে তো চলবেনা বর সাহেব। সংসার জীবনের ভিত্তি হলো এই ধৈর্য। দুজনের ধৈর্য যত বেশি সংসারের স্থায়িত্ব এবং সুখশান্তি তত বেশী।


: ধৈর্য নাহয় পরে ধরবো, আগে বউকে ধরি।


কথা শেষ করেই অভ্র আমাকে জড়িয়ে ধরতেই বাইরে ধুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। অভ্র আমাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কি হতে পারে। 


আমি বললাম– হয়তো বাতাসে শুকনো নারকেল পড়েছে গাছ থেকে অভ্র। 


অভ্র ভ্রু কুঁচকে বললো– চোরও হতে পারে, এরকম ওয়েদার শুধু জামাই বউয়ের জন্যই নয়। চোরদের জন্যও চুপচাপ কাজ শেরে সটকে পড়ার সময় বুঝলে? যাই বাইরে গিয়ে দেখি। 


এরকম পরিস্থিতিতে কিছুতেই অভ্রকে বাইরে যেতে দেয়া যাবেনা। 


আমি উঠে দাড়িয়ে অভ্রর হাত ধরে টেনে খাটে শোয়ালাম। 


পাতলা কম্বল টেনে আমাদের গায়ে জড়িয়ে অভ্রর বুকে মাথা রেখে বললাম– এরকম ওয়েদারে বউয়ের পাশে শুয়ে থাকতে হয় মিস্টার জামাই। 


অভ্র ইচ্ছে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো– শুধু শুয়ে থাকা আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে বিরিয়ানির প্লেটের সামনে বসে থাকা ভীষণ বেদনার বিষয় যে বউ।


অভ্রর কথা শুনে না হেসে আর থাকতে পারলাম না আমি। হেসে হেসে বললাম– বিরিয়ানি খেয়ে ফেললেই তো হয়ে গেল, মাঝেমধ্যে অপেক্ষা করা কিন্তু মধুর, অপেক্ষার পরে পেলে তখন তৃপ্তি বেশি।


অভ্র মজা করে বললো– আর তৃপ্তি! এরকম হবে জানলে আবেগের বশে বিয়ে না করে বিবেকের বশে চিরকুমার থেকে যেতাম। 


অভ্র আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো, আমি ধীরে ধীরে অভ্রকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।


সকালবেলা উঠে জলদি করে ফ্রেশ হয়ে অভ্রর জন্য নাস্তা রেডি করলাম। একটা নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবে ও।


নাস্তা শেষে রেডি হয়ে সবসময়ের মতো কোথাও যাবার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে মিষ্টি হেসে ভালোবাসি বউ বলে অভ্র বেড়িয়ে গেল।


আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রান্নার কাজে মনোযোগী হলাম, অভ্রর আসতে হয়তো দুপুর হয়ে যাবে। 


রান্নাঘর থেকে বাইরে বের হতেই অবাক হয়ে গেলাম। পুকুর পাড়ের কাছে সেই রক্তজবার বাগানের পাশে অনড় হয়ে দাড়িয়ে রক্তজবার বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে একটা সাত আট বছরের বাচ্চা মেয়ে।


– এই যে শুনছো?– আমি বললাম। 


মেয়েটি ঠিক সেভাবেই অনড়ভাবে দাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। 


আমি মেয়েটির কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে বাজপাখির মতো ছোবল মেরে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিয়ে এক মহিলা বললো– কতবার বলেছি তোকে এবাড়িতে ভুলেও ঢুকবিনা।


মহিলা সম্ভবত মেয়েটির মা।


মহিলা আবারও বললো– কেন এসেছিস এখানে? 


বাচ্চাটি মুখ ভার করে বললো– উনি ডেকেছে আমাকে ফুল দেবে বলে।


মহিলা বিরক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে তারপর আমাকে দেখিয়ে বাচ্চাকে বললো– কে ইনি ডেকেছেন? 


বাচ্চা মেয়েটা না সূচক মাথা নেড়ে আঙ্গুল দিয়ে রক্তজবার বাগানের দিকে ইশারা করে বললো– ঐখানে সাদা কাপড় পরা এক দাদু ছিল, সে আমাকে ডেকেছে।


মেয়েটির কথা শেষ হতে না হতে আমার এবং মেয়েটির মায়ের চোখ রক্তজবার বাগান তন্নতন্ন করে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। কিন্তু কৈ, কোথাও কেউ নেই। 


আমার বুকের ভেতরটা কেমন ধড়াম করে উঠলো। 

বাচ্চারা তো মিথ্যা বলেনা সহজে। তাহলে কি সাদা কাপড় পড়া সে কোনো অশুভ শক্তি ছিল?!


মেয়েটিকে তার মা– আর কোনদিন ভুলেও যেন এবাড়িতে আসতে না দেখি– বলে চলে যেতে যেতে আমাকে বললো– ভাবী আপনিও একটু সাবধানে থাকবেন, বাড়িটা আমার কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। 


আমি ঘুরে দাড়িয়ে ঘরে যাবার উদ্দেশ্যে দুপা বাড়াতেই পেছনের রক্তজবা গাছগুলো কেমন ঝরঝর করে হেলে-দুলে উঠলো। আমি চমকে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম সব স্বাভাবিক। 


ইশ চুলোয় তরকারি চাপিয়ে এসেছি আবার পুড়ে যায়নি তো! দৌড়ে রান্নাঘরে এসে দেখি যা ভেবেছি তাই। পুড়ে গেছে।


মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। 


বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়তে দেরী হলোনা মোটে।


ঘুম ভাঙলো অভ্রর ডাকে, চোখ খুলে দেখি হাসিমুখে দাড়িয়ে আছে জনাব। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই এগিয়ে এসে আমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো– জবটা অবশেষে পেয়ে গেলাম বউ, এবার আমি আমার বউটাকে মনের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারবো। 


আনন্দে আমার চোখের কোণে জল টলমল করে উঠলো অভ্রর আনন্দ দেখে, এটাই বোধহয় ভালোবাসা, এটাই প্রেমের প্রতিচ্ছবি।


আমাকে কোল থেকে নামিয়ে অভ্র বললো– জলদি করে রেডি হও আজ আমরা বাইরে ঘুরবো ফিরবো এবং বাইরেই খাবো।


অভ্রর সাথে পালিয়ে আসার পরে থেকে বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বাবা তো এখনও রেগে আছেন। মায়ের সাথেই যা দুচার কথা হয়। অভ্রর চাকরিটা হয়েছে এই খুশির খবর কারো সাথে শেয়ার করার আগপর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিনা যে।


মাকে ভিডিও কল করলাম, মা রিসিভ করতেই দেখলাম বাবা মায়ের কাছ থেকে সরে গেল। তারমানে বাবা মা পাশাপাশি বসা ছিল। 


মাকে বললাম– মা পালানোর মতো অপরাধ করে হলেও তো ভালোবাসার মানুষটাকে আজীবনের জন্য নিজের করে পেয়েছি বলো, ভালোবাসার জন্য এটুকু অপরাধ হয়তো জায়েজ আছে। ভালোবাসার মানুষটাকে পেয়েছি এবার তোমরা মেনে নিলেই তো আমি চির সুখী। তোমরা তো সবসময় আমার সুখই চাইতে মা।


আমার কথা শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো– তাই বলে পালিয়ে যাবি? বাবার সামনে সাহস করে বললেই হতো অভ্রকেই চাই। বাবা তো তোর, জম নয় যে মেরে ফেলতো।


– মা, বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ঐ কথাটুকু বলার সাহস মেয়েদের হয়না বলেই তো পালিয়ে যাবার মতো অপরাধ করে ফেলে। 


– বুঝলাম, কিন্তু তোর চোখের নিচে কালি পড়েছে যে, শরীর ঠিক আছে তো তোর? 


