মাহতিম কিছু বলল না। উত্তর দিতে সে অনিচ্ছুক। অহনার হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে গেল।
ক্লান্ত থাকার দরুন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। অহনা এপাশ-ওপাশ করে। ঘুম আসছে না তার। হাজারটা প্রশ্ন মনে। উঠে পড়ে বিছানা থেকে। দরজা খুলে বাইরে বের হয়। মাহতিম তার কাঁধে হাত রাখে,
' যাচ্ছ কোথাও?'
অহনার চুপ করে থাকে। মাহতিম পুনরায় প্রশ্ন করে,' বের হলে কেন?'
অহনা কিছু না বলে হাঁটা ধরল। কিছুক্ষণ পরেই মুখ খুলে,
' ভাবছি তোমার মতো কম কথা বলব। কথা কম কাজ বেশি।'
' কিন্তু গন্তব্য কোথায়?'
' দেখতেই পাবে।'
অহনা নদীর পাড়ে গিয়ে থামে। পূর্ণিমা প্রখর থাকায় চারিদিকটা খুব ভালোই দেখতে পাচ্ছে। নদীতে নেমে পড়ে অহনা। মাহতিম তাকে বাঁধা দেয় না। আপনমনে অহনা পানিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে। একটু পর উঠে এসে মাহতিমের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে,' কে তুমি?'
মাহতিম দূরে তাকিয়ে বলে,' মাহতিম।'
' আমি তোমার পরিচয় জানতে চেয়েছি। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছো? কেন এসেছো? আমাকে কেন সাহায্য করছো? কি সম্পর্ক আমাদের মধ্যে? এসব উত্তর জানতে চাই আমি।'
' জেনে গিয়ে কি করবে?'
' সেটা তোমার না জানলেও চলবে। আপাতত নিজের পরিচয় দাও।'
' এই মুহূর্তে আমার কোনো পরিচয় নেই। না আর কখনো থাকবে!'
অহনা ভাবে, বলল,' তোমার কথা কখনোই আমি পুরোপুরি বুঝি না। কি বলতে চাও তা স্পষ্ট করে বলো না কেন? আমার হাঁসফাঁস লাগে, তোমার মধ্যে আমি অন্যরকম কিছু দেখতে পাই।'
' সেটাই, যেটা অপূর্ণ ছিল।'
অহনা মাহতিমের কাঁধ স্পর্শ করে। কিন্তু ছুঁতে পারে না। আকুতি জড়ানো কন্ঠে বলে,' আমি তোমাকে ছুঁতে চাই।'
মাহতিম কিছুটা দূরে সরে যায়। অহনা আবারো এগিয়ে আসে, তুমি কেন এমন অদৃশ্য হয়ে থাকো? পাশে থাকলেও অস্তিত্ব নেই। আমার কেন জানি না ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।'
'কিসের কষ্ট তোমার?'
' জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে আমি স্বশরীরে দেখতে চাই। দেখা দাও।'
অহনার কথায় মাহতিম কোমল হয়ে আসে। দৃশ্যমান হলো আস্তে আস্তে। অহনার কাঁধ স্পর্শ করতেই সে ব্যথায় শব্দ করে উঠে।
' ব্যথা হচ্ছে খুব তাই না?' মাহতিম কোমল স্পর্শে বলল।
' এখন ব্যথা নেই।'
' আর থাকবেও না। আমি উপশম করে দিলাম।'
মুহুর্তেই সকল ব্যথা উধাও হয়ে যায় অহনার। মাহতিমের স্পর্শের জাদুতে শরীর তার চাঙ্গা হয়ে উঠে।
মাহতিম বলল,'তোমাকে একা রেখে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি আমার। আমি না গেলে এতকিছু ঘটত না।'
' নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন? দোষী আমি। আমি রেগে গিয়ে বের করে দিয়েছি।'
মাহতিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,' জীবনটা আরেকটু দীর্ঘ হলে কি হতো?'
অহনা বুঝতে পারে না তার কথা,
' তোমার জীবনটা আছে কিনা সেটাও জানি না আমি। তুমি কি? আদৌ মানুষ নাকি অদৃশ্য কিছু? আমি বুঝতে পারি না।'
অহনার মাহতিমের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে তার খুব চেনা মনে হয়, তবুও মনে করতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই চোখের দিকে সে আগেও তাকিয়ে ছিল। অনেক কথা জমা রয়েছে এই চোখে। অহনা বলল,' তুমি কেন সবসময় অদৃশ্য থাকো? কেন লোকের সম্মুখে আসো না? তোমার কি কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না?'
' যতবার আমি দৃশ্যমান হব। ততবার আমার শক্তি একটু একটু করে শেষ হয়ে যাবে। দুটো কাজের জন্য আমি এসেছি। সেগুলো শেষ না হতেই শক্তি শেষ হয়ে গেলে দুর্ভোগ নেমে আসবে।'
অহনা প্রশ্ন করে,' কোন দু'টো কাজ? কেন দুর্ভোগ নেমে আসবে?'
