Ads

https://www.cpmrevenuegate.com/b8yhybmrq8?key=9f4e3679f1c8c81a3529870bf1b4e18f

সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৫



মাহতিম কিছু বলল না। উত্তর দিতে সে অনিচ্ছুক। অহনার হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে গেল।


ক্লান্ত থাকার দরুন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। অহনা এপাশ-ওপাশ করে। ঘুম আসছে না তার। হাজারটা প্রশ্ন মনে। উঠে পড়ে বিছানা থেকে। দরজা খুলে বাইরে বের হয়‌। মাহতিম তার কাঁধে হাত রাখে,

' যাচ্ছ কোথাও?'


অহনার চুপ করে থাকে। মাহতিম পুনরায় প্রশ্ন করে,' বের হলে কেন?'


অহনা কিছু না বলে হাঁটা ধরল। কিছুক্ষণ পরেই মুখ খুলে,

' ভাবছি তোমার মতো কম কথা বলব। কথা কম কাজ বেশি।'


' কিন্তু গন্তব্য কোথায়?'


' দেখতেই পাবে।'


অহনা নদীর পাড়ে গিয়ে থামে। পূর্ণিমা প্রখর থাকায় চারিদিকটা খুব ভালোই দেখতে পাচ্ছে। নদীতে নেমে পড়ে অহনা। মাহতিম তাকে বাঁধা দেয় না। আপনমনে অহনা পানিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে। একটু পর উঠে এসে মাহতিমের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে,' কে তুমি?'


মাহতিম দূরে তাকিয়ে বলে,' মাহতিম।'


' আমি তোমার পরিচয় জানতে চেয়েছি। কে তুমি? কোথা থেকে এসেছো? কেন এসেছো? আমাকে কেন সাহায্য করছো? কি সম্পর্ক আমাদের মধ্যে? এসব উত্তর জানতে চাই আমি।'


' জেনে গিয়ে কি করবে?'


' সেটা তোমার না জানলেও চলবে। আপাতত নিজের পরিচয় দাও।'


' এই মুহূর্তে আমার কোনো পরিচয় নেই। না আর কখনো থাকবে!'


অহনা ভাবে, বলল,' তোমার কথা কখনোই আমি পুরোপুরি বুঝি না। কি বলতে চাও তা স্পষ্ট করে বলো না কেন? আমার হাঁসফাঁস লাগে, তোমার মধ্যে আমি অন্যরকম কিছু দেখতে পাই।'


' সেটাই, যেটা অপূর্ণ ছিল।'


 অহনা মাহতিমের কাঁধ স্পর্শ করে। কিন্তু ছুঁতে পারে না। আকুতি জড়ানো কন্ঠে বলে,' আমি তোমাকে ছুঁতে চাই।'


মাহতিম কিছুটা দূরে সরে যায়। অহনা আবারো এগিয়ে আসে, তুমি কেন এমন অদৃশ্য হয়ে থাকো? পাশে থাকলেও অস্তিত্ব নেই। আমার কেন জানি না ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।'


'কিসের কষ্ট তোমার?'


' জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে আমি স্বশরীরে দেখতে চাই। দেখা দাও।'


অহনার কথায় মাহতিম কোমল হয়ে আসে। দৃশ্যমান হলো আস্তে আস্তে। অহনার কাঁধ স্পর্শ করতেই সে ব্যথায় শব্দ করে উঠে।


' ব্যথা হচ্ছে খুব তাই না?' মাহতিম কোমল স্পর্শে বলল।


' এখন ব্যথা নেই।'


' আর থাকবেও না। আমি উপশম করে দিলাম।'


মুহুর্তেই সকল ব্যথা উধাও হয়ে যায় অহনার। মাহতিমের স্পর্শের জাদুতে শরীর তার চাঙ্গা হয়ে উঠে।


মাহতিম বলল,'তোমাকে একা রেখে বাইরে যাওয়া উচিত হয়নি আমার। আমি না গেলে এতকিছু ঘটত না।'


' নিজেকে দোষ দিচ্ছ কেন? দোষী আমি। আমি রেগে গিয়ে বের করে দিয়েছি।'


মাহতিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,' জীবনটা আরেকটু দীর্ঘ হলে কি হতো?'


অহনা বুঝতে পারে না তার কথা,

' তোমার জীবনটা আছে কিনা সেটাও জানি না আমি। তুমি কি? আদৌ মানুষ নাকি অদৃশ্য কিছু? আমি বুঝতে পারি না।'


অহনার মাহতিমের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে তার খুব চেনা মনে হয়, তবুও মনে করতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই চোখের দিকে সে আগেও তাকিয়ে ছিল। অনেক কথা জমা রয়েছে এই চোখে। অহনা বলল,' তুমি কেন সবসময় অদৃশ্য থাকো? কেন লোকের সম্মুখে আসো না? তোমার কি কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না?'


' যতবার আমি দৃশ্যমান হব। ততবার আমার শক্তি একটু একটু করে শেষ হয়ে যাবে। দুটো কাজের জন্য আমি এসেছি। সেগুলো শেষ না হতেই শক্তি শেষ হয়ে গেলে দুর্ভোগ নেমে আসবে।'


অহনা প্রশ্ন করে,' কোন দু'টো কাজ? কেন দুর্ভোগ নেমে আসবে?'


' খুব শিঘ্রই জানতে পারবে।'


হঠাৎ বাতাস ব‌ইতে শুরু করে। ভিজে থাকার কারণে অহনার শীত করে। আস্তে আস্তে তা আরো জোড়ালো হয়। শীতে দাঁতে দাঁত চেপে আছে অহনা। অহনা মাহতিমের দিকে তাকিয়ে দেখল, সে একমনে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। রাগে ফুঁসে উঠে বলল,' কখনো কি বাংলা সিনেমা দেখেছ?'


মাহতিম অবাক হয়ে বলে,' না! আমি পছন্দ করতাম না।'


' পছন্দ করতে না মানে? যাই হোক, সেজন্য‌ই এই অবস্থা।'


' কি হয়েছে?'


' তুমি তো দেখনি, বলে কি করব?'


' বলো?'


' সিনেমায় নাইকার শীত করলে নায়ক তার শার্ট খুলে তার গায়ে জড়িয়ে দেয়। ছেলেদের শীত লাগে না বেশি তাই আরকি।'


মাহতিম হেঁসে উঠল। অহনা বিভোর হয়ে সে হাসি দেখে। গম্ভীর এই লোকটার হাসি তার ভীষণ রকমের ভালো লেগে যায়। অনেকদিন পর বলে হয় সে হাসল। অহনা বলল,' আমি হাসির কথা বলিনি। তোমার উচিত আমাকে সাহায্য করা।'


' তুমি শার্ট চেয়েছো, কিন্তু আমিতো শার্ট গায়ে দেইনি।'


' দেখতেই পাচ্ছি। তুমি এমন গাঢ় পাঞ্জাবি কেন পরেছ? বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছ মনে হয়। তুমি কি গোসল করো না? সবসময় এটাই দেখি যে।'


' এটা মানুষদের জন্য প্রযোজ্য। ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার। বাড়ি যাওয়া উচিত।'


' আমার অনেক শীত করছে। পারব না যেতে।'


মাহতিম অহনার কাছে আসে। তার ভেজা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দেয়। দুই কাঁধে হাত রাখে। অহনা কিছুটা সরে যেতে চাইলেই মাহতিম আরো শক্ত করে নিজের দিকে টেনে আনে। কোমরে এক হাত রেখে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। অহনা শিউরে উঠে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ছোটার চেষ্টা করছে না, এই অনুভূতি তার ভালো লাগছে। ঠোঁট দুটো ঝাঁকি দিয়ে উঠে অহনার। কেমন দিশেহারা ভাব তার মধ্যে। চোখ বন্ধ করে নেয়। 

মাহতিম অহনাকে শক্ত করে ধরে আছে। অহনা চোখ খুলতেই চোখাচোখি হয় মাহতিমের। লজ্জার ভাব স্পষ্ট। দৃষ্টি দিতে পারছে না। এখন তার ঠান্ডা লাগছে না। মাহতিমের শরীরের ওম তার শরীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অহনার গরম নিঃশ্বাস বারি খাচ্ছে মাহতিমের চ‌ওড়া বুকে।


গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি নেশা করে পুরনো পোড়া বাড়িটা থেকে বের হয়। সাথে তার চার সঙ্গি। ড্রাগের নেশায় তারা পাঁচজন ঢুলছে। তাদের মনে হচ্ছে, পিঠে একটা ডানা লাগিয়ে দিলেই হয়তো তারা উড়তে পারবে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তায় পা বাড়ায়। ওদের মধ্যে একজন উপরে তাকাতেই অহনাকে দেখতে পায়। চোখ কচলে মতিনকে জিজ্ঞেস করে,' গুরু! মানুষ কি আকাশে উড়ে?'


মতি হেসে উঠে,' হ উড়ে। আমার মতো করে।'


' না গুরু! তুমিতো নিচে। আকাশেও মানুষ উড়ে।'


' শা* আমি উড়ছি দেখে নে।'


' তুমি না। একটা সুন্দরী মেয়ে। মেয়েরাও পাখি হয়, উড়ে যায়।'


মতি উপরে তাকায়। অহনাকে দেখেই মুহুর্তেই আরো জোরে হেসে উঠে,' মেয়েটা উড়ছে দেখ। এটা পাখি, আমার উরন্ত পাখি।'

গান ধরে, এক মুহুর্তের জন্য মাথা ঝাঁকি দিয়ে আবারো দেখে। কেমন সন্দেহ হয় তার। ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে চোখে-মুখে পানি দেয়। ফ্রেস হয়ে আবার দেখতে পায় উরন্ত অহনাকে। মাহতিমকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখতে পাচ্ছে অহনাকে। অহনা উড়ছে দেখে মতি বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। দূরে সরে যাচ্ছে অহনা। আরজ কিছুটা কাছে গিয়ে দেখে নেয়। অদ্ভুত লাগছে তার কাছে। ভাবছে নেশার কারণে এটা হচ্ছে। আবারো পানি দেয় চোখে-মুখে। 

না সে সত্যি দেখছে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,' আমি যা দেখছি তোরাও কি তাই দেখছিস?'


' হ গুরু। মেয়েটা উড়ছে। কিন্তু কিভাবে? পাখি উড়তে দেখেছি, আজ প্রথম মেয়ে উড়তএ দেখলাম।'


 মতি নিজেকে সামলে নেয়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বিষয়টা সে জেনেই ছাড়বে.....


চলবে.....

বৃহস্পতিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৩

ভয়_পর্ব-০১

 –“ আমার পিরিয়ড চলছে অভ্র ”– এই কথা বলে আজ পরাপর দুই রাত নিজেকে অভ্রর থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি আমি। যদিও আমরা এখন স্বামী স্ত্রী তারপরও এরকম করার কারণ হলো কেউ একজন বলেছিল আমার ফুলশয্যার রাতে আমার স্বামীর মৃত্যু হবে। 


ফুলশয্যার রাতেই আমার স্বামীর মৃত্যু হবে এই কথাটা নাকি কোনো একজন বলেছিল আমার মাকে। সেই কারণে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরেও পরিবার থেকে কখনোই আমার বিয়ে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিলনা পরিবারের।


অবশ্য এই কথা আমাকে আর কেউ না বললেও আমার দাদী বলেছিল আমায়। সেই থেকে আমিও বিয়ের চিন্তাভাবনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার কারণে একজনের মৃত্যু হবে এটা কোনদিনই আমি চাইনি। ভেবেছি আজীবন নাহয় কুমারী হয়ে কাটাবো। সবার থেকে একটু ভিন্ন জীবনযাপন হবে আমার। সবাই স্বামীর সংসার করার স্বপ্ন দেখে সেটা সত্যি করে। আমি নাহয় স্বপ্নই দেখে যাবো।


ঐসব ঘর সংসারের আশা বাদ দিয়ে যখন স্বপ্নহীন দিন পার করছি তখন একদিন হঠাৎ করে জীবনে আসে অভ্র তারপর পাল্টে যায় পুরো গল্পটা। 


সেই সন্ধ্যায় বড়ো খালার বাড়িতে বিয়ের আনন্দে পুরো ধুমধাম। বড়ো খালার বড়ো মেয়ে মানে আমার খালতো বোন নুপুরের বিয়ে। 


সন্ধ্যায় বরযাত্রী আসতেই গেট ধরে বরযাত্রীদের একেবারে নাজেহাল করে ছাড়লাম আমরা সব ভাইবোন মিলে। সেইসময়ও অভ্র উপস্থিত ছিল কিন্তু বিশেষ ভাবে চোখে পড়ার মতো কিছু ছিলনা তখন।


সন্ধ্যার পরে সবাই মিলে হৈহল্লা আনন্দে মেতে আছে, কখনো গান, কখনও নাচ, আবার বরপক্ষের লোকদের সাথে ধাঁধা খেলা। 


সব বোনেরাই শাড়ী পরে আছে শুধু আমার পরনে সেলোয়ার কামিজ। এবার বোনেরা মিলে বায়না করলো আমারও শাড়ী পরে আসতে হবে। 


ব্যাস আমি চলে এলাম শাড়ী পরতে, ওদিক রং খেলা শুরু হয়ে গেল। 


বড়ো খালাদের ঘরের পেছনের বারান্দায় একটা পর্দার মতো টানানো। সেই পর্দার এপাশে দাড়িয়ে আমি পাজামা খুলে ছায়া পরে ব্লাউজটা কেবল পরবো এমন সময় অভ্র দৌড়ে এসে বারান্দায় উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়ে পর্দায় এপাশে চলে এসে আমাকে এ অবস্থায় দেখে একদম থ মেরে গেল। আমিও এতটাই চমকে গেলাম যে এই মুহূর্তে কি করবো সেই হিতাহিত জ্ঞানটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছি। আমার খোলা বুক। দুই হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে থ মেরে আমি তাকিয়ে আছি অভ্রর দিকে, আর অভ্রও তাকিয়ে আছে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে।


কয়েক সেকেন্ড পরে সম্বিৎ ফিরে পেতেই আমি চিৎকার করার জন্য মুখ খুলতেই অভ্র বিদ্যুৎ গতিতে এসে এক হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরলো। 


এবার আমি আরও বেশি ভয় পেয়ে গেলাম। এই ছেলে আবার অন্য কোনো মতলব নিয়ে আসেনি তো। ভয়ে আমার শরীর কাঁপছে। মনে মনে ভাবলাম এতটা ভয় পেলে চলবেনা এই মুহূর্তে, তাহলে ছেলেটা আরও সুযোগ পেয়ে যাবে। 


দিলাম অভ্রর হাতের তালুতে কামড় বসিয়ে। মা গো বলে অভ্র হাতটা সরিয়ে নিয়ে আবার অন্য হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরে বললো– বিশ্বাস করেন আমি এখানে খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। আমি জানতামওনা আপনি এখানে আছেন এবং আমি চিনিওনা আপনাকে। বাইরে ওরা রং মাখিয়ে দেবার জন্য ধাওয়া করছিল তাই ওদের হাত থেকে বাচতেই এই বারান্দায় উঠে দরজা বন্ধ করে লুকানোর চেষ্টা। কিন্তু এখানে এসে এরকম বিপদে পড়ে যাবো জানলে ওদের ইচ্ছে পূর্ণ হতে দিতাম তবু এখানে আসতাম না।


অভ্রর কথা শুনে মনে হয়েছিল একটুও মিথ্যা বলছে না। আর বাইরের পরিস্থিতিটাও এমন।


অভ্র আবার বললো– আমি বর পক্ষের লোক, বর আমার বন্ধু। আপনি চিৎকার করলে লোকজন যেমনটা ভাববে ঘটনা যে তার উল্টো সেটা তো কেবল আপনি আর আমি জানি। তারা ভুল বুঝে বিয়েটা ভেঙে দেবে, আর আমার লোকজনের সামনে মুখ দেখানোর আর কোনো উপায় থাকবেনা। প্লিজ আপনি চিৎকার করবেননা দয়া করে।


আমি এক হাত দিয়ে টেনে আমার মুখের ওপর থেকে অভ্রর হাত সরিয়ে বললাম– কিন্তু আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেল এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে হুম? 


অভ্র আমতা আমতা করে বললো– আপনি যে শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে মেনে নেবো।


আমি বললাম– আপাতত ঘুরে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে থাকুন, আমি শাড়ীটা পরে নেই তারপর দেখি কি শাস্তি দেয়া যায়।


অভ্র ঘুরে দাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো, আমি জলদি করে শাড়িটা পরে নুপুরের রুমে গিয়ে ওর লিপস্টিক এনে অভ্রর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম– আপনার শাস্তি হলো এই লিপস্টিপ ঠোঁটে মেখে বিয়ে বাড়ির সমস্ত লোকজনের সামনে ঘুরতে হবে।


অভ্র অবাক হয়ে হা করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বলতে গিয়েও আবার থেমে গেল। 


অভ্রর অবস্থা দেখে আমার হাসি আটকে রাখা দায়। হাসতে হাসতে আমি শেষ। বেচারা ফান্দে পড়েছে আজ।


আমি বললাম– কি ব্যাপার মিস্টার হ্যান্ডসাম, ঠোঁটে লিপস্টিক মাখবেন নাকি গায়ে কলঙ্কের কালি। একবার সবার কাছে বলে দিলেই কিন্তু খেল খতম। 


অভ্র কোনকিছু আর না বলে ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।


সবার সামনে অভ্র হাটাহাটি করছে, কেউ কেউ অভ্রর ঠোঁটে লিপস্টিক দেখে ভাবছে ছেলেটা পাগল হয়ে গেল নাকি! কেউ আবার হো হো করে হেসে দিচ্ছে। কেউ আবার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আর আমার তো হাসতে হাসতে অবস্থা কাহিল।


নুপুরের বরকে গিয়ে বললাম– দুলাভাই আপনার বন্ধু ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে ঘুরছে আপনাকেও একটু দিয়ে দেবো নাকি? বন্ধু বলে কথা। 


দুলাভাই অবাক হয়ে উঠে গিয়ে অভ্রকে ডেকে বললো– কিরে আমার বিয়ে হয়ে গেল তোর আগে সেই দুঃখে তোর মাথাটা খারাপ হয়ে গেল নাকি? 


দুলাভাইয়ের কথা শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম সবাই। 


অভ্র লজ্জা পেয়ে বললো– ইয়ে মানে ভেসলিন ভেবে অন্ধকারে লিপস্টিক মেখে ফেলছি মনে হয়। 


আমি বললাম– ব্যপার কি বেয়াই, লিপস্টিক নিয়েও ঘোরেন নাকি আজকাল? এ-তো পুরাই বিয়ে পাগল ছেলে রে।


আবার সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। 


লজ্জায় বেচারার ফর্সা মুখটা একেবারে লাল হয়ে আছে।


যা-ই হোক সবশেষে নুপুরকে নিয়ে চলে গেল বরপক্ষ। কিছু অভ্রর প্রতি ভালোলাগার ছোট্ট একটা চারাগাছ জন্ম নিলো আমার হৃদয়ে। 


আমাকে আর বাড়িতে যেতে দিলনা খালামনি।


তিনদিন পরে আমরা গেলাম নুপুরকে আনতে। 

এবারও সাথে আসলো ভাইয়া ও তার দুই বোন এবং অভ্র। অভ্র ভাইয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড এবং দুজন দুজনের এতটাই কাছের যে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারেনা বলা যায়।


বিকেলে সবাই মিলে অনেক ঘোরাঘুরি এবং মজামাস্তি করা হলো। 


সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পরে খালামনি বললো সবাইকে লেবুর শরবত করে দিতে। সবার জন্য ঠিকঠাক করলেও একটা গ্লাসে আলাদা ভাবে বোম্বাই মরিচ গুলে সেটা তুলে দিলাম অভ্রর হাতে। 


সবাই শরবত খেতে শুরু করলো, অভ্রর গ্লাসে অভ্র চুমুক দিতেই কেমন একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল।


দুলাভাই অভ্রকে বললো– কি হলো খা, ও কিন্তু দারুণ শরবত বানায়। আহ অসাধারণ। 


আমি মুখ চেপে হেসে মনে মনে বললাম– কি দারুণ শরবত যে বানিয়েছি সেটা অভ্র টের পাচ্ছে দুলাভাই। 


আমাকে হাসতে দেখে জেদের বেশে অভ্র এক চুমুকে পুরোটা খেয়ে ফেললো। আমি অবাক! এরকম করবে ভাবতেই পারিনি।


অভ্রর মুখটা লাল হয়ে গেছে, ভাব দেখে মনে হচ্ছে কান দিয়ে এক্ষুণি ধোঁয়া বের হবে। চোখে জল টলমল করছে। 


নুপুর অভ্রর চোখে জল দেখে বললো– কি ব্যাপার ভাইয়া চোখে জল কেন? শরবত কি খুব বাজে ছিল? 


অভ্র বললো– আরে না না, তেমন কিছু না, আফসোস হচ্ছে তাই। 


দুলাভাই বললো– শরবত খেয়ে আবার আফসোস কিসের? 


অভ্র বললো– আফসোস হচ্ছে তুই বিয়েটা আরও আগে কেন করলিনা, আগে করলে শরবতের স্বাদটা আরও আগে থেকে পেতাম।


তারপর অভ্র উঠে সেই যে হাওয়া হয়ে গেল, ফিরলো অনেক পরে।


নুপুর কিন্তু বুঝতে পেরেছিল বিষয়টি এবং এই নিয়ে পরে নুপুর এবং দুলাভাই হাসাহাসি করলেও আমার খারাপ লাগছিল এটা ভেবে যে অভ্রর সাথে এমন করাটা ঠিক হয়নি।


রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে যে যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আমার ঘুম আসছিল না। চাঁদের মায়াবী স্নিগ্ধ আলোয় ভাসছিল চারপাশ। ভাবলাম ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখি।


ছাদে এসে এক কর্ণারে দাড়িয়ে চাদের দিকে তাকিয়ে আছি আনমনে। এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে কারো এগিয়ে আসার শব্দ পেয়ে ঘুরে দাড়ালাম। অভ্র এগিয়ে আসছে। 


আমি বললাম– এতরাতে আপনি, ঘুমাননি এখনও?


আমার সামনে দাড়িয়ে অভ্র বললো– অত ঝাল খেলে ঘুমও পালায় বিয়াইন। ঝাল তো কমাতে হবে আগে। 


আমি বললাম– মধু খেয়ে নিন, কমে যাবে। 


অভ্র হঠাৎ করে আমার হাত ধরে টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললো– পৃথিবীর স্রেষ্ঠ মুধু নাকি এটাই, তাই খেয়ে নিলাম। এবার যদি ঝাল কমে। 


আমি থ মেরে দাড়িয়ে আছি, চোখের পলকে এটা কি ঘটে গেল। 


অভ্র মুচকি হেসে বললো– কি চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেলেন তো? মনে রাখতে হবে ওস্তাদের মার শেষ রাতে।


আমার কিছু বলার আর শক্তি নেই যেন, ছাদে বসে পড়লাম। 


অভ্র চলে যেতে যেতে বললো– চাঁদের নিজের আবার চাঁদ দেখার কি দরকার, নিচে এসে শুয়ে পড়ো।


এভাবেই আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ে যাই ধীরে ধীরে। একসময় পরিস্থিতি এমন হয় যে দুই পরিবারে জানাজানি হয়ে যায় এবং তারা মানে না।


কিন্তু আমরা দুজন দুজনের ভালোবাসায় এতটাই জড়িয়ে গেছি যে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবোনা।


অবশেষে আমরা পালিয়ে এসে বিয়ে করে ফেলি।


বাসর রাতে পিরিয়ডের কথা বলে অভ্রকে দূরে সরিয়ে রেখেছি আজ সাতদিন। কিন্তু অভ্র তো এতটাও বোকা নয় যে এসব বিষয়ে ওর মোটেও জ্ঞান নেই। 


আজ অভ্র কাছে আসতে চাওয়া মাত্র আঁতকে উঠলাম, তাহলে কি এই রাতটাই অভ্রর জীবনের শেষ রাত হতে চলেছে...


চলবে...


ছায়া_মানব_পর্ব-১৪


১৪

অহনার মুখে হঠাৎ মাহতিম শব্দ শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকায়। অহনা সেটা বুঝতে পেরে বলল,' আসলে... আমি...'


' কি আমি আমি করছিস? মাহতিম কে?' হ্যারি জিজ্ঞেস করল।


' ক‌ই কেউ না। ময়নার কথা শুনে হঠাৎ নামটা মুখে আসল।'


অহনা দিকে সবাই সন্দিহান চোখে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেয়। ময়নার দিকে তাকিয়ে দেখল সে কাঁদছে। অভয় দিয়ে সবটা বলতে বলল হ্যারি।


ময়না চোখ মুছে আবার যোগ করে,' সোহেল আমাকে ধ*র্ষণ করে। আমার শাশুড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল শুধু। রাফিজ ঘরে এসে আমাকে না দেখে পুরো বাড়ি খুঁজে। একপর্যায়ে খুঁজে পায়। সেদিন রাফিজ সোহেলকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আমাকে রাফিজ বলল, এসব থেকে দূরে থাকতে। রাফিজ অনুতপ্ত ছিল, নারী পাচারকারী দলের সাথে সে পরিচিত ছিল না, শুধু মেয়েগুলোকে পাহারা দেওয়াই ওর কাজ ছিল। সোহেলের সাথে খারাপ আচরণ করায় রাফিজের খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে খু*ন করে তাকে। আমি আগে জানলে বাঁচিয়ে নিতাম তাকে।

রাফিজ চলে যাওয়ার পর আমি একা হয়ে যাই। সেদিন বিকেলেই সোহেল আমার সাথে বাজে কাজ করে। নিজেকে বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করি। সবশেষে সোহেলের ফোন আসতেই সে বারান্দায় যায়, সে সুযোগে আমি জানালা বেয়ে পালিয়ে এসেছি। নদীর পাড়ে আসতেই অহনা আপার সাথে দেখা হয়।'


অহনা বলল,' তাহলে সবাই তোমায় মৃ*ত বলছিল কেন?'


ময়না ঢোক গিলে বলতে শুরু করে,' মর্গে থেকে একটা ডেড বডি এনে বলছিল, ওটাই আমি। আমি ম*রে গিয়েছি গলায় দঁড়ি দিয়ে।'


মাহতিম অহনার কানের এসে বলে,' তুমি চাইলে সবাইকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারি।'


অহনা বলল,' না, এখানে আরো মেয়ে আছে। তাদের খুব বিপদ, আমাদের তাকে সাহায্য করা উচিত।'


' কিন্তু তারা কোথায়?'


' সেটা দেখার দায়িত্ব তোমার।'


মাহতিম চলে যায়। অহনা দেখল সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। টিকু বলল,' তুই নিজে নিজে কার সাথে কথা বলছিলি?'


' ক‌ই, কারো সাথে না তো?'


' আমি দেখলাম। কাউকে বললি কিছু দেখে আসার জন্য।'


সবাই বলল,' হ্যাঁ। এখানে থেকে আবার ভূতে ধরল নাতো?'


এর‌ই মাঝে সোহেল এসে পড়ে। সাথে এসেছে আফতাব জহরু। এতজনকে একসাথে দেখে তার জিভ লকলক করে উঠে। সোহেল সব খুলে বলল। আফতাব বলল,' তাহলে আর সমস্যা নেই। আজ রাতের মধ্যে আরো দু'টো মেয়ে জোগাড় করার কথা ছিল, এখন আর লাগবে না, ওদের দিয়েই হয়ে যাবে। আজ রাতেই আসছে তারা। তৈরি রাখিস এদের।' বলেই আফতাব চলে গেল।


সোহেল অহনাকে বলল,' তোমাকে আমার লাগবেই। তোমাকে ভোগ করে তারপর‌ই পাচার করব। আগে আমি মজা নেব, তারপর টাকা পাব। বিষয়টা দারুণ না?'


অহনা কিছু বলার আগেই তার মুখে রুমাল পেঁচিয়ে দেয়। সবার মুখে একে একে রুমাল বেঁধে দেয়। সোহেল কোমরে এক হাত রেখে বলে,' তোমাদের কিচিরমিচির আর ভালো লাগছে না। একটু চুপ থাকো।'


মাহতিম অহনার কাঁধে হাত রাখে। ভরসা দেয়,' একটু অপেক্ষা করো, আমি সবাইকে উদ্ধার করব।'


ভরসার হাত পেয়ে অহনা দমে যায়। সোহেল তার দিকে যেতেই আফতাব ডেকে উঠে। সোহেল বিরক্তিতে দেয়ালের সাথে হাত দিয়ে আঘাত করে,' শা*লার বাপ শান্তি দিল না। যখনি একটু শান্তি নিতে আসি তখনি কল করবে বা ডেকে নেবে। বাইনঞ্চ* বহুত জালাচ্ছে। ইচ্ছে করছে গলাটা কে*টে দিই।'


সোহেল চলে যায়। মাহতিম অহনাকে বলল,' প্রায় একশটা মেয়ে বন্দি আছে।'


অহনা মাহতিমের দিকে তাকায়,' আমরা কিভাবে ওদের উদ্ধার করবো? তুমি কিছু করলেইতো সবাই দেখে যাবে।'


' ভাবতে হবে।'


মাহতিম ভাবে। পরক্ষণেই বলল,' চিন্তা করো না। সারাজীবন গোয়েন্দা হয়ে কাটিয়েছি, এখন এই সামান্য বিষয়টা আমি সামলাতে পারব!'


' গোয়েন্দা হয়ে কাটিয়েছ মানে?'


অহনার কথার উত্তর না দিয়েই মাহতিম চলে যায়। সোহেল আর আফতাবের কথোপকথন শুনে। বুঝতে পারে, রাতেই মেয়েগুলোকে পাচার করা হবে। কিন্তু অহনাকে কষ্ট দেওয়ার কারণে মাহতিমের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে আছে। সোহেল আর তার বাবার সামনে যায়। সোহেলের হাত দিয়ে আফতাবকে থা*প্পর বসায়। আফতাব রেগে গিয়ে ছেলের কলার চেপে ধরে। সোহেল বলছিল, সে ইচ্ছে করে দেয়নি। কিভাবে হলো বুঝতে পারেনি। তবুও আফতাব কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়। হনহন করে বেরিয়ে পড়ে আফতাব। সোহেল ভ্যাবলার মতো বসে থাকে। তখনি পেছন থেকে ধাক্কা দেয় মাহতিম।

সোহেল পড়ে গিয়ে ধমক দিয়ে উঠে,' কে এখানে? বেরিয়ে আয় বলছি।' আরো কিছু অশ্রাব্য গালিও দেয়। মাহতিম তাকে দেয়ালের সাথে ছুড়ে মারে। মাথা ফেটে র/ক্ত বের হয়। সোহেল গালিগালাজ করছে, কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছে না। মাহতিম পুনরায় তাঁকে ধাক্কা দেয়। সোহেল হুমড়ি খেয়ে দরজার সাথে পড়ে যায়। কোনরকমে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।


রাত হতেই পাঁচটা মালবাহী ট্রাক এসে হাজির হয় সেই গোপন দরজার কাছে। একে একে সবগুলো মেয়েকে আনা হয়। ট্রাকে তোলা হয় তাদের। সোহেল অহনার কাছে এসে বলল,' কোনো ব্যাপার না, যাওয়ার পথে তোমার সাথে রোমান্স হবে। এখানে তো সুযোগ পেলাম না।'


গা ঘিন ঘিন করে উঠে অহনার। মাহতিম তেড়ে আসতেই অহনা তাকে থামিয়ে দেয়, বলল,' বুদ্ধি দিয়ে কাজ করা উত্তম। ওদেরকে ওদের স্টাইলেই শাস্তি দিতে হবে।'


সোহেল হেসে উঠে,' কার সাথে কথা বলছো? মাথাটা গেছে মনে হয়!'


রুমি, ইরা, টিকু, হ্যারিও চিন্তায় পড়ে গেছে। আজকাল কেন অহনা নিজে নিজে কথা বলে। 


সোহেল অহনার চুলে ফুঁ দিয়ে চলে যায়। মেয়েদেরকে জোর করে ট্রাকে তুলতে থাকে। অহনাকেও তোলা হয় একটি ট্রাকে। 

মাহতিম কিছু করছে না দেখে অবাক হয় অহনা। মাহতিম চুপ করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকের ডালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর কিছুই দেখতে পায় না অহনা। এভাবে মাহতিমকে কিছু না করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ মুখ লাল হয়ে আছে তার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাক চলতে শুরু করবে, কিন্তু মাহতিম এখনো দাঁড়িয়েই আছে।


সকলের মধ্যে আহাজারি। মেয়েগুলো কেঁদে মরছে, অথচ আওয়াজ নেই, মুখ বাঁধা তাদের।


ট্রাক ছাড়ার পজিশন নিতেই অহনা ভয়ে কেঁপে উঠে। মাহতিমকে ডাকতে থাকে।

যখন সব আশা ছেড়ে দিল অহনা, তখন বাইরে থেকে শব্দ পায় গুলির। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে। আনন্দে নেচে উঠে সে। পুলিশ ট্রাকগুলোকে ঘিরে ধরেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে উদ্ধার করে। 

অহনা দেখল মাহতিম এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে বাকি র‌ইল না সেই জানিয়েছে পুলিশকে। ইন্সপেক্টর রিজু সেন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,' এখানে অহনা কে?'


অহনা এগিয়ে আসে। ইন্সপেক্টর বলল,' আরে আপনি সেই না, যাকে কিছুদিন আগে উদ্ধার করেছিলাম? আপনি কিভাবে এখানে আটকা পড়লেন।'


' আমার বোনকে খুঁজতে এসে।'


' যাই হোক, আপনি অনেক সাহসী। আপনার জন্য‌ই আজ এই অপরাধীরা ধরা পড়ল। কবে থেকেই এই গ্যাংটাকে খুঁজছিলাম, বুঝতেই পারিনি আমাদের নাকের ডগায় ছিল।'


' আমি... মানে, বুঝতে পারছি না।'


' আপনিইতো আমাদের কল করে বললেন আসতে।'


অহনার মাহতিমের দিকে তাকায় একনজর, তারপর বলল,' জ্বী আমিই।'


' আপনার হাজবেন্ড কেমন আছেন?'


ইন্সপেক্টরের কথা শুনে সবার চোখ ছানাবড়া। হ্যারি এগিয়ে এসে বলল,' ওর এখনো বিয়ে হয়নি।'


' কি বলছেন আপনি? কিছুদিন আগেই ওনার সাথে আমার দেখা হলো। আজ আবার হলো। এই থানায় কালকেই বদলি হয়েছি আমি।'


অহনা হ্যারিকে বলল,'সবাইকে নিয়ে তুই যা। আমার কিছু কথা আছে ইন্সপেক্টরের সাথে। আমি কথা বলেই আসছি।'


হ্যারি যেতে না চাইলেও অহনা তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। তারপর ইন্সপেক্টরকে বলে,' আসলে আমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করেছি, তাই এরা জানে না।'


' কি বলেন? পুলিশকে বোকা বানাচ্ছেন নাতো আবার?'


' সবাই জানে। শুধু বন্ধুরা ছাড়া। আপনিও জানলেন এখন। আমি তাহলে আসি?'


ইন্সপেক্টর গাড়িতে গিয়ে একজন কনস্টেবলকে বলল,' মেয়েটাকে সন্দেহ হয়। ওর পুরো ডিটেলস্ চাই আমার কালকের মধ্যেই।'


' জ্বী স্যার!'


অহনার মাহতিমের কাছে যায়,

' কি হলো, বাড়ি যাবে না?'


' অবশেষে ধরা পড়ল তারা। যাদের বহুকাল আগেও ধরতে পারিনি আমি।'


' বহুকাল আগে মানে? কি বলছ? তুমি কি এদের চিনতে?'  


চলবে......

সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১৩



১৩.

ছবির পেছনে দরজা দেখে অহনা অবাক হয়। ময়নাকে ভরসা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরটা অন্ধকার। কিছুক্ষণ হাতড়ে চলতেই অন্য একটি দরজার সামনে হাজির হয়। বাইরে থেকে আটকানো সেটা। অহনা অনেক চেষ্টা করে খোলার জন্য, বিফলে‌ যায়। 


পেছনে তাকিয়ে দেখে সোহেল বুকের সাথে হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ময়না ভয়ে অহনার সাথে লেপ্টে যায়। অহনা অভয় দেয়,' কিছু হবে না ময়না। ভয় পেয়ো না।'


সোহেল কপট রাগ নিয়ে বলল,' তোমাদেরকে ছেঁড়ে রাখাই আমার উচিত হয়নি। বার বার হতাশ করছ আমাকে। এবার দেখবে আমি কি করি।'


বলেই ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' ময়নারে ধর, আমি এটাকে সামলাই।'


পুনরায় ওদেরকে আগের ঘরটায় নেওয়া হয়। চেয়ারের সাথে দুজনকেই শক্ত করে বাঁধা হয়। 


সোহেল অনেকটা হিংস্র হয়ে যায়। অহনার সামনে এগিয়ে আসে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' তোর সামনেই আজ তোর বোনের এমন হাল করব, পরেরবার আমার উপর কথা বলতেও তার ভয় হবে।'


ময়না কেঁদে উঠে,' ছেঁড়ে দাও ভাই, আমার বোনকে ছেঁড়ে দাও।'


' ধরবো কি ছাড়ার জন্য? আজকে ওকে দিয়েই নাস্তাটা সেরে নেব।' সোহেল শয়তানি হাসি দিয়ে উঠে‌।


অহনার দিকে এগিয়ে আসে। অহনা ছোটার জন্য ছটফট করতে থাকে। এই মুহূর্তে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই,

' দূরে থাক আমার থেকে। তোকে দেখতেও আমার ঘেন্না লাগে।'


' এত অহংকার ভালো নয়‌। তোমার অহংকার যতক্ষণ না ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ততক্ষণ আমি শান্তি পাবো না।'


' এতো কনফিডেন্স? তাহলে মনে রাখ, আমাকে বাঁচাতে সে আসবেই। তখন কোল কি হাল হবে সেটা নিয়েই ভয়ে আছি আমি।'


' দেখিয়ে দিই তাহলে আমার কনফিডেন্সের মাত্রা। দেখি কে বাঁচাতে আসে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, আর না।  কাজ সব শেষ দিতে দিয়ে তোমার কাছেই আসতে পারিনি। এখন তাহলে আর কাজটাই করে নিই‌।'


সোহেল আরো এগিয়ে আসে‌। ময়না কেঁদে মরছে, ছুটতে পারছে না। সোহেল অহনার কাছাকাছি এসে শরীরের ঘ্রাণ নেয়,

' এত সুন্দর ঘ্রাণ! আমি মুগ্ধ! বিমোহিত! মেয়েদের শরীরের ঘ্রাণ আমার অনেক প্রিয়, তোমারটা আরো প্রিয়।'


' কাপুরুষ তুই? অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছিস।'


'ইশশ! এভাবে বলো না। তবে বলতে ইচ্ছে করলে বলো, আমার এসব গায়ে লাগে না।'


অহনা চোখ মুখ খিঁচে নেয়। সোহেল তার জামায় হাত দিতেই তার চোখ যায় জানালার দিকে। একজোড়া চোখ বাইরে থেকে দেখছে তাদের।


'কে ওখানে?' সোহেল হন্তদন্ত হয়ে জানালার কাছে যায়। 

ক্যাবলাকে ডেকে বলে,' বাইরে গিয়ে দেখ, কে ছিল? আমি সিউর কেউ দেখছিল আমাদের।'


পরপরই অহনার দিকে তাকায়। আগুনের সাথে সাথে লালসা ঝড়ছে তার চোখ দিয়ে। অহনার দিকে এগিয়ে আসতেই ফোনে কল আসে। সোহেল ওপাশের কথাগুলো শুনেই অহনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,' তোমার কাছে আসলেই যত বাধা পড়ে। চিন্তা করো না, বিশ মিনিটের মধ্যেই আসছি আমি।'


সোহেল বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যায়। অহনা কেঁদে উঠে। ময়নার দিকে তাকিয়ে বলল,' মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু কে জানো?'


'কে আপা?'


' তার নিজের শরীর।'


ময়না ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে‌। বুঝতে পারেনি সে। উত্তর পাওয়ার জন্য চেয়ে র‌ইল অহনার দিকে।


অহনা নাক টেনে বলল,' এই শরীরের জন্য‌ই বার বার ঐ নরপশুদের খোরাক হ‌ই। এই শরীরের লালসার জন্য‌ই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজেদের কি রক্ষা করবো? যেখানে নিজের শরীরটাই শত্রু‌।'


ময়না চুপ করে থাকে। কথাটার সম্পূর্ণ মানে সে এতক্ষণে বুঝে গেছে। সত্যিইতো মেয়েদের দুর্বলতা তার শরীর। এই শরীরের জন্য‌ই সে বাইরে বেরুতে পারে না, সবার লালসার দৃষ্টি থাকে।


ক্যাবলা দেখে নেয় হ্যারিকে। ছয়জন শক্তপোক্ত লোককে ডেকে এনে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। হ্যারিকে ডাকতে এসে সবাই বিপদে পড়ে। চারজনকেই বেঁধে নিয়ে যায় তালাবদ্ধ ঘরটাতে। 


হ্যারি তখন চিৎকারের শব্দ পেয়েছিল ঘরটিতে তাই জানালায় উঁকি দেয়। সোহেল সেটা দেখে নেয়।


অহনাকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে নিয়ে যায়। সবাইকে একসাথে বাঁধে। অহনা আরো অবাক হয় বাকিদের দেখে,

' তোরা এখানে আসলি কিভাবে?'


রুমি বলল,'‌ তোকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু এরা দেখে নেয়।'


' কেন করলি এটা? তোরা কেন আসতে গেলি? এবার সবাই বের হব কিভাবে?'


হ্যারি অভয় দেয়,' সবাই মিলে ঠিক একটা ব্যবস্থা করে নেব। একটা না একটা উপায় বের হবেই।'


ময়না বলে উঠে,'পারবে না। এবার আমরা সবাই শেষ। বাকি মেয়েদের মতো আমাদের অস্তিত্ব‌ও বিলীন হয়ে যাবে সময়ের সাথে সাথে।'


ইরা ভয়ে বলল,' কি বলছো তুমি? আরো মেয়ে মানে?'


' আম ঠিকই বলছি। এসবতো চলছে আরো ত্রিশ বছর আগে থেকেই। আফতাব জহরু, মানে আমার শশুর এই সব করছে।'


অহনা ময়নার দিকে তাকায়,' পুরো ঘটনাটা আমাদের বলো। এমন কি হয়েছিল, যার জন্য তোমাকেও ছাড় দেয়নি?'


'শুনো তাহলে!'

ময়না বলতে শুরু করে,' আমার বাবা একজন সাধারণ মানুষ। বাজারে এইটা দোকান আছে শুধু। মা মা/রা গেছে আমার জন্মের সময়, বাবাই মানুষ করেছে। আমার পনেরো বছর হতেই আফতাব জহরু আমাকে বাবার দোকানে দেখতে পায়, সেখান থেকেই বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বড় বাড়িতে বিয়ে হবে ভেবে বাবা অনেক খুশি। আমি দেখতে মন্দ ছিলাম না বলে সবাই পছন্দ করে। আমার বিয়ে হয় আফতাব জহরুর মেজো ছেলের সাথে। দিন ভালোই যাচ্ছিল। একদিন আমার দেবর সোহেল বিনা অনুমতিতে আমার ঘরে প্রবেশ করে, আমার সাথে নোংরামি করার চেষ্টা করে। সেটা দেখে নেয় আমার স্বামী রাফিজ। সে তার ভাইকে থাপ্পর দেয়। আমাকে রক্ষা করার জন্য তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। রাফিজ আমাকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু গরীব বলে শাশুরী, ননদের অত্যাচার সহ্য করেছি খুব। উঠতে বসতে খোটা দিত। এভাবেই চলছিল দিন। একদিন বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে তারা বদ্ধ একটা ঘর দেখতে পাই। দরজাটা খুলে একজনকে বের হতে দেখে অবাক হ‌ই। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ দেখা গেলেও আসলে এটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। লোকটা বাইরে আসতেই আমি সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে যাই কি আছে দেখার জন্য। এখন মনে হচ্ছে, আমি না গেলেই আমার জীবনটা সুন্দর থাকতো।

দুইটা ঘর পেরিয়ে অনেকগুলো মেয়ের গোঙানির শব্দ পেলাম। আমি উৎসুক হয়ে দেখতে গেলাম। দেখলাম রাফিজ বসে আছে একটা চেয়ারে আর মেয়েগুলো কাতরাচ্ছে। আমাদের দেখে সে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম এতোগুলো মেয়ে এখানে কেন? আমি জিজ্ঞেস করতে করতেই ক্যাবলা নামক লোকটা এসেই ওকে বলল, মেয়েগুলোকে কেনার জন্য কাস্টমার এসে গেছে, আজ রাতেই নিতে আসবে, বাইরের দেশে পাচার করা হবে তাদের। রাফিজ লোকটাকে আকারে ইঙ্গিতে এসব বলতে না করল, কিন্তু লোকটা বুঝেনি তাই সব বলে দিল। সোহেল চলে এলো সেখানে। আমাকে দেখে রেগে গিয়ে থাপ্পর দিল। রাফিজ‌ও তার সাথে রেগে যায়। রাফিজ আমাকে নিয়ে ঘরে চলে আসে‌। আমাকে বুঝাতে থাকে বিভিন্নভাবে। কিন্তু আমি এমন অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারিনি। আমি আমার শাশুড়িকে সব বলি, ভেবেছি তিনি সাহায্য করবে। অথচ করেনি উল্টো সোহেলকে ডেকে এনে তার দিকে ঠেলে দিল আমাকে। সোহেল আমাকে তার মায়ের সামনেই.....'

এতটুকু বলতেই ময়না কেঁদে উঠে। অহনা কিছু বলার ভাষা পাচ্ছে না। কিছু বলতে যাবে, তখনি শব্দ এলো,' ওকে কাঁদতে দাও, মনে শান্তি আসবে।'


অহনা খুশিতে গদোগদো করে উঠে। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে,' মাহতিম!'


চলবে.....

বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৩

The love

 Once upon a time, in a picturesque coastal town, there lived two souls, Mia and Ethan. Their paths had never crossed until one fateful summer's day when a local charity event brought them together.


Mia, an aspiring artist with a free spirit, was volunteering to paint a mural for the event. Ethan, a dedicated marine biologist, was there to give a talk about ocean conservation. As their eyes met across the bustling town square, something magical happened.


Their connection deepened during the event as Mia listened in awe to Ethan's passionate speech about the wonders of the ocean. He, in turn, was captivated by her creativity and the sparkle in her eyes when she spoke about her art.


The days turned into weeks, and Mia and Ethan found themselves spending more and more time together. They strolled along the beach at sunset, collected seashells, and shared their dreams under the starry night sky. Their love blossomed like the vivid colors Mia used in her paintings.


As the summer drew to a close, Mia and Ethan faced a heart-wrenching dilemma. Mia's art scholarship in a distant city and Ethan's vital research work were pulling them in opposite directions. The impending separation weighed heavy on their hearts, but they couldn't bear to let go of the love they had found.


In the end, they decided that their love was worth the sacrifices. Mia pursued her art scholarship, and Ethan continued his research, but they vowed to make the most of every moment they could steal together. They wrote heartfelt letters, painted vivid seascapes, and even managed to surprise each other with visits whenever possible.


Their love story became an inspiration to everyone who knew them. They showed that love could thrive despite distance, and that when two hearts are truly connected, no amount of space or time can break the bond.


Mia and Ethan's love story reminds us that sometimes, love isn't just a destination but a beautiful journey, one filled with passion, dedication, and the unwavering belief that love can conquer all.

মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১২



১২.

অহনা সোহেলের গলা চেপে ধরে। সোহেল এক টানে তার হাত সরিয়ে নেয়।

ময়নাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একবার পালাতে চেয়েছিল বলে এই অবস্থা করেছে। 


' তোমার অবস্থাও এমন হবে আবার পালাতে চাইলে।' সোহেল জহুরী দৃষ্টিতে তাকিয়ে অহনাকে বলল।


অহনা মুখ থুবড়ে বসে পড়ে। অকথ্য নির্যা/তন করেছে ময়নার উপর। অজ্ঞান হয়ে আছে, আদৌ জ্ঞান ফিরবে কিনা জানা নেই।


সোহেল নিচে নামিয়ে আনে ময়নাকে। অহনা ওর কাছে গিয়ে বসে। আদর করে ডাকে, সাড়া পায় না। সোহেল ঘরটিতে তালা মেরে আবারো বেরিয়ে যায়। 

অহনা দেখতে পায়, পাশেই পানির গামলা রাখা আছে। সেখান থেকে পানি এনে ময়নার চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর‌ই ময়না চোখ খুলে। অহনাকে সামনে দেখে খুব আনন্দিত হয়। জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। 

' আপা তুমি এসেছ? আমি তোমাকে অনেক মনে করেছি।'


অহনা ওর গালে হাত রেখে বলে,' পাগলী মেয়ে, কয়েক ঘন্টায় মন জয় করে নিলে, আর এখন বলছো আসছি কিনা? বোনের জন্য বোন সব করতে পারে।'


' আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আপা।'


' আমি সেটা জানি। কিন্তু কেন তোমাকে এখানে এনে কষ্ট দিচ্ছে এ সোহেল?'


' সে অনেক কথা আপা। তোমার সময় হবে না, আমাদের আগে এখান থেকে বের হতে হবে, বাড়ি গিয়ে সব বলব। এরা নরপশু, এদের থেকে বাঁচতেই হবে।'


' কিন্তু কিভাবে? চারিদিকে পাহারা, যেতে পারব না একদম। সবার চোখ এড়ানো সম্ভব হবে না।'


' আমি জানি। তবুও আমাদের চেষ্টা করতে হবে। সবার মতো আমরাও তাহলে আটকে যাব।'


' সবার মতো মানে? এখানে কি আরো কেউ আটকে ছিল?'


' এখনো শত শত মেয়ে আটকে আছে।'


অহনা আঁতকে উঠে। ময়নার গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,' আমাকে সবটা খুলে বলো, সবটা।'


' বলব আপা। কিন্তু এখন পালাতে হবে।'


অহনা উঠে দাঁড়ায়, ঘরটার চারিদিকে দেখে, তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না‌। ময়না দেখতে পায় পাশের দেয়ালে একখানা ছবি আটকানো। এমন পরিত্যক্ত জায়গায় ঘরটিতে ছবি আটকানো থাকার কথা না। অহনা আর ময়না ছবিটি খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। অহনার সন্দেহ হয় এটা নিয়ে। ছবিটা অনেক ভারী, হাত দিয়ে সরাতে পারছে না। মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর ধরে ছবিটা এখানে রয়েছে। ময়না আর অহনা দুজন মিলে একসাথে ছবিটাকে ঠেলে সরায়। মুহুর্তেই চোখে মুখে বিষাদ নেমে আসে।


অহনার তার বন্ধু অহনার ঘর খুঁজে রুমালটা পায়। টিকু হাতে নিয়েই সেটা দিয়ে ঘাম মুছে। ঘাম থেকে পানির কণাগুলো রুমালে লাগতেই সেখানে কিছু লেখা ফুটে উঠে‌। টিকু ভয়ের চোটে সেটা হাত থেকে ফেলে দেয়,

' ভাই আমাকে বাঁচা। ভূতের রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে ফেলেছি ভুল করে। এখন আমার কি হবে?'


টিকু চোখ বন্ধ করে থাকে‌। সবাই তার কথায় নজর দেয়। ইরা তার মাথায় চাপড় মেরে বলল,' আমার থেকে বড় ভূত আর একটাও নেই, আমাকে ভয় না পেয়ে একটা রুমালে ভয় পাচ্ছিস কেন? চোখ খোল।'


' না আমি খুলব না। রুমালের ভেতরে ভূত আছে‌। সে লিখেছে।'


হ্যারি হাতে নেয় রুমালটা। দেখল একটা লেখা,' বড় বাড়ি।'


হ্যারি উল্টে পাল্টে দেখে বলল,' ক‌ই তেমন কিছু না। লেখাটা আগেই ছিল, তুই খেয়াল করিসনি টিকুর বাচ্চা।'


রুমিও দেখল, বলল,' হ্যাঁ, তেমন কিছু নেই। তবে একটু খটকা লাগছে।'


হ্যারি উৎসুক হয়ে তাকায়,'কিছু কি মনে হচ্ছে তোর?'


' হ্যাঁ, কেমন অদ্ভুত লাগছে আঁকা গুলো। আর দেখ, কিছু অগোছালো অক্ষর, আমার মনে হয় কেউ এই রুমালের দ্বারা সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।'


'দেখতে হবে। টিকু তাহলে ঠিক বলেছে। পানি লাগায় লেখাটা ফুটে উঠেছে। আমাদের দেখা উচিত, আর কোনো সূত্র পাই না।'


তারা রুমালটার উপর পানি ঢালল, আরো কিছু লেখা ফুটে উঠল। লেখা ছিল, ফুলের বাগান, বাম দ্বিতল।


লেখাগুলো বুঝতে পারছিল না কেউই, আসলে কি বোঝানো হয়েছে। 


এর‌ই মাঝে রোস্তম ঘরে প্রবেশ করে। ওদের হাতে রুমালটা দেখেই বলল,' এটা ময়নার রুমাল, তার বাড়ি থেকে পেয়েছে।'


সবাই তখন জিজ্ঞেস করল,' আপনি কি জানেন বড় বাড়ি দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে?'


' পাশের এলাকায় বড় বাড়ি রয়েছে। অহনা ঐ বাড়িটার কথা বলেছিল, ময়নার শশুর বাড়ি এটা।'


হ্যারি বলল,' তার মানে এটাই সংকেত। আমরা ঐ বাড়িতে গেলেই পরবর্তী সংকেতের উদ্দেশ্য বুঝতে পারব। চলো সবাই।'


রোস্তম যেতে চাইলে সবাই তাকে না করে। তাকে বাড়িতে রেখেই চারজন র‌ওনা দেয়। রাস্তার মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে বাড়ির ঠিকানাও নিয়ে নেয়।


বাড়ির গেইটে প্রবেশ করতেই দারোয়ান আটকায় তাদের। কিন্তু সবার স্মার্টনেস দেখে ঢুকতে দেয়। কলিং বেল চাপতেই বয়স্ক একজন মহিলা দরজা খুলে দেয়। বড় গলায় কাউকে ডেকে বলল,' আপা, বাইত্তে মেহমান আইছে। দেইখ্যা যান।'


একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এগিয়ে আসেন। ব্রু কুঁচকে তাকায় চারজনের দিকে,' কারা তোমরা?'


টিকু কিছু বলতে যেতেই রুমি তার হাত চেপে ধরে ইশারা দেয় চুপ থাকতে‌। তারপর হ্যারি বলল,' আমরা ময়নার বন্ধু।'


চাকর মহিলাটি সুর টেনে বলল,' ওমা, কয় কি? মাইয়া মানুষের আবার ছেইলে বন্ধু। আর কি যে দেহার বাকি আছে।'


মধ্যবয়সী মহিলাটি বলল,' রুনি, তুই চুপ থাক। রান্নাঘরে যা।' তারপর চারজনের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,' কেমন বন্ধু? ময়নার তো কোনো কালে কোনো বন্ধু ছিল না।'


রুমি বলল,' আমরা ওর ছোটবেলার বন্ধু। আমরা ওর থেকে বয়সে বড় ছিলাম, কিন্তু একসাথে খেলতাম। সেখান থেকেই পরিচয়, খবর নিয়ে দেখবেন।'


' ঠিক আছে। তোমরা কি জানো না ময়না আর নেই?'


' জানি তো।'

রুমি কথাটা বলতেই হ্যারি থামিয়ে দেয়,

' আসলে ওর কথা মনে পড়ছিল, এখানে ওর অনেক স্মৃতি আছে, তাই আপনাদের বাড়িতে ঘুরে দেখতে আসলাম।'


' ঠিক আছে। দেখো তবে।'

মহিলাটি উঠে, একজন কাজের লোককে তাদের নাস্তা দিতে বলে চলে যায়।

ইরা রেগে যায়,' বড়লোক হয়েছে যে মনে হয় মাথা কিনে নিয়েছে। কিভাবে কথা বলে চলে গেল।'


' এই মুহূর্তে রাগ না করে আসল কাজ কর। আমাদের কাজ অহনাকে খুঁজে বের করা। পুরো বাড়িটা খুঁজে দেখ কে কি পাস!'


তারা সবাই মিলে বাড়ির আনাচে-কানাচে দেখতে থাকে। একেকজন একেক দিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।


হ্যারি আবিষ্কার করে ফুলের বাগান। রুমালটা বের করে দেখে। বাম দ্বিতল কথাটার মানে বুঝতে পারছে না। বাড়িটার দিকে তাকায়, বাম পাশের উপরের তলায় চোখ দেয়। একটি জানালা দেখতে পায়.....

 


চলবে....

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১১



১১.

কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়েই অহনার হৃদয়ে কেঁপে উঠে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,' কে?'


আস্তে আস্তে পেছনে তাকায়। সোহেল দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝটকায় অহনা তার হাতটা সরিয়ে ফেলে। সোহেল হাতদুটো বুকের সাথে ভাঁজ করে দাঁড়ায়,

' পালাতে চেয়েছিলে তাই না?'


অহনা কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সোহেল চোখ মুখ হিংস্র করে আবার থেমে যায়,

' সুন্দরীদের গায়ে হাত তুলি না আমি, তাদের আদর করতেই ভালোবাসি। কিন্তু সবাই আমাকে হতাশ করে, তারা আমার থেকে পালাতে চায়।'


' শয়তানের কাছে কেউ কখনো নিজ ইচ্ছায় থাকতে চায় না।'


' তুমি ভুলে গেছ, আমার নাম সোহেল।'


সোহেল অহনাকে আবার আগের ঘরটিতে টেনে নেয়। ক্যাবলাকে জোরেশোরে একটা লা*থি দিতেই সে চোখ খুলে। সোহেল চলে যায় বিশ্রী একটা গালি দিয়ে। এবার আর অহনাকে বাঁধা হয়নি। শুধু বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।


ঘরটাতে তেমন আলো নেই। অনেক শীত‌ও পড়ছে হঠাৎ করে। অহনা কান পেতে শুনল, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই অহনা আপনচিত্তে বৃষ্টিতে ভিজে। আজ সুযোগ নেই। শীতে তার দাঁত-মুখ খিঁচে আসে। একটা টিশার্ট আর প্লাজু ছিল শুধু পরনে। কাঁপন আসে শরীরে।


একটু পর‌ই সোহেল আবার আসে। হাতে তাঁর বিরিয়ানি। অহনার সামনে এসেই প্যাকেট খুলে খেতে বলে। অহনা অন্য দিকে ফিরে যায়। সুযোগ পেয়ে পালানোর চেষ্টা করে,‌ কিন্তু ব্যর্থ হয়। সোহেল সহজেই একহাতে টেনে ধরে ওকে। অহনা স্থির হয়ে যায়। সোহেল ধমক দেয়,''খেয়ে নাও বলছি। না হয় আর কিছুই পাবে না সারাদিন।'


' খাব না বলছিতো।'


' সুন্দরীদের প্রতি আমার একটু বেশি দরদ তাই বিরিয়ানি নিয়ে এলাম। খাও বলছি, না হয় কি করব?'


' আমি খাব না। বন্দি করে এখন খাবার খাওয়ানো হচ্ছে?'


' আহহ্, সুন্দরী, কথা বলো না বেশি, হৃদয়ে লাগে। যদি নিজে না খাও তাহলে আমি খাইয়ে দেব বলে দিলাম।'


অহনা রেগে যায়, তেড়ে আসে সোহেলের দিকে,' তোকে আমি মে/রে দেব। আমাকে অসহায় ভাববি না একদম।'


' একদম না। তুমি অসহায় কে বলেছে? আমিতো পাশেই আছি, তাহলে কি করে অসহায় হলে?'


অহনা চুপ করে থাকে। কিছু বলতে পারছে না। বার বার ভাবছে মাহতিমের কথা। তাকে বেরিয়ে যেতে বলা উচিত হয়নি। এখন কত সমস্যায় পড়ল।


' মেয়ে মানুষ একটু বেশি না বললে শান্তি পায় না। আর সুন্দরী হলেতো কথাই নেই। যাই হোক, একটা কথা বলব।'


সোহেলের কথায় ব্রুক্ষেপ করে না অহনা। নিজেকেই বলল,'সারাক্ষণতো বলেই যাচ্ছিস, মুখ তোর থামছে না, আবার কি বলতে চাস?'


সোহেল অহনার কানের কাছে তার মুখ নেয়। তার কানের পাশ দিয়ে বেয়ে আসা চুলে ফুঁ দিয়ে পেছনে উড়িয়ে দেয়। পরক্ষণেই কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,' খেয়ে নাও পাপি, ময়নাকে দেখতে যাবেতো তুমি তাই না?'


ময়নার কথা বলতেই অহনা বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে নেয়। 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গোগ্রাসে গিলতে থাকে খাবারগুলো। মরিচ কামড়ে পড়ায় আকাশ-বাতাশ এক করে চিৎকার করে উঠে। সোহেল কানে হাত চেপে ধরে,' কানের পোকা বের করে ফেলবে দেখছি, পানি খাও তারাতাড়ি।'


সোহেল নিজেই পানি এগিয়ে দেয় অহনাকে। তারাতাড়ি খেতে গিয়ে কি একটা অবস্থা হলো। অহনা একদম ঝাল খেতে পারে না। অল্প ঝাল হলেও ম/রে যাওয়ার অবস্থা। অহনা খাওয়া অর্ধেক শেষ করেই বলল,' আমার খাওয়া শেষ, এবার ময়নার কাছে যাব।'


সোহেল শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,' পুরোটা শেষ করতে হবে। আজকে আর খাবার পাবে না, তাই ক্ষুদা থেকে তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। তোমার মূল্য....'

সোহেল থেমে যায়। 


অহনা কিছু না বলে আবারো খাওয়া শুরু করে। পুরোটা শেষ করে। ঝালের কারণে তার নাক-মুখ জ্বলতে শুরু করে, তবুও শেষ করে। 

' আমার খাওয়া শেষ।'


সোহেল হাসে,' বোনের জন্য এতো টান? ঝাল খাবার খেয়ে নিলে?'


' এতো কথা না বলে নিজের কাজ কর। কাপুরুষের মতো আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস কেন?'


' এতো বিপদে থেকেও তোমার তেজ কমেনি। অতি দুঃসাহস। পাতানো বোনের জন্য নিজেই ফেঁসে গেলে। জানো না, বাঘের মুখে আছ, যে বাঘ কাউকে ছাড় দেয় না। এক থাবায় পুরোটা হজম করে নেয়, চিবানোর প্রয়োজন মনে করে না।'


' তোর মতো বেড়ালেরা নিজেকে বাঘ ভাবতেই শেখে। তাদের নিজস্বতা নেই। আমাকে আবার বোনের কাছে নিয়ে চল, অন্তত এই পূণ্যটা জীবনে কর, পাপের খাতা ভরে গেছে তোর, জায়গা খালি নেই।'


' বোন? হা হা হা... আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যাচ্ছি‌।'


অহনা মনে মনে বলল,' মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। কয়দিন দাঁত ব্রাশ করেনি কে জানে।'


' কিছু বললে?'


অহনা না বুঝার ভান ধরে,' ক‌ই কিছু না তো। আপনার কানের পর্দা বেশি মোটা তাই শুনতে পান অনেক কিছু।'


অহনার বন্ধুরা এসে হাজির হয় ইলাশপুর। অহনাদের বাড়িতে আসতেই দেখল রোস্তম ঘরের চৌকাঠে বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। টিকু তার পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,' এই ব্রো, এখানে কোথায় অহনা থাকে?'


রোস্তম চোখ তুলে তাকায়,' তোমরা কারা?'


' আমি টিকু, ওদের নাম জানতে হবে না, আপাতত আমারটাই জেনে নিন। বলুন অহনাকে চিনেন? আপনি কি তাদের কাজের লোক?'


' না বাবা, আমি অহনার বাবা। কিন্তু তোমরা কারা?'


টিকু রোস্তমের ঘাড়ে হাত রেখে কথা বলছিল এতক্ষণ, যখন জানল এটা অহনার বাবা, হকচকিয়ে উঠে। হাত সরিয়ে দেয় তার ঘাড় থেকে। আমতা আমতা করে বলে,' আঙ্কেল আমার অভিনয়টা কেমন হয়েছে বলেন তো?'


' কিসের অভিনয়?'


' একটু আগে আমি আপনাকে বললো বললাম, ফাজলামো করে জিজ্ঞেস করলাম আপনার মেয়ের কথা সেটা আরকি।'


' ওহ, আমি ভেবেছি আজকালকার ছেলেমেয়েদের বুঝি অধঃপতন হলো।'


' স্যরি আঙ্কেল। আমি বুঝতে পারিনি।'


' আমি কিছু মনে করিনি। তোমরা ভেতরে যাও, অনেকটা পথ এসেছ।'


রুমি এতক্ষণ সেলফি নিয়েই বিজি ছিল আর অন্যদিকে ইরা পরিবেশের ছবি তুলতেই ব্যস্ত। হ্যারি কোমড়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে তাদের সবার অবস্থা দেখছিল। 


সবাই ঘরে গিয়ে বসে। রোস্তম তাদের শরবত দেয়। তারা অহনার কথা জানতে চাইলেই সব কথা খুলে বলে। চারজন অবাক হয়ে যায়। এতকিছু ঘটে গেল কিন্তু অহনা তাদের কিছুই জানায়নি। ময়নার কথা কিছুই বলেনি। তবুও তারা ঠিক করে নেয় অহনাকে খুঁজে বের করবে।


সোহেল অহনাকে তিনটা ঘর পাড় করে নিয়ে যায় অন্য একটি ঘরে। সেখানে একটি সিঁড়ি। অহনা এবং সোহেল সেই সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে। দেখতে পায় থানে থানে বাক্স রাখা। বাক্সগুলো খুব বড়, আস্ত মানুষকে ঢুকিয়ে রেখে দেওয়ার মতো। অহনা সেগুলো ধরে দেখতে থাকে। সোহেল হাঁক দেয়,' কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? এসো তারাতাড়ি।'


অহনা সোহেলের তালে হাঁটে। একটা ঘরে এসে পৌঁছায়। অহনা ঘরে পা দিয়েই ভেতরে তাকায়। চারিদিক দেখে বলল,'ক‌ই এখানে কি?'


সোহেল উপরে ইশারা দিয়ে দেখায়। অহনা উপরে তাকাতেই চিৎকার দিয়ে উঠে। পা দুটো শীতল হয়ে আসে.....


চলবে......

বৃহস্পতিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-১০



১০

মুখোশধারী লোকটি অহনাকে নিয়ে বড় বাড়ির পেছনে যায়। তালাবদ্ধ একটা ঘর। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখা গেলেও মূলত ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। বাইরে লোক দেখানোর জন্য তালা ঝুলানো হয়েছে। লোকটি দরজায় করাঘাত করতেই ভেতর থেকে একজন দরজা খুলে দেয়। লোকটি থপ করে অহনাকে নিচে ফেলে দেয়। গা ঝেড়ে বলে,' তেজের থেকেও এর ওজন বেশি। সুন্দরী মেয়েরা বেশি ওজন হয় নাকি রে ক্যাবলা?'


ক্যাবলা দাঁত বের করে সাঁয় দেয়,' হ বস। তবে এবারের মাইয়াডা খাসা।'


' এরে নিয়ে আলাদা ঘরে রাখ। এর তেজ বেশি, সবার সাথে মিশতে সময় লাগবে।'


মাথা দুলিয়ে বলল ক্যাবলা,' জ্বী বস, এখুনি যাচ্ছি।'


মাহতিম রাগের বসে বাইরে ছিল। অদৃশ্য হ‌‌ওয়ার সুবাদে সে ঘুরে বেড়ায় চারিদিকে।

অহনার কথা তার মনে হতেই জানালা দিয়ে উঁকি দেয়। না দেখতে পেয়ে ভাবে ওয়াশরুমে গিয়েছে হয়তো। কিন্তু দশ মিনিট পরেও যখন এলো না তখন মাহতিম ঘরে ঢুকে। কোথাও পায় না। এত রাতে কোথাও যাবেও না। মাহতিম নিজের বোকামির জন্য নিজেকে দোষারোপ করে। সে ভাবে, যদি সে রেগে বের হয়ে না যেত তাহলে এতো কিছু হতো না, তার দেখা উচিত ছিল। সে জানতো অহনা খুব বোকাসোকা মেয়ে। সহজে তার মাথায় বুদ্ধি আসে না। আবার কোনো ভুল করে বসবে। মাহতিম সবসময় তার মনোযোগ অহনার দিকে রাখে, আজ একটু রাগের জন্য ভুল করে বসল।


অহনার ঘোর কে/টে যায়। নিভু নিভু চোখে চারিদিকে তাকায়। অন্ধকার ঘরে কাউকে না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। হাতে-পায়ে বাঁধন দেওয়া‌, মুখেও রুমাল বাঁধা। একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছোটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এক চুল‌ও নড়াতে পারে না নিজেকে। পরিশেষে শান্ত হয়ে দেখতে থাকে। মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না।


রাত আরো গভীর হতেই মুখোশধারী লোকটি আসে। দরজায় ক'ট'ক'ট শব্দ হয়। অহনা চোখ তুলে তাকায়। আবছা আলোয় মুখোমুখি দেখতে পায় একজন ছায়া‌ মানবকে। অহনার চোখে হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যায়। লোকটা একটা দিয়াশলাই কাঠি জ্বালিয়ে নেয়, ফুটে ওঠে তার চেহারা। অহনা দেখতে পায়, এটা মাহতিম নয়, অন্য কেউ। কিন্তু তার মুখ ডাকা। লোকটি এক টানে নিজের মুখোশটি খুলে ফেলে। অহনা দেখতে পায় লোকটি আর কেউ নয়, দুপুরে কথা হ‌ওয়া সে লোকটি, বড় বাড়ির ছোট ছেলে। অহনা কিছু বলতে লাগে, কিন্তু মুখে রুমাল থাকার কারণে শব্দ বের হয় না। লোকটি অহনার মুখ থেকে রুমাল সরিয়ে দেয়, বলল,' তোতাপাখি কি কখনো কথা না বলে থাকতে পারে? তুমি বলো, আমি শুনছি।'


' কু//ত্তা/***র বা////চ্চা।' অহনা গালি দিতেই ফিক করে হেসে ফেলে লোকটি।


' তুমি মনে হয় আমার নাম জানো না তাই ভুল নামে ডাকছো। আমার নাম সোহেল জহরু।'


' আমাকে এখানে ধরে আনলি কেন?'


' ইশশ্, বুকে লাগে কথাগুলো। একটু আদর করে বলো, সুন্দরীরদের আদরমাখা কথা আমার খুব ভালো লাগে।'


' ছেঁ//ড়ে দে শ*য়.  তা*ন।'


' এটা বাংলা সিনেমা না। ডায়লগ বন্ধ করো। নিজ দায়িত্বে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করো।'


' কখখনো না।' অহনা নিজেকে ছোটানোর অনেক চেষ্টা করে। শক্ত দড়ি দিয়ে বেধেছে, সহজে খুলবে না। সোহেল অহনার দিকে এগিয়ে আসে,

' নিজেকে তোমার অসহায় লাগছে না?'


অহনা রপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে,' তুই একটা কাপুরুষ।'


'একদম না, আমি সুপুরুষ। প্রমাণ চাও?'


' আমাকে ছাড় বলছি, না হয় পস্তাবি। ও আসবে, তোদের সবাইকে দেখে নেবে।'


সোহেল ভয় পাওয়ার ভান ধরে বলল,' ওরি বাবা, ভয় পেয়ে গেলাম আমি। এ আসবে, আমাকে মারবে খুব। ভয় পাচ্ছি আমি, খুব ভয় পাচ্ছি।' উচ্ছস্বরে হেসে উঠে সোহেল,' তোমার কান্না, কথা, কেউ শুনবে না, এই চার দেয়াল ছাড়া। যত ইচ্ছে ডেকে যাও সবাইকে।'


' তোকে শেষ করতে ও একাই যথেষ্ট। দেখবি, আসবেই।'


' ওকে অপেক্ষা করি সেই মহামানবের জন্য। আরেকটা কথা বলব তোমায়, ময়নার ব্যাপারে।'


অহনা সচকিত হয়ে উঠে ময়নার কথা শুনে,

' ময়না কোথায়, বলুন আমাকে?'


' আমার কাছেই আছে।'


' ও কোথায়? আমি ওর কাছে যাব।'


' কাল সকালেই তোমাকে তার কাছে পাঠানো হবে। এখন আমার ঘুম পাচ্ছে, এনার্জি নেই একদম। কাল দেখা হবে, গুড নাইট।'


' আমাকে ছাড়....'


সোহেল চলে যায় ঘরের দরজা বন্ধ করে।


সকাল হতেই রোস্তম সারা বাড়ি খুঁজে মেয়েকে, পায় না। এক পর্যায়ে পুরো এলাকা খুঁজে, কোথাও নেই। রোস্তম হাঁউমাঁউ করে কাঁদে, ময়নার পর তার মেয়েটাকেও হারিয়ে গেল।


রোস্তম আর এক মুহূর্তও দেরী করে না। পুলিশের কাছে যায়। ময়নার ব্যাপারেও গিয়েছিল, কিন্তু বিষয়টা আগেই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, মৃ//ত ঘোষণা করা হয়েছিল ময়নাকে। এখন অহনাকে খোঁজার জন্য আবার থানায় ডায়রি করতে গেলে সবাই তাকে পা//গ/ল ভাবে। তাকে বের করে দেয়। তার মামলাটা নেওয়া হয় না। রোস্তম বাড়ি না গিয়ে রাস্তার ধারেই বসে থাকে।


অহনার ঘুম ভাঙতেই সে পিঠে ব্যথা অনুভব করে। বন্দি থেকে সারা শরীর ফোঁড়ার মতো ব্যথা হয়ে যায়। অস্ফূট স্বরে আওয়াজ করে। জনমানব নেই এখানে যে সাহায্য করবে। অহনা স্থির থাকতে পারছে না, ব্যথা প্রচন্ড।


ক্যাবলা হাতে করে দুটো রুটি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। থালাটা এগিয়ে দেয় অহনার দিকে,

' খাইয়া লন।'


অহনা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ক্যাবলা আবারো বলল,' এই জায়গায় এইডাই সকাল বিকালের খানা। না খাইলে সারাদিন না খাইয়া থাকন লাগব।'


' খাব না আমি। নিয়ে যাও এই ময়লা পানি আর বাশি রুটি।'


' তাইলে উপাস থাকেন। বসের আদেশ, না খেলে জোর না করতে।'


ক্যাবলা চলে যেতে চাইলেই অহনা থাকে ডাকে,' ভাই শুনো?'


' হ আপা, কন।'


' আমি খাব।'


' এতক্ষণে লাইনে আইছেন। খাইয়া লন, এইছাড়া উপায় নাই। বসের যারে পছন্দ অয় তারেই নিয়া আহে। কপাল খারাপ আম্নের, সুন্দরী ক্যান আপনি?'


অহনা সুযোগ বুঝে বলল,' হাতের বাঁধন না খুললে আমি খাব কি করে বলো?'


ক্যাবলা এক গাল হেসে বলল,' কি যে কন আপা। খাঁড়ান, আমি খুইলা দিতাছি।'


মূলত অহনার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কোনোমতে বাঁধন খুলে ক্যাবলাকে আক্রমন করবে। 


ক্যাবলা হাতের বাঁধন খুলে দেয়। অহনা বলল,' আপনি ওপাশে ঘুরে দাঁড়ান, কারো সামনে খেতে লজ্জা করে আমার।'


' আইচ্ছা আপা। আমনে খান, বসের আদেশ আপনাকে খাওয়ানোর।'


ক্যাবলা উল্টো দিকে ফিরতেই অহনা পায়ের বাঁধন খুলে নেয়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েই চেয়ারটা হাতে নেয়। শরীরে জোর নেই, তবুও সমস্ত শক্তি দিয়ে ক্যাবলার মাথায় আ///ঘা***ত করে। ক্যাবলা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

অহনা নিজেকে ছাড়াতে পেরে উচ্ছ্বাসিত হয়। বন্ধ ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে। চারিদিকে কেমন অন্ধকার। পাশেই একটা জানালো দেখল অহনা। খুব ছোট সেটা, তাকিয়ে দেখে বড় বাড়ির পেছনের দিক এটা, ফুলের বাগানের কাছে। অহনা দেখল কেউ একজন নয়নতারা ফুল তুলছে। অহনা তাকে ডাকতেই কাঁধে কারো স্পর্শ পায়.....


চলবে.....

বুধবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৯



৯.

অহনা লুকিয়ে লুকিয়ে বের হ‌ওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। লোকটা চলে গেলেই অহনা‌ গেইটে যায়। বের হয়ে বাড়ি যায়। 


বিছানায় বসে মুখে এক হাত রেখে অহনা ভাবতে থাকে, কি করা যায়। রোস্তম আসে,' কিছু পেলি?'


 অহনার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,' নাগো বাবা, পাইনি কিছু। তবে পেয়ে যাব। ও আমাকে আপা বলে ডেকেছে যেহেতু, আমি ওকে খুঁজে বের করবোই।'


' তবে আর খুঁজে কাজ নেই। কিছু পাসনি যেহেতু আর পাবিও না। তুই আর ভাবিস না মেয়েটাকে নিয়ে।'


' এটা কেমন কথা বলছ বাবা? ও আমার বোন। আমি কি আমার বোনকে খুঁজব না? বের করবোই, যেখানেই থাকুক। পারলে পাতাল থেকেও খুঁজে বের করব।'


অহনা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় গাছের আড়ালে বসে থাকে। সাথে নিয়ে এসেছে ময়নার ঘর থেকে নিয়ে আসা রুমালটা। অহনা চোখ বুলায় রুমালের উপর। কিছু চিহ্ন আর আঁকাআঁকি করে রেখেছে। খুব সূক্ষ্ম নজরে দেখল, ছোট ছোট ঘরগুলোতে বাংলা বর্ণমালার কয়েকটা অক্ষর, তা আ হে ব সো ফ ল। অহনা অক্ষরগুলো একে একে সাজানোর চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ পর বের করে এর আসল মানে। একটা নাম সোহেল এবং অপরটি আফতাব। রুমালের শেষাংশে ছোট একটি মেয়ের চেহারা ফুটে উঠেছে, চোখে পানি, তার কাঁধে হাত রেখে আছে আরো কিছু মেয়ে। 


নাম দুটো অহনার অচেনা মনে হলো। ঘরে গিয়ে রোস্তমকে জিজ্ঞেস করে,' বাবা, আফতাব বা সোহেল নামের কাউকে চেনো?'


' হ, পাশের এলাকার, বড় বাড়ির মালিক আর তার ছেলে।'


' বড় বাড়ি কোনটা বাবা?'


' ময়নার শশুর বাড়ি বললি না। সেটাকেই সবাই বড় বাড়ি বলে।'


অহনার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে গেল যে কিছু একটা বিষয় নিশ্চয় আছে। কিন্তু এখন কি করা উচিত। অহনা বসে বসে ভাবে, প্রথমে সে ঐ বাড়িতে যাবে, গিয়ে দেখবে ময়না আছে কিনা। তারপর পদক্ষেপ নেবে।


কল আসে ইরার। অহনার ভাবনায় ছেদ পড়ল। কল ধরে,

' হ্যালো।'


' হ্যালো পরে বলিস। আগে বল ঐদিন দেখা করলি না কেন?'


' বাবা কল করেছিল, তাই গ্রামের বাড়ি এসেছি।'


' আমাদের কিছু বললি না। হঠাৎ কেন গেলি?'


' আমার মা....' অহনার গলা নরম হয়ে আসে। বলতে পারছে না। হঠাৎ মায়ের কথা মনে হতেই বুক চিঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।


' কিরে পানসা, কিছু বল।'


' আমার মা আর নেই। চলে গেছে আমাকে একা রেখে।'


' যা হয় ভালোর জন্য হয়। তুই কাঁদিস না, তোকে ভেঙে পড়লে হবে না। তোর বাবা কত কষ্ট করে ক্ষেতে-খামারে, তুই ভেঙে পড়লে তাকে কে সামলাবে? তোকে কিছু করতে হবে তোর বাবার জন্য।'


অহনা কান্না থামায়,' ঠিক বলেছিস। আমিতো স্ট্রং, আমি কাঁদবো না।'


' এখন বল, কেমন আছিস?'


' এইতো ভালো। সবাই কেমন আছে?'


' একদম পাক্কা আছে সবাই। তবে তুই ছাড়া ভালো লাগছে না। যদিও তোকে অল টাইম পানসা বলি, তবুও তুই না থাকলে আমাদের আনন্দ আরো পানসে হয়ে যায়।'


' থাক আর বলতে হবে না। তোদের কাছে তো আমার দামটাই নেই।'


' একদম না। তুই আমাদের গুলুমুলু, সুন্দরী বান্ধবী। তবে রাগ করেছি আমি তোর সাথে! এক বালতি রাগ করেছি!'


' এতো রাগ কেন আমার উপর? নাকি বয়ফ্রেন্ডের সব রাগ আমার উপর ঝাঁড়বি?'


' না। রাগ করেছি তোর বোকামি দেখে। ঠিক আছে তুই বিপদের সময় চলে গেছিস। কিন্তু এরপর কি হলো? আমাদের একবার কল করে বলতে পারতি, আমরাও দেখতে যেতাম। এমনকি দুইদিন হয়ে গেল কোনো কল করলি না, আমার কলটাও ব্যাক করলি না।'


' গ্রামে কারেন্টের সমস্যা খুব। চার্জ দিতে পারিনি।'


' আচ্ছা বুঝলাম। আমরা সবাই কি তোকে দেখতে আসব?'


' না লাগবে না। আমি ময়নাকে পেলেই চলে যাব।'


' ময়না কে?'


' আমার বোন।'


' তোর তো কোনো বোন ছিল না। কোথা থেকে আমদানি করলি?'


' সে অনেক কথা। পরে সময় করে বলব, এখন রাখছি।'


ইরা তবুও মানল না। সে সব বন্ধুদের জানিয়ে দিল বিষয়টা। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা অহনার গ্রামের বাড়ি যাবে। পরদিন‌ই র‌ওনা হবে।


রাত হয়ে এসেছে অহনার মনটা খুব খারাপ। এখনো সে ময়নাকে খুঁজে পায়নি। ক্ষতি হবে ভেবে আরো চিন্তায় পড়ে। 


রাত হয়ে এসেছে। অহনা টি শার্ট আর প্লাজু পড়ে নেয়। ব‌ই হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ভীষণ হাঁসফাঁস করতে থাকে। ঘরের দরজার দিকে তাকাতেই একটি ছায়া দেখতে পায়।

'চ' সূচক শব্দ করে বলল,' তুমিতো আমাকে একদম ভয় পাইয়ে দিলে।'


মাহতিম ওর পাশে এসে বসে। কোনো কথা বলে না। অহনা আবার বলল,' সবসময় এতো চুপচাপ থাক কেন? ভাল্লাগেনা।'


কিছুই বলে না‌ মাহতিম। জ্বলজ্বল চোখে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। অহনা আবারো বলল,' সবসময় এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কি আর কিছুই করতে পারো না?'


এবারও কোনো উত্তর না পেয়ে বালিশ ছুঁড়ে মারে মাহতিমের দিকে। বালিশটা তার দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়।

' তুমি খুব বোকা।' মাহতিম মুখ খুলল।


' তোমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বোকা। না হয় এভাবে তাকিয়ে না থেকে এতোক্ষণ কিছু না কিছু বলতে।'


' অপ্রয়োজনে কথা বলো তুমি, ঠিক আগের মতো!'


' আমি অপ্রয়োজনে কথা বলি না তুমি প্রয়োজনে কথা বলো না।'


' ঝগড়া করো না। কোথাও যাবে? তোমার মন খারাপ বুঝতে পেরেছি।'


' আমি কাল কি করব সেটাও জানো কিন্তু ময়নাকে খুঁজতে কোনো সাহায্য করতে পারছ না কেন? আগে এই উত্তর দাও।'


কিছু বলে না মাহতিম। চুপ হয়ে যায় একদম। অহনা আবার বলে,' ইচ্ছে করছে তোমার মাথায় কয়েক হাজার পাথর ভাঙ্গি। কাজের সময় তুমি চুপ।'


' আমি তোমার জন্য ফিরে এসেছি আবার অন্য কারো জন্যে নয়।'


' যাই হোক। জানি না তুমি কোথা থেকে, কেন এসেছো। কিন্তু তবুও মনে হয় তোমাকে যুগ যুগ ধরে চিনি।'


' যাবে?'


' কোথায়।'


'চলো আগে।'


মাহতিম ওকে নিয়ে যায় নিরিবিলি একটা জায়গায়। অহনা আশ্চর্য হয়। ওরা একটি পাহাড়ের উপর। জোনাকিদের মেলা, নিচে নদী, পাখিদের ছন্দ, আকাশের নীলাভ আভা, চারিদিকে পূর্ণিমার প্রখর আলো, এক অপরূপ দৃশ্য। অহনা খুশিতে নেচে উঠে,

' এটা কোন জায়গা?'


মাহতিম উত্তর দেয় না। অহনা খুশি মনে ঝর্ণা ছুঁয়ে দেখে। জোনাকিদের সাথে মজা করে। মাহতিম অবাক হয়ে দেখে। তার চোখ থেকে আগুনের তেজটা কমে এসেছে।


' তোমার চোখদুটো ভয়ঙ্কর। যে কেউ দেখলে ভয়ে জ্ঞান হারাবে। আবার বলো না আমি কেন ভয় পাচ্ছি না! আসলে আমি কোনো কিছুকেই ভয় পাই না। ভয় আমাকে ভয় পায়, তাই আমার কাছে এসেও দূরে যায়।'


অহনার কথা মাহতিম বুঝতে পারে না। তবে তার চোখ মুখের ভাষাটা বুঝে নেয়। এই মুহূর্তে অহনা খুশি।


অনেকক্ষণ হয়ে এসেছে। মাহতিম বলল,' এবার তোমার যাওয়া উচিত।'


' না, আমি যাব না। আমি এখানেই আজ রাত কাটিয়ে দেব।'


মাহতিম কিছু না বলেই চোখের পলকে অহনাকে বাড়ি নিয়ে আসে।

রাগে ফুঁসতে থাকে অহনা,

' কেন নিয়ে এলে আমায়? আমি ওখানে শান্তিতে ছিলাম। জানে আমার কেমন সুনসান লাগে।'


' অনেকক্ষণ না দেখে‌ তোমার বাবা এসেছিল ঘরে।'


' তাতে কি হয়েছে? তুমি নিয়ে এলে কেন? এখন তোমাকে এর শাস্তি পেতে হবে।'


অহনা মাহতিমকে ধরতে গিয়েও পারে না। কারণ সে অদৃশ্য, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অহনা রাগের বশে বলেই ফেলল,' এখন থেকে তিন ঘন্টা তুমি আমার কাছেও আসবে না, কথা বলবে না, একদম আমার ঘরের বাইরে থাকবে। যদি আসো তো.....'


তার আগেই মাহতিম চলে যায়। কষ্ট পেয়েছে হয়তো বা অভিমান। 


রোস্তম ঘরে প্রবেশ করে,' ঘরের কি অবস্থা করেছিস, মনে হচ্ছে কাউকে পিটি*য়েছিস।'


অহনা কিছু বলল না। রোস্তম ওর পাশে এসে বসল, মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রাতের খাবার খেতে বলল তাকে। অহনা খাবে না বলল। রোস্তম বলল,' তবে আমিও আজ উপোস করলাম।'


বাবার এমন জেদ দেখে অহনাও আর রাগ করে থাকতে পারল না। রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে। তবে মনে অনুশোচনা হতে থাকে মাহতিমের জন্য। ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে।


রাত গভীর হতেই মুখোশধারী একজন লোক প্রবেশ করে অহনার ঘরে। অজ্ঞান করে তাকে কাঁধে তুলে নেয়.....


চলবে.....

ছায়া_মানব_পর্ব-৮



৮.

অহনা মাথা ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে। নিজেকে সামলে নেয়। বশিরকে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কি আপনার মেয়ের ডেড বডি দেখেছেন?'


বশির ঝংকার মেরে উঠে,' আমি নিজে হাতে দাফন করেছি আমার মেয়েকে।'


অহনা আরেকটা ঝটকা খায়। লোকটা তার মেয়েকে নিজের হাতে দাফন করলে, কাল যার সাথে দেখা হয়েছে, সে কে?


অহনা পুনরায় বলল,' দয়া করে আপনি পুরো ঘটনাটা বলেন। কি করে আপনার মেয়ে মারা গেল।'


' মেয়ের জামাই কয়দিন আগে মরছে। রাগে দুঃখে মেয়েও গলায় দড়ি দিল।'


' এই বাড়িতেই নাকি শশুর বাড়িতে?'


' মেয়ের শশুর বাড়িতে।'


অহনা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,' আপনি কি তার ঘরটা দেখাবেন আমাকে?'


' নিশ্চয়! আমার মেয়ে খুব শৌখিন ছিল। তার ঘর সবসময় আয়নার মতো ঝকঝকে করতো। বাহারী জিনিসে ভরপুর। আসো আমার সাথে!'


অহনা বশিরের পেছন পেছন যায়। দেখল, ঠিকই বলেছে লোকটা। বাহারী সাজে ঘরটা। অহনার নিজের ঘরের কথা মনে পড়ল। একবার যখন টিকু ওর ঘরে এসেছিল, তখন অহনা ওয়াশরুমে ছিল। বের হতেই টিকু নাক সিঁটকে বলল,' গরুর গোয়ালটাও তোর ঘরের থেকে বেশি সুন্দর। আমার মনে হয় না গরু ছাগল‌‌ও এখানে এক রাত্রি থাকতে চাইবে না।'


অহনা তখন ভেঙচি কেটে বলেছিল,' ভাগ্যিস তুই গরু বা ছাগল না, তাহলে তুইও থাকতে পারতিনা'


বশির অহনাকে পুরো ঘর দেখায়। অহনা দেখে মন ভরে। ওর চোখ যায় একটি রোমালের দিকে। নকশা করা। অহনা অবাক হয় সেই নকশা দেখে। কোন ফুল, লতাপাতা না। এটায় কিছু চিহ্ন আঁকা। অহনা বশিরের অগোচরে সেটা লুকিয়ে নেয়। দেখা শেষে বের হয়ে যায় সে। বশিরের থেকে বিদায় নিতেই সে প্রশ্ন করে,' আমার মেয়েকে নিয়ে তুমি এতো কিছু জানতে চাইলে, কিন্তু আমি জানি না তুমি কে? যদি পরিচয়টা দিতে!'


অহনা বলল,' আমি তার সিনিয়র ছিলাম স্কুলে।'


' কিন্তু আমার মেয়েতো ক্লাস সিক্সের পর আর পড়েনি। এতোদিন পর তুমি তাকে কেন খুঁজতে আসলে।'


অহনা ঘাবরে যায়, বলল,' অনেক আগেই তার সাথে কথা হয়েছিল। কিছুদিন আগে বলতে পারেন। তাই খবর নিতে এসেছিলাম।'


কোনো রকমে বিদায় নিয়ে অহনা চলে যায়। অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে মনে, কিন্তু উত্তর জানা নেই।

অনেক সময় উত্তর আমাদের সামনেই থাকে। আমরা দেখতে পাই না।


অহনা বশিরের থেকে ময়নার শশুর বাড়ির ঠিকানা নিয়েছিল। গন্তব্য এখন ময়নার শশুর বাড়ি।


দুপুরের খাবার খেয়েই অহনা র‌ওনা দেয় ময়নার শশুর বাড়ি। চাকরের সমাগম মানুষের থেকেও বেশি। অহনা গেইট পাড় হতে চাইলেই দারোয়ান তাকে আটকে দেয়। অহনা লম্বা ঘোমটা টেনে বলল,' আমি ভেতরে যেতে চাই।'


দারোয়ান বলল,' ভেতরে বাইরের লোক যাওয়া নিষেধ।'


' আমি তাদের আত্মীয় হ‌ই।'


' কেমন আত্মীয়? এই বাড়িতে ত্রিশ বছর আছি আমি। কোনো আত্মীয় আমার অচেনা না।'


' তাদের বাড়ির ব‌উয়ের সব আত্মীয়কে চেনেন?'


' না।'


' তাহলে? এই বাড়ির মালিকের বাবার ভাইয়ের চাচাতো বোনের ছেলের মেয়েকে চিনেন?'


দারোয়ান কিছুক্ষণ ভেবে নেয়,' না, চিনি না।'


' চিনবেন কি করে, বুড়ো হয়ে গেছেনতো তাই। আমাকে যদি এখন ভেতরে ঢুকতে না দেন, তাহলে আমি গিয়ে বড়বাবুর কাছে নালিশ করব। আপনার চাকরি যাবে।'


' না, ঠিক আছে, আপনি ভেতরে যান। কিছু বলবেন মালিককে।'


অহনা ভেতরে চলে যায়।একজন চাকরানীকে দেখতে পেয়ে অহনা জিজ্ঞেস করে,' তুমি কি এই বাড়িতেই থাক?'


' হ্যাঁ।'


' তাহলে বলো, এই বাড়ির ব‌উ নাকি মা/রা গেছে?'


' কোনডা? ছোডডা না বড়ডা।'


অহনা অবাক হয়ে যায়। বড় ব‌উ না ছোট ব‌উ সে সেটা জানে না। বলল,' দুইজন‌ই।'


' খাঁড়ান আপা। আমি গামলাটা রাইখ্খা আসি।'


মেয়েটা গামলা রেখেই অহনার কাছে আসে।

'তয় আপা কন, আম্নে কি ক‌ইছিলেন?'


' এই বাড়ির দুই ব‌উয়ের কথা।'


' ব‌ড় ব‌উতো দুই মাস আগে মরছে শ্বাসকষ্ট উইঠা। আর ছোডডা গলায় দড়ি দিছে।'


' কেন দিয়েছে তুমি কি জানো?'


' হের জামাইর লাইগ্গা। মাইয়া ভালাই আছিল, জামাইডাও ভালা।' তারপর মেয়েটা অহনার কানের কাছে এসে বলল,' তয় আপা, শশুর বাড়ির লোকজনডি ভালা না। মাইয়াডারে অত্যাচার করত। বড় ব‌উডারেও করছে। এরা এমনিতেও মরতো।'


ভেতর থেকে একজন লোকের আগমন দেখে মেয়েটি সরে যায়। অহনাও পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। অহনা ফুল হাতা শার্ট গায়ে দিয়েছে, হাত কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। গলায় একখানা কালো উড়না জড়ানো। বাতাসের কারণে সেটার কিছু অংশ উড়তে লাগল। ঘর থেকে বের হ‌ওয়া মানুষটি সেটার দিকে চোখ দেয়।


লোকটি এগিয়ে আসে অহনার দিকে,

' ঠিক ধরেছিলাম। এখানে কেউ ছিল। কে তুমি মেয়ে?'


অহনা বের হয়ে আসে। ভয় হচ্ছে তার খুব।

' আমি আমার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে এসছি।'


' কে তোমার বান্ধবী?'


' ময়না।'


' ময়না নামের কেউ এখানে থাকে না। ফিরে যাও।'


' এটা তার শশুর বাড়ি।'


' কালকেই সে মরে গেছে, তুমি হয়তো জানো না।'


' আমি জানি। আর এটাও জানি, সে এখনো জীবিত।'


' এসব উল্টা পাল্টা কি বলছ? সবাই সাক্ষী আছে, জিজ্ঞেস করো।'


' আমি বিশ্বাস করি না। নিজের চোখে না দেখলে কিছুই বিশ্বাস হয় না আমার।'


' তোমার বিশ্বাসের জন্য কি আরেকবার কাউকে মেরে দেখাব?'


' কি বললেন আপনি?‌ কাকে মেরেছেন?'


' কথা বাড়িও না। তোমার মতো মেয়ে কিছুই করতে পারবে না। এখান থেকে চলে যাও ভালোয় ভালোয়, না হয় ময়নার মতোই তোমার অবস্থা হবে।'


' আমি যাব না। কি করবেন করে নিন।'


' কাউকে ছাড় দেই না আমি‌। তোমার ভালোর জন্য বলছি চলে যাও না হয় খারাপ হবে। সুন্দরী মেয়ে বলে ছেড়ে দিচ্ছি, কারণ আবার দেখা হবে।'


লোকটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। অহনা বিরক্ত হয়,

' আপনার হাসি ঠিক আপনার সেই পাকা চুলের মতো বাজে।'


হাসি থামিয়ে লোকটি বলল,' সুন্দরী মেয়েদের গালিতেও শান্তি পাওয়া যায়। তোমার দিকে নজর পড়েছে আমার। এখন‌ চলে যাও, পরে আবার দেখা হবেই হবে। কারণ আমার নজরে পড়েছে। বিদায় সুন্দরী।'


অহনা নাক‌ সিঁটকায়,

' আপনার থেকে গন্ধ আসছে, সরে দাঁড়ান।'


লোকটি চলে যায়। একজন চাকরানী এসে বলল,' এই বাড়িত্তে যেই একবার ঢুকে তারে আর বাইর হ‌ইতে দেখি না। তারা সবাই ক‌ই যায় কেউ জানে না। বিশেষ করে মাইয়ারা।'


' এসব কি বলছো? মানে কি? আর ঐ লোকটা কে?'


' বাড়ির ছোড ছেলে। গাউড়া পুরা। আপা, আম্নে চ‌ইলা যান। বিপদে পড়বেন।'


' আমার চিন্তা করো না। এটা বলো তুমি, ময়নার লাশের চেহারা কি তুমি দেখেছো?'


' না আপা। তারেতো তারাতাড়ি দাফন করা হ‌ইছিলো। তার বাপরেও একবার দেখতে দেয়নাই।'


' ঠিক আছে তুমি যাও।'


মেয়েটি চলে যেতেই অহনা গেইটের দিকে পা বাড়ায়। মুহুর্তেই তার পা থেমে যায়। গাছের আড়ালে চলে যায়। একজন লোক ভেতরে ঢুকছে, তাকে চেনে অহনা। কালকে যে লোকটা ছুরি নিয়ে আক্রমন করেছে, এটাই সেই লোক......


চলবে......

রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৭


৭.

অহনাকে চিৎকার করতে দেখে লোকটি সরে যায়। রোস্তম এসে মেয়েকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। 

' কি হয়েছিল মা? মাথা ঘুরে গেল নাকি?'


' না বাবা।'


অহনা কিছু বলে না রোস্তমকে। যদি চিন্তা করে সে। 


রাতের খাবার খেয়ে যখন সবাই ঘুমাতে যায়, তখন জানালায় খটখট শব্দ শুনতে পায়। অহনার পাশেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ময়না। শব্দ শুনে অহনা উঠে যায়। শব্দের গতি অনুমান করে জানালায় চোখ দেয়। অহনা জানালা খুলে দিতেই তাকে কেউ ছিটকে ফেলে দেয়। বুঝতে পারে, এটা মাহতিম। পরক্ষণেই খেয়াল করে, কেউ তাকে ছু/রি দিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিল। অহনা মাটি থেকে উঠেই দৃষ্টি দেয় সামনে। সন্ধ্যার সেই লোকটাকে দেখতে পায়। অহনা তেড়ে আসে তার দিকে। মাহতিম তাকে থামিয়ে দেয়। 

লোকটা দাঁত কেলিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অহনার দিকে এগিয়ে এসে ছু/রি ধরতেই সেটাকে একটি খেলনা বন্দুক বানিয়ে দেয় মাহতিম। লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে ছু/রিটাকে। কাজ করছে না দেখে এটাকে ফেলে দিয়ে এগিয়ে আসে অহনার দিকে। আবার পেছনে ফিরে যায়। ঘুমন্ত ময়নার মাথার কাছে গিয়ে তাকে আঘাত করতে যেতেই তার হাত শূন্যে ভেসে থাকে। সে কোনোমতেই হাত টেনে নিচে নামাতে পারছে না। এটা দেখে অহনা উচ্চস্বরে হেসে উঠে। জেগে যায় ময়না। সামনে এমন অদ্ভুত একটা মানুষকে দেখে ভয়ে সে দৌড়ে এসে অহনার পেছনে লুকায়।


পাশের ঘর থেকে রোস্তম উঠে আসে। দরজা খুলতে বলে অহনাকে। অহনা ভয় পেয়ে যায়‌। বাবাকে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মাহতিম লোকটাকে ঠিক করে দেয়। লোকটা ভয়ে তড়িঘড়ি হয়ে জানালা দিয়ে লাফ দেয়। বেগোছে পড়ে পায়ে ব্যথা পায়‌। তবুও ভূতের ভয় সাঙ্গ করে পালিয়ে যায়।


অহনা দরজা খুলে দেয়। রোস্তম সারা ঘর খুঁজে বলল,' ঘরে কেউ ছিল মনে হয়? কে দিল?'


' কেউ না বাবা। আমি ছিলাম আর ময়না ছিল শুধু।'


' কেউ চিৎকার করেছে। আর তুই এতো রাতে হাসছিলি কেন?'


অহনা ঠোঁট কামড়ে ভাবে কি বলবে। মাথা চুলকে বলল,' আমি একটা হাস্যরসিক স্বপ্ন দেখেছি, যেখানে তুমি মাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে রেজিনা আন্টিকে জড়িয়ে ধরেছিলে সেটাই দেখলাম।'


' ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।'

রোস্তম কিছুটা ভারী গলায় বেরিয়ে যায়। অহনাও গিয়ে শুয়ে পড়ে। ময়না ভয় পেয়ে আছে তাই অহনা তাকে বোনের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।


সকালে ঘুম ভাঙতেই ময়নাকে বিছানায় দেখতে পায় না অহনা। দৌড়ে বাইরে যায়, দেখতে পাচ্ছে না। তন্নতন্ন করে পুরো বাড়ি খুঁজে কিন্তু পায় না। হতাশ হয়ে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ে। রোস্তম এলাকা খুঁজেও পায় না। হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টা কারো হজম হচ্ছে না। রোস্তম অহনাকে বলল,' মেয়েটা সকালে খুব তারাতাড়ি উঠেছিল।'


অহনা সচকিত হয়,' বাবা, তুমি সেটা আমাকে আগে বললে না কেন? তারপর কোথায় গেল?'


' সকাল ভোরে উঠেই বাইরের চালতা গাছটার নিচে বসে ছিল। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলল না। আমি ঘরে চলে আসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আর দেখতে পেলাম না। কোথাও উধাও হয়ে গেছে। এরপর তুইও উঠে গেলি।'


' কোথায় গেল বাবা? ওর পরিচয়টাও এখনো জানা হলো না।'


অহনা ঠিক করে নদীর পাড়ে যাবে। সেখান থেকে যদি কোনো ক্লু পেয়ে যায় তাহলে খুঁজতে সুবিধা হবে। তৎক্ষণাৎ দেরী না করে অহনা নদীর পাড়ে র‌ওনা দেয়। 


গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হয় মতির সাথে। গ্রামের মোড়লের ছেলে মতি। অহনা তাকে দেখেই কপাল কুঁচকায়। পাশ কেটে চলে যেতে চাইলেই মতি তাকে ডাক দেয়,' অহনা না?'


অহনা দাঁড়ায়, ছোট করে উত্তর দেয়,' হু।'


' বেচারা, মাকে হারিয়ে ফেললাম। কি আর করার, যা হয় ভালোর জন্য‌ই হয়।'


রেগে উঠে অহনা,' আর কিছু বলার আছে?'


' রেগে যাচ্ছিস কেনো? মেলা দিন পর তোরে দেখলাম, একটু কথা বলি ভালো করে।'


' আমার তাড়া আছে, যেতে হবে।'


' সে আমারও রাজ্যের তাড়া থাকে, তাই বলে তোর সাথে দেখা হলো, কথা বলবো না, তা কি হয়?'


' আমি আপনার মতো বেকার মানুষ ন‌ই।'


' তাইলে কি, কয়টা রাজ্য চালাস তুই?'


' আপনার কথা শেষ হলে আসতে পারেন। আমাকে যেতে হবে।'


অহনা পাশ কেটে চলে যায়। মতি ছোট ছোট দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে নিজেকেই বিড়বিড় করে বলে,'সেই ছোট্ট ছোট্ট মেয়েগুলা কবে এতো বড় হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। বিষয়টা দেখতে হবে।'


অহনা নদীর পাড়ে হন্যি হয়ে খুঁজে ময়নাকে। কিছুই পায় না। আশাহত হয়ে যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনি তার চোখ যায় পড়ে থাকা একটা লকেটের দিকে। বালির নিচ থেকে খুব অল্প পরিমাণ অংশ দেখা যাচ্ছে। অহনা বালির ভেতর থেকে বের করে লকেটটি। পরিষ্কার করে ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখে। লকেটটি খুলতেই অবাক হয়। সেখানে ময়নার সাথে অন্য একটি ছবি। অহনা সেটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। রোস্তমকে দেখাতেই সে চিনতে পারে। বলল, পাশের এলাকায় তার বাড়ি। অহনা ঠিক করে, সে যাবে ঐ বাড়িতে। রোস্তম যেতে না করে, কিন্তু অহনা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে, সে যাবেই।


লোকটির ঠিকানা বের করে অহনা র‌ওনা দেয়। একটা অটো নিয়ে তার বাড়ি পৌঁছায়। কয়েকজন লোককে জিজ্ঞেস করে বাড়ির খবর নিয়ে নেয়। 


একটা বহু পুরনো বাড়িতে থাকে লোকটা, নাম বশির। দরজা ধাক্কাতেই বশির ঘুমঘুম চোখে বেরিয়ে আসে। অহনাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে,' কাকে খুঁজছেন আপনি?'


অহনা লকেটটা বশিরের হাতে দেয়। লকেট দেখেই বশির হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। মুহুর্তেই ভেঙে পড়ে। এমনিতেই সারারাত কান্না করে কাটিয়েছে। ভোর রাতের ঘুমটাই চোখে ছিল। অহনার দিকে দৃষ্টি দেয় বশির,' এটা তুমি কোথায় পেলে মামনি?'


' আপনি কি চিনেন এই মেয়েটাকে?'


' আমি তার অভাগা বাবা।'


' তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?'


' আমি জানি না তুমি কে? তুমি হয়তো জানো না কালকেই আমার মেয়েটা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।' বলেই বশির অঝোরে কাঁদতে লাগল।


অহনার পা দুটো অসাড় হয়ে আসে। কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, অহনার মাথায় ঢুকছে না কিছুই। অহনা কাঁধে কারো স্পর্শ পায়। বুঝতে পারে মাহতিম কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। অহনা নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,' আপনি কিছু ভুল বলছেন নাতো?'


' আমি কেন নিজের মেয়েকে নিয়ে মিথ্যা বলব? বাবা হয়ে আমি মেয়ের মৃ/ত্যুর সংবাদ দিচ্ছি, তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলছি?'


' না আঙ্কেল। কিন্তু....'


অহনা থেমে যায়। লোকটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে, এখন তাকে প্রশ্ন না করে সঙ্গ দেওয়াই উত্তম। একটু পর ধীরস্থির হয়ে সব জানতে চাইবে।


অনেকগুলো প্রশ্ন অহনার মাথায় ঘুরপাক খায়। যদি ময়না কালকেই মারা যায়, তাহলে আজ সকাল পর্যন্ত তার সাথে কে ছিল? দেখে তো মনে হয়নি সে মৃ/ত! মাথা ধরে এসেছে অহনার। ময়নাকে সে মৃ/ত ঘোষণা দিতে পারে না.....


চলবে......

শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৬


অহনা আবারো জিজ্ঞেস করে,' বলো কে তুমি?'


অহনা আগ্রহ নিয়ে তাকায় ছায়া মানবের দিকে। সেও পূর্ণ দৃষ্টি দেয়।

' আমি মাহতিম। কিন্তু....'


অহনা উৎসুক হয়ে তাকায়,' কিন্তু কি?‌ আর মাহতিম নামটা আমার খুব চেনা মনে হচ্ছে। মনে পড়ছে না‌ তাও। আমাদের কি আগে কখনো দেখা হয়েছিল?'


' দেখা নয়, আমাদের মনের মিল ছিল।'


' আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।'


' তুমি বলোতো আজ থেকে দুই মাস বা তিন মাস আগে তোমার সাথে কি ঘটেছিল?'


' আমি জানি না। মনে নেই।'


' পাঁচ মাস বা ছয় মাস আগে কি ঘটেছিল?'


অহনা ভাবে। কিন্তু তার ভাব শূন্য। আগামী কিছু মাসের কোনো কথাই তার মনে নেই। মনে পড়ছে না এক মাস আগে কি হয়েছিল!

' আমার মনে পড়ছে না কিছু।'


' কারণ কোনো ঘটনাই তোমার মনে নেই। তুমি....'


ক্লাস শেষে সবাই বের হচ্ছিল তাই ছায়াটি কথা বন্ধ করে দেয়। উধাও হয়ে যায় কোথাও। 


অহনা বাড়ি যায়। একটা ভাড়া বাড়িতে থাকে। মালিক একজন মহিলা। খুব খিটখিটে মেজাজের তিনি। একদম অনিয়ম পছন্দ করে না। হ্যারি কল করে অহনাকে,

' ক‌ই গেলি তুই? পার্টি এরেঞ্জ করেছি, আসবি কখন?'


' স্যরি ব্রো, আমার মনে ছিল না। ক্লাস শেষে বেরিয়ে পড়েছি। শরীরটা ভালো নেই, আমি ঘুমাব।'


' তোর ঘুমের মা* বাপ। এখন আসবি তুই। এতো কিছু জানতে চাই না।'


' আচ্ছা আসছি, দশ মিনিট লাগবে।'


অহনা নিজেকে জোর করে ঠেলতে ঠেলতে পুনরায় কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে কাউকে দেখতে পেল না। তাই কল করে হ্যারিকে। হ্যারি বলল তাদের বাড়িতে আসতে। অহনা রেগে যায়,' একটু আগে কলেজে আসতে বললি, এখন তোর বাড়ি যাব কেন? আমাকে কি ঘানি টানার বলদ পেয়েছিস নাকি?'


' ওফফ্ রাগ করিস না। তোর কি মাথা খারাপ নাকি? পার্টি বাড়িতে না করে কি কলেজের অফিস রুমে করব নাকি?'


' আচ্ছা আসছি। কথা বাড়াবি না আর।'


অহনা কলটা রাখতেই তার বাড়ি থেকে কল আসে। অহনার বাবা কল করেছে। কাঁদছেন তিনি,' মা তুই কেমন আছিস?'


' আমি ভালো বাবা, তুমি কেমন আছো? গলাটা এমন শুনাচ্ছে কেন?'


অহনার বাবা রোস্তম আলী ঝরঝর করে কেঁদে উঠে,' তোর মা আর আমাদের মাঝে নেই রে।'


অহনা আঁতকে উঠে,' কি বলছো বাবা? তুমি মায়ের কাছে কল দাও, আমি কথা বলব।'


রোস্তম নিজেকে সামলে নেয়,' হ্যাঁ রে মা, সুমা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তুই তারাতাড়ি তোর মাকে দেখতে আয়। তোকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিল, পারেনি। তুই তাকে শেষ দেখে যা।'


' বাবা তুমি কাঁদবে না, আমি আসছি এখুনি।'


অহনার মনটা যেন মুহুর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মা তাকে দেখতে চেয়েছিল, শেষ দেখা আর দেখতে পেল না। ছুটে যায় মায়ের কাছে গ্রামের বাড়িতে। 


হ্যারি কল করতে থাকে বার বার। লোকেশন ট্রেক করে জানতে পারে সে আসছে না, অন্য কোথাও যাচ্ছে। 


অহনা বেলা একটার সময় বাড়ি পৌঁছায়। মাকে খাটিয়ারে দেখে অঝোরে কেঁদে উঠে। পাগলের মতো আচরণ করে সে। মাকে সে কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবে না। জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্না করে। রোস্তম তাকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে নেয়। দাপন করা হয় অহনার মাকে।


অহনা দক্ষিণ জানালার পাশে মুখ করে বসে আছে। টিনের চালে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। অহনার মনে হলো, মা তাকে বলেছিল বৃষ্টির সময় যদি আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হয় তাহলে সেটা পাওয়া যায়। অহনা কেঁদে কেঁদে মাকে ফেরত চাইল। রোস্তম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।


 সারাদিন কিছু খায়নি অহনা। রোস্তম কিছু খাবার নিয়ে আসে। অহনা দক্ষিণের দুয়ারে তাকিয়ে আছে। কিছুই মুখে রুচছে না। একমনে তাকিয়ে থেকে একসময় আন্দাজ করে, তার পাশে কেউ বসে আছে। অহনা খাবারের থালা হাতে নিয়ে বলল,' বাবা, তুমি এখন বিশ্রাম নাও, আমি খেয়ে নেব।'


রোস্তম চলে যায়। অহনা পাশে না ফিরেই বলল,' ভাবি নি এখানেও আসবে।'


'‌আমার যে আসতেই হতো।'


' কেন?'


' তুমি এখানে।'


' আমার বাড়িতে আমি এসেছি। তোমার কাজ কি?'


 ছায়া মানবটি কিছু বলে না। সেও দক্ষিণে তাকিয়ে থাকে। অহনা বলল,' উত্তর নেই?'


ছায়াটি সরে যায় অহনার থেকে। সে উত্তর দিতে চায় না। গলায় বিঁধে তার।


বিকেল হতেই অহনা ঘুম থেকে জেগে উঠে। সন্ধ্যা হবে হবে প্রায়। গ্রামের নাম ইলাশপুর। গ্রামের পাশেই একটি নদী। অহনা সন্ধ্যা উপভোগ করতে নদীর পাড়ে যায়। 

মিষ্টি বাতাসে গা এলিয়ে দেয়। পেছন থেকে কারো চিৎকার শুনে অস্বাভাবিকভাবে ভয় পেয়ে যায়। দেখল সাদা থান পড়া একটি মেয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। অহনা ভাবল এটা তার চোখের ভ্রুম। কিন্তু একদম কাছে চলে আসায় বিশ্বাস করল, এটা জলজ্যান্ত একটা মানুষ। মেয়েটির বয়স পনেরো কি ষোলো হবে। তার শরীরে ক্ষতের চিহ্ন। কেউ তাকে খুব মেরেছে। মেয়েটি অহনাকে বলল,' বোন আমাকে বাঁচাও। ওরা খুব নিষ্ঠুর, আমাকে মেরে ফেলবে।'


অহনা অভয় দেয়,' কেঁদো না তুমি, কেউ কিছু করবে না। আমি আছি।'


' ওরা ভয়ঙ্কর। আমাকে লুকিয়ে ফেলো বোন, আমাকে লুকিয়ে ফেলো।'


'‌ভয় পেয়ো না। তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে চলো।'


অহনা মেয়েটিকে নিয়ে নিজের ঘরে যায়। রোস্তম জিজ্ঞেস করলে বান্ধবী বলে পরিচয় দেয়। অহনা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে,' তোমার নাম কি বোন?'


মেয়েটি ঢকঢক করে গ্লাসের সব পানি সাবার করে বলল,' ময়না.... আমার নাম ময়না। বাবা আদর করে মনি ডাকত।'


' ওহ... তোমার বাবা কোথায়?'


' বাবা, বাবার বাড়িতে।'


' তোমার কি আর কেউ নেই?'


ময়না কেঁদে উঠে,' আমার কোনো কালেই আপন কেউ ছিল না। আজ একদম নেই, আরো নিঃস্ব আমি।'


' তোমার কি হয়েছিল, খুলে বলো আমাকে?'


' আমার খুব ক্ষুদা লেগেছে আপা, আমাকে কিছু খেতে দেবে?'


অহনা লজ্জিত হয়। মেয়েটাকে হাজারটা প্রশ্ন করছে কিন্তু তার যে ক্ষুদা লেগেছে কিনা একবারও জিজ্ঞেস করেনি।


' তুমি বসো, ভয় পেয়ো না। আমি এখনি যাব আর খাবার নিয়ে আসব।' 


অহনা রান্নাঘরে যায়। পাতিলের ডাকনা উঠিয়ে দেখল খাবার স্বল্প। সেটাই বেড়ে নিয়ে আসে অহনা। ময়না গপাগপ করে খেতে থাকে। মনে হলো অনেকদিনের অনাহারি সে। অহনা ময়নার খাওয়ায় দেখে মনভরে। 


খাওয়া শেষে অহনা তাকে বলল,' এখন তোমার বিশ্রাম নেওয়া দরকার বোন। তুমি বরং কিছুক্ষণ গা এলিয়ে নাও। ততক্ষণে আমি ভাত রেঁধে আসি।'


' আচ্ছা আপা।'


আপা শব্দটা অহনার হৃদয়ে গিয়ে লাগে। কত মায়া জড়ানো কন্ঠে ময়না তাকে আপা ডাকল। অহনা ময়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে যায়। রান্নাঘরের কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। অহনার মা কখনো মেয়েকে দিয়ে কাজ করাতো না। ছোট থেকেই কষ্ট করে শহরে পড়াশোনা করাচ্ছে। ছুটিতে এলেও তাকে আদর যত্নে রাখত। কখনো তার ঘর কন্যার কাজ করতে হয়নি। অহনা রান্নার জন্য কাঠ আনে, কিন্তু কোনমতেই আগুন ধরাতে পারে না। ধোঁয়ায় তার চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে আসে। এমতাবস্থায় তার চোখ যায় রান্নাঘরের জানালায়। ধোঁয়া যাওয়ার জন্য যে সুড়ঙ্গটা রেখেছে সেটা দিয়ে কেউ দেখছে। অহনা উপরে তাকাতেই সরে যায় সেটি। অহনা আবার চেষ্টা করতে থাকে আগুন ধরানোর, আবার সে কাউকে দেখতে পায়। জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অহনা। কাউকেই দেখে না।

অহনা আবার ফিরে আসতেই উঁকি দেয় সে মানব। মাথার চুল তার নজরুলের মতো লম্বা, খোঁচা খোঁচা দাড়িতে মুখ ভর্তি। সে পকেট থেকে একখানা ছু*রি বের করে। অহনা ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে.....


চলবে......

বুধবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৩

"ইন্টারগ্যালাক্টিক যাত্রী"


একে অপরের দিকে তাকানো বিশাল উষ্ণ সূর্য তাদের দেখাচ্ছিল। এটি বেহেঁড়ে বাস্তবতা থেকে সরে যাওয়া দেখে একটি উচ্চতা অফিসারের নয়, বরং একটি পরমাণু বিমানের গেজেটের প্রযুক্তি ছিল। তার সাথে সাথে, ক্যাপ্টেন আর্চার স্পেসশিপ "স্টারলাইট" এর নির্দিষ্ট উপযুক্তি নেয়।

"স্টারলাইট" এ আরো তিনটি মেক্যানিক্যাল আর্ম এবং একটি প্রায়শক্তি ইন্জিন ছিল, যা স্পেস ট্রাভেল সম্পর্কে নতুন মানবজনের দৃষ্টিতে একটি শক্তিশালী স্যুপারনোভা ছিল।

ক্যাপ্টেন আর্চার তার নেভিগেটরে বসে এবং কোর্স বিভাগের নেভিগেটর রবটিক কমান্ডার "রোভো" সাথে সাথে তাকানো বিশাল উষ্ণ সূর্যে একটি সূচনা পান। "রোভো, এই সমস্যাটি কি?"

"স্যার, এটি দেখা যাচ্ছে যে এই সূপারনোভাটি আমাদের সময় এবং স্পেসশিপের অকেক সিস্টেমের সঙ্কেত ধ্বংস করছে।"

স্যুপারনোভাটির প্রকট নিশান আর্চারের মাথায় দেওয়ার সাথে সাথে সবকিছু শব্দের প্রতিধ্বনি দিল। সূর্য দেখে অপরের প্রাণীরা দুইটি হৃদয়ের মাঝে সাংঘটিত হয়ে যাচ্ছিল।

তাদের একটি সুবিধানিষ্ঠ স্পেসক্র্যাফটি নির্মাণ করতে আর্চার এবং তার দল একসাথে আসলে, তারা সূপারনোভাটি থেকে সার্বিক সুরক্ষিত থাকতে পারতে।

কোন অদৃশ্য শক্তির আগুন স্যুপারনোভাটি দিয়ে নেমে যাচ্ছিল, এবং এটি স্পেস

মঙ্গলবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৩

ছায়া_মানব_পর্ব-৫



৫.

অহনা ছায়া মানবটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। ছোটার চেষ্টা করে না সে। আস্তে আস্তে তার চেহারা স্পষ্ট হতে থাকে। অদৃশ্য হয়ে ধরেছিল অহনাকে, কিন্তু এখন আস্তে আস্তে তার আসল রুপ বেরিয়ে আসছে। অহনা দেখছে তাকে। এক পর্যায়ে পুরো শরীর দৃশ্যমান হলো। অহনা তার কোল থেকে নেমে পড়ে। অবাক হয়ে যায়। কাল রাতে যার সাথে আকাশ ভ্রমণ করছিল, এটা সেই লোক। অহনা খপ করে তার হাত ধরে ফেলে। 

হাত ধরতেই মনে হয়, এই স্পর্শ তার খুব চেনা। এই হাতে আরো অনেকবার হাত মিলিয়েছিল। অহনা জিজ্ঞেস করে,' কে তুমি?'


তখন‌ই অহনার ফোনে কল আসে। কল ধরতেই ওপাশ থেকে শব্দ আসে,

'তুই কোথায় রে তারাতাড়ি আয়। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।'


হ্যারির গলা পেয়ে অবাক হয় অহনা। হ্যারি তাকে দোষারোপ করছিল সব কিছুর জন্য। এখন ডাকছে কেন? অহনা উত্তর দেয়,' এইতো ভাই, বিশ মিনিট পরেই আমি আসছি।'


' তারাতাড়ি আয়। আজ পার্টি হবে।'


অহনা কল রেখে দেয়। পাশে তাকিয়ে দেখে সুযোগ পেয়ে ছায়া মানব উধাও। রাগ হয় তার। মনে মনে গালি দিতে থাকে। পরক্ষণেই মনে হয়, ছায়া মানব তার মনের কথাও জেনে নেয় পরপরই লজ্জিত হয়।


অহনা তৈরি হয়ে কলেজে চলে যায়। দেখা হয় হ্যারি, টিকু, রুমি আর ইরার সাথে। অহনা দেখে তারা এগিয়ে আসে। রুমি বলল,' কিরে, এতো দেরি করলি কেন?'


' একটু বেশি ঘুমিয়েছিলাম, তাই। কিন্তু কালকের কথা কি তোদের কারো মনে নেই?'


' কি বলছিস এসব? কি মনে থাকবে?'


অহনা আর কিছু বলে না। এতো সহজে সবটা ভুলে যাওয়ার মতো পাবলিক তারা নয়। মোবাইলে তাকাতেই দেখতে পায় মেসেজ,' সুস্থ হ‌ওয়ার পর ওদের স্মৃতি মুছে দিয়েছি। তারা ভ্রমণের বিষয়টাও ভুলে গেছে। ওদের আচরণে তোমার কষ্ট হবে ভেবেই এটা করলাম।'


অহনা খুশি হয়ে মোবাইলে চুমু খায়। এদিকে সবাই ড্রেককে একের পর এক ফোন দিতে থাকে। কল লাগছে না। লোকেশন ট্রেক করে দেখল, মোবাইলের লোকেশন বান্দরবান দেখাচ্ছে। টিকু বিশ্রী এক গালি দিয়ে বলে,' শা* আমাদের না বলে কেমন ঘুরতে চলে গেল। বা* আসলে তারে এমন কেলানি কেলাবো, আমাদের জমের মতো ভয় পাবে।'


ইরা অহনার কাছে এসে দাঁড়ায়,' কিরে, কার মেসেজে চুমু খাচ্ছিস?'


অহনা হকচকিয়ে উঠে। মোবাইলটা লুকিয়ে নিতেই ইরা কেড়ে নেয়।

' দেখি তো কাকে মেসেজ করছিস? আমাদের জিজু নাতো আবার?'


' তেমন কিছু না। দিয়ে দে মোবাইলটা।'


ইরা কোনো কথা না শুনে মেসেজগুলো দেখে। উপরের লেখাটা দেখেই কেমন অদ্ভুত হয়ে যায়। অহনা ভয়ে আছে। যদি ইরা সব বুঝে যায় তাহলে কি হবে?


' কিরে, এসব কোন গাধার সাথে মেসেজ করলি। কেমন অদ্ভুত কথা। এই মাতালকে ক‌ই পেলি? কার স্মৃতি কেউ মুছে দিয়েছে?' বলল ইরা।


' আরে দূর, এটা আমার এক কাজিন। ভৌতিক কথা বলতে ওর ভালো লাগে। কেউ আড্ডা দেওয়ার নেই তাই আমার সাথে কথা বলে। আমরা এসব হাবিজাবি অনেক কথাই বলি। তুই বুঝবি না।'


' তুই যেমন, তোর কাজিন‌ও তেমন।'


ইরা হেসে মোবাইল দিয়ে দেয়। অহনা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ক্লাসে ঢুকে সবাই মিলে। অহনা লক্ষ্য করল পাশের রুমে কিছু অঘটন ঘটছে। অহনা ওদেরকে বসতে বলে সেখানে চলে যায়। দেখল কলেজের ভেতরেই ছেলেটা জুনিয়র একটা মেয়েকে রেগ দিল। অহনা ছিল সিনিয়র। ছেলেটা তার ক্লাসমেট। বলা হয়েছিল ছেলেটাকে কিস করতে হবে। গ্রাম থেকে আসা মেয়েটি রাজি হলো না বলে সবগুলো ছেলে তাকে ঘিরে ধরল। কথা একটাই, যেকোনো একজনকে কিস না করলে তারা সবাই মেয়েটাকে কিস করবে। এমন উদ্ভট নিয়ম দেখে অহনা আর স্থির থাকতে পারল না। এগিয়ে গেল।

অহনাকে দেখেই অনিত বলল,' এখানে ছোটদের রেগ দেওয়া হচ্ছে, তুমি তোমার ক্লাসে যাও।'


অহনা রেগে যায়, বলল,' এটা রেগ না। মেয়েটাকে অসম্মান করা হচ্ছে। ওদের যেতে দাও, না হয় আমি তোমাদের এমন হাল করব যে কাউকে দেখাতে পারবে না।'


' কি করবে তুমি, হ্যাঁ? এটা আমাদের কলেজ, আমরা যা ইচ্ছা করব। তোমাদের মেয়েদের এতো জোর আসে কোথা থেকে। তোমরা শুধু আমাদের কথায় উঠবে আর বসবে, এছাড়া কিছু নয়।'


অহনা রাগে ছেলেটিকে থাপ্পর দিতে যায়। থাপ্পর দেওয়ার আগেই সে হাতটা ধরে মুছড়ে পেছনে দিক বরাবর নিয়ে যায়,' এই কচি হাত, কাউকে চর মারার জন্য নয়, তাকে আদর করার জন্য।'


অহনার শরীর রাগে ফুঁসে ওঠে। ছেলেটির অন্ডকোষ বরাবর লাথি দেয়। মুহুর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বন্ধুর এমন অবস্থা দেখে আর কয়জন এগিয়ে আসে। অহনা দু'হাতে দুটোর গলায় ধরে আছাড় মারে। এতেই সবাই ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে বেরিয়ে যায় সবাই। অনিত বের হ‌ওয়ার সময় বলে যায়,' দেখে নেব তোকে। ম* তোর তেজ বের করব।'


অহনা মেয়েটিকে তার ক্লাসে পাঠিয়ে দেয়। নিজের হাতে দিকে তাকিয়ে দেখে, হাতটাতো নরম লাগছে, কিন্তু একটু আগে কেমন শক্তিশালী ছিল, হাত দুটো টান টান শক্ত ছিল। এখন তো ফুলকে টোকা দিলেও ব্যথা পাবে না।


অহনা ক্লাসে বসে ছিল। হঠাৎ মনে হলো কেউ তার পাশেই বসে আছে। তার শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে। অহনা সরে বসে। আবারো মনে হয় কেউ তার কাছে, খুব কাছে। অহনা প্রশ্ন করে,' তুমি কি আমার পাশে?'


উত্তর আসে না। শিক্ষক দেখল অহনা অমনোযোগী, তাকে দাঁড়াতে বলে। অহনা কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষক প্রশ্ন করে,' একা একা কার সাথে কথা বলছ?'


অহনা আমতা আমতা করে বলল,' না স্যার। আমি কারো সাথে কথা বলিনি।'


' আমি স্পষ্ট দেখলাম। ক্লাসে মনোযোগ দাও, আর না হয় বেরিয়ে যাও।'


' স্যরি স্যার। আর ভুল হবে না।'


' সিট ডাউন।'


অহনা বসেই ছায়া মানবকে উদ্দেশ্য করে বলে,' তোমার জন্য‌ই এসব হলো। আমি জানি, তুমি এখানেই, আমার পাশেই আছ। কথা বলতে পারো না নাকি ব্রাশ করোনি?'


অহনার কথায় ছায়া মানবটিও কেমন শব্দ করে হেসে উঠে। তবে সেটা অহনা ছাড়া আর কেউ শুনতে পায়নি। ছায়াটি জানালার কাছে চলে যায়। অহনা জানালার দিকে তাকিয়ে হাসে। আবারো শিক্ষকের নজরে পড়ে যায়। শিক্ষক ঝাঁঝালো বাক্য বলল,' এখনি বেরিয়ে যাও বলছি।'


' স্যার, আমি.... আসলে....'


' বেরিয়ে যাও।'


অহনা বেরিয়ে যায় ক্লাস থেকে। বেরুতেই ছায়া মানবটি তার পাশে এসে দাঁড়ায়। পিনপতন নীরবতা, অহনা রেগে আছে। মুখ ফুলিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে,' তোমার যোগ্যতা নেই আমার পাশে দাঁড়ানোর। অপরিচিত কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকুক সেটা আমি চাই না।


ছায়া মানবটি চোখ তুলে তাকায় অহনার দিকে,' তুমি নিজেই ভুলে গেলে, আমি অপরিচিত কি করে হ‌ই?'


অহনা ভালো করে দৃষ্টিপাত করে। কোনভাবেই মনে পড়ছে না।

' কিন্তু আমি তোমাকে চিনি না। কে তুমি?'


' আমি....


চলবে......

<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-3025496335450504"

     crossorigin="anonymous"></script>

<ins class="adsbygoogle"

     style="display:block"

     data-ad-format="fluid"

     data-ad-layout-key="-fb+5w+4e-db+86"

     data-ad-client="ca-pub-3025496335450504"

     data-ad-slot="4868183911"></ins>

<script>

     (adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

</script>

ছায়া_মানব_পর্ব-২১

  অহনা জানালার কাছে যেতেই মতি এগিয়ে আসে। অহনা জানালা বন্ধ করে দিতে চাইলে মতি ধরে ফেলে, '‌আমাকে দেখতে ভালো লাগে না, সেটা না হয় মানলাম। ...