– হ্যা মা আমি একদম ঠিক আছি, শুধু তোমাদের কাছে যেতে পারছিনা বলে কষ্ট হয়। ওমা– আব্বার রাগ কি কমবেনা?


– কে জানে! তোর বাপের যে রাগ।


– বাংলা সিনেমার মতো বাবু নিয়ে গিয়ে আব্বার হাতে তুলে দিলেই নাতির মুখ দেখে রাগ পানি হয়ে যাবে দেইখো মা।


– হা হা হা, তুই এখনও সেই পাগলী মেয়ে রয়ে গেলি।


– মা, অভ্রর খুব ভালো একটা চাকরি হয়েছে। 


– আলহামদুলিল্লাহ খুশীর সংবাদ। ভালো থাকিস তোরা, সাবধানে থাকিস। এখন রাখি পরে আবার কথা হবে।


কল কেটে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি অভ্র নীল শাড়িটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। শাড়িটা আমার হাতে দিয়ে বললো– আজকে এটা পরে নীলপরি হয়ে যাও আমার মায়াপরি। তুমি রেডি হও তারপর আমরা বের হবো।


অভ্র গিয়ে খাটে বসলো। 


আমি শাড়ি চুড়ি পরে চোখে কাঁজল আঁকতে আঁকতে অভ্রর দিকে তাকিয়ে বললাম– এবার কিন্তু আমরা এই বাসা চেঞ্জ করে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিবো যত দ্রুত সম্ভব। 


অভ্র আমার দিয়ে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো– ওসব বাদ আগে বউটার ওপর আরও আরও ক্রাশ খেয়ে নেই। নীল শাড়ীতে তোমায় অপূর্ব লাগছে নীলপরি।


– বেশি বেশি বলছো কিন্তু – বলে আবার আয়নায় তাকাতেই বুকের ভেতর কলিজাটা যেন উল্টে গেল আমার, শরীরের লোম কাটা দিয়ে উঠলো। ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এ কি দেখলাম আমি...


চলবে...

ছায়া_মানব_পর্ব-১৮

 

১৮.

'আমাকে একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'


মাহতিমের চোখ স্থির হয়ে যায়। উঠে যায় সে, দায়সারাভাবে দাঁড়িয়ে থাকে অহনার সামনে। অহনা পুনরায় বলল,' একবার জ*ড়ি*য়ে ধরবে?'


' কেন?'


' আমি চাইছি তাই!'


' কিছু চাওয়া অগোচরে থাকা ভালো।'


' ধরো না। একবার শুধু।'


মাহতিম নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। কষ্ট হচ্ছে তার, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দম নেয়,

' আমি দৃশ্যমান হলেই আমার শক্তি কমে যাবে। যে কাজের জন্য এসেছি সেটা অপূর্ণ থেকে যাবে।'


' এতো বাঁধা কেন? তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে?'


' আমি আসতে চাইনি। তুমি ডেকে এনেছো।'


'‌আমি ডেকে এনেছি? কিন্তু আমিতো কখনোই তোমাকে ডাকিনি, চিনতাম‌ও না।'


' কে বলেছিল অর্ণব নামের সেই ছেলেটার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর?'


' আমি তাকে চিনতে পারি নি। দু'মাসের পরিচয়ে তাকে আমার বিশ্বাস করা উচিত হয়নি।'


' এটাই কারণ।'


'ক্ষমা চাইছি।'


মাহতিম অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে রাখে। চোখ তার নত। কিছুতেই অহনার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। গাল বেয়ে তার কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল,

' মানুষ কত সহজে হা*রি*য়ে যায়। যাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি সেও হা*রি*য়ে গেল।'


অহনা নাক টেনে বলে,' তোমার এত কষ্ট কিসের? বলো আমাকে।'


' আমার কোনো কষ্ট নেই। জীবন নিয়েও কোনো আফসোস নেই। শুধু....'


' শুধু কি? এটাই বলবে তো, তুমি একজন ম্যাজিশিয়ান। তুমি ম্যাজিক করে সব করতে পারো। আমি জানি, আমার আগেই মনে হয়েছিল। কি, ঠিক বলছি তো?'


মাহতিম অহনার দিকে চেয়ে থাকে,

' হ্যাঁ, তুমি ঠিক। ঠিক তুমি। আমি একজন ম্যাজিশিয়ান, আমি জা*/দু জানি।'


' তাহলে কষ্ট কিসের? তুমি কেন কাঁদছো? চোখের পানি কখনো মিথ্যে হয় না।'


' আমি বুঝতেই পারছি না, কেন আমি কাঁদছি! কারণ অজানা।'


বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠে অহনার। মাহতিমের কাছে এগিয়ে আসে। অশ্রুসজল চোখজোড়া র/ক্তি/ম হয়ে আছে মাহতিমের। অহনার দিকে হাত বাড়ায়। কাঁধে দুহাত রাখে। অহনার চোখের কোণে জমে থাকা পানির কণা আঙুলের ঘষায় সরিয়ে দেয়,

' কাঁদছো কেন?'


' তুমিওতো কাঁদছো।'


মাহতিম দু হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নেয়,' কাঁদছি না আমি। তুমি খুব বোকা, বুঝতে পারো না।'


' জ/ড়ি/য়ে ধরো। আমার হাঁসফাঁস লাগছে।'


মাহতিম এক ঝ/ট/কা/য় অহনাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠে অহনা। শক্ত করে মাহতিমের শার্ট খামচে ধরে। ছেড়ে দিলেই বুঝি হারিয়ে যাবে। কেঁদে কেঁদে শার্টের অনেকটা ভিজিয়ে ফেলেছে। 

মাহতিম অহনার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া টের পায়। গরম নিঃশ্বাস অনুভব করে। আলতো করে মাথায় চুমু খায়। কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়,

' পা/গ/লী মেয়ে, কান্না শেষ হয়েছে?'


অহনা জ/ড়ি//য়ে ধরে আছে মাহতিমকে। মাহতিম ছাড়াতে চাইলেও সে আরো জোড়ালোভাবে ধরে আছে। অহনা বিরক্ত হয়ে বলল,' এমন অদ্ভুত আচরণ করছো কেন? আর একটু থাকতে দাও।'


' ঘরে যাও। সবাই অপেক্ষা করছে।'


' সবাই ঘুমাচ্ছে।'


' তাহলে তুমি কি করছো?'


' চোখে দেখো না? আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি আগলে রেখেছি।'


' কোনটা তোমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি?'


অহনা মাহতিমের বুকে হাত রেখে বলে,' এটা, এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইলেও দেব না‌। এর উষ্ণতা থেকে আমি বঞ্চিত হতে চাই না কখনো।'


' তোমার জ্ঞান লোপ পেয়েছে। হুঁশে নেই তুমি। ছাড়ো আমাকে আর ঘরে চলো।'


' আরেকটু!'


মাহতিম সরিয়ে দেয় অহনাকে। বুকের গরম ওম থেকে ছাড় পেতেই অহনার কেমন শীত লেগে উঠে। শরীর তার তেজ হা/রি/য়ে ফেলে। মাহতিম বলল,' কতক্ষণ এভাবে ছিলে মনে আছে?'


অহনা অনুভূতির রো/ষা/ন/ল থেকে বেরিয়ে আসতেই ওর মনে হয়, একটু আগেই জ/ড়ি/য়ে ধরেছিল। ল/জ্জা/য় নুইয়ে যায়। আবেগের বশে কি করে বসল?


দৌড়ে ঘরে চলে যায় অহনা। মাহতিম ভাবতে থাকে, একটু আগে নিজেই এতো কান্ড করল একটু জড়িয়ে ধরার জন্য। আর এখন নিজেই ল//জ্জা পাচ্ছে।


ভালোবাসা সবাইকে কেমন বেহায়া করে দেয়। নি/র্ল/জ্জ করে দেয় নিমেষেই। প্রমময়‌ ছোঁয়া পেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সেটাই হলো অহনার ক্ষেত্রে। 


আছরের পর রোস্তম হাজির হয় মোড়ল বাড়ি। বিশাল দৈর্ঘ ও প্রস্থ ব্যাপী বাড়ি। তবে আধুনিক বাড়ি বলা যায়। রোস্তম থমথমে পরিবেশ দেখে পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরপরই প্রবেশ করে। 


মোড়ল বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। রোস্তমকে দেখে হেসে বলল,' আসো, আসো। তোমার জন্য‌ই অপেক্ষা করছিলাম। একটু দেরি করে ফেললে বটে, তবে সমস্যা নেই‌।'


রোস্তম ক্ষমা চেয়ে নেয়। মোড়ল তাকে বসতে বলে। কিন্তু সে বসে না। মোড়ল অনেক জোরাজুরি করতেই রোস্তম সোফায় বসে। মোড়ল ঘরের দিকে মুখ করে বলে,' অতিথির জন্য নাস্তা নিয়ে আয়।'


রোস্তম থমথম খেয়ে যায়। ভয়েভয়ে বলল,' কর্তা, কেন ডেকেছেন আমাকে? আমি কোনো ভুল করিনি। কিছুদিনের মধ্যেই শহরে চলে যাব, মেয়েটা পড়বে, আমিও পাশে থাকতে পারব।'


' সেকি কথা? মেয়ে আবার চলে যাবে কেন? এবার না হয় একেবারে থেকে যাক। নিজের দেশের মাটি বলে কথা।'


' না কর্তা, মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়ালে আমিও শান্তি পাব।'


নাস্তা এসে যায়। মোড়ল থাকে চা এগিয়ে দেয়। এতো খাতির যত্ন দেখে রোস্তম আরো কাঁচুমাচু হয়ে বসে। মোড়ল আবার বলল,' মেয়ের চিন্তা আর করো না। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।'


' তা কেমন করে হবে? কখন আমার প্রাণ‌ও চলে যায়। মেয়েটাকে কোনো কূল করে দিতে পারলেই আমি শান্তি পেতাম।'


' আচ্ছা শুনো, আমার বড় ছেলেকে কেমন লাগে তোমার?'


রোস্তম ভেবে পায় না হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?

' আপনার ছেলেরা হলো হিরে, নজরকাড়া, কার না ভালো লাগে বলুন?'


' আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার কেমন লাগে?'


' ভালোই লাগে, শহর থেকে পড়াশোনা করে আশা ছেলে, এলাকার‌ও উন্নয়ন হবে তাকে দিয়ে।'


' একটা অনুরোধ রাখবে রোস্তম?'


রোস্তম বিনীত হয়ে বলে,' ছি ছি কর্তা, কি বলছেন আপনি? আপনি বললে জীবনটাও দিয়ে দেব। আপনি কেন অনুরোধ করবেন, আপনি আদেশ করবেন।'


' না, এখানে তুমি নিজেকে ছোট করে দেখবে না। এই মুহূর্তে আমি আর তুমি সমান। এটা ভেবেই আমি বলছি কথাটা।'


রোস্তম ঢোক গিলে নেয়,' কি কথা?'


' তোমার মেয়েকে আজ সকালে দেখেই ভালো লেগে গেছে। বড় ছেলে আরিশের জন্য কবে থেকেই মেয়ে দেখছি, মনের মতো কাউকে পাইনি। তোমার মেয়েকে দেখে মনে হলো রুপে, গুনে সে আমার ছেলের জন্য উত্তম। আমি চাই তাদের দুই হাত এক করতে। তোমার কি মতামত? আমি জোর করবো না। জানতে চাই শুধু।'


রোস্তম আনন্দিত হবে নাকি বিষন্ন হবে বুঝতে পারছে না। চুপ করে র‌ইল।

মোড়ল আবার বলল,' আমার ছেলে ভালো, তোমরা এই এলাকায় আছো, কখনো কি তাকে নিয়ে কোনো খা/রা*/প কথা শুনেছো?'


রোস্তম এক গাল হেসে বলল,' আমি ভাবতে পারিনি আপনার আমার মেয়েকে ভালো লেগেছে। আমার মেয়ের সৌভাগ্য এই বাড়িতে বিয়ে হবে। আমি রাজি।'


' আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে তারাতাড়ি তারিখটা ফেলে দেব, কি বলো বেহাই?'


রোস্তম ভেবে বলল,' মেয়েকে একবার কথাটা জানানো জরুরি। যদি....'


' আরে কোনো ব্যাপার না। আর এমন ভ/য়ে ভ*য়ে থাকবে না। মনে করবে আমরা সমান। বেড়াই আমরা, গলায় গলায় ভাব থাকবে। মেয়ের সাথে কথা বলে আমাকে জানাবে। আমি নিজে যাব তোমার মেয়েকে দেখতে বাড়ির মহিলাদের নিয়ে।'

বলেই মোড়ল রোস্তমের কাঁধে হাত রাখল। রোস্তম জোরপূর্বক হাসল। তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।


পুরো বিষয়টা খেয়াল করল মাহতিম। সে পাশে থেকেই মোড়ল আর রোস্তমের সব কথা শুনে নিল....


চলবে.....

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৭


১৭.

গ্রামের পাশের সরু গলি দিয়ে ধান ক্ষেতে আসতেই মোড়লের সাথে দেখা হয়। রোস্তম সালাম দিতেই লোকটা থামে। সবার দিকে তাকিয়ে বলল,' রোস্তম যে, তা কেমন আছো?'


'আপনাদের দোয়ায় ভালোই আছি।'


'এরা কারা? এলাকায় নতুন মনে হচ্ছে।'


রোস্তম গলা নামিয়ে সরল কন্ঠে বলল,' শহর থেকে এসেছে, আমার মেয়ের বন্ধু সকল।'


' মেয়ে ক‌ই? তাকে তো অনেক দিন দেখি না। কলেজে পড়ে না?'


রোস্তম পেছন থেকে টেনে অহনাকে সামনে দাঁড় করালো,' এই যে আমার মেয়ে। অনেকদিন পর গ্রামে পা রাখল। শহরেই পড়ে।'


অহনা সালাম দিল মোড়লকে। সালাম নিয়েই মোড়ল অহনাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে,

' মেয়েতো বড় হয়ে গেছে অনেক। তা কিছু কি ভেবেছ?'


' এখনো ভাবা হয়নি। মা ম//*রা মেয়েটাকে এখন চাপ দিতে চাই না‌।'


' বিষয়টা আমি ভাবব। আসি রোস্তম আলী, আবার দেখা হবে।'


অহনা রোস্তমের দিকে তাকালো,' বাবা, লোকটা তোমাকে কি ভাবতে বলেছে?'


' কিছু না। চল তুই।'


অহনা আবার পেছনে চলে আসে। মাহতিমের মুখটা লাল হয়ে আছে। অহনা তুড়ি বাজিয়ে জিজ্ঞেস করে,' কি হলো? কি ভাবছ?'


মাহতিম অহনার দিকে তাকায়,' যা তোমার বাবা ভাবছে।'


' বাবা আবার কি ভাবছে?'


' কিছু না। কেউ পেছনে আসছে।'


মাহতিম দাঁড়িয়ে পড়ে। অহনা সবার সাথে তাল মিলিয়ে তাদেরকে চারিদিকটা দেখায়।


পেছন থেকে মতিকে দেখে মাহতিম ভাবার চেষ্টা করে তাকে চিনে কিনা। না চিনে না। কখনো দেখেনি। অহনা পেছনে তাকালেই লোকটা কেমন লুকিয়ে পড়ছে। মাহতিম ভেবে পায় না লোকটা এমন করছে কেন?


অহনাকে গিয়ে বলল। অহনা থেমে যায়। সবাই অনেকটা সামনে চলে যায়। মতি বেরিয়ে আসতেই অহনা তার কাছে যায়,

' সমস্যা কি আপনার? পিছু নিলেন কেন?'


মতি পাশে কাউকে না দেখে বলল,' কাল রাতে একটা বিষয় দেখেছি, বুঝতে পারছি না সত্যি কিনা।'


' কি দেখেছিলেন?'


' আমি দেখেছিলাম তুমি উড়ছিলে আকাশে। আমি অনেকবার খেয়াল করেছি দেখলাম উড়ছিলে। স্যরি তুমি করে বললাম, আসলে তুমিতো এখন আর ছোট না, তাই বললাম।'


অহনা আঁতকে উঠে, বলল,' ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে দেখলেন কিভাবে?'


' আমি মানে.... আমার ঘুম আসছিল না রাতে, তাই হাঁটতে বেড়িয়েছিলাম।'


' আর কাউকে কি দেখেছেন?'


' না, তুমি একা। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না কিভাবে উড়েছিলে তুমি?'


অহনা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, বলল,' আপনি ভুল দেখেছেন। মানুষ কখনো উড়তে পারে নাকি।'


' আমি ঠিক দেখেছি, এবার তুমি আমাকে সত্যিটা বলবে। কিভাবে তুমি পারলে। আমাকে বলো, না হয় খা/রা//প হয়ে যাবে।'


' এমন কিছুই হয়নি। আপনি কাকে দেখে আমাকে ভাবছেন কে জানে। চোখে দুই চামচ বেশি দেখেন। আমাকে যেতে হবে, বায়।'


' আমি জানি তুমি মিথ্যে বলছ। আমি জেনেই ছাড়ব কিভাবে এই শক্তি পেলে তুমি। এবার দেখো আমি কি করি!'


' কি করবেন? কি//ড ন্যা প করবেন?'


' দরকার হলে সেটাই করব। আমার জানতে হবে।'


অহনা চলে যেতেই মতি তার হাত চেপে ধরে,' সত্যিটা বলে যাও। আমি ভুল দেখিনা কখনো। আমি একা নয় আরো অনেকে দেখেছে, সবাইতো আর ভুল দেখেনি।'


' বাহ, একটু আগে বললেন আপনি হাঁটতে বেরিয়ে দেখেছেন এখন বলছেন আরো অনেকে দেখেছে?'


'কথা না বাড়িয়ে সত্যিটা বলো।'


' হাত ছাড়ুন।'


' ছাড়ব না।'


মতি হাত ছাড়ছে না দেখে মাহতিম তার নাক বরাবর ঘু*/ষি মা///রে। নাক ফে//টে র*/ক্ত পড়তে থাকে। অদৃশ্য মার খেয়ে মতি চমকে উঠে। ব্যথার দিকে খেয়াল করল না সে।বলল,' কে মা/*র/ল আমাকে? এখানে কিছু তো গোলমাল হচ্ছে। আমি খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি না।'


' নিজেকে গুটিয়ে নিন, আর চলে যান।' অহনা রেগে চলে যেতেই মতি আবারো হাত চেপে ধরে।

মাহতিম কন্ট্রোল হারিয়ে ধা'ক্কা দেয় তাকে। মতি এবার কিছুটা ভয় পেল। কিছু বলতে যাবে, তখনি ময়না ডাকল অহনাকে। পেছনে পড়ে যাওয়ায় সবাই আবার ফিরে এলো। মতির এমন হাল দেখে রোস্তম জানতে চায় কি হয়েছে! মতি কোনো কথা না বলে প্রস্থান করে। অহনা 


দাঁয়সাড়া দাঁড়িয়ে থাকে। মতিকে নিয়ে ভাবছে সে। ভ/য় পাচ্ছে এটা ভেবে, একদিন বিষয়টা সবাই জেনে যাবে, খুব শিঘ্রই। ময়না ওর কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকি দিতেই অহনার হুঁশ ফিরে। সবার সাথে আবার চলতে থাকে।


দুপুর হতেই সবাই ফিরে আসে বাড়িতে। ফ্রেস হয়ে খাবার খেয়ে নেয়। বাড়িতে মাত্র তিনটা রুম। একটায় রোস্তম থাকে, বাকি দুইটায় অহনা ও তার বন্ধুরা। ছেলেদের জন্য একটা রুম মেয়েদের জন্য একটা। বিকেলে সবাই শুয়ে আছে। ইরা আর রুমি দিনের তোলা সব ছবি স্ক্রল করে দেখছে। ময়না অহনার পাশেই তার কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে।


ইরা আর রুমির ছবি তোলা দেখে মাহতিম বলল,' মেয়েরা এতো ছবি তুলে কি পায়?'


অহনা হেসে বলল,' শান্তি।'


' আর কিছুতে কি শান্তি নেই?'


' এতো প্রশ্ন করো কেন? যেটা বুঝো না সেটা নিয়ে কথা বলতে নেই।'


মাহতিম চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার বলল,' মন খারাপ?'


অহনা ফিসফিস করে বলল,' তাতে তোমার কি? কথা বলো না। সবাই এমনিতেও আমাকে পাগল মনে করে।'


' বাইরে যাবে?'


' না।'


'‌আচ্ছা, তুমি কেন ছবি তুললে না?'


'‌আমার ভালো লাগে না।'


' কেন? তোমার কি শান্তি পেতে ইচ্ছে করে না?'


' সবার ভালো লাগা এক না। মেয়েরা স্বভাবত অনেক ছবি তুলে। আমি নই।'


' সেটা দেখতেই পেলাম। প্রায় হাজারটা ছবি তুলল। কিন্তু তুলে লাভ কি, বসে বসে এখন সব ডিলেট করছে। একটু পর সেখান থেকে পাঁচটা ছবি অবশিষ্ট থাকবে শুধু।'


' কি বলতে চাও?'


' তেমন কিছু না। কথা হলো, ডিলেট‌ই যখন করবে, তখন এতো ছবি তোলার মানে কি?'


' সেটা ওদের ব্যাপার।'


ময়না উঠে বলল,' আপা তুমি কার সাথে কথা বলছ?'


অহনা মাহতিমের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙায়। মাহতিম বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। অহনা বলল,' মনে মনে!'


ময়না যথাযথ উত্তর না পেয়ে আবারো শুয়ে পড়ে। অহনা উঠে পড়ে। বাইরে বেড়িয়ে দেখতে পায় মাহতিম কল পাড়ে থাকা একটি বেঞ্চের মধ্যে বসে আছে। অহনা পেছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখে। মুহুর্তেই তা ভেদ করে বেরিয়ে আসল তার বুক বরাবর। মাহতিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অহনা দেখতে পায় তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। অহনার মনটাও হুঁ হুঁ করে উঠে,

' কাঁদছ নাকি?'


মাহতিম নিজেকে সামলে নেয়,' ক‌ই নাতো।'


' আমি বুঝতে পারছি। কেন কষ্ট পাচ্ছ?'


' একদম না। বেশি ভাবছ।'


' আমি ভুল বলিনি। তোমার চোখ পড়তে পারি আমি।'


মাহতিম অহনার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয়,

' আচ্ছা, মৃ/*ত মানুষ কি ভালোবাসার অধিকার রাখে?'


অহনা এমন প্রশ্ন শুনে উত্তর খুঁজে পায় না। নির্বাক দৃষ্টিতে তাকায় মাহতিমের দিকে। মাহতিম আবার বলে,' মৃ*/ত মানুষের কি কষ্ট হয়?'


অহনা এবার উত্তর দেয়,' ভালোবাসার অধিকার সবার আছে। কষ্ট সবার হয়। কিন্তু তুমি এসব কেন বলছ?'


' আমার কষ্ট হয় কেন?'


' ধুর বোকা, তুমি কি আর...'


অহনা থেমে যায়। নিরবতা গ্রাস করে নেয় তাকে। বুকে কেমন চিনচিন ব্যথা হচ্ছে। কেমন একটা খাপছাড়া ভাব তার মনটাকে বিষিয়ে তুলে। হা/রা/নো/র ভ*য় জেগে ওঠে।


রোস্তম অহনার মায়ের ছবিটা দেখছিল। কান্নাভেজা চোখ তার। ছবিটায় হাত বুলিয়ে বলল,' মেয়েটাকে কোনো কূল কিনারা না করে চলে গেলে তুমি! স্বা-র্থ/পর তুমি। আমি কিভাবে কি করব? তুমি কি জানো, বাবা না থাকলেও মা তার সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারে। কিন্তু মা না থাকলে বাবা কেন পারে না? সবাই এটাই বলে। আমি জানি, আমি পারব মেয়েটাকে ভালোভাবে রাখতে, তবুও ভ\য় হয়, তুমি থাকলে সবকিছু আরো ভালো হতো।'


দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। রোস্তম চোখ-মুখ মুছে দরজা খুলে দেয়। মধ্যবয়স্ক একটি লোক এসেছে। রোস্তম আসার কারণ জিজ্ঞেস করতে বলল,' কর্তা আমনেরে যাইতে ক‌ইছে।'


রোস্তম ভ/য় পেয়ে যায়। মোড়লকে তার ভালো মনে হয় কিন্তু বড়লোকদের সে বিশ্বাস করে না। কখন কি ঝা*মে/লা দিয়ে বসে বলা যায় না। লোকটা আবার বলল,' কর্তা বলেছে আছরের পর যাইতে। কথা আছে নাকি।'


চলে যায় লোকটি। রোস্তম বিভোর হয়ে ভাবে, কোনো ভুল করেছে কিনা। হঠাৎ ডা/কা/তে রোস্তম ভ/য় পেয়ে যায়। কিভাবে ক্ষমা চাইবে এই বিষয়টা কয়েকবার ভেবে নেয়..... 


চলবে......

রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-২



আজ অভ্র কাছে আসতে চাওয়া মাত্র আঁতকে উঠলাম, তাহলে কি এই রাতটাই অভ্রর জীবনের শেষ রাত হতে চলেছে?!


দাদী বলেছিল আমার বিয়ের পরে ফুলশয্যা রাতে দুজন দুজনের একান্ত কাছে আসার পরে নাকি বরের মৃত্যু হবে। কিন্তু আজ তো ফুলসজ্জা রাত নয়। ফুলশয্যা ফেলে এসেছি সেই কবে। তারপরও কি আজ একান্ত কাছাকাছি গেলে অভ্রর মৃত্যু হবে!


এসব ভাবতেই আমার শরীরের সমস্ত লোম কাটা দিয়ে উঠলো। গলা শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে যেন। আজ কীভাবে ফেরাবো অভ্রকে, ও আবার ভুল বুঝবেনা তো!


এসব চিন্তায় আমার আমার অবস্থা নাজেহাল। টেবিলের ওপর জগ থেকে পারাপার দুই গ্লাস পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম। 


অভ্রর সামনে যতই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছি ততই অস্বাভাবিকতা বেড়ে যাচ্ছে আমার। অভ্র কিন্তু এসব এতক্ষণ ঠিকই খেয়াল করেছে কিন্তু কিছু বলেনি।


এবার কাছে এসে জড়িয়ে ধরে বললো– আর কতদিন এভাবে দূরে সরিয়ে রাখবে বলো তো, আমার যে ভীষণ ইচ্ছে হয় তোমাকে কাছে পেতে, আদরে আদরে তোমায় ভরিয়ে দিতে। আচ্ছা তুমি কি ভয় পাও এসবে?


আমি মজার ছলে বললাম– আদরে আমার এলার্জি আছে তাই। 


আমার কথা শুনে অভ্র হেসে ফেলে বললো– জীবনে এই প্রথম শুনলাম আদরেও এলার্জি থাকে। 


আমি ইচ্ছে করেই একটু ফান করলাম স্বাভাবিক হবার জন্য এবং মোটামুটি সাকসেস।


অভ্র বললো– আচ্ছা তাহলে ফার্মেসী থেকে ঘুরে আসি।


: এত রাতে ফার্মেসীতে কি তোমার?


: এলার্জির অষুধ আনতে যাবো তোমার জন্য। 


: মানে? 


: মানে হলো আগে তোমাকে এলার্জির ওষুধ খাইয়ে তারপর আদর করবো।


এবার অভ্রর কথা শুনে আমার হেসে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা।


হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বললাম– আচ্ছা অভ্র ওসব ছাড়া কি ভালোবাসা হয়না? 


অভ্র স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো– কেন হবেনা, কিন্তু ওসবও তো ভালোবাসার একটা অংশ, ভালোবাসা আরও মধুর করে তোলে। আর এটা তো এখন অবৈধ বা পাপ নয়, আমরা স্বামী স্ত্রী এখন।


: তবুও যদি বলি আমাদের ভালোবাসা বন্ধন ওসবের বাইরে হোক। 


: আরে পাগলী তাহলে তো তুমি আম্মু ডাক আর আমি আব্বু ডাক থেকে বঞ্চিত হবো।


অভ্রর যুক্তির কাছে আমি পরাজিত, আম্মু ডাকটাই তো একজন নারীর জীবনের পরিপূর্ণতা, এখানেই আমরা দূর্বল। 


আমি যে কেন এবং কোন ভয়ে দূরে সরে থাকছি সেটা আমি ভালো জানি। নয়তো অভ্রকে আমারও একান্ত কাছে পাবার ভীষণ ইচ্ছে যাকে, অভ্রর আদরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। প্রাপ্তবয়স্ক একটা মেয়ে আমি কিন্তু ভয়টা তো প্রিয়জনকে হারানোর। একান্ত কাছাকাছি এবং আদর সোহাগের ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে হলেও অভ্রর প্রাণে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরী। আমি কিছুতেই ওকে হারিয়ে বাঁচতে পারবোনা।


আমার ডান পায়ের কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি জোড়া, ওটাই নাকি এসবের কারণ। আমার ওপর নাকি অদৃশ্য শক্তির নজর আছে। 


ছোটবেলায় একবার– ছোটবেলা বলতে তখন বয়স নয় বছর হবে। দুপুরবেলা আব্বুর জন্য চালভাজা নিয়ে রাস্তায় যাবার সময় জবা ফুলগাছের নিচে বেহুশ হয়ে পড়েছিলাম। তারপর বেশ কয়েকদিন নাকি আমি অস্বাভাবিক ছিলাম। এরপর একজন নামডাকওয়ালা হুজুরকে বাড়িতে আনে আব্বা। হুজুর আমাকে একটা তাবিজ দিয়ে যায় এবং আব্বাকে বলে উঠোনের কোণের তেঁতুলগাছটা কেটে ফেলতে, ওখানেই নাকি তেনাদের আস্তানা।


আব্বা সেইদিনই তার শখের গাছটা কেটে ফেলে। 


ভূত প্রেত এসবে আমি বিশ্বাস করিনা কিন্তু মাঝেমধ্যে অদ্ভুত কিছু বিষয়ও লক্ষ্য করেছি কয়েকবার আমাদের বাড়িতে। রাত গভীরে হঠাৎ শরীর ভারী হয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া। ঘুমের মধ্যে ফিসফাস শব্দ শোনা। তাছাড়া এমনিতেই আমার সবসময় কেমন মনে হতো আশেপাশে কেউ রয়েছে। সেই কারণে মুরব্বিদের বলা কথা একেবারেও ফেলে দিতে পারিনা। 


আমাকে চুপচাপ দেখে অভ্র আমাকে জড়িয়ে ধরতেই রুমের জানালার কপাট খটাস করে আচানক খুলে গিয়ে হুহু করে রুমের মধ্যে হাওয়া ঢুকে আমাদের দুজনকেই ছুয়ে গেল যেন। 


আমি আর অভ্র দুজনেই অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। 


অভ্র পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মুচকি হেসে আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো– ভয় পেয়োনা আবার, বাতাসের তোড়ে জানালার কপাট খুলে গেছে। দাড়াও বন্ধ করে আসছি।


অভ্র উঠে গিয়ে জানালার কপাট বন্ধ করে এসে আমার পাশে বসলো। 


বাইরে হঠাৎ করে বাতাসের তান্ডব বাড়তে শুরু করছে, আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে সেই সাথে মেঘের গর্জন। ক্ষাণিক আগের মেঘমুক্ত আকাশ এখন কালো মেঘের কাছে বন্দি। ঝড় শুরু হয়েছে, বাতাসে গাছের শুকনো ডালপালা মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে এদিক সেদিকে। 


এই বাড়িটা শহরের কাছাকাছি হলেও বাড়ির মালিক গ্রামের বাড়ির মতো করেই সাজিয়েছে। সামনে বিশাল পুকুর, শানবাঁধানো ঘাট, পেছনে বিশাল বাগান। বাড়ির চারপাশে নানারকম ফলের গাছে ঘেরা। বাড়ির ডানপাশে আরেকটা বাড়ি। ঐ বাড়ির লোকজনকে কখনও এবাড়িতে আসতে দেখিনি। 


আমি আর অভ্র যখন পালিয়ে এসে বিয়ে করে থাকার জন্য ভাড়া বাসা খুজছিলাম তখন একজন আমাদের এই বাড়ির সন্ধান দিয়েছিল। সুন্দর সাজানো গোছানো পরিপাটি বাড়ি, আবার ভাড়াও কম।


এই বাড়িতে আসার পরে আমাদের সবকিছু বুঝিয়ে দেয় এক বৃদ্ধ চাচা। বয়স প্রায় সত্তর পচাত্তরের মাঝামাঝি। চুলদাড়ির সাথে পাকা ভ্রুতে বেশ অদ্ভুত লাগছিল চাচাকে। চাচা আমাদের জানায়– এ বাড়ির মালিক স্ব পরিবারে অনেক বছর আগে লন্ডন চলে গেছে বাড়িটা দেখাশোনার দায়িত্ব তাকে দিকে। সেই থেকে সে এই বাড়ির দেখাশোনা করে আসছে। এই বাড়ি থেকে চাচার বাড়ি প্রায় দুই কিলোমিটার, পায়ে হেটে আসতে যেতে হয়। এই বয়সে এখন এটা কষ্টকর। তাই তিনি চান বাড়িটা কারো কাছে ভাড়া দিতে যারা এখানে থাকবে এবং বাড়িটার দেখাশোনা করবে।


আমি প্রশ্ন করলাম– তাহলে আপনি কেন আপনার পরিবার নিয়ে এতসুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িতে থাকছেননা?


চাচার চোখেমুখে কেমন অস্বস্তির ভাব ফুটে উঠলো, তিনি কথা ঘুরিয়ে বললেন– তোমরা যদি থাকতে চাও তাহলে এখানে নিরিবিলি থাকতে পারো। অল্প কটাকা ভাড়া দিলেই চলবে। আর হ্যা পুকুরপাড়ের ঐ রক্তজবা গাছের বাগানটার দিকে তেমন যেওনা। 


রক্তজবার বাগানের কথা শুনে খটকা লাগলেও যেহেতু আমরা পালিয়ে এসেছি, অভ্রর পকেটেও তেমন টাকাকড়ি নেই তাই এতবেশী না ভেবে আমরা এই বাড়িতে বসবাস শুরু করলাম। চাচারও যেন কষ্ট লাঘব হলো। এখন মাঝেমধ্যে এসে ঘুরে যায়।


সেই থেকে আমরা এই নিরিবিলি অদ্ভুত বাড়িতে আছি দুজন।


বাইরের বাতাসের গতি যেন বেড়েই চলছে সেই সাথে তাল মিলিয়ে ঝুম বৃষ্টি। 


হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো রুম জুড়ে মৃত্যুপুরীর অন্ধকার। অভ্র মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে দিয়াশলাই দিয়ে হারিকেনের ফিতায় আগুন ধরিয়ে চিমনি লাগাতে লাগাতে বললো– আজ এই রোমান্টিক ওয়েদার কিন্তু প্রকৃতি আমাদের উপহার দিয়েছে বউ, মিস করা যাবেনা। এই ওয়েদার কাছে আসার এবং ভালোবাসার। 


এদিকে আমার বুক দুরুদুরু করতে শুরু করেছে, সত্যি যদি অভ্র কাছে আসতে চায়।


হারিকেনের নিভু নিভু আলোয় পুরো নব্বই দশকের ফিল পাচ্ছি, মনে হচ্ছে আমরা অনেকটা সময় পিছিয়ে সেই সোনালী যুগে চলে এসেছি। বেশ দারুণ লাগছে ব্যপারটি। এবাড়ির মালিক হয়তো খুব সৌখিন, পুরনো আমলের অনেক কিছুই বেশ যত্নে সংরক্ষিত আছে এ বাড়িতে।


হারিকেনর তেজ বাড়িয়ে মোবাইলের ফ্লাস জ্বালিয়ে অভ্র চলে গেল কিচেনে। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুই হাতে দুই কাপ গরম গরম চা নিয়ে ফিরলো। আমি দেখে ভীষণ অবাক। 


অভ্র মুচকি হেসে বললো– এরকম রোমান্টিক ওয়েদারে সবাই বউয়ের হাতের গরম গরম চা খেতে চায়। কিন্তু আমি আমার হাতে চা বানিয়ে বউকে খাওয়াচ্ছি। একটু তো ডিফরেন্ট হওয়া উচিৎ বলো। তোমার জামাই বলে কথা। 


আমার এত আনন্দ অনুভব হলো বলে বোঝানো অসম্ভব, সবাই তো এরকম একটা কেয়ারিং হাসব্যান্ড এর সপ্নই দ্যাখে। সেই হিসেবে অভ্রকে পেয়ে আমি নিজেকে সবসময় ভাগ্যবতী মনে করি।


অভ্র খাটের পাশের জানালার কাছে গিয়ে বসে আমায় ডাকলো। আমি গিয়ে অভ্রর গা ঘেঁষে বসলাম। একটা পাতলা কাঁথা টেনে অভ্র আমাদের দুজনের গায়ে জড়িয়ে আমার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিলো। তারপর জানালার কপাট খুলতেই হুহু করে বাইরের বৃষ্টি ভেজা শীতল হাওয়া ভেতরে এসে আমাদের শীতল স্পর্শে ছুয়ে দিতে লাগলো।


আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি অভ্রর দিকে, কত সুনিপুণ ভাবে প্রকৃতির সাথে নিজের অনুভূতি মিশিয়ে মুহূর্তগুলো স্বর্গ সুখের করে তুলেছে অভ্র। 


আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে অভ্র আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো– মুহুর্ত গুলো গরম গরম ধোঁয়াওঠা চায়ের কাঁপে চুমুক দিয়ে উপভোগ করো বউ, এত ভাবনায় ডুবলে চা ঠান্ডা হয়ে যাবে যে।


বাইরে ঘোর কালো অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকানোর ক্ষণস্থায়ী আলোর লুকোচুরি, মেঘের গর্জনে পৃথিবী কেঁপে উঠছে ক্ষানিক বাদে বাদে। চোখের সামনে এমন দৃশ্য আর ধোঁয়াওঠা চায়ের কাঁপে চুমুক দিয়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই যে।


আমি খেয়াল করছি অভ্র ধীরে ধীরে আমাকে জড়িয়ে নিচ্ছে, ঠিক এমন সময় পেছনে টেবিলের ওপর রাখা হারিকেনটা হঠাৎ স্ব শব্দে মেঝেতে পড়ে চিমনি ভাঙ্গার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। আমরা দুজনেই লাফিয়ে উঠলাম। ভয়ে অভ্রকে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম...


চলবে...

ছায়া_মানব_পর্ব-১৬


১৬.

সকালে ফ্রেস হয়েই অহনা ব্যাগ গোছাতে থাকে। রোস্তম এসেই মেয়েকে ব্যাগ গোছাতে দেখে জিজ্ঞেস করে। কিছু বলে না অহনা। তৈরি হয়ে অন্যদের বলল,' তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে। আজকেই চলে যাব।'


রোস্তম বাধা দিয়ে বলে,' নারে মা, আর কয়দিন পর না হয় যাবি। এখন যাস না।'


' না বাবা, পরীক্ষা আছে আমার। তুমিও চলো, আমি কি একা রেখে যাব নাকি তোমাকে?'


' আমি এই বাড়ি ছেড়ে কীভাবে যাব। তুই আর দুদিন পর যাস।'


অহনা নারাজ। বাবাকে নিয়ে সে চলে যাবে। হ্যারি বলল,' গ্রামে কখনো আসা হয়না। একদিন অন্তত থাক। এলাকাটা ঘুরে দেখি আমরা।'


' এখানের পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের বিপরীত। এখানে থাকা মানেই বিপদ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে গেলেই ভালো হয়।'


মাহতিম পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। বুকের সাথে হাত দুটো ভাঁজ করে এক পাশে দেয়ালের সাথে ঠেস মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলল না। অহনার দিকে তাকিয়ে আছে সে। অহনা এক নজর মাহতিমকে দেখেই আবার চোখ সরিয়ে নেয়। 

ইরা একদম যেতে নারাজ। রোস্তমকে বলল,' আঙ্কেল, ওকে চলে যেতে বলুন, আমরা থাকব।' তারপর অহনার দিকে তাকিয়ে বলে,' তুই যেতে পারিস, আমরা কিছু বলব না। পারলে এখুনি চলে যা। আমরা থাকব আঙ্কেলের সাথে।'


অহনা চোখ রাঙায় ইরাকে। ইরা দমে যায়। রুমি বলেই ফেলল,' তুই আমাদের বের করে দিতে চাস নাকি তোদের বাড়ি থেকে?'


অহনা করুণ চোখে তাকায় রুমির দিকে,' ছি, কি বলছিস এসব? দেখলি না কতকিছু ঘটে গেল এখানে। আমরা গেলেই মঙ্গল হবে। তোদের কথা ভেবেই ভয় পাচ্ছি। আমার কিছু হয়ে গেলে সমস্যা নেই, কিন্তু তোদের কিছু হলে আমি আঙ্কেল আন্টিকে কি জবাব দেব? তোদের ক্ষতি হোক আমি চাই না। আমাকে ভুল বুঝিস না।'


অহনা মাহতিমের দিকে চোখ দিতেই সে ইশারায় ডাকে। অহনা নজর দেয় না তার দিকে। গোছগাছ প্রায় শেষ। নাস্তা করেই র‌ওনা দেবে। 


অহনা কল পাড়ে যায় হাত-মুখ ধুঁতে। কল পাড় পিচ্ছিল খুব। পা দিতেই উল্টে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতেই একটি শক্তপোক্ত হাত ওকে ধরে নেয়। মাহতিম বলল,' সামলে চলবে। এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?'


' তুমি জানো না, এখানে পদে পদে বিপদ লুকিয়ে আছে। আমাদের যাওয়া উচিত। তুমিও তৈরি হ‌ও।'


' আমি কেন?'


' তাহলে ঠিক আছে, যক্ষ হয়ে এই বাড়ি পাহারা দাও।'


' আমি বলতে চেয়েছি, আমি কি তৈরি হবো?'


' আমিতো ভুলেই গিয়েছি তুমি কখনো ফ্রেস হ‌ও না। সবসময় এক‌ই ড্রেস, কিছু খেতেও দেখি না। অদ্ভুত তুমি! অথচ তোমার কাছে গেলেই কেমন নেশালো গন্ধ পাই। তোমার হরমোনের প্রভাব পড়ে আমার উপর। মানে আমি বলতে চেয়েছি, তোমার গায়ের স্মেলটা আমার ভালো লাগে। আমাকে তোমার দিকে টানে। ইচ্ছে করে সারাজীবন তোমার সাথে ঐ মুহুর্তকে থামিয়ে কাটিয়ে দিই। কিন্তু এটা হ‌ওয়ার নয়। আমি.....'


অহনাকে থামিয়ে দিয়ে মাহতিম বলল,

' তোমার কি বলা শেষ?'


' না আরো অনেক কিছু বলার আছে, সেটা শোনার সময় হয় না তোমার।'


' এখন বলবে?'


' বলব না। তুমি শোনার যোগ্য না।'


' আচ্ছা শুনো!'


অহনা পেছনে তাকিয়ে দেখল ইরা এসে গেছে। ইরা অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' একা একা কার সাথে কথা বলছিস? এখানেতো কেউ নেই। তোকে বার বার দেখছি কারো সাথে কথা বলছিস, আদৌ কেউ নেই। বিষয়টা ভাবাচ্ছে আমাকে।'


' এদিকে তাকা!'


অহনা হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল একটা বিড়ালকে, বলল,'এই বিড়ালটার সাথে কথা বলছিলাম। গম্ভীর থাকে সবসময়। ইচ্ছে করে তার গলা টিপে দেই।'


' ওফফ্ তোর যা ইচ্ছা কর। আমি যাচ্ছি।'


ইরা চলে যেতেই মাহতিম বলল,' আমাকে কি তোমার বিড়াল মনে হয়?'


' ইশশ্, তার মানে বুঝে গেছ এটা তুমি? আমি কিন্তু বলিনি একবার‌ও। নিজেকেই নিজে বিড়াল বললে।'


' তুমি একটু বেশিই বুঝ।'


' কারণ আমার ব্রেইন ভালো।'


' একদম না।'


' প্রমাণ চাই নাকি তোমার?'


' হ্যাঁ চাই, আমার জানামতে তোমার ঘটে বুদ্ধি নেই।'


' কি প্রমাণ দিতে হবে?'


' বুদ্ধিমান হলে এখান থেকে যেতে না। আর কয়টা দিন থেকে যেতে। বুদ্ধি নেই বলেই চলে যেতে চাইছো!'


' এটা কেমন কথা হলো?'


' যা বলছি ঠিক বলছি। দেখো আহি, তোমার মা চলে গেছে বেশিদিন হয়নি। এখন পিতৃভূমি ছেড়ে চলে গেলে লোকে কথা শোনাবে। তুমি জানো না লোকের কথা কতটা বিষাক্ত হয়। এখানে থাকাটা উত্তম হবে।'


অহনা চমকে উঠে, আহি? আহি কে? তুমি কি আমাকে আহি বলে ডাকলে নাকি?'


মাহতিম আমতা আমতা করে বলে,' আসলে, তোমার নামটা ছোট করে নিয়েছি। অহনা থেকে আহি।'


' ওহ, ঠিক আছে, আমি যাব না। কিছুদিন থেকে যাই আরো। খুশিতো এবার তুমি?'


' বুদ্ধিমানের মতো কাজ করলে।'


' এদিকে আস। আমি কেমন বুদ্ধিমান তোমাকে দেখাবো।'


মাহতিম চলে যায়। আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। অহনা হেসে উঠে। 

ঘরে গিয়ে সবাইকে একবার গম্ভীর মুখে পর্যবেক্ষণ করে দেয় অহনা। মুখে হাসি নেই কারো। চলে যাবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে।

অহনা খাটের উপর পা ছড়িয়ে বসে বলল,' বৃষ্টি আসবে আজকে।'


' টিকু বলল,' হ্যাঁ, সেই বৃষ্টিতে মাছ পড়বে প্রচুর, সেটা তুই ধরবি আর গালে ফুরবি।'


' আমরা যাচ্ছি না কোথাও।'


অহনার কথায় সবাই সচকিত হয়ে উঠে। রুমি আয়েশি ভঙ্গিতে বলে,' কি বললি এখন? আমরা যাচ্ছি না ফিরে?'


' কানে এয়ারফোন নেই, তাও শুনতে কষ্ট হচ্ছে নাকি তো। এক কথা দুইবার বলব না‌।'


রুমি মন খারাপ করে নিতেই অহনা তার কাছে এসে হেসে বলল,' চলো এবার, পার্টি করি‌। অনেক মজা হবে।'


অহনার ভিন্ন রূপ দেখে সবাই আনন্দিত হয়ে উঠে। আজকাল তাকে একটু বেশি গম্ভীর বা হাসিখুশি মনে হয়। আগে তেমন ছিল না।


সবাই মিলে বের হয় গ্রাম ঘুরে দেখতে। অহনা সবার থেকে আলাদা হাঁটছে, পেছনে। হ্যারি, টিকু, রুমি, ইরা অনেক এক্সাইটেড। মাঝে মাঝে অহনাকে বলছে, কিন্তু তার কর্ণপাত নেই। একেতো গ্রাম তার আগের পরিচিত অন্যদিকে মাহতিমের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে সে‌। 


হাঁটার সময় অহনার মনে হলো কেউ তার পিছু নিয়েছে। পেছন ফিরে দেখল কেউ নেই। মাহতিম তার পাশেই হাঁটছে, বলল,' কি হলো?'


অহনা নিজেকে ঠিক রেখে বলল,' কিছু না।'


আবারো অহনার মনে হলো কেউ পেছনে। গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, বাঁশঝাড় অগণিত। কেউ থাকলেও তাকে দেখা যাবে না। অহনা বার বার পেছনে দেখছে। এক পর্যায়ে মাহতিমকে বলল,' তুমি কি পেছনে কাউকে দেখতে পাচ্ছ?'


মাহতিম পেছনটায় ভালো করে চোখ বুলিয়ে বলল,' না, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।'


' ওহ।'


ইরা অহনার সামনে থাকায় ওর কথা সব শুনতে পায়। একা একা কারো সাথে কথা বলতে দেখে ইরা আরো ঘাবরে যায়। ভাবে, হয়তো জিনে আছর করেছে অহনাকে। না হয় এতবার একা একা কথা বলে কেন? 


অহনা আবারো বিরক্ত হয়, কেউ তার পিছু নিয়েছে সেটা বেশ ভালো বুঝতে পেরেছে। মাহতিম‌ও অহনার দুশ্চিন্তার জন্য সতর্ক দৃষ্টি দেয়। একটু পর‌ই অহনাকে বলল,' কেউ তোমাদের অনুসরণ করছে।'


অহনা ব্রু কুঁচকে ফেলে,' কেউ কেন অনুসরণ করবে?'


' আমার জানা নেই। খুব শিঘ্রই সে সামনে আসবে।'


' কে সে?'

  


চলবে....

ছায়া_মানব_পর্ব-২১

  অহনা জানালার কাছে যেতেই মতি এগিয়ে আসে। অহনা জানালা বন্ধ করে দিতে চাইলে মতি ধরে ফেলে, '‌আমাকে দেখতে ভালো লাগে না, সেটা না হয় মানলাম। ...