' খুব শিঘ্রই জানতে পারবে।'
হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করে। ভিজে থাকার কারণে অহনার শীত করে। আস্তে আস্তে তা আরো জোড়ালো হয়। শীতে দাঁতে দাঁত চেপে আছে অহনা। অহনা মাহতিমের দিকে তাকিয়ে দেখল, সে একমনে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। রাগে ফুঁসে উঠে বলল,' কখনো কি বাংলা সিনেমা দেখেছ?'
মাহতিম অবাক হয়ে বলে,' না! আমি পছন্দ করতাম না।'
' পছন্দ করতে না মানে? যাই হোক, সেজন্যই এই অবস্থা।'
' কি হয়েছে?'
' তুমি তো দেখনি, বলে কি করব?'
' বলো?'
' সিনেমায় নাইকার শীত করলে নায়ক তার শার্ট খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দেয়। ছেলেদের শীত লাগে না বেশি তাই আরকি।'
মাহতিম হেঁসে উঠল। অহনা বিভোর হয়ে সে হাসি দেখে। গম্ভীর এই লোকটার হাসি তার ভীষণ রকমের ভালো লেগে যায়। অনেকদিন পর বলে হয় সে হাসল। অহনা বলল,' আমি হাসির কথা বলিনি। তোমার উচিত আমাকে সাহায্য করা।'
' তুমি শার্ট চেয়েছো, কিন্তু আমিতো শার্ট গায়ে দেইনি।'
' দেখতেই পাচ্ছি। তুমি এমন গাঢ় পাঞ্জাবি কেন পরেছ? বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছ মনে হয়। তুমি কি গোসল করো না? সবসময় এটাই দেখি যে।'
' এটা মানুষদের জন্য প্রযোজ্য। ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার। বাড়ি যাওয়া উচিত।'
' আমার অনেক শীত করছে। পারব না যেতে।'
মাহতিম অহনার কাছে আসে। তার ভেজা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দেয়। দুই কাঁধে হাত রাখে। অহনা কিছুটা সরে যেতে চাইলেই মাহতিম আরো শক্ত করে নিজের দিকে টেনে আনে। কোমরে এক হাত রেখে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। অহনা শিউরে উঠে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ছোটার চেষ্টা করছে না, এই অনুভূতি তার ভালো লাগছে। ঠোঁট দুটো ঝাঁকি দিয়ে উঠে অহনার। কেমন দিশেহারা ভাব তার মধ্যে। চোখ বন্ধ করে নেয়।
মাহতিম অহনাকে শক্ত করে ধরে আছে। অহনা চোখ খুলতেই চোখাচোখি হয় মাহতিমের। লজ্জার ভাব স্পষ্ট। দৃষ্টি দিতে পারছে না। এখন তার ঠান্ডা লাগছে না। মাহতিমের শরীরের ওম তার শরীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অহনার গরম নিঃশ্বাস বারি খাচ্ছে মাহতিমের চওড়া বুকে।
গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি নেশা করে পুরনো পোড়া বাড়িটা থেকে বের হয়। সাথে তার চার সঙ্গি। ড্রাগের নেশায় তারা পাঁচজন ঢুলছে। তাদের মনে হচ্ছে, পিঠে একটা ডানা লাগিয়ে দিলেই হয়তো তারা উড়তে পারবে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তায় পা বাড়ায়। ওদের মধ্যে একজন উপরে তাকাতেই অহনাকে দেখতে পায়। চোখ কচলে মতিনকে জিজ্ঞেস করে,' গুরু! মানুষ কি আকাশে উড়ে?'
মতি হেসে উঠে,' হ উড়ে। আমার মতো করে।'
' না গুরু! তুমিতো নিচে। আকাশেও মানুষ উড়ে।'
' শা* আমি উড়ছি দেখে নে।'
' তুমি না। একটা সুন্দরী মেয়ে। মেয়েরাও পাখি হয়, উড়ে যায়।'
মতি উপরে তাকায়। অহনাকে দেখেই মুহুর্তেই আরো জোরে হেসে উঠে,' মেয়েটা উড়ছে দেখ। এটা পাখি, আমার উরন্ত পাখি।'
গান ধরে, এক মুহুর্তের জন্য মাথা ঝাঁকি দিয়ে আবারো দেখে। কেমন সন্দেহ হয় তার। ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে চোখে-মুখে পানি দেয়। ফ্রেস হয়ে আবার দেখতে পায় উরন্ত অহনাকে। মাহতিমকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছে অহনাকে। অহনা উড়ছে দেখে মতি বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। দূরে সরে যাচ্ছে অহনা। আরজ কিছুটা কাছে গিয়ে দেখে নেয়। অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। ভাবছে নেশার কারণে এটা হচ্ছে। আবারো পানি দেয় চোখে-মুখে।
না সে সত্যি দেখছে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' আমি যা দেখছি তোরাও কি তাই দেখছিস?'
' হ গুরু। মেয়েটা উড়ছে। কিন্তু কিভাবে? পাখি উড়তে দেখেছি, আজ প্রথম মেয়ে উড়তএ দেখলাম।'
মতি নিজেকে সামলে নেয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বিষয়টা সে জেনেই ছাড়বে.....
চলবে